তিনি তানসেনের সমসাময়িক | কেউ কেউ বলেন‚ তিনি তানসেনের থেকেও প্রতিভাবান | তিনি বৈজু বাওরা | মধ্যযুগের এই প্রতিভাবান ধ্রুপদ শিল্পী সম্বন্ধে লিখিত বা প্রামাণ্য তথ্য বিশেষ নেই | আছে শুধু প্রচলিত লোককথা আর কিংবদন্তি |

সপ্তদশ শতকের বই মীরাৎ-ই-সিকন্দরি বলছে‚ গুজরাতে বচ্চু বলে এক গায়ক ছিলেন | কেউ কেউ তাঁকে বলতেন বক্ষু বা মঞ্জু | গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ-এর সভাগায়ক | একবার গুজরাত আক্রমণ করেছিলেন মুঘল সম্রাট হুমায়ুন | বন্দি হলেন শিল্পী বক্ষু | তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন হুমায়ুন | কিন্তু সম্রাটের সহযোগী এক হিন্দু রাজা তাঁর পরিচয় সামনে আনলেন | জানতে পেরে হুমায়ুন রদ করলেন শাস্তি | শিল্পীকে বহাল করলেন সভাগায়ক হিসেবে | কিন্তু কিছুদিন পরে শিল্পী পালিয়ে গেলেন গুজরাতের চম্পানীর | কারণ ওখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন পরাজিত পলাতক বাহাদুর শাহ | কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে‚ এই বক্ষুই বৈজু বাওরা |

মধ্যযুগীয় কিংবদন্তি থেকে এ বার আধুনিক লেখিকা সুশীলা মিশ্রর বই Some Immortals of Hindustani Music | সেখানে তিনি বলছেন‚ চম্পানীরের গরিব ব্রাহ্মণ বংশে জন্ম বৈজনাথ মিশ্রের | বাবার মৃত্যুর পরে তাঁর মা চলে গিয়েছিলেন বৃন্দাবন | সেখানে স্বামী হরিদাসের গুরুকুলে স্থান পেলেন বৈজনাথ | 

ক্রমে তাঁর গানের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল | বৈজনাথ থেকে তিনি লোকমুখে হয়ে গেলেন বৈজু | এই সময় অকৃতদার বৈজু দত্তক নিলেন গোপাল নামে এক অনাথ শিশুকে | তালিম দিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের | গোপালও প্রতিশ্রুতিমান শিল্পী হিসেবে নিজেকে মেলে ধরলেন |

চান্দেরির রাজার আমন্ত্রণে বৈজু গেলেন তাঁর সভাগায়ক হয়ে | সঙ্গে গেল গোপালও | ততদিনে সেও সঙ্গীতগুরু | বিবাহ করল প্রভা নামের এক শিষ্যাকে | তাদের একমাত্র মেয়ে মীরা তো বৈজুর চোখের মণি | গোপাল-প্রভা-মীরাকে নিজের পুত্র-পুত্রবধূ-নাতনি হিসেবেই দেখতেন বৈজু |

মাঝে মাঝে চান্দেরি থেকে বৈজুকে যেতে হতো গোয়ালিয়র | সেখানকার রাজা মান সিং তোমর তাঁর গুণগ্রাহী | স্বয়ং রানি মৃগনয়নী শিষ্যত্ব নিয়েছেন বৈজুর | একদিন গোয়ালিয়র থেকে চান্দেরি ফিরে বৈজু দেখলেন তাঁর গৃহ শূন্য | গোপাল কোথায় যেন চলে গেছে সপরিবারে |

নাতনিকে দেখতে না পেয়ে পাগলের মতো হয়ে গেলেন বৈজু | শুনলেন‚ কয়েকজন কাশ্মীরি বণিক প্রলুব্ধ করে গোপালকে নিয়ে গেছে | সেখানকার রাজার সভাগায়ক হওয়ার জন্য | গোপালের থেকেও বৈজুর মনে আঘাত লেগেছিল শিশুকন্যা মীরার চলে যাওয়ায় | তিনি ঘর ছেড়ে পথে পথে ছোট্ট নাতনিকে খুঁজে বেড়াতেন | বাউন্ডুলে ছন্নছাড়া বৈজু সবার কাছে হয়ে গেলেন বাওরা | বা পাগল | আবার অনেকে বলেন‚ সঙ্গীত সাধনায় বসলে বাহ্যিক জ্ঞান রহিত হতেন তিনি | তাই তাঁকে বলা হতো বাওরা | বৈজু বাওরা |

বৃন্দাবনে যে গুরুর কাছে সঙ্গীতশিক্ষা করেছিলেন বৈজু‚ সেই স্বামী হরিদাসের শিষ্য ছিলেন তানসেনও | গুরুকুলে এসেছিলেন বৈজুর চলে যাওয়ার কিছু পরে | গুরুর কাছে এবং পরে সারা দেশে তিনি বৈজুর সুখ্যাতি শুনলেন | ভাবলেন‚ একবার এই স্বর্গীয় শিল্পীকে দেখতেই হবে |

তখনও তানসেন আসেননি মুঘল দরবারে | ছিলেন মধ্যপ্রদেশের রেওয়ার রাজ রামচন্দ্র বাঘেলার সভাগায়ক পদে | রাজাকে অনুরোধ করলেন তানসেন | সঙ্গীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে | তিনি নিশ্চিত ছিলেন সেখানে বৈজু আসবেনই |

তানসেনের অনুমান অব্যর্থ ছিল | এসেছিলেন পাগল বৈজু | মৃগরঞ্জিনী রাগে সম্মোহিত করেছিলেন হরিণদের | রাজপ্রাসাদের উদ্যান থেকে তারা ছুটে এসেছিল সভাঘরে | যেখানে সাধনায় মগ্ন ছিলেন বৈজু | তাঁর কণ্ঠে মালকৌন ( বা মালকোষ ) রাগে পাথর গলে জল হয়ে গিয়েছিল | প্রতিযোগিতার শেষে তানসেন আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন বৈজুকে |

অথচ এই কিংবদন্তির সম্পূর্ণ অন্য দিক দেখানো হয়েছিল ১৯৫২ সালের জনপ্রিয় হিন্দি ছবি বৈজু বাওরায় | বৈজু রূপী ভারতভূষণ সেখানে তানসেনের শত্রু | কারণ তানসেনের সেনা তাঁর পিতাকে হত্যা করেছিল | তাই এক সঙ্গীত প্রতিযোগিতার আসরে তিনি তানসেনকে পরাজিত করে‚ তাঁর সম্মান ভূলুণ্ঠিত করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন |

রুপোলি পর্দার বাইরে অবশ্য বৈজু-তানসেন দ্বৈরথের কোনও প্রমাণ নেই | সেখানে গানপাগল বৈজু ফিরে এসেছিলেন রেওয়াতে তাঁর শূন্য ঘরে | আত্মীয় পরিজন ছাড়াই কাটিয়েছিলেন জীবনের শেষ দিনগুলো | ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের বসন্ত পঞ্চমীতে তাঁর মৃত্যু হয় টাইফয়েড রোগে | দেবী সরস্বতীর আরাধনার দিনেই চলে গিয়েছিলেন তাঁর বরপুত্র | 

গোয়ালিয়র প্রাসাদে রক্ষিত গ্রন্থ বলছে‚ বৈজু অন্ধকার সভাকক্ষে গান শুরু করতেন | তার দীপক রাগে নিজের থেকে জ্বলে উঠত শত শত ঘৃতপ্রদীপ | মল্লার রাগে নামত আকাশভাঙা বৃষ্টি | বাহার রাগে ফুলে ফুলে ভরে উঠত প্রাসাদ উদ্যান |

আরও পড়ুন:  বিয়ের আগেই এই কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন ইন্দিরা-পুত্র সঞ্জয় গান্ধী ?
- Might Interest You

NO COMMENTS