ঢিসুম …

ঘড়ির কাঁ্টা তখন প্রায় রাত দু’টো ছুঁিছুঁি | চারপাশে ভয়ের মতো নিকষ অন্ধকার | প্রবল ঠান্ডা আর হাড় কাঁ্পিয়ে দেওয়া হু হু বাতাস যেন বলছে,কেন এত কষ্ট করে বেঁ্চে থাকা, শুধু মাঝে মধ্য়ে চিরে দিচ্ছে ভারি বুটের আওয়াজ | খট.. খট..খট..খট.., একবার কাছে আসছে,আবার মিলিয়ে যচ্ছে দ্ুরে | পকেটে টর্চ থাকলেও, জ্বালানো যায় না | যে কোন ম্ুহুর্তে, আলোর পথ ধরে ছুটে আসতে পারে গুলি | তবে, অন্ধকারেও দেখতে পাওয়ার ট্রেনিং দেওয়া হয় ওদের | চোখ সয়ে গেলে, কিছুক্সণ পর, খানিকটা ঠাওর করা যায় | আরও তিন ঘন্টা পর রিলিভার আসবে, তখন ওর ছুটি |

হঠাৎ কে যেন চেঁ্চিয়ে ওঠে – ‘হল্ট’ | এক ঝটকায় কাঁ্ধের বন্দুকটা নামিয়ে, ও তাক করে যেদিক থেকে শব্দটা ভেসে আসছে সেইদিকে | পাল্টা আওয়াজ বেরিয়ে আসে ওর মুখ থেকে – ‘হল্ট’ | বুঝতে পারে, হাঁ্টতে হাঁ্টতে LOC’র সবচেয়ে সরু জায়গাটায় চলে এসেছে ও | খেয়াল করা উচিত ছিল | এখানে এক ম্ুহুর্তের অসাবধানতা মানে নির্ঘাত মৃত্য়ু | বুকের ওপর লাফিয়ে শুয়ে পড়ল ও | কোথাও কোন আওয়াজ নেই, একমাত্র হাওয়ার শব্দ ছাড়া |

যেদিক থেকে আওয়াজটা এসেছিল,প্রায় দম চেপে বন্দুকের ভিউ ফাইন্ডারে খানিকক্সণ চোখ রাখাতে….ঐ যে, দেখতে পেয়েছে লোকটাকে | তারই দিকে তাক করে আছে স্বয়ং্ক্রিয় অত্য়াধুনিক রাইফেল | ও নিশ্চয়ই আগে দেখেছে | তবে গুলি চালায়নি কেন

—মরার সাধ হয়েছে নাকি?

—তোর মরার সাধ হয়েছে নাকি?

—ছ্য়া, আমি চাইলে আগেই মারতে পারতাম | তোর তো খেয়ালও ছিল না |

—রাখ..রাখ | এখুনি তোকে উড়িয়ে দিতে পারি | সেদিনই তো দিয়েছি তোদের দু’টোকে | এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি

— তোদের লজ্জা করে না,এই নিয়ে গর্ব করতে’দিনে পৃথিব্ি থেকে মুছে দিতে পারি তোদের |

—আব্বে ছাড় | জানিস আমাদের ক্সমতা কত? আমাদেরও কাছে আছে পরমাণু বোমা | মনে নেই, তোরা বিস্ফোরণ ঘটাবার ক’দিনের মধ্য়েই আমরাও সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলাম আমাদের ক্সমতার কথা |

—আরে ওটা তো শেষ অস্ত্র | অন্য় সব কিছুর হিসেব রাখিস্? আমাদের Active MIlitary Personnel প্রায় ১,৩২৫,০০০ | আর তোদের মোটে ৬,১৭,০০০ | পৃথিব্িতে সবচেয়ে বেশি Anti Tank Weaponry আছে আমাদের কাছে,প্রায় ৫১,৮০০ |
Aircraft, Tank, Navy Ship, Submarine সব কিছুই বেশি আছে আমাদের |

—ওসব বলে লাভ আছে, সে খেয়াল আছে? নিজেদের নিয়ে খালি ফাঁ্কা গর্বই কর তোরা | আর আমরা খেলি অন্য় খেলা | আর কবে শিক্সা হবে তোদের

চলতে থাকা এই

বেশ ভয় পেয়ে যায় ও |

ও অস্ফুটে বলে ওঠে… ‘ই…ল্লা’
ও অস্ফুটে ডাকে…’হে,…ম’

—কিরে ভয় পেয়ে গেলি নাকি?

—তুই ভয় পাস নি?

—না,ভয়ের ক্ি আছে? এতো নতুন দেখছি না | সয়ে গেছে | আসলে গতকালই ঘর থেকে একটা চিঠি এসেছে | মায়ের খুব অসুখ,হাঁ্টুতে বাত,আর চলতে পারে না | বয়স হয়েছে অনেক | বারবার নাকি বলছে, আমাকে একবার দেখতে চায় | ছুটির দরখাস্তও করেছি | বাড়ি যাইনি আজ প্রায় ন’মাস | এখন যদি আবার গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়,তাহলে হয়ত ছুটিটাও নামঞ্জুর হয়ে যাবে |

—ও আচ্ছা | আমিও বাড়ি যায়নি আজ প্রায় সাত মাস হল | একটা মেয়ে হয়েছে,তিনমাস হল | আজও তার মুখ দেখতে পাইনি | বউটাকেও দেখিনি কতদিন |

—তোমার কি এই প্রথম সন্তান?

—হ্য়াঁ্ | তোমার কটা?

—আমার এক ছেলে,আর এক মেয়ে | ছেলেটা বড় | তোমার বাবা-মা নেই?

—না | বাবা সেই ৭৯ সালে… আর মা তার একবছর পর |

আবার প্রচন্ড শব্দে কেঁ্পে ওঠে গোটা উপত্য়কা | আর তারই সঙ্গে কেঁ্পে ওঠে ঐ দু’জন |

—জানো,আমার বাড়িটা না একটা টিলার ওপর | একটাই ঘর |টিনের চাল |সামনে খানিকটা খোলা জায়গা | বউ ফুল গাছ লাগিয়েছে সেখানে | ঘরের বাঁ্দিকে, একটা ছোট কুয়োতলা | ক্ি মিষ্টি আর ঠান্ডা জল | দুটো গরুও আছে আমার | বউটা আমার খুব ভাল সেলাই জানে | জরির কাজ করে ও | ছুঁ্চ ফুটে ফুটে আঙ্গুলের ডগাটা কেমন লাল আর গর্ত হয়ে গেছে | গতবার যখন গেছিলাম,বলেছিলাম,এত ফরসা আর সুন্দর হাত তোর্ | সেলাইয়ের কাজ আর করিস না | ও শুনল না | আসলে ছেলে-মেয়ে দু’টোকে বড় করতে হবে তো | আমি যা মাইনে পাই,তাতে হয় না |

—তোমার কথা শুনে না, বড় কষ্ট হচ্ছে আমার | খুব দেখতে ইচ্ছে করছে ছেলেটাকে,বউটাকে | আমিও এবার ছুটি নেব |

—যদি এই পাহারা না দিতে হত,কত ভাল হত না? যদি ঝগড়া না থাকত,আমরা তো বাড়ি যেতে পারতাম |

—কখনও পারলে এসো আমার বাড়ি | খুব ভাল ফল হয় আমার গাছে | আর তোমার মায়ের জন্য় এক শিশি তেল দিয়ে দেব | আমার বউ বানায় | ওর বাবার কাছে শেখা | গ্রামে, ঐ তেলের জন্য় ওর খুব নাম | আর খুব ভাল আচার বানায় ও | ওর হাতে তৈরি ডাল,রুটি আর আচার খাওয়াব তোমায় |

—তোমার নামটা বললে নাতো?

—বন্ধু বলে ডাকতে পারবে আমায়?

—তুমিও তবে বন্ধু বলে ডেকো |

হঠৎি আগুন জ্বলে ওঠে স্িমান্তের দু’পাশে | কামান দেগেছে ওরা | ঝলসে যায় দু’টো দেহ | দু’স্িমান্তের মাঝে no man’s land এর মাটি ভিজে যায় দু’জনের রক্তে |

অবাক হওয়ার আরও বাকি থাকে |

দু’জনেরই রক্তের রঙ এক |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.