নিভাননীর উপত্যকা

পর্ব ১

পুজো শেষ হতে না হতে এ বছর যে ভাবে বিছানা নিয়েছিলেন নিভাননী, ভাবেননি যে আবার উঠে বসবেন ! এক একটা দিন কেটেছে তখন বটে ! এই গেলেন গেলেন ভাব | সেই সময়, শয্যাশায়ী অবস্থায় তাঁর মনে পড়ত –নাহ, আত্মীয় পরিজন, জ্ঞাতি গুষ্টি, পাড়া প্রতিবেশী কেউ নয়, এমনকি পূর্ণেন্দু হতভাগাকেও নয়, – তাঁর শুধু মনে পড়ত নবমীর দিন শেষ দেখতে পাওয়া মাঠের ঠাকুরের সেই অপরূপ মুখখানা ! কি বরাভয় সেই রূপে, ‘ওরে মরবি নে রে নিভাননী, মরবি নে, আরো কটাদিন প্যাঁটরায় আয়ু রাখা আছে তর, নিশিন্তে থাক, পুর্নেন্দুর ছেলে দুটো ভাতের দানা মুখে না দেওয়া অব্দি তুই মরবি নে!’ সেই মৃন্ময়ী, অন্তর্যামীকে মনে মনে কল্পনা করে তিনি তখন খোশামোদ করতেন একটু, ‘কি সাজই না সেজেছো এ বছর ঠাকুর ? চোখ যে আর ফেরাতে পারি নে ! নব্বই পার করে দিলাম, এমনটা কখনো দেখি নি কো ! একেবারে জলজ্যান্ত ! তিথি নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল মন্ডপের একটা চেয়ারে, তোমায় দেখে আমি তো হতবাক | উঠে আসতে আর ইচ্ছায় করছিল না ! কিন্তু এই বুড়ি মাগীকে ঘরে তুলে না দেওয়া অব্দি তো পূর্ণেন্দু তিথিকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে যেতে পারবে না, তাই তিথি বারবার কানের কাছে বলতে লাগলো, ‘বাড়ি চলো ঠাকুমা, এরপর হিম পড়বে, মাথায় হিম পড়বে!’ – আর পোড়া কপাল আমার, শীতকালে শীত পড়ে এখন কলকাতায়? আশ্বিন মাসে হিম পড়ে এখন কলকাতায়?’ আগে হলে, পাঁচ বছর আগে হলেও জোর এক ধমক দিতেন তিথিকে, বলতেন, ‘দূর হ !’ কিন্তু এখন এত কথা বলার শক্তি তাঁর ফুরিয়েছে বলে তিনি ভালো মানুষের মতো মুখ করে তিথি যতবার ‘ঠাকুমা, বাড়ি চলো’ বলল, ততবার বললেন, ‘ এই যাই, আর এট্টু বসে নিয়ে যাই চল মা !’

একাদশীর দিনই অবশ্য গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি ! কিন্তু তাঁর মধ্যেও, অক্ষম শরীরের মধ্যেও বেঁচে থাকার বাসনাটা দিব্যি টাটিয়ে উঠত তাঁর !নির্লজ্জের মতো শুয়ে শুয়ে মার কাছে মিনতি করতেন নিভাননী, – ‘আর কটা দিন!’ কারণ হিসেবে তিনি দেখাতেন তিথির কোল জোড়া বাচ্চা একটা ! যদিও অন্তরে সেটাই একমাত্র কারণ ছিল না ! ওদের বয়স কম, আজ না হলেও কাল বাচ্চা হবে ! কিন্তু তবু ঠাকুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে এ বয়সেও পিছপা হন না তিনি ! তাঁর যে নিজের আর কটা দিন বেঁচে থাকার ইচ্ছে ভুলেও এমন কথা নিভাননী মুখ থেকে বের করেনননি ! তা সে প্রার্থনাতেই হোক কি যে কারণেই হোক, শেষমেষ আবার বেঁচে উঠলেন নিভাননী | জবুথবু শরীরটা আবার লাঠি হাতে উঠে দাঁড়াল, উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অবশ্য জগদ্ধাত্রী পুজো পেরিয়ে গেল !

পুর্নেন্দুরা তখন ভারী ব্যস্ত | পাড়ার ফাংশন, বসে আঁকো, নাটক, নাচগান, দরিদ্র নারায়ণ সেবা এসব নিয়ে ! সন্ধে থেকে সব যোগেশের বাড়িতে থাকছে | তিথি মুখচোরা গোছের, সেও একদিনও বাড়ি থাকে না, অফিস যায়, ফিরেই পূর্নেন্দুর  জোরাজুরিতে যোগেশের ওখানে গিয়ে বসে থাকে | সেখানে যুগল আর বাবলির ত্বত্তাবধানে তখন রোজ মচ্ছব ! নাটকের রিহার্সালের সঙ্গে খানাপিনাও হচ্ছে খুব ! পারলে সারা পাড়া গিয়ে জড়ো হয় যোগেশের অট্টালিকায় ! কাঁহাতক আর বসে বসে শেফালির মায়ের মুখ দেখবেন, ভেবে, একদিন দুপুরে মনে জোর করে লাঠি ঠুকে ঠুকে দীননাথ মুখুজ্জেদের বাড়ি যাবেন বলে বেরোলেন | মুখুজ্জেদের নাতনিটা তাকে খুব ঠাকুমা ঠাকুমা করে | তিনি নিচ থেকে বান্টি বলে হাঁক দিলেই, ধুপধাপ নেমে এসে জড়িয়ে ধরে দোতলায় রাধারানী যে ঘরে শুয়ে থাকে সেই ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেয়, বলে, ‘ তোমরা গল্প করো, আমি শুনি !’ রাধারানী তাই শুনে বলে, ‘আর গল্প কি করব দিদি? সব কথাই এবার ছাই হতে চলল !’

তিথি চাকরি করতে শুরু করায় অত বড় বাড়িটা হাঁ করে গিলতে আসে নিভাননীকে | এমনিতেই তাঁর চিরকেলে অভ্যেস ছিল বেলায় একপ্রস্থ জলখাবার খেয়ে বাঁশির বাড়ি হাজির হওয়া ! বাঁশি মারা যাওয়ার পর রায়দের বাড়ি যাওয়া তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন | যখন যেতেন তখন তিনি আর বাঁশি গল্প করতে বেলা পার করে দিতেন – এই বয়সেও, এই সত্তর পঁচাত্তর বছরের পুরনো বন্ধুত্বেও এত কথা থাকত তাঁদের ! বাঁশি চলে যাওয়ার পর টার মনে হয় অনেক কথায় না বলা রয়ে গেল ! কথা কইতে কইতে একটা দেড়টা বেজে যেত, তখন বাঁশির কোনো নাতবৌ ধরে পড়ত তাঁকে – ‘একটু খেয়ে যান না ঠাকুমা, আবার বাড়ি যাওয়ার কি দরকার? তিথি তো নেই ! এখানেই খেয়ে একটু বিশ্রাম নিন তারপর বিকেলবেলা অরিন্দম পৌঁছে দিয়ে আসবে ক্ষণে !’ কিন্তু এই বয়সেও এ সব বিষয়ে টনটনে জ্ঞান রয়েছে নিভাননীর ! আসেন, যান সব বাড়িতেই, কিন্তু পাত পাতেন না ! সে একটা সময় ছিল যখন সংসার ছিল বাঁশির হাতে, কানাই রায় বউয়ের কোথায় উঠত বসতো, বাঁশি মুখ টিপে হেসে বলত, ‘ এখনও বুড়োর রস কি রে নিভা, ওনাকে কাছে আসতে না দিলেই অমনি হাতে পায়ে ধরবেন, বলবেন, ‘কি নতুন গয়নার শখ হয়েছে বুঝি? কালু স্যাকরাকে খপর দোব ?’

কানাই রায় নাকি কথায় কথায় বান্শিকে বলত, ‘ আমরা হলাম কুলীনের বংশ | আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা একশ বিয়ে করেছিলেন, সেই কম আমাদের রক্তে বসে আছে, অথচ সবেধন নীলমনি এই এক বাঁশি বউ !’ বাঁশি একথা তাকে বলতে, নিভাননী বন্ধুকে শিখিয়ে দিলেন, ‘ কেন বলতে পারিস না, এই এক বান্শিকেই তো উল্টে পাল্টে এত রকমের সুর বের করছো, আবার আপশোষটা কি শুনি?’ টার কথা শুনে হেসে কুটোপাটি হতো বাঁশি, বলত, ‘তা যা বলেছিস, বড়টা হলো লম্বা ফর্সা, মেজজন কালো আর বেঁটে, বড় মেয়ের মাথায় এত চুল, ওদিকে ছোটোর চুলের চিন্তায় আমার চুল উঠে যাওয়ার জোগাড় ! আর বঙ্কিম? গায়ের রং কালো, কিন্তু চোখ কটা! এক এক সময় ভাবি, ভগবান, এরা সবাই আমারই পেট থেকে পড়েছে তো?’

তখন দিনকাল অন্য রকম ছিল, বাঁশির কাছে তিনি গেলে যেমন ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, তেমনি তাঁর কাছে বাঁশি এলেও তিনি যারপরনাই যত্ন করতেন ! ঠাকুরকে বলতেন, ‘ ঠাকুর এক্ষুনি লুচি ভাজো, বাঁশি লুচি বড় ভালোবাসে ! তা সে সময় এ পাড়ায় তাঁর ওজন কি ? বাড়িতেও যারা কাজ করত সব যমের মতো ভয় পেত তাকে, একটা কাজ হাত তুলে করতে হতো না, অঙ্গুলিহেলনেই সব হয়ে যেত | তাঁরপর দিন বদলালো ! ওদিকে কানাইবাবু চলে গেলেন, কালে দিনে বাঁশিও অথর্ব হয়ে উঠলো | তিনিই তখন যেতে লাগলেন বাঁশির কাছে, বাঁশি তো দোতলা থেকে নামতেই পারত না | যা হয় – একদিন সংসারের সর্বময় কর্ত্রী ছিল বাঁশি, ওর হুকুম ছাড়া একটা খুঁটি পর্যন্ত স্থান পরিবর্তন করতে পারত না, সেই সংসারের চাকা দিব্যি ঘুরতে লাগল অথচ ওর একটা পরামর্শেরও প্রয়োজন থাকলো না কারো ! অবশ্য টুকটাক বিষয়ে সব সময়েই বাঁশির কাছে আসতো ওর চার ছেলের বউ, এমনকি বলা উচিত নয়, ওরা নিভাননীকেও এই সেদিন পর্যন্ত কারণে অকারণে নানা সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে ওদের হয়ে, আর এখন তো বাঁশির বড় ছেলেই দাদু বনে গেছে, বড় বউটাই তো ক’দিন হলো মারা গেল ! এখন যারা আছে, তারাও তাকে চেনে, খাতির করে, কেউ না কেউ ঘুরে ফিরে খবর নিয়ে যায়, অম্বুবাচীতে আজও এক ঝুড়ি ফল ও বাড়ি থেকে বাঁধা, বাঁশি দিত, সত্তর বছরে তা একবারও বন্ধ হয়নি কিন্তু !

তা সেরে উঠে সেদিন মুখুজ্যে বাড়ির পথ ধরলেন নিভাননী – লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটছেন, বলরাম মল্লিক স্ট্রিটের কাছে ব্রজেনের সঙ্গে দেখা | এ কথা ও কথা বলতে না বলতেই ব্রজেন বলে উঠলো –

‘ দ্যাখো বৌঠান, এই শীতটা আমি নিতে পারি কিনা ! রাধারানী বৌঠান তো আমার থেকেও চার পাঁচ বছরের ছোটো ছিল!’

‘ছিল মানে?’ চমকে উঠলেন নিভাননী ! টলে গেলেন একেবারে | শক্ত করে ধরলেন লাঠিগাছ |

‘জানেন না আপনি? ও, তা পূর্ণেন্দু আপনাকে বলেনি দেখছি ! তা না বলে ভালোই করেছে | শুনে কী লাভ?’ বলল ব্রজেন |

‘আহ, থাম দেখি তুই ! কথাটা পরিস্কার করে বল আগে |’ হাঁকপাঁক করে বলে উঠলেন তিনি |

‘মুখুজ্যে বৌঠান আর নেই ক বৌঠান, গেল হপ্তায়, দুদিনের জ্বরে চলে গেল বেচারি | কতই বা বয়েস হয়েছিল বলো? আটাত্তর পূর্ণ হয়নি ! এ পাড়ার মেয়েছেলেরা সব নব্বই পার করে দেয় ! সে তুলনায়…!’

তিনি আর বললেন না রোদটা গায়ে মাখতে মাখতে তিনি রাধারানীর কাছেই যাচ্ছিলেন ! এক মুহূর্তের জন্য নিভাননীর চোখ থেকে পঙ্গু রাধারানী মুছে গেল, তিনি দেখতে পেলেন এক ষোড়শীকে, গল্পের বইয়ের পোকা ছিল মেয়েটা, রান্নাঘরে বসে গল্পের বই পড়ত আর শাউরির ঝ্যাঁটা লাঠি খেয়ে তাঁর কাছে কাঁদত  ! সে মেয়েটা মরে গেল? ব্রজেন বলল, ‘ প্রতি বছর শীত আসে, আর আমার ভয় হয় এই শীত আর সহ্য হবে না ! যখন টাটকা সবজি ওঠে বাজারে, বৌঠান তখন মনটা আরো খারাপ হয়ে যায় | ওরা আমাকে ফুলকপির সিঙ্গারা কড়াইশুঁটির কচুরি, নলেন গুড়ের পায়েস সব বেশি বেশি করে দেয়, বলে, ‘খান না বাবা, পেটে যখন নিচ্ছে তখন খান না !’ আমি তখন বুঝতে পারি মনে মনে ওরা ভাবে বুড়ো খেয়ে নিক যতটা পারে, পরের শীতে থাকবে কিনা সন্দেহ !’

নিভাননীর মনটা নেহাত খারাপ হয়ে গেছে রাধার খবর শুনে তবু ব্রজেনকেও তিনি ন্যাংটা বয়স থেকে দেখেছেন, সে বেচারার দুঃখও তাঁকে না ছুঁয়ে পারে না | তিনি বলে ওঠেন, ‘দূর হতভাগা, ওরা তা মোটেও ভাবে না ! তুই তো কোন জম্ম থেকে খেটে ভালোবাসিস, তাই তোকে বেশি দেওয়া ওদের অভ্যেস | এত বছর ধরে এত পিঠে পায়েস সাপটে খেয়েও তোর আশ মেটেনি একথা কি কেউ ভাবতে পারে ভাই? যা, যা, ও নিয়ে দুঃখ করিস নে !’

‘কি যে বলো বৌঠান, লক্ষ্মী পুজোর দিন বড় বৌমার হাতে পাঁচ মিশেলি তরকারী খেয়ে আমি হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলাম ! মনে হলো কই এমনটা তো আগে বড় খাইনি?’ বলতে বলতে ব্রজেনের হলুদ লুঙ্গিটার খুট হঠ করে খুলে গেল ! এই গেল গেল করে উঠল ব্রজেন | কিন্তু লাঠি ধরা হাতে খুট বাঁধবে কী করে বেচারি, সব সময় তো কাঁপছে, তিনি তাড়াতাড়ি এক হাতে নিজের আর ব্রজেনের লাঠিটা ধরলেন, অন্য হাতে ধরে রইলেন ব্রজেনকে, এতে দুজনে দুজনকে ধরে দাঁড়াতে পারল যা হোক, আর ব্রজেন লুঙ্গির খুটটা হাজার ভাঁজ খাওয়া, কুঁচকোনো  পেটের চামড়ার কোথাও একটু গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল | তা সে পারে আর না, দুজনেই উল্টে পড়েন আর কি! তিনি ধমকালেন ছেলেটাকে, ‘তোকে বেরোতে দেয় কেন বল দেখি, পড়ে মরবি তো পথে ঘটে !’

এই সময় টুলু যাচ্ছিল পাশ দিয়ে, চট করে দু হাতে ধরে নিল দুজনকে | তিনি বললেন, ‘বেঁচে থাক বাবা, ভালো থাক, ঠিক সময়ে এসে পড়েছিস !’ ব্রজেনের খুটটা এঁটে দিয়ে টুলু বলল, ‘এখন এই দুপুরে রাস্তায় লোকজন কম, এই সময় তোমরা বেরিয়েছে কেন ঠাকুমা? পূর্নেন্দুরা কেউ নেই ! এঃ হে, পড়ে টড়ে কেলেঙ্কারি হবে দেখছি ! ওরা থাকতে ওদের বলবে, তখন দু চক্কর ঘুরিয়ে আনবে | দাদু তুমিও এখন বাড়ি চলে যাও !’

নিভাননী বললেন, ‘ওরে, তুই ব্রজেনকে এট্টু গলির মুখ অব্দি এগিয়ে দিয়ে আয় তো, ও তাপ্পর দেওয়াল ধরে ধরে চলে যাবে ক্ষণ, আমি ওর থেকে অনেক শক্তপোক্ত, আমি নিজেই চলে যাচ্ছি !’

টুলু বলল, ‘দ্যাখো তো, আমি এখন কাকে ছেড়ে কাকে পৌঁছতে যাই, একজন আশি, তো অন্যজন নব্বই, কিছু হলে এদিকে পূর্ণেন্দু আমায় ধরবে, ওদিকে সজল আমায় ধরবে !’

সেদিন বাড়ি ফিরে আবার কেমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি, তিথিকে অফিস কামাই করতে হলো, পূর্নেন্দুকে ডাক্তার ঘর করতে হলো, তবু সেই ঝামেলার মধ্যেও একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন পূর্নেন্দুকে, ‘হ্যাঁ রে রাধটা যে মরে গেল, কই সে খবরটা তো আমায় দিলি নে তুই ?’

পূর্ণেন্দু বলল, ‘কেন অত খবরে তোমার কী দরকার? একই তো খবর, নতুন কী?’ কথাটা ছেলেটা কিছু ভুল বলেনি !

আজ আবার মনের জোর করে খটখটে রোদটায় একটু গা মজবেন বলে আর সেই সঙ্গে বটুকদের বাড়ি গিয়ে বটুকের বাপ নক্ষত্র বসের একটা খবর নেবেন বলে বেরিয়েছেন, তিথি বেরিয়ে যাওয়ার পর পর, তা সেই পার্কের কাছটায় মন্মথর সঙ্গে দেখা | মন্মথ তাকে দেখেই বলল, ‘বৌদি, রঞ্জিতদের বাড়ি চললেন নাকি?’

তিনি থমকালেন, ‘কেন সেখানে আবার কী?’

‘ও জানেন না বুঝি ! শনিবার রাতেই তো রঞ্জিত চলে গেল !’

তিনি আবার লাঠি সামলালেন, রঞ্জিত? ও তো সেদিনের ছোঁড়া, বড় জোর সত্তর হবে বয়স! মন্মথ এদিকে বলতে লাগল, ‘আপনারা মেয়েছেলে, তাও বাড়িতে শুয়ে বসে দিন কাটিয়ে দিতে পারেন, আমাদের তো জীবনটাই কেটেছে রকে বসে, বাড়িতে এক দন্ড থাকতে পারি না ! কিন্তু এখন বাড়ি থেকে বেরুলেই একটা না একটা মৃত্যু সংবাদ! আহ, সব চেনাচেনা মুখগুলো চলে যাচ্ছে গো বৌদি! পড়ে রইলাম আমরা, যাদের কবেই হেজে মজে যাওয়ার কথা!’

রঞ্জিতের খবরটা তাকে যথেষ্ট মনোবেদনা দিলেও মন্মথর কোথায় নিভাননী না চটে পারলেন না! দূর হতচ্ছাড়া মরণের আবার বয়েস কি? আজও তিনি আর এগোলেন না! মন্মথর কাছ থেকে বটুকের বাপের খবরটা নিয়ে গুটি গুটি বাড়ি ফিরে এলেন | মন্মথ বলল, ‘নক্ষত্রটা যা ভুগছে, এবার ওকে ভগবান তুলে নিতেই তো পারেন বৌদি! মিথ্যে বাড়ির লোকের ভোগান্তি!’ মন্মথটা চিরদিনের বদ, অন্যের ভালো দেখতে পারে না | বাড়ি ঢুকতেই শেফালির মা তাঁর কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগল, ‘আবার তুমি বেরোলে ঠাকমা, দাদা জানতে পারলে আমাকে এবার তাড়িয়ে দেবে! একটু ঝিম এসেছে কি আসেনি, চোখ খুলে দেখি ঘরে কেউ নেই!’

‘তুই থাম দিকিনি, ব্যাজর ব্যাজর করিসনি, যা, ঠাকুরের নকুলদানা থেকে দুটো এনে দে, মুখে দিয়ে জল খাই! তোর ভরসায় দাদা আমায় রেখে গেছে আর কি! একটু ঝিম এসেছিল, চোখ খুলে দেখি ঘরে কেউ নেই, আহাঃ একটু ঝিম এসেছিল, কলের ছেলে জলে পড়ে গেল, তের পেলুম না! –যা দেখি সামনে থেকে!’ শেফালির মা মুখখানা তোলা হাঁড়ির মতো করে চলে গেল | ঘটনাটা সত্যি! ওর ছেলেকে ও এভাবেই খুইয়েছে! নিভাননী শুয়ে পড়লেন পালঙ্কে | কথাটা ঠিকই বলেছে মন্মথ, বাড়ির বাইরে পা দিলেই আজকাল খালি মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয় | পূর্নেন্দুরা খবরগুলো গোপন করে তার কাছে, ভাবে বুঝি শুনে তিনি কষ্ট পাবেন | কিন্তু কষ্ট পাওয়ার তো একটা শেষ আছে? এই যে এখন এসব খবর শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ব্যাস, ওতেই সব কষ্ট বের করে দেন তিনি | কষ্ট পুষে রাখতে যাবেন তিনি কোন দুঃখে? তের বছর বয়েসে যখন বিকেলে বাড়ির সক্কলকে থিয়েটার দেখতে নিয়ে যাবে বলে অক্ষয় চাটুজ্যে আর ফিরল না, তখনি জীবনের শেষ শক পেয়ে গেছিলেন তিনি | আর কোনও দিনও সত্যি বলতে শক দুঃখ তেমন করে কাবু করতে পারেনি তাঁকে, এ না হলে তিনি আজ বাঁচতেন? নব্বই অব্দি বাঁচা মানে চারিদিকে থিকথিকে মৃত্যু লাফিয়ে ডিঙিয়ে বেঁচে থাকা, তা কথায় কথায় দুঃখ পেলে জীবন সহ্য করতে পারত?

তিনি নিভাননী, এই চাটুজ্যে বাড়ির বাল-বিধবা | এই পাড়ার, এই দেড়শ দুশো বাড়ি জুড়ে বিস্তার লাভ করা চারটে, পাঁচটা প্রজন্মের জীবিতদের মধ্যে, বর্তমানদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ | গত বছরের আগের বছর শীতে বাঁশি মারা যাওয়ার পর রায় মেডিকেলের মোড় থেকে ওদিকে তিমির বরণ লেন, এদিকে বলরাম মল্লিক স্ট্রিট, হলধর বসু লেন, ঘোষ বাগান জোড়া বিস্তীর্ণ এলাকায় তিনি এই স্থান আদায় করে নিয়েছেন, বাঁশি ছিল তাঁর চেয়ে কয়েক মাসের বড় মাত্র, তা হলেও! বয়েসের মিল ছাড়া বাঁশির সঙ্গে আর কোনো দিকে তাঁর কোনো মিল ছিল না অবশ্য | নিভাননী মাত্র তেরো বছর বয়েসে বিধবা হয়েছিলেন | সেখানে বাঁশি চুলা পাকিয়ে ফেলেও কানাইলালকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে | বাঁশির ছিল ঘর ভরা ছেলে পুলে, আর তাঁর শ্বশুরের আট কাঠা ছ’ছটাকের এত বড় বাগান ঘেরা বাড়িতে প্রদীপের সলতের মতো টিমটিম করে জ্বলছে ওই এক পূর্ণেন্দু | দশ বছর হয়ে গেল তারও বিয়ে দিয়েছেন কিন্তু এখনো একটা ছেলে পুলে হলো না! এক একটা বংশ এরকম থাকে, একেবারে বাড় নেই, আবার এক একটা ডাল পালা মেলে বটবৃক্ষ হয়ে ওঠে | তা নিভাননী ছিলেন সুন্দরী! বিধবার বেশও তাঁর সেই রূপ যৌবনকে বাঁধ দিতে পারত না, যে দেখত হাঁ করে তাকিয়ে থাকত, লজ্জায় শীত গ্রীষ্ম তিনি একটা চাদর ব্যবহার শুরু করলেন | আসলে তিনি যত্ন করতেন শরীরের, কত রূপটান মাখতেন, তাঁর উপর গার্জেনগিরি করার মতো কেউ তো ছিল না! যা খুশি তাই করতেন | যে শরীর নিয়ে জন্মেছিলেন তাও কিছুতেই শেষ হতে চাইছিল না যেন, ষাট বচ্ছরেও দেখাত চল্লিশের মতো, এই সেদিন অব্দি বডিস পরা অভ্যেস ছিল তাঁর, তিথি আসার পর ছেড়ে দিলেন | তাঁর পাশে বাঁশি ছিলেন শ্যামলা, রোগা, খুব সাধারণ, সাতটা বাচ্চা বিইয়ে হাত পা খুলে গেল ওর | হাতির মতো গতর হলো | নিভাননীর কাছে অবশ্য এ পাড়ার সব মেয়ে বউকেই সাধারণ দেখাত | তিনি ছিলেন বাল্য বিধবা, সুন্দরী, লেখাপড়া জানা | ইংরিজি পড়তে পারতেন | তিনি ছিলেন জেদী, রাগী আর দয়ালু ! যদিও এই বংশ ছিল কিপ্পনের ঝাড় | এই সব সমন্বয় তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল এত মধ্যবিত্তের মাঝখানে | তেরো বছর বয়েসে যখন পঁচিশ বছরের তরতাজা অক্ষয় চাটুজ্যেকে হারালেন নিভাননী, মোটর অ্যাকসিডেন্টে, তখন বর্ধমান থেকে তাঁর বাবা এসেছিলেন সদ্য বিধবা মেয়েকে ফেরৎ নিয়ে যাবেন বলে! শ্বশুরমশাই জানতে চাইলেন, ‘তা মেয়েকে আবার বিয়ে দিতে চান নাকি বেয়াই মশায়?’ উত্তরে দোষের মধ্যে দোষ বাবা মৌন ছিলেন, ব্যস আর যায় কোথায় ? শোক ভুলে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন শ্বশুর | তারিয়েই দিলেন বাবাকে, সেই বাপের বাড়ির পথ বন্ধ হয়ে গেল নিভাননীর জন্য, আর কোনদিনও যেতে দেননি শ্বশুর তাকে বাপ মায়ের কাছে | অনেক পরে একটা জোয়ান ছেলে, বউ শুদ্ধু এসে দাঁড়িয়েছিল তাঁর কাছে, নাকি সবার ছোটো ভাই, মায়ের পেটের ভাই | তা সত্যি মিথ্যে খোঁজ নেবে কে ? ভালো করে খাইয়ে দাইয়ে বিদেয় করে দিলেন তাদের | থাকতে চেয়েছিল, থাকতে দেননি | মুখটা একেবারে তার মা বসানো, তবে মায়া করে লাভ কি? আশ্চর্য একটা জীবন কাটালেন নিভাননী এই বাড়িতে এসে! যা পেলেন এদের কাছেই পেলেন, যা পেলেন না এদের কাছেই পেলেন না | এক অক্ষয় চাটুজ্যে তাঁকে বারো বছর বয়েসে বিয়ে করে এনে তেরোতে বিধবা করে দিয়ে চলে গেল | সেই মানুষটাকে তিনি কিছুই চিনতেন না, দু চারদিন জল টল খেতে দিয়েছিলেন ব্যস ! বিধবা হয়ে থেকে গেলেন যাদের সঙ্গে তারা সম্পর্কে শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাসুর, জা | কিন্তু আসলে কে? আসলে কেউ না! শ্বশুর গেলেন, শাশুড়ি গেলেন, ও মা বড় জা, বড় ভাসুরও চলে গেলেন | তিনি একা মহাশ্বেতা আর অলকেন্দুকে টেনে তুললেন কত কষ্টে, বিয়ে দিলেন দুজনের, কিন্তু দুম করে চলে গেল অলোকটা, পূর্নেন্দুর আট বছর বয়েসে ওর মাও মারা গেল | আবার ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি সংসারে, ছুটি হলো না, কলে পিঠে করে বড় করলেন ছেলেটাকে | কিন্তু যাকে ওরা একমাত্র বলে জানল, চিনল সে যে প্রকৃতপক্ষে ওদের কেউ নয় তা নিভাননী নিজে সারাজীবনে একবারও ভোলেননি !

ক্রমশঃ….

Advertisements

2 COMMENTS

  1. খুব ভাল লাগছে। প্রতি সপ্তাহে নতুন পর্ব চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.