অনুপম মুখার্জির ক্যামেরায়

বেড়াতে যাওয়ার টিকিট না পাওয়াও যে কত আনন্দের হতে পারে‚ টের পাচ্ছেন তিন বন্ধু | যুগান্তকারী আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে চলেছে কলকাতার এই ত্রয়ীর নাম |

এতদিন নেকড়ে বলতেই বাঙালির মনে আসত লালমোহন গাঙ্গুলি আর মন্দার বোসের কথা | আফ্রিকায় যে নেকড়ে বিশেষ নেই‚ এই তথ্য এরা ছাড়া কজন বাঙালি জানেন বলুন ! কিন্তু সুন্দরবনেও যে নেকড়ে আছে সে কথা সারা বিশ্ব জানল তিন ছবি-নেশাড়ুর দৌলতে |

অনুপম মুখার্জি‚ শুভায়ু পাল ও ঋদ্ধি মুখার্জি | ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন তিন বন্ধু | নেশা বন্যপ্রাণীর ছবি তোলা | পেশা অবশ্য আলাদা | প্রথম দুজন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী | ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে ঋদ্ধি নিজেও একটি সংস্থার কর্ণধার |

বাঁ দিক থেকে – অনুপম‚ শুভার্থী‚ খোকা‚ গৌরাঙ্গ (বোট চালক)‚ মৃত্যুঞ্জয় (গাইড – ইনিই প্রথম দেখেন সুন্দরবনের নেকড়ে)‚ শুভায়ু‚ ঋদ্ধি

তিনজনে মিলে ভেবেছিলেন গুড ফ্রাইডে-এর লম্বা উইকএন্ডে যাবেন বক্সা-জয়ন্তী | কিন্তু ট্রেনের টিকিট পাওয়া গেল না | অগত্যা হাতের কাছে সুন্দরবন |

শুক্রবার তিনজনে কলকাতা থেকে রওনা দেন সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ | গাড়িতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগল গতখালি পৌঁছতে | সেখান থেকে নৌকায় সজনেখালি আরও দেড় ঘণ্টা | ঘড়িতে প্রায় সোয়া চারটে | সেদিন জঙ্গলে ঢোকার অনুমতি আর পাওয়া যাবে না | পরের দিনের জন্য নিয়ে নিলেন সরকারি অনুমতি |

অনুমতির পাশাপাশি পেয়ে গেলেন চেনা‚ পুরনো গাইড মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলকে |

একগাল হেসে জানালেন‚ দাদা‚ কাছেই জ্যোতিরামপুর গ্রামে একটা প্রাণী হানা দিচ্ছে | গত কয়েকদিন ধরে গ্রামে ঢুকে নিয়ে যাচ্ছে আস্ত খাসি | যাবেন নাকি ?

শুনেই মুহূর্তে উধাও পথশ্রম | তিনজনে চেপে বসলেন নৌকায় | সঙ্গে মৃত্যুঞ্জয় | জ্যোতিরামপুর গ্রাম ঘিরে শুরু হল জল-চক্কর |

আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন গাইড‚ দাদা ! ওই দেখুন ! ওই যে ওটা !

দেখা হল তার সঙ্গে | জল থেকে কয়েক বিঘৎ দূরে কাদাজমিতে দাঁড়িয়ে | পায়ের কাছে উঁকি দিচ্ছে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বিখ্যাত শ্বাসমূল | তার মাঝেই দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে নৌকার দিকে তাকিয়ে সে |

ওদিকে লেন্সের শাটার পড়ছে ঝপাঝপ | একটুও ভয় না পেয়ে ছবির জন্য পোজ দিল সে | তারপর ঢুকতে গেল গ্রামে | কিন্তু গ্রামবাসীরা পটকা ফাটাতে শুরু করেছেন ততক্ষণে | সে তখন গ্রামে না ঢুকে দিল দৌড় |

সে ছুটছে কাদাজমিতে | পাশাপাশি সমান্তরালভাবে জলে এগোচ্ছে নৌকা | খানিক পরে একফালি খাল পেরিয়ে ঘন জঙ্গলে ঢুকে গেল সে |  

শুভায়ু পালের ক্যামেরায়

এতক্ষণ অবধি তিন বন্ধুর ধারণা ছিল খ্যাঁকশিয়াল-দর্শন হল বুঝি | যাকে বলে ইন্ডিয়ান গোল্ডেন জ্যাকল | পরে জুম করে ছবি দেখতেই ভাঙল ভুল | খ্যাঁকশিয়ালের মুখে তো এরকম গ্রে প্যাচ থাকে না | বা চোয়ালের উপরে ওই সাদা দাগ ? এ তো সম্পূর্ণ নেকড়ের লক্ষণ |

শক্তি ব্যানার্জির মতামত

ছবি পাঠানো হয় বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ কুশল মুখার্জিকে | তিনি স্টিল ছবিটি নিয়ে আলোচনা করেন শক্তিরঞ্জন ব্যানার্জি‚ সুজন চ্যাটার্জির মতো বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে | প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে ওটি ভারতীয় নেকড়ে |

গুজরাত‚ রাজস্থান‚ উত্তরপ্রদেশ‚ মধ্যপ্রদেশ‚ হরিয়ানার শুকনো ঘাসজমি‚ ঝোপঝাড় ভরা জঙ্গল‚ কিছুটা কৃষিজমি লাগোয়া এলাকায় মূলত বাস ভারতীয় নেকড়ের | লবণাক্ত অরণ্য বা ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে নেকড়ের অস্তিত্ব এই প্রথম |

বন দফতর থেকে প্রাথমিক শিলমোহর দেওয়া হয়েছে ওটা নেকড়ের ছবি বলে | কিন্তু সুন্দরী গাছের জঙ্গলে মোগলির সঙ্গীসাথীরা এল কী করে ?বনকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের জন্য গবেষণার নতুন বিষয়বস্তু এনে দিলেন কলকাতার তিন পর্যটক তথা শখের ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার |

কুমির-বাঘের পাশাপাশি সুন্দরবনের নতুন আকর্ষণ কি এ বার তবে নেকড়ে বাঘ ?

আরও পড়ুন:  ডোনা গাঙ্গুলির ওড়িশি মুদ্রা‚ দুর্গাবেশে শুভশ্রী‚ রেড রোডে বর্ণময় নিরঞ্জন-শোভাযাত্রা

1 COMMENT

  1. অতি সাহসিক ব্যাপার । শুভায়ু আমার ভাগনে । এইধরনের সাহসিক কাজের জন্য পুরো দলকে অভিনন্দন জানাচ্ছি ।