‘মাঝখানে লক্ষ যোজন বয়ে চলে যায়’! না না, এটা মান্না দের জনপ্রিয় গানের প্যারোডি ভাববেন না। এত স্পর্ধাই নেই এই কলমচির। আসলে কি হয়েছে জানেন ? ক’দিন আগে রিয়া-রাকেশ এসেছিল। রিয়া তুতো বোন। সেই সুবাদে রাকেশ তুতো জামাই। রিয়ার চাকরিস্থল বেঙ্গালুরু। রাকেশ লাগেজ গুছিয়ে পাড়ি জমিয়েছে লন্ডনে। পেশায় ডাক্তার রাকেশের একটাই লক্ষ্য – যেন-তেন-প্রকারেন বস্তা বস্তা পাউন্ড বন্দি করা। সঙ্গে আরও চাট্টি ডিগ্রি যদি এই মওকায় হাসিল করা যায় – পুরো কেরিয়ার জমে কুলফি ! ভবিষ্যতকে শক্ত অ্যান্ড পোক্ত করতে রিয়া-রাকেশ সত্যিই দুজনে দু-কূলে ! ওদের এই ‘ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ’কে জলবৎ তরলং করে আপনাদের কাছে পরিবেশন করতেই উপরের লাইনটি লেখার লোভ একেবারেই সামলানো যায় নি।

উপরের প্যারাগ্রাফ আপনারা লেখার গৌরচন্দ্রিকা হিসেবে ভাবতেই পারেন। যদিও ‘দূরের সম্পর্ক’ জেন জেড-এর কাছে জলভাত। এখন একজন ছেলে যতখানি ‘বিদ্যেধর’, অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েরা তার থেকেও বেশি ‘বিদ্যেবতী’। তো, এই ‘সরস্বতী বিদ্যেবতী’রা কি শুধুই ‘হোমমেকারে’র ভূমিকায় সন্তুষ্ট থাকবেন ? ‘কভি নেহি’। বরং ‘কদম কদম বাঢ়ায়ে যা’ আওড়াতে আওড়াতে ছাদনাতলা, শ্বশুরবাড়ি-র গন্ডি পেরিয়ে পা রাখবেন অচিনপুরে। হতে পারে সেটা স্বদেশে। হতেই পারে ভিনদেশে।

একুশের নারীই যদি এহেন হন, পুরুষরাই বা পিছিয়ে থাকবেন কোন যুক্তিতে ? এমনিতে ‘সোনার আংটি আবার ব্যাঁকা’ ট্যাগলাইন তো লেপটেই আছে তাঁদের পিঠে। সেই বলে বলীয়ান হয়ে তাঁরাও নমঃ নমঃ করে ‘বিয়ে’টুকু সেরে টুক করে বেরিয়ে পড়েন বিশ্বভ্রমণে। মোদ্দা গল্প কী দাঁড়াল ? দেবা-দেবী দুই প্রান্তে। চোখ মেলা থেকে বন্ধের আগে অবধি কাজ অ্যান্ড কাজ। সঙ্গে টুইটার, ফেসবুক।  দিনের শেষে ঘুমের দেশে যাওয়ার আগে রুটিন মাফিক আধা ঘন্টার স্কাইপ বা ভিডিও কলিং। ব্যস, তাতেই নিত্য কর্ম সারা। বুড়ি ছোঁয়া সম্পর্ক এতেই সন্তুষ্ট। মাস দুই-তিন অন্তর পরিযায়ী পাখির মতো দু’জনে উড়ে এসে বসে একে অন্যের আস্তানায়। কিংবা শ্বশুরবাড়িতে। ১০ দিনের ছুটিতে সুখী কপোত-কপোতীর মতোই চোখে হারায় একজন আরেকজনকে। ছুটি ফুরোলেই আবার দু’জনার দু’টি পথ বেঁকে যায় দু’দিকে।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

এই লাইফস্টাইলে নাকি ‘বিন্দাস’ আছে এই প্রজন্ম। চোখে দেখলে তেমনটাই ঠাহর হয় বটে। অন্তত, রিয়া-রাকেশের চেহারায় জৌলুষ দেখার পর নিজেরই এক-একসময় লোভ হয় ! কিন্তু আরেক দম্পতির ‘দূরের সম্পর্ক’-এর উপর থেকে পর্দা ওঠার পর কপালে বেশ কয়েকটি চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এই দূরত্ব, এই সব পেয়েছির দেশে পৌঁছোনোর আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যস্ত দু’টি জীবন সারা জীবন-ই কি সমান্তরাল হয়ে থাকবে ? মিলবে না এক বিন্দুতে ?

উত্তর খোঁজার আগে জেনে নিন ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা। রূপসা-রূপকের জীবনেও একই ছবি। এক ক্যাম্পাসে আলাদা। প্রেম। পরিণয়। শেষমেশ পেশার কারনে দেশ ছাড়া না হলেও রূপসা নয়ডায়। রূপক হায়দরাবাদে। রোজ রাতে নিয়মিত স্কাইপ, সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যাট ছিলই। কিন্তু দুজনের জীবনেই পা রেখেছে তৃতীয় ব্যক্তি। রূপসার জীবনে অর্জুন। রূপকের জীবনে শাওন। এবার শ্যাম রাখি না কূল রাখি করতে গিয়ে মাঝখান থেকে সাতপাকের বাঁধন আলগা হতে বসেছে। রূপসার মা এবং শাশুড়ি দু’জনেই পরামর্শ দিয়েছিলেন রূপসাকে, চাকরি ছেড়ে রূপকের কাছে চলে যেতে। কিন্তু আজকের জেন্ডার ইক্যুয়ালিটির যুগে কোন মেয়ে নিজের তৈরি জায়গা ছেড়ে সরে আসতে চায়। রূপসাও তাই মেনে নেয়নি গুরুজনের পরামর্শ।

মাঝখান থেকে হল কী ? দু’টি পাখি দু”টি তীরে। দাম্পত্য ভেঙে খান খান। সম্পর্ক ছেঁড়ার আগে দু’জনে মনোবিদের কাছে গিয়েছিল। তারপরেও নিটফল জিরো। এখনকার বঙ্গ জীবনের অঙ্গে ‘ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ’ যখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় ছড়িয়েছে তখন তার পরিনাম নিয়েও বোধহয় ভাবার সময় এসে গিয়েছে। এই বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল বিশিষ্ট মনোবিদ পারমিতা মিত্র ভৌমিকের সঙ্গে। পারমিতা নানা দিক থেকে আলোচনা করে দেখালেন, কী কী কারণে ‘দূরের সম্পর্ক’ আরও দূরে হয়ে যাচ্ছে –

১) সুখী গৃহকোণ তখনই হবে যখন কর্তা গিন্নি একে অন্যের আক্ষরিক জীবনসঙ্গী হবেন। এর জন্য দরকার ধৈর্য, সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং এক ছাদের নীচে জীবনযাপন।

আরও পড়ুন:  লেখক বেচারার খেদ

২) এই মুহূর্তে পাশ্চাত্যের ঢেউ প্রবল ভাবে আমাদের দেশে আছড়ে পড়েছে। বিদেশে ডিভোর্স জলভাত। ওখানে জেন্ডার ইক্যুয়েশন নিয়ে কোনও ট্যাবু নেই। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির অর্ধেক কাজ স্ত্রী করলে বাকি অর্ধেক হাসি মুখে স্বামী সারেন। ফলে, কাজ ভাগ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিশ্রম আর দায়িত্ব দুটোই ভাগাভাগি হয়ে যায়। চাপ পড়ে না কারোর উপর। আঁচড় পড়ে না সম্পর্কেও। সেখানে আমাদের দেশ এখনও পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষরাই বাড়িতে, অফিসে শেষ কথা বলার অধিকারী। এতদিন মেয়েরা মুখ বুজে সহ্য করলেও নব্য প্রজন্ম প্রশ্ন তুলছে, ‘আমরাই বা কম কীসে’। ফলে, না পোষালে পাশ্চাত্যের অনুকরণে বিয়ের বাঁধন খুলে মুক্ত বিহঙ্গ হচ্ছেন অনেকেই।

৩) তৃতীয় কারণটি মারাত্মক। পশ্চিমের ‘ফ্রি-মিক্সিং’ এবং ‘ফ্রি-সেক্স’ আমাদের দেশেও এখন বেশ পরিচিত। আদি-অনন্ত থেকে স্বামী-স্ত্রীর অটুট সম্পর্কে ‘সহবাস’ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এসেছে। তাই লক্ষ যোজন মানসিক দূরত্ব স্কাইপে মিটলেও দুটি শরীর সেই লক্ষ যোজন দূরেই। কতদিন গিলবেন আশ্লেষ, আদর, শরীরী চাহিদার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ? এভাবেই চাহিদার চোরা পথে এক সময় প্রবেশ পরকীয়ার। খুব কলোকিয়াল ল্যাঙ্গোয়েজে আমরা একে বলি ফিক্সড ডিপোজিট তো রইলই। একটা, দুটো খুচ্রো অ্যাকাউন্ট থাকলে মন্দ কি ? এই পরকীয়া বা ‘এক্সট্রা ম্যারিটাল আফেয়ার’ বিয়ে ভাঙতে একাই পাঁচশো।

৪) তারপর যদি বাচ্চাকাচ্চা থেকে থাকে তো সাড়ে সব্বোনাশ পুরো পরিবারের। সন্তান মা পায় তো বাবা পায় না। বাবা এলে মা ব্যস্ত। দাদু-ঠাম্মির আঁচল ধরে ঘুরতে ঘুরতে অবোধ দৃষ্টি খুঁজে বেড়ায় মা-বাবার ছায়া। একলা শৈশব অযত্নে, অবহেলায় এলোমেলো হয়ে যায় অনেক সময়েই।

হয়তো খুঁজে দেখলে আরও, আ-র-ও সমস্যা এসে দাঁড়াবে। এখন প্রশ্ন, তাহলে কী করবেন মিঞা-বিবি ? কে, কার জন্য কেরিয়ার জলাঞ্জলি দেবেন ? পুরোটাই দম্পতিদের বিচার্য বিষয়। তবে শেষ করব ‘ডিস্ট্যান্স রিলেশনশিপ’-এর আরেকটি নিদারুণ গল্প শুনিয়ে। রাধা-কৃষ্ণের ‘প্রেমলীলা’ নিয়ে আখ্যানের শেষ নেই। কিন্তু কৃষ্ণ মথুরা যাওয়ার পর রাধার কী হয়েছিল? সে খবর কেউ রাখে নি।

আরও পড়ুন:  কে?

চোখের বার হলে যে মনের দুয়ারও বন্ধ হয় আপনা থেকে – এর থেকে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে ? অতএব, সাধু সাবধান !

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ