আজ যা লোকজ‚ কাল তা ক্লাসিক্স | তার সেরা উদাহরণ বিরিয়ানি | তুর্ক-মুঘল যুগে শ্রমিকদের খাবার ভারতের ইসলামিক শাসনের শেষদিকে হয়ে উঠল রাজকীয় ভোজ |
 কলকাতার উপান্তে মেটিয়াবুরুজে প্রিয় শহর লখনৌয়ের রেপ্লিকা বানিয়ে ফেললেন ওয়াজেদ আলি | সুন্দরীদের নিয়ে হারেম পরীখানা‚ চিড়িয়াখানা‚ ঘুড়ি ওড়ানো‚ কবুতরবাজিবাকি থাকল না কিছুই | 

কিন্তু খাবার দাবার ! সেটাও তো জুতসই হওয়া দরকার | সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন নবাবের বাবুর্চিরা | যাতে নবাবের মনে হয় তিনি লখনৌয়ের প্রাসাদে বসেই খাচ্ছেন |

কিন্তু নির্বাসনে আর কী করে নবাবের নবাবিত্ব থাকে ! সন্দেহ নেই‚ ব্রিটিশরা তাঁকে প্রচুর ভাতা দিতেন | আজকের হিসেবে সেটা কয়েক লক্ষ | কিন্তু ওই মাপা টাকায় কি আর নবাবের চলতে পারে ?

টান পড়তে লাগল হেঁশেলে | বিরিয়ানিতে মাংসর যোগান আর দেওয়া যাচ্ছিল না | আর মাংস দিলেও বৃদ্ধ নবাব খেতেও পারছিলেন না ঠিক করে | দুর্বল দাঁতের জন্য |

শেষে উপায় বের করলেন বাবুর্চিরাই | বিরিয়ানিতে দিলেন আলু আর ডিম | এতে খেতেও সুবিধে হল নবাবের | আর পরিমাণেও বাড়ল |

একটা কথা মনে রাখতে হবে | তখন কিন্তু আলু এখনকার মতো পাতি সব্জি ছিল না | এই সব্জি এসেছিল পর্তুগিজদের হাত ধরে | ভারতের মাটিতে তারাই চাষ শুরু করেছিল আলুর | উনিশ শতকের মাঝামাঝি তখনও দামি আলু আমদানি হতো পর্তুগাল থেকে | সেই আমদানিকৃত আলুই প্রবেশ করেছিল নবাবি বিরিয়ানিতে |

সেই শুরু | আজ তো আলু ছাড়া কলকাতার বিরিয়ানি ভাবাই যায় না | অওয়ধি বিরিয়ানির সঙ্গে কলকাতার বিরিয়ানির মূল তফাৎ হল আলু | অওয়ধি বিরিয়ানিতে আলু থাকে না |

কলকাতায় এখন থাকেন ওয়াজেদ আলি শাহ-এর প্র-প্র-নাতনি মনজিলৎ ফতিমা | তিনি খাঁটি নবাবি রান্না শিখেছেন মায়ের কাছে | তাঁর মা শিখেছিলেন তাঁর ঠাকুমা ফারুখ আরা মেহদি বেগমের কাছে | মেহদি বেগম ছিলেন মেহর কুর্দের স্ত্রী | মেহর কুর্দ ছিলেন বিরজিস কুর্দের ছেলে | বিরজিস কুর্দ হলেন ওয়াজেদ আলি শাহর বড় ছেলে |

যাঁরা মনজিলতের হাতের বিরিয়ানি খেয়েছেন তাঁরা হলফ করে বলেন‚ এই রান্না কলকাতার যেকোনও দোকানের বিরিয়ানি থেকে আলাদা | কারণ মনজিলৎ পারিবারিক ধারা মেনে রান্নায় দেন আসল জাফরান | দোকানের মতো রং নয় |

বিরিয়ানির মাংস রাঁধেন সর্ষের তেলে | সর্ষের গন্ধ যাতে না আসে ভাল করে তেলকে গরম করে নেন | পাশাপাশি কেওড়ার জল‚ দুধ‚ ঘি সবই দেন | আসল কায়দা নাকি বিরিয়ানিতে দম দেওয়া | ঢিমে আঁচে রান্নার ওটাই আসল রহস্য |

এখনও তাঁর বাড়িতে যখন বিরিয়ানি রাঁধেন প্রথম বার হাঁড়ি আঁচে বসানোর সময় মনজিলৎ একবার উচ্চারণ করেন বিসমিল্লাহ | যেকোনও শুভ কাজের আগে এটাই রেওয়াজ ইসলামিক রীতিতে | ওয়াজেদ আলি শাহ-এর এই উত্তরসূরী মনে করেন‚ এটাতেই অসাধারণ স্বাদ আসে বিরিয়ানিতে |

তবে নবাবি মহলে বিরিয়ানি ভোজন অসম্পূর্ণ যদি না সঙ্গে থাকে বুরানি | টক দই‚ পুদিনা পাতা‚ লঙ্কা‚ বিটনুন আর ভাজা সর্ষের ঘোল বা রায়তা |

আরও পড়ুন:  মাসির বাড়ি থেকে ফেরার পথে একবারই থামে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার রথ‚ সেটাও এই কারণে
- Might Interest You

NO COMMENTS