গত পর্বে বলেছিলাম শিষ্য আরুণির কথা | তবে যখন তিনি পিতা‚ তখন কিন্তু আর আরুণি নন | এই বৈদিক ঋষি তখন পরিচিত বাজশ্রবস পরিচয়ে | মহা ঋষি বাজশ্রবস | বিখ্যাত তাঁর দানশীলতায় | কিন্তু একদিন তাঁকে ম্লান করে দিলেন পুত্র নচিকেতা | নিজেকেই দান করে হলেন মৃত্যুঞ্জয়ী |

নচিকেতা শব্দের অর্থ বহু | এক অর্থে তিনি যজ্ঞের পবিত্র আগুন | আবার অন্য অর্থে তিনি সেই আত্মা যিনি অজ্ঞানতাকে জয় করতে চান জ্ঞানালোক দিয়ে |

বিভিন্ন কালপর্বে বৈদিক সাহিত্যে একাধিকবার উল্লেখিত হয়েছে নচিকেতার নাম | খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে রচিত কঠোপনিষদে বিস্তারিত ভাবে আছে বাজশ্রবস-নচিকেতা-যম বৃত্তান্ত | যেখানে অনিত্য জাগতিক সুখ থেকে রহিত হয়ে নচিকেতা মোক্ষলাভ করেছিলেন | উপলব্ধি করেছিলেন জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে কীভাবে মুক্তি পেতে পার আত্মন বা ব্রহ্মণ | এছাড়া তৈত্তীরীয় ব্রাহ্মণ ও মহাভারতেও উল্লেখ আছে যম-নচিকেতা পর্ব |

ঋষি বাজশ্রবস যজ্ঞ করছিলেন | দেবতাদের বর পেতে তিনি বহু দান করছিলেন সেখানে | পিতার পাশে বসেছিলেন বালক নচিকেতা | বালক কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে দেখছেন পিতা দানে শ্রেষ্ঠ জিনিস দিচ্ছেন না | দিচ্ছেন এমন গাভী যেগুলো বয়স্ক দুর্বল এবং রুগ্ন | বালক পিতাকে বললেন‚ আপনার দানে শ্রেষ্ঠত্ব নেই | আমিও তো আপনার | তাহলে আমাকে আপনি কাউকে দিয়ে দিচ্ছেন না কেন ?’

প্রথমে শিশুর কথায় গুরুত্ব দেননি বাজশ্রবস | শেষে বিরক্ত হয়ে বললেন‚ আমি তোমাকে দান করলাম যমরাজের পায়ে |

পিত্রাদেশ পালনে নচিকেতা পৌঁছলেন যমরাজ্যে | কিন্তু যমরাজ তখন সেখানে অনুপস্থিত | বাধ্য হয়ে নচিকেতা অপেক্ষা করতে লাগলেন যমরাজের প্রাসাদের দ্বারে |

তিনদিন অপেক্ষার পরে দেখলেন প্রবেশ করছেন যমরাজ | এক ব্রাহ্মণ পুত্রকে এতদিন তাঁর অপেক্ষায় দেখে বিব্রত হলেন তিনি | বললেন তিনটি বর চাইতে |

প্রথম বরে নচিকেতা তাঁর এবং তাঁর পিতার জন্য শান্তি চাইলেন | সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হল | দ্বিতীয় বরে নচিকেতা বললেন তাঁকে যজ্ঞের আগুনে আহূতির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে হবে | সেটাই করলেন মৃত্যুর রাজা  | এ বার তৃতীয় বর |

নচিকেতা বললেন‚ তাঁকে ব্যাখ্যা করতে হবে মানুষের মৃত্যুর পরে কী হয় |

এ বার নীরব হয়ে রইলেন যমরাজ | বললেন‚ এই গূঢ় সত্য দেবতাদেরও অজানা | কিন্তু নচিকেতা না জেনে শান্ত হবেন না |

পরিবর্তে যমরাজ তাঁকে জাগতিক জিনিস দিতে চাইলেন | উত্তরে নচিকেতা বললেন‚ তিনি মৃত্যুরাজ্যে প্রবেশ করেছেন | নরলোকের কাছে তিনি মৃত | তাই নশ্বর জিনিস নিয়ে তিনি কী করবেন ? সে তো আজ বাদে কাল বিলীন হয়ে যাবে |

তাঁর এই উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন যমরাজ | জাগতিক কোনও জিনিসের প্রতি বালক মোহশূন্য দেখে অবিনশ্বর মৃত্যুর অধিপতি তাঁকে ব্যাখ্যা করলেন জগতের চির শাশ্বত মন্ত্র |

বালক নচিকেতা জানতে পারলেন‚

পবিত্র ওম !’ শব্দ হল আত্মনের শেষ কথা | আত্মন বা আত্মা বা পরম ব্রহ্মের কোনও আকার নেই | তা ধ্বংস হয় না | তা সর্ববৃহতের থেকেও বড় | ক্ষুদ্রতমর চেয়েও ছোট | জগতে জ্ঞানের লক্ষ্যই হল আত্মনকে জানা | আমাদের ইন্দ্রিয় হল অশ্ব | আত্মন তাতে আরোহী | অর্থাৎ ইন্দ্রিয় চালনা করে নিয়ে চলে আত্মন বা আত্মাকে | কোথা দিয়ে ?কামনা-বাসনার ভুলভুলাইয়ার মধ্যের সর্পিল সঙ্কীর্ণ পথ দিয়ে | মৃত্যুর পরে থেকে যায় শুধু আত্মা | কিন্তু শুধু পুথি-শাস্ত্র পড়ে তাকে জানা-বোঝা বা উপলব্ধি করা যায় না | মানবদেহ হল কামনা বাসনার পীঠস্থান | তাই সেখান থেকে আত্মাকে পৃথক না করলে ব্রহ্মজ্ঞান হয় না | ব্রহ্মজ্ঞান না হলে চলতেই থাকবে জন্মমৃত্যুর চক্র | আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান হলে তবেই মোক্ষলাভের দিকে এগোয় জাতক |

ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে নচিকেতা হলে পরমজ্ঞানী | জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে মোক্ষলাভ করে ফিরে এলেন মর্ত্যলোকে | ততদিনে ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন ঋষি বাজশ্রবস | পুত্রশোকে তিনি কাতর | ব্রহ্মজ্ঞানে আলোকিত মৃত্যুঞ্জয়ী পুত্র নচিকেতাকে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর অনুতপ্ত পিতা |  

আরও পড়ুন:  বাহামণি-শালুক-পারির জন্মদাত্রীর হাতে এ বার রক্তমাংসের নারীদের গুরুভার
- Might Interest You

NO COMMENTS