কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে একবার যুধিষ্ঠিরকে হত্যা করতে উদ্যত হন অর্জুন | তৃতীয় পাণ্ডবের তরবারিতে  তাঁর দাদার প্রায় প্রাণ চলে যায় আর কি ! কিন্তু কেন ঘটেছিল এই অদ্ভুত ঘটনা ? মহাভারতের কর্ণ পর্বে আছে তার বিবরণ |

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ১৭ তম দিনে কর্ণের কাছে মারাত্মক আহত হন যুধিষ্ঠির | রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে শিবিরে নিয়ে যান দুই ভাই নকুল ও সহদেব | যুদ্ধক্ষেত্রে তখন প্রবল পরাক্রমে লড়ছেন মহাবলী ভীম ও অর্জুন |

এমন সময়ে ভীমকে অনুরোধ করলেন অর্জুন | শিবিরে গিয়ে দাদা যুধিষ্ঠিরের খোঁজ নেওয়ার | কিন্তু যেতে চাইলেন না ভীমসেন | তিনি একই আদেশ করলেন অর্জুনকে | গুরুজনের আদেশ রক্ষা করলেন অর্জুন | যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে তিনি গেলেন দাদা যুধিষ্ঠিরের কাছে | সংশপ্তক বাহিনীকে নিয়ে পাণ্ডব বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে লাগলেন ভীম |

এদিকে‚ শিবিরে অর্জুনকে দেখে আহত যুধিষ্ঠির ভাবলেন‚ ছোট ভাই নিশ্চয়ই কর্ণকে বধ করে সেই সুসংবাদ দিতে এসেছেন | তিনি তার জন্য অর্জুনকে স্তুতিতে ভরিয়ে দিলেন | কিন্তু যুধিষ্ঠিরের প্রশংসায় নীরব হয়ে থাকলেন কৌন্তেয় অর্জুন |

কিছুক্ষণ পরে তিনি জ্যেষ্ঠকে জানালেন‚ কর্ণ এখনও বধ হননি | তিনি দাদার খোঁজ নিতে এসেছেন | শুনে তো রেগে অগ্নিশর্মা যুধিষ্ঠির | কর্ণর নিধন না করেই কি না যুদ্ধ থেকে চলে এসেছেন অর্জুন !

ধিক্কার দিয়ে ভাইকে তীব্র বাক আক্রমণ করলেন যুধিষ্ঠির | বিনা প্রতিবাদে সব শুনলেন অর্জুন | কিছুক্ষণ পর অর্জুনের ধনুক গাণ্ডীব নিয়ে অপমানজনক কথা বললেন যুধিষ্ঠির |

আর সহ্য করলেন না অর্জুন | তরবারি দিয়ে দাদাকে হত্যায় উদ্যত হলেন তিনি | শুয়ে রয়েছেন রক্তাক্ত যুধিষ্ঠির | তাঁর সামনে প্রসারিত অর্জুনের তরবারি | ঠিক সেই সময়ে শিবিরে প্রবেশ করলেন শ্রীকৃষ্ণ |

তাঁকে দেখে সম্বিৎ ফিরল অর্জুনের | এহেন আচরণের কারণ জানতে চাইলেন শ্রীকৃষ্ণ | অর্জুন বললেন‚ গাণ্ডীব লাভের পরে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন‚ যে তাঁর অস্ত্রের অপমান করবে‚ তাকে অর্জুন হত্যা করবেন | সেই প্রতিজ্ঞা পালন করতেই যুধিষ্ঠিরকে হত্যায় উদ্যত হয়েছিলেন তিনি | কারণ যুধিষ্ঠির অপমান করেছিলেন গাণ্ডীবের |

আরও পড়ুন:  ' প্রাকৃতিক নয়‚ মানুষের তৈরি রামসেতু ছিল'‚ কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন বিশ্বাসে বৈজ্ঞানিক শিলমোহর ?

এখন যুধিষ্ঠিরকে হত্যা না করলে তো প্রতিজ্ঞাভঙ্গের দায়ে পড়বেন অর্জুন | উপায় দিলেন শ্রীকৃষ্ণই | বললেন‚ গুরুজনকে মৌখিক অপমান করা তাঁকে হত্যারই নামান্তর | তাই সেভাবেই বরং যুধিষ্ঠিরকে‘হত্যা‘ করুন পার্থ | কৃষ্ণের কথা পালন করলেন অর্জুন | সুতীব্র ভাষায় অপমান করলেন জ্যেষ্ঠর |

যুধিষ্ঠিরকে অপমান করে এ বার তীব্র বিবেক দংশন শুরু হল অর্জুনের | পাপস্খালনের জন্য তিনি নিজের প্রাণ নিতে উদ্যত হলেন | আবারও অবতীর্ণ অহলেন মধুসূদন | তিনি দেখলেন‚ সর্বনাশ হতে চলেছে যে ! ঠান্ডা মাথায় অর্জুনকে বোঝালেন কৃষ্ণ | প্রাণ বিসর্জনের কোনও দরকার নেই | অর্জুন বরং লোকসমক্ষে নিজের ভূয়সী প্রশংসা করুন | তাতেই যা পাপ হবে‚ তা নিজের মৃত্যুর সমতুল্য |

শ্রীকৃষ্ণের আদেশ শিরোধার্য করে সেটাই করলেন পার্থ | প্রকাশ্যে নিজের মুখে নিজের প্রশংসা করতে লাগলেন | নিশ্চিন্ত হলেন কৃষ্ণ | সাপও মরল | লাঠিও ভাঙল না | সব দিক রক্ষা করে পার্থকে নিয়ে আবার যুদ্ধের ময়দানে গেলেন পার্থসারথি | যুদ্ধের সপ্তদশ দিনে আবার যুদ্ধ শুরু করলেন অর্জুন | এবং সেদিনই যুদ্ধের সময়ে মাটিতে বসে গিয়েছিল কর্ণের রথের চাকা | সেই সময় তাঁকে হত্যা করেছিলেন অর্জুন |

NO COMMENTS