অগ্নি রায়
সকালে কবিতা লেখেন আর সন্ধ্যায় সংবাদ । এই স্বআরোপিত দ্বিচারিতার মধ্যেই ফ্রিস্টাইল বেঁচে থাকা । পেশার সূত্রে দেড় দশক দিল্লিতে অতিক্রান্ত। ভ্রমণ যত্রতত্র, কাব্যগ্রন্থ আপাতত দু’টি । জন্ম ১৯৭০, কলকাতা ।

‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’

পাড়ায় পাড়ায় মাইক শোভিত হয়ে সে এসেছে | ক্লাব চত্বর, ইস্কুল মাঠে ফ্ল্যাগ উঁচিয়ে সে এসেছে | হপ্তার মাঝে ছুটির মৌতাত জাগিয়ে সে এসেছে |

প্রতি বছর এভাবেই আসে স্বাধীনতা দিবস-রজনী | কিন্তু আমি তার আসার আশায় থাকছি কি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রথমেই রঙ্গলালের লাইন মনে এসেছিল | লাইনটি আদ্যিকালের | কিন্তু যদি তাকে ফিরে দেখা যায় নতুন পোশাকে ?

সহজ করে বলি | ধরুন আপনি সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষুবরেখা থেকে অনেক উপরে থাকা একজন | এই স্বাধীন ভারতে যে কোনও বিপণি-বাজার-মলে ঢুকে পড়ে মাস শেষেও শপিং করতে সক্ষম আপনার ডেবিট কার্ড | চাইলে সপ্তাহান্তে মান্দারমণি বা ম্যাকলাক্সিগঞ্জ অথবা ফুল ট্যাঙ্ক করে লং ড্রাইভও বাজেটে আটকাচ্ছে না | সন্ধ্যায় মজতে শহরের যেকোনও পাবে ঢুকে গিয়ে নিজেকে ভিজিয়ে নিতে পারেন সিঙ্গল মল্ট-এ |

তবুও, পরন্তু, কিন্তু—–মশায় আপনি কি এই বাজারে স্বাধীন ? ৫৪ বছর আগে আটলান্টিক সিটিতে ব্রা পুড়িয়ে শুরু হয়েছিল উইমেনস লিব | তাতে এখন নব জলধারা বইছে | আর আপনি তোম্বা মুখ করে দেখেই যাচ্ছেন ! বড়জোর ভাস্কর চক্রবর্তীর জনপ্রিয় লাইনের নকলে ফিসফিস করে প্রশ্ন করছেন-‘মেন্স লিব কবে আসবে সুপর্ণা ?’

এই অবধি পড়ে ন্যায্য ভাবেই রুষ্ট হওয়া পাঠিকা, আরও একটু মুখ লাল করার জন্য না হয় বুদ্ধদেব গুহর “গোসাঘর (প্রাঃ) লিমিটেড” গপ্পোটা একবার ঝালিয়ে নিন | যেখানে বলা হচ্ছে ,’ স্ত্রীদের হাতে অত্যাচারিত স্বামীদের সংখ্যা যে এত বেশি সে সম্বন্ধে আমাদের কোনও ধারণা ছিল না | আমাদের এই মুভমেন্টের স্নো বলিং এফেক্ট হচ্ছে | কী বলব আপনাকে, সমাজের বাঘা বাঘা পুরুষেরা যে সকলেই প্রায় মেনি বেড়াল এবং আমাদেরই দলে এই অর্গানাইজেশনটা না করলে জানতেই পেতাম না |’ আরও শুনুন,’ আমাদের মতো লক্ষ লক্ষ স্বামী তিল তিল করে স্লো পয়জনিং-এ মারা যাচ্ছি , খুন হয়ে যাচ্ছি, হাপিশ হয়ে যাচ্ছি তাদেরই মৃণাল ভুজে, তাদের বাঘনখে সে খবর কে রাখে ?’

আরও পড়ুন:  চাঁদ-ধনপতি বণিকের ভদ্রাসনে সন্তান-সন্ততি নিয়ে‚ মহাদেবের কোলে বসে মহাষষ্ঠীতে সোনার নথ পরেন মা দুর্গা

উদ্ধৃতি দীর্ঘ করার কারণ এতদ্বারা মেল শ্যভিনিজমের অভিযোগ যদি কিছুমাত্র উঠে থাকে তা মাননীয় লেখকের ঘাড়েই বর্তাক ! আমরা বরং চোখ ফেলি আজকের ব্যস্ত মধ্য বা উচ্চবিত্ত পুং দের দিকে | তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার দিকে |

খুব গভীর না হলেও স্বাধীনতার মোদ্দা অর্থটাই যদি ধরি-তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর একজন সংসারী পুরুষ তাঁর দিনগত পাপক্ষয়ে কোথায় ওড়াতে পারছেন তাঁর স্বাধীনতার পতাকা ? মনে করুন, ভোর বেলা ঘুম ভেঙে আসন্ন পুজো-আকাশে সাদা মেঘকে গাভীর মতো চড়তে দেখে আপনার দুম করে মনে পড়ে গেল ছোটবেলার কোনও মহালয়া-ভোরের কথা | তৈরি হচ্ছে এমন প্যান্ডেল থেকে লুকিয়ে বাঁশ এনে পাশের মাঠে বানানো অস্থায়ী গোলপোস্টের কথা | খেলা শুরুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গোটা পাড়া জুড়ে গম গম করে ওঠা বীরেন ভদ্রের কথা | মশাই, এই সামান্য মনে হওয়াটুকু আপনার ব্রেনটিতে তৈরি করতে লাগল উৎসবের বুদ্বুদ—-ভাবলেন ধুত্তরি ! সকালের মিটিং আর বিকেলের ক্লায়েন্ট ভিজিট! চুলোয় যাক অফিস | মোবাইলে পুরনো নম্বরগুলোর সঙ্গে কথা বলে বা হঠৎ দেখা করে আজ ডুবব নস্টালজিয়ায় |

পারবেন কি সামান্য উপহারটুকু (যারও নাম স্বাধীনতা), নিজেকে রঙিন কাগজে মুড়ে উপহার দিতে?

আমিও জানি, আপনিও জানেন–পারবেন না | চারদিকের ইঁদুরের সঙ্গে আপনিও দৌড়চ্ছেন মাসিক ক্ষুদকুড়োর জন্য , কোনওভাবে পিছিয় পড়লে বন্ধ হবে চাকা | আটকে যাবে EMI, হাজারো বিল, গিন্নির মাসকাবারি দাবি, সন্তানের আইনস্টাইন বা বেচু বাবু হওয়ার লাখ লাখ টাকার প্রজেক্ট !

MP3 আইপডে সবসময় মন ভরে না | সেই হস্টেল বা কমিউন জীবনের মতো ইচ্ছে করে সমঝদার কিছু বন্ধুকে বাড়িতে ডেকে হোম থিয়েটারে গম গম করে শুনি জ্যাজ-ব্লু-বিঠোফেন-মান্না-হেমন্ত-বিটলস | সবই তো এখন মজুত এবং হাতের কাছেই | আগের মতো ‘পরাধীন’ সময় তো আর নেই | যে বাজার-মারা টাকা জমিয়ে কায়ক্লেশে কিনতে হবে রেকর্ড বা ক্যাসেট | কিন্তু কাছে থাকলেও যে দূর রচিত হয়, রবি ঠাকুর তো সেই কবেই বলে গেছেন | গোটা বছর জুড়ে ছেলেমেয়েদের টেস্ট চলে | এই এক অনন্ত পরীক্ষা ঈশ্বর ! সোশ্যাল স্টাডিজ, সায়েন্স- আর্টস-ফ্রেঞ্চ ম্যামের দাপটে যেন একটা মাছিও বাড়িতে না গলতে পারে—-সঙ্গীত কোন ছাড় !

আরও পড়ুন:  সমকামী স্বামীর থেকে যৌনরোগ ? অকালমৃত্যুর ১১৭ বছর পরে ‘সিফিলিস-অপবাদ-মুক্ত’ অস্কার ওয়াইল্ড-পত্নী

কথা বলতে হবে ফিসফিস করে | হাঁটতে হবে মেপে | এমনকী দরজা বন্ধ করার শব্দও যেন বিলায়েৎ খানের আলাপের মতোই মিঠে হয় ! বৌ-এর মাথা ধরলে ওই বাড়তি শব্দতেও আপনার জমানত জব্দ হতে পারে | কোথায় বেড়াতে যাবেন, কত দিনের জন্য, যাবেন কবে, ফিরবেন কবে সেগুলো আপনার ভ্রমণপিপাসু মন ঠিক করছে না | করছে আপনার সন্তানের স্কুল-ক্যালেন্ডার | কী খাবেন সেটা স্থির করছে আপনার ব্লাড রিপোর্ট আর ডায়েটিশিয়ান | এক সিটিং-এ বসে এক জামবাটি রাবড়ি বা বাজি রেখে বরযাত্রী গিয়ে খাসির মাংসে শর্ট ফেলে দেওয়া বাবা-কাকাদের গপ্পো ভুলে যান | সে রাম এখন আর নেই | যদিও রাজত্বটা পড়ে আছে | সেই রাজত্বের নাম দিতে পারেন রাষ্ট্র , সংসার, শ্বশুরবাড়ি , সিস্টেম, ই এম আই—-যে কোনও কিছু | যে নামেই ডাকুন আপনি তার পরাধীন প্রজা ছাড়া কিছু নন | দুদিন টানা দাড়ি না কামানোর ইচ্ছে হলে, সে স্বাধীনতাটুকু অবধি নিঃশব্দে আপনার কাছ থেকে হরণ করেছে মহাকাল | আপনি ভ্যাবলা হয়ে দেখেই যাচ্ছেন |

এই ‘ইচ্ছে’ প্রসঙ্গে অবশ্য শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লাইন আওড়ে এই ‘বন্দির বন্দনায়’ ব্রেক মারা যায় | সেটি হল ‘সকাল থেকে আমার ইচ্ছে এক ধরনের সাহস দিচ্ছে উড়ে না যাই…’

স্বাধীনতা না থাক | আসুন, এই স্বাধীনতা দিবসে মনের কোণে জমে থাকা এই ওড়ার ইচ্ছেটুকুই সেলিব্রেট করি আমরা | চিয়ার্স !!!

(পুনর্মুদ্রিত )

NO COMMENTS