রণিত দাশগুপ্ত
জন্ম ১৯৮৪। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। কেরিয়ার শুরু কিশোর ভারতী পত্রিকায় ফ্রিল্যান্সের মাধ্যমে। তারপর দৈনিক স্টেটসম্যান, একদিন পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স। অনিয়মিত লেখালিখি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বর্তমানে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড-এ কর্মরত।

মিনু একবার জিগ্যেস করেছিল, ‘তুই এভাবে হাঁটিস কেন রে?’

     শতরূপ হেসে বলেছিল, ‘আসলে কী জানিস, মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটলে দুটো ভালো কাজ হয়। জুতোর তলায় কোনো নোংরা লাগার সম্ভাবনা কমে। তাছাড়া অনেক সময় রাস্তা থেকে টাকা কুড়িয়ে পাওয়া যায়।’

কিছু মিথ্যে বলেনি সে। সত্যিই সে বার তিন চার কয়েকটা ১০ বা ২০ টাকার নোট কুড়িয়ে পেয়েছে। আর তাই দিয়ে ফুচকা খেয়েছে।

বিষয়টা হল, শতরূপ যখন হাঁটে, তখন ওর চোখ থাকে মাটির দিকে। আশপাশ দিয়ে কে চলে গেল, ও খেয়াল করে না। অনেকেই তাকে কতবার বলেছে, ‘কী রে, একটু তাকা আমাদের দিকে।’ কখনোবা পরিচিত কেউ বলেছে, ‘সেদিন আমার পাশ দিয়ে চলে গেলি, দেখতেই পেলি না?’ পাড়ার মোড়ে বেকার ছেলেরা আড্ডা দিচ্ছে। এমন সময় শতরূপ যাচ্ছে। কেউ একজন ডেকে বলল, ‘অ্যাই শত, বড় চাকরি করছিস বলে আর আমাদের দিকে তাকাসও না। একটু দ্যাখ ভাই।’

     তবে শতরূপ কিন্তু খুব মিশুকে। শুধু ওর হাঁটার স্টাইলটাই ওরকম। অনেকবার ঠিক করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। এসব কথার জবাবে সে শুধু সামান্য হাসে।

     তা সেই শতরূপ রবিবার বিকেলে বাগবাজার ঘাট থেকে কুমারটুলির দিকে তার স্টাইলেই হাঁটছিল। সামনেই কাশি মিত্র শ্মশান। ঠিক তার আগেই চোখে পড়ল রাস্তায় একটা ওয়ালেট পড়ে আছে। ভিতর থেকে তিন-চারটে ১০০ ও ৫০০ টাকার নোট উঁকি মারছে।

     একটু এদিক-ওদিক তাকাল শতরূপ। না কেউ দেখছে না। টুক করে তুলে নিল ব্যাগটা। মনে মনে ভাবল, নিশ্চয়ই কোনো শ্মশানযাত্রীর পকেট থেকে পড়ে গেছে। সে ব্যাগটা খুলল। শুধু টাকা নয়। যার ওয়ালেট, তার ছবি, আধার ও প্যান কার্ড ও আছে। ব্যাগের মালিকের নাম বিশ্ব রায়।

     ছবিটা দেখেই শতরূপের লোকটাকে খুব চেনা মনে হল। কোথায় যেন দেখেছে। কিন্তু মনে পড়ছে না। ব্যাগটা হাতে নিয়েই সে শ্মশান পেরল। কুমারটুলি ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে আবার ব্যাগটা খুলল। ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। নাহ! কিছুতেই মনে পড়ছে না। কিন্তু যেন খুব চেনা। অফিসের বা বাজারের পরিচিত? মনে পড়ছে না। মনে পড়ছে না। তবে মনে হচ্ছে যেন আজকেই দেখেছে তাকে। কিন্তু কোথায়?

আরও পড়ুন:  অভিসার

     ‘এই যে ভাই।’

     হঠাৎ কারোর গলা শুনে চমকে পিছন ফিরে তাকাল শতরূপ। দেখে, যার ব্যাগ, সে সামনে দাঁড়িয়ে।

     ‘ব্যাগটা আমার। একমাত্র এটাই পকেটে ছিল শ্মশানে। কখন পড়ে গেছে, টের পাইনি। যদি প্রমাণ চান, দেখুন, ওর ভিতরে আমার ছবি, প্যান আর আঁধার কার্ড আছে।’

     ‘দেখেছি। আপনাকে আর প্রমাণ দিতে হবে না। মাটিতে পড়ে ছিল। তুললাম। তবে, আপনাকে আগে কোথায় দেখেছি বলুন তো… কিছুতেই মনে করতে পারছি না। তখন থেকে সেটাই ভাবছি।’

     ব্যাগটা ফেরৎ নিতে নিতে লোকটার মুখে হাসির রেখা ফুটল। সেই হাসি নিয়েই বলল, ‘ভালো করে মনে করার চেষ্টা করুনতো কোথায় আমাকে দেখেছেন? আমি আপাতত চলি। আবার দেখা হবে। ব্যাগের জন্য ধন্যবাদ।’ এটুকু বলে লোকটা শ্মশান পেরিয়ে, যেদিক থেকে শতরূপ এসেছিল, সেদিকে চলে গেল।

     মনে পড়ল না কিছুতেই শতরূপের। সন্ধের কিছু পরে বাড়ি ফিরে এলো। সোফায় গা এলিয়ে দিল। সামনে ছোট টেবিলে পড়ে আছে খবরের কাগজ, কিছু ম্যাগাজিন।

     হঠাৎ প্রায় লাফিয়ে উঠল শতরূপ। একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল তার শিঁড়দাড়া দিয়ে। খবরের কাগজটা হাতে তুলে নিল। যে পাতাটা খোলা আছে, সেখানেই আছে খবরটা। বাইপাসে বাইক দূর্ঘটনায় নিহত বাগবাজারের বাসিন্দা বিশ্ব রায়।

     রয়েছে দূর্ঘটনার বিবরণ। এবং বিশ্ব রায়ের ছবি। মনে পড়ল শতরূপের, ঘটনাটি টিভিতেও দেখিয়েছে। বারবার নিউজ ফ্লাশে ছিল দুমড়ে মুছড়ে যাওয়া বাইক এবং বিশ্ব রায়ের ছবি।

     সব মনে পড়েছে শতরূপের। সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছে। শরীর দিয়ে নেমে চলেছে ঠাণ্ডা স্রোত।

    

      

2 COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ