পৌরাণিক কিছু সূত্রে তিনি প্রথম জীবনে দস্যু রত্নাকর | আবার কোথাও তিনি ব্রাহ্মণ পুত্র | জীবনের প্রথমার্ধ নিয়ে সংশয় বা দ্বিমত থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে কিন্তু তিনি ভাস্বর আদিকবি বাল্মীকি পরিচয়ে | প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার রীতি ছিল কেউ জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ হবে না | ব্রহ্মত্ব অর্জন করলে তবেই তিনি ব্রাহ্মণ | সমাজের সবাইকে অধিকার দিতে হবে ব্রহ্মত্ব আয়ত্তের | এমনকী ব্রাহ্মণ বংশে জন্মালেও প্রমাণ দিতে হবে সেই জ্ঞানের | তবেই দ্বিজত্ব প্রাপ্ত হবে |
সেই তত্ত্ব যে পরের দিকে পালিত হয়নি তা বলার অপেক্ষা রাখে না | কিন্তু প্রথমার্ধে যে এই রীতি ছিল‚ তার সমর্থনে অনেকেই দস্যু রত্নাকরের উপমা দিয়ে থাকেন | নৃশংস দস্যু ছিলেন রত্নাকর | পথচারীর কাছ থেকে সর্বস্ব লুঠ করে তাকে হত্যা করতেন |

একদিন সামান্য পথচারী ভেবে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন নারদের উপরে | হুঙ্কার দিলেন‚ যা আছে নারদ যেন দিয়ে দেন | একটুও ভীত না হয়ে স্মিত হেসে দেবর্ষি বললেন তাঁর কাছে পরনের পোশাক ব্যতীত কিছু নেই | তাঁর এই ভয়হীন আচরণে বিস্মিত হলেন রত্নাকর | তখনও তিনি জানেন না তাঁর সামনে দন্ডায়মান ব্যক্তির সম্যক পরিচয় |
নারদ তখন বললেন‚ তুমি যে এই দস্যুবৃত্তি করছ‚ এই পাপের ফল কিন্তু কেউ নেবে না | তোমার পরিবারও নয় | তুমি গিয়ে জিজ্ঞাসা করো |

বিশ্বাস করতে না পেরে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন রত্নাকর | বাবা‚ মা‚ স্ত্রী‚ পুত্র‚ কন্যা‚ সবাই বলল‚ সংসার চালানো তাঁর কর্তব্য | পিতা হিসেবে‚ স্বামী হিসেবে‚ পুত্র হিসেবে সেটাই করেন তিনি | কিন্তু তাঁর পাপের ফল কেউ নেবে না |

দস্যু রত্নাকর বুঝলেন তিনি যা করছেন সবই অন্তঃসারশূন্য | দেবর্ষি নারদের কথায় তিনি রামচন্দ্রের ধ্যান শুরু করলেন | কিন্তু দস্যু জিহ্বায় রাম নাম আসে না | নারদের পরামর্শে বলতে শুরু করলেন মরা মরা | সেটাই উল্টে গিয়ে রাম রাম হয়ে গেল | গভীর তপস্যায় মগ্ন রত্নাকরের দেহে গড়ে উঠল উইয়ের ঢিপি বা বল্মীক | তিনি পরিচিত হলেন ঋষি বাল্মীকি নামে | এসবই অবশ্য প্রচলিত কাহিনী | প্রামাণ্য পৌরাণিক সূত্রের দাবি‚ বাল্মীকির নাম ছিল অগ্নি শর্মা | তিনি ছিলেন ভৃগুর বংশধর | পিতার নাম প্রচেত বা সুমালি | 

খ্রিস্টের জন্মের ৫০০ থেকে ১০০ বছর আগে বাল্মীকি রচনা করেছিলেব রামায়ণ | সাত কাণ্ডের মহাকাব্যে আজ ২৪ হাজার শ্লোক | বাল্মীকিকে বলা হয় সংস্কৃত ভাষাত আদিকবি | তাঁর আশ্রমেই আশ্রয় পেয়েছিলেন স্বামী পরিত্যক্তা অন্তঃসত্ত্বা সীতা | জন্ম নিয়েছিলেন লব ও কুশ | রামচন্দ্র-সীতার যমজ পুত্র | বাল্মীকির নির্দেশে লব ও কুশ রামচন্দ্রের সভায় গিয়ে গেয়েছিলেন‚ পাঠ করেছিলেন সমগ্র রামায়ণ | একেই বলা হয় সংস্কৃত ভাষায় প্রথম অভিনয় | সেই থেকেই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বলা হয় কুশীলব | লব কুশের নাম থেকে |

বাল্মীকি কী করে প্রথম শ্লোক লিখলেন তার নেপথ্যে সক্রিয় এক আখ্যান | একদিন তিনি গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছিলেন | পিছনে বস্ত্র বহন করে শিষ্য ভরদ্বাজ | পথে তামস বা তমসা নামে এক উচ্ছ্বল নদী পড়ল | তার কাকচক্ষু স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হলেন বাল্মীকি | শিষ্যকে বললেন সেদিন আর গঙ্গায় নয় | স্নান করবেন ওই খরস্রোতায় |

স্নানের সময়ে ওই নদীতে বাল্মীকি দেখলেন মৈথুনরত সারস বা ক্রৌঞ্চ জুটিকে | সেই মনোরম দৃশ্যে মোহিত হয়ে পড়লেন তিনি | কিন্তু মুহূর্তে খানখান হয়ে গেল সেই সুখকর পরিবেশ | দূর থেকে নিক্ষেপিত শরাঘাতে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হল পুরুষ সারসের | তাকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে তীব্র চিৎকার করতে লাগল সঙ্গিনী | লহমায় শোকাঘাতে মৃত্যু হল তারও | মৈথুনরত জুটির এই পরিণতি দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হলেন বাল্মীকি |

এতক্ষণে অকুস্থলে এল সেই ব্যাধ‚ যে শরনিক্ষেপ করেছিল | তাকে দেখে ক্রোধানলে কম্পমান বাল্মীকি উচ্চারণ করলেন‚ “मां निषाद प्रतिष्ठां त्वमगमः शाश्वतीः समाः।
 यत्क्रौंचमिथुनादेकम् अवधीः काममोहितम्॥’ (মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ |
যৎক্রৌঞ্চমিথুনাকেদম অবধীঃ কামমোহিতম || )

অর্থাৎ‚ ব্যাধ‚ তুমি শাশ্বত লাভের ( মৃত্যু) ক্ষণ অবধি এক মুহূর্তও শান্তিলাভ করবে না | কারণ তুমি মৈথুনরত ক্রৌঞ্চদের বধ করেছো | এই দুই পংক্তিকেই রাজভাষা সংস্কৃতে রচিত প্রথম কাব্যশ্লোক বলে মনে করা হয় | আদিকবি প্রণীত আদিশ্লোক‚ যার উপরে দঁড়িয়ে আছে সমগ্র সংস্কৃত সাহিত্য | 

আরও পড়ুন:  চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রহর গুনছে পৃথিবীর চতুর্থ ক্ষুদ্রতম দেশ

NO COMMENTS