কাজ করার কথা ছিল দিনে দুবেলা | সেটা এখন ঠেকেছে এক বেলা, তাও রাত নটায় | প্রতি রাতে কাজ করে গেলেই বুক ছ্যাঁৎ করে ওঠে, কাল আসবে তো ? বেশি নয়, আমার কাজের লোক আরতি কাজ করে মাত্র তেইশ বাড়িতে | আমার বাড়ি সেরে আরও তিন বাড়ি, তারপর বাড়ি ফিরে রাত দুটো পর্যন্ত সিরিয়াল | আবার ভোর পাঁচটায় বেরিয়ে পড়া বাড়ি বাড়ি |

আর এ সবের ফাঁকে ফাঁকেই নিয়ম করে দশ বছরের মেয়েটাকে এস এস কে এম নিয়ে যায় আরতি | সেখানে তার মেয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে | রোগা ডিগডিগে হাতময় হাজা এই আরতিই বাড়ি বাড়ি ক্লাবে ক্লাবে ঘুরে মেয়ের চিকিৎসার খরচ ম্যানেজ করে | এছাড়াও আছে বড় মেয়ের উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার খরচ, বরের মদের খরচ, দুই মেয়ের বিরিয়ানির আবদার | কী বলা যায় আরতিকে ? দশভুজা ? মাতৃত্বের প্রতীক ? না কি নেহাত সুযোগসন্ধানী কাজের লোক, যে কোনও নোটিশের ধার না ধেরে আচমকা ৫-৬ দিন নির্বিকার ডুব মারে ?

ও নিজে অবশ্য ওর অবস্থাকে বাঁচার লড়াই হিসেবেই ব্যাখ্যা করে | ওর সোজাসাপটা কথা, বর কাজকম্ম করে না, শুধু মদ গেলে, তেইশ বাড়ি কাজ কমাতে বলছ, আমি বসে গেলে তুমি খাওয়াবে ?

তাই আরতি নিজে তার বড় মেয়ের এগারো ক্লাস পড়া নিয়ে যথেষ্ট গর্বিত হলেও তার জীবনকে মাতৃত্বের রঙচঙে মোড়কে আমি কখনও দেখার চেষ্টা করিনি | ডারউইনের থিওরি মেনে তা অস্তিত্বের জন্য সংগ্রামের গল্প ছাড়া আর কিছু নয়। আর পাঁচজনের মত সেও একজন পদাতিক, নিজেরটুকু বুঝে নিতে যে প্রাণপণে যুঝছে | মা তো সে অবশ্যই কিন্তু তারও ওপরে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাওয়া একজন সৎ নাগরিক, সংসারের দায়িত্ব জোয়াল মনে না করে যে তা হাসিমুখে কাঁধে তুলে নিয়েছে |

আরতির কথা ছাড়ুন | একমাত্র হিন্দি ফিল্মের নিরূপা রায় ছাড়া সো কলড মাতৃত্বের জয়গান আর কোথাও দেখা যায় কি ? আর কথায় কথায় গ্যালন গ্যালন চোখের জল ঝরানোয় বিশ্বাসী ওই মহিলা কি অসহ্যরকম বোরিং নন ? তাঁর থেকে তো অনেক স্বাভাবিক এখনকার জিন্স টপ পরিহিত মায়ের দল, বাচ্চাকে হাসিমুখে টা টা করে যারা স্বাধীন জীবনের পথে বেরিয়ে আসে | তবে বাচ্চাকে ফাঁকি দিয়ে অফিস করতে হচ্ছে বলে অনেকেই প্রচণ্ড হীনমন্যতায় ভোগে অবশ্য |

আরও পড়ুন:  ' ময়ূরের অশ্রু পান করে গর্ভবতী হয় ময়ূরী !'

আসলে পুরাণই বলুন বা গল্প উপন্যাস বা হালের পত্রপত্রিকা- মাতৃত্বের নন স্টপ ঢাক পেটানোই মেয়েদের মাথাটা খেয়েছে | তা না হলে ১৬ বছরের কচি মেয়ে সুস্মিতা সেন কিনা মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার ফাইনাল প্রশ্নে নারীজাতির এসেন্স বলতে শুধু মাতৃত্বকেই তুলে ধরেন ? স্ত্রী বা বান্ধবীরূপেণ সংস্থিতায়ের ধন্য ধন্য করা উচিত ছিল এমনটা বলছি না | কিন্তু যে মেয়েটা মা নয় বা কখনও হবেও না, সে পিছিয়ে কোন দিক থেকে ?

নাই বা আসুক মাতৃত্ব, সেও তো সংসারের জগদ্দল ক্রুশটা বইছে তার মত করে | শুধু নিজের অস্তিত্বের জোরেই তো সে শক্তিস্বরূপিণী । বা যে মেয়েটা নিজের শর্তে বাঁচতে গিয়ে বিয়েই করল না, সে অসম্পূর্ণ কীসে ? বরং এই বেবি বুমের যুগে কেউ যদি গুরুজনদের বাঁকা চোখকে পাশ কাটিয়ে অন্যরকম ভাবার সাহস দেখান তাঁকে তো মাথায় তুলে রাখা উচিত আমাদের । মহাভারতের কথাই ধরুন না |দ্রৌপদীর পাঁচ পাঁচটা ছেলে ছিল | কিন্তু কাকে মনে রেখেছি আমরা ? মা দ্রৌপদীকে ? না গর্বিতা, তেজদৃপ্ত, স্বয়ংসম্পূর্ণা নারী দ্রৌপদীকে?

এখন আবার মাগ্যিগণ্ডার যুগ পড়ায় অনেক পাত্রপক্ষই কষ্টেসৃষ্টে পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে লিখছেন, চাকুরীরতা চলিবে | ভাবটা এমন, চাকরি করা পাপী মেয়েটাকে উদ্ধার করে মাথাটা কিনে রাখবেন তার | পাশাপাশিই মেয়েদের কানে প্রথম থেকে মন্ত্র দেওয়া হচ্ছে, সে তুমি চাকরিই করো আর যাই করো, ভোর ভোর উঠে স্বামী শ্বশুর শাশুড়ির মুখের সামনে গরম চা না ধরতে পারলে অমন চাকরির কোনও দাম নেই | আর বাচ্চা হয়ে গেলে তাকে মানুষ করার দায়িত্ব পুরোপুরি তোমার |

চাকরি তো করবে অবশ্যই | কিন্তু ঘরদোর সামলাতে হবে, বাচ্চার দেখভালও করতে হবে পুরোদমে | কিন্তু কেন তাকে নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা অগ্রাহ্য করে জান লড়িয়ে আদর্শ দুর্গা ঠাকুর হয়ে উঠতে হবে তার জবাব কারও কাছে নেই | তার এই প্রাণপণ স্ট্রাগলের ফল অশ্বডিম্ব হতে পারে, তার ছেলেমেয়ে অমর্ত্য সেন না হয়ে হরিপদ কেরানিও হতে পারে |

আরও পড়ুন:  টিপু সুলতানের বংশধররা আজ কলকাতায় কেউ রিক্সা চালান‚ কেউ গৃহস্থের পরিচারিকা

আর চাকরি না করলে ? দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ মাথায় করে মেয়েকে স্কুল থেকে বাড়ি নিয়ে আসতে হবে তাকে, মেয়েকে কোনওক্রমে নাইয়ে খাইয়ে কোচিং সেন্টারেও নিয়ে যেতে হবে তাকেই | কারণ ? কারণ সে আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী | তার থেকেও বড় কথা, সে তো চাকরি করে না, তাই অফিস যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই | আর এই একই কারণে স্বামী শ্বশুর শাশুড়ি ঘরে বহাল তবিয়তে বর্তমান থাকলেও কুটোটি নাড়ার কথাও ভাবতে পারে না তারা | অথচ তারও তো ইচ্ছে করে, সকালবেলা বিছানায় আধশোয়া হয়ে চা খেতে খেতে খবরের কাগজের পাতা ওল্টাতে | বেশি নয়, মাঝে মধ্যে এক আধ দিন। সেটুকু বিলাসিতাও তার কাছে বিলাসিতা, আক্ষরিক অর্থেই |

মাতৃ দিবস | মাতৃত্বের খাঁড়ার তলায় জীবনের ছোটখাটো সব খুশি আর আনন্দকে বিসর্জন দিতে অভ্যস্ত মেয়েদের দিন | তার মধ্যেই কারও কারও ছেলেমেয়ে মায়ের হাতে তুলে দেবে কোনও গিফট | ক্লান্তিহীন ননস্টপ মাতৃত্বের বাৎসরিক স্বীকৃতি | আর সন্তান গর্বে গর্বিত মায়ের দল ছেলের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প জুড়বে, জানিস তো, আমার ছেলেটা অ্যাত্তো সেন্সেটিভ না…

(পুনর্মুদ্রিত)

- Might Interest You

NO COMMENTS