পতিদেব শিবের তীব্র ক্রোধের সঙ্গে আর পেরে উঠছেন না স্ত্রী পার্বতী | অর্ধাঙ্গিনীর অনুরোধে ও অন্য দেবাতদের আকুতিতে ক্রোধানল প্রশমিত করতে তৎপর হলেন দেবাদিদেব | তিনি গেলেন ঋষি অত্রির স্ত্রী অনসূয়ার কাছে | ঋষিপত্নীর কাছে গিয়ে মহাদেব রেখে এলেন তাঁর যাবতীয় ক্রোধ | কালক্রমে সেই ক্রোধ থেকে জন্ম নিল এক শিশু | এতই উগ্র তাঁর বদমেজাজ‚ যে সঙ্গে বাস করাই দুষ্কর | সেই থেকে তাঁর নাম হল দুর্বাসা | ব্রহ্মানন্দ পুরাণ অনুযায়ী এই হল তাঁর জন্ম বৃত্তান্ত | ভগবৎ পুরাণ আবার বলছে‚ অত্রি পত্নী অনসূয়া নিজের প্রার্থনা করে মহাদেবকে পুত্র হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন | মহাদেবের সেই অবতারই হলেন দুর্বাসা |

দুর্বাসা বললেই মনে প্রতীয়মান হয় ক্রোধ আর অভিশাপের ছবি | তিনি যেন মানুষের জীবনের ষড়রিপুর দ্বিতীটির প্রতীক |

সনাতন হিন্দুধর্মের শাস্ত্র-পুরাণ খুললেই শুধু ঋষি দুর্বাসার দেওয়া অভিশাপের বহর | প্রথমেই তাহলে বলি দেবরাজ ইন্দ্রর সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব |

বিভিন্ন পৌরাণিক সূত্র অনুযায়ী দুর্বাসা-ইন্দ্র সাক্ষাতই অনুঘটক ছিল সমুদ্রমন্থনের | একদিন ভ্রমণ করছিলেন দুর্বাসা | সাক্ষাৎ হল অপ্সরা বিদ্যাধরীর সঙ্গে | অপ্সরার কণ্ঠে এক অপূর্ব পুষ্পহার দেখে মুগ্ধ হলেন দুর্বাসা | স্বর্গীয় সেই কণ্ঠহার তাঁকে দিয়ে দিলেন অপ্সরা | ওটা গলায় পরেই পদব্রজে এগোচ্ছিলেন ঋষি |

এ বার দেখা হল ঐরাবতে আসীন দেবরাজ ইন্দ্রর সঙ্গে | তাঁকে ওই কণ্ঠহার উপহার দিলেন দুর্বাসা | কোথায় রাখবেন বুঝে না পেয়ে সেটা ঐরাবতের মাথায় রাখলেন ইন্দ্র | এদিকে ফুলের গন্ধ মোটেও ভাল লাগল না ঐরাবতের | সে মাথা ঝাঁকিয়ে ফেলে দিল পুষ্পহার | পা দিয়ে পিষ্ট করে দিল সেটা |

তাঁর দেওয়া উপহারের এই পরিণতি দেখে দুর্বাসা তো সীমাহীনভাবে ক্ষুব্ধ | তিনি অভিশাপ দিলেন যে একদিন স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হবেন ইন্দ্র | দেবরাজের বহু অনুনয়েও কাজ হল না | দ্রবীভূত হল না দুর্বাসার মন |

সত্যি তাঁর অভিশাপে স্বর্গ থেকে দেবতাদের বিতাড়িত করল অসুররা | উপায় না দেখে ব্রহ্মার পরামর্শে বিষ্ণুর কাছে গেলেন দেবতারা | তখন বিষ্ণু পরামর্শ দিলেন সমুদ্রমন্থন করে অমৃতকুম্ভ তুলে আনতে | ফলে কার্যত দুর্বাসার অভিশাপেই অমরত্ব পেয়েছিলেন দেবতারা |

কিন্তু একবার অভিশাপ দিতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন দুর্বাসা | তিনি শাপ দিয়েছিলেন বিষ্ণুভক্ত অম্বরীশকে | দুর্বাসার একটি চুল থেকে জন্ম নিল এক রাক্ষস | সে হত্যা উদ্যত হয় অম্বরীশকে | এদিকে বিষ্ণুর আশীর্বাদে সুদর্শন চক্র ছিল অম্বরীশের কাছে | তাঁর নির্দেশে সেই চক্র নিধন করল রাক্ষসকে | এবার সে ধাবিত হল দুর্বাসার প্রতি | প্রাণভয়ে ঋষি গেলেন নারায়ণের কাছে | কিন্তু তিনি বললেন দুর্বাসাকে বাঁচাতে তিনি অপারগ | রক্ষা করতে পারবেন একমাত্র অম্বরীশই | সেটাই করলেন দুর্বাসা | ক্ষমা চাইলেন অম্বরীশের কাছে | এরপর সুদর্শন চক্র আবার ফিরে এল অম্বরীশের কাছে |

আবার রামানুজ লক্ষ্মণের মৃত্যুর সঙ্গেও ঋষি দুর্বাসার সম্পর্ক আছে | কথিত‚ রামচন্দ্র রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছিলেন যমরাজের সঙ্গে | দ্বারে প্রহরারত ছিলেন লক্ষ্মণ | অগ্রজ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কাউকে বৈঠক কক্ষে প্রবেশাধিকার না দিতে | যদি এর অন্যথা হয় তবে লক্ষ্মণের মৃত্যু অনিবার্য | এদিকে সেখানে হাজির হলেন দুর্বাসা | বলেন তাঁকে রামের কাছে যেতে দিতেই হবে | নইলে অযোধ্যাবাসীকে অভিশাপ দেবেন তিনি | রাজ্যবাসীকে বাঁচাতে লক্ষ্মণ বাধ্য হন দাদার আদেশ অমান্য করতে | রামের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় দুর্বাসার | পরিণামে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ভাইকে রামচন্দ্র নির্দেশ দেন তাঁর থেকে বহুদূরে চিরতরে চলে যেতে | লক্ষ্মণ গিয়ে সরযূ নদীতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন |

আবার এত বদমেজাজি ঋষিকেই তুষ্ট করেছিলেন কুন্তী | যখন তিনি অবিবাহিত কুমারী ছিলেন | সন্তুষ্ট হয়ে দুর্বাসা বর দিয়েছিলেন | যেকোনও দেবতার ঔরসে সন্তানলাভ করতে পারবেন কুন্তী |

তবে তা আসলে আশীর্বাদ ছিল‚ নাকি আশীর্বাদের রূপে অভিশাপই‚ সেটা কুন্তীর থেকে ভাল আর কে জানবেন !

আরও পড়ুন:  বেতের ঝুড়িতে মুড়ি, ‘ড়’ এবং ঋতুদা
- Might Interest You

NO COMMENTS