সং্সারযাত্রা

225

এই হিমাচলের কল

তুমি যদি দমদম নাগের বাজারের দেবু বোস হও, তোমার যদি বত্রিশ হয় তাহলে ওই হিমালয়ের সামনে তোমার তুলনা সমেত কেমন করে দাঁ্ড়াবে তুমি, কেউ ফুলকপির ফুল, লঙ্কা কুচোয়, ডিম সিদ্ধ করে, বিনস… | ঠিক তখনই নিয়মমাফিক তোমার সেলফোনের বাজনা বাজে | তুমি ফোনটা নিয়ে কিচেন ছেড়ে বাইরের বারান্দায় চলে যাও | ওধার থেকে মন্িষা, গুড মর্নিং্ | ক্ি খবর্?

— গুড মর্নিং্ | এই তো সবে সকাল হল্ | এখনও গোটা দিন পড়ে াছে |

— বেশ্ | তাহলে বলো ওখানে ক্ি দেখছো এখন্?

— বুঝেছি | কল সেন্টারে তোমার এখন কোনও কাজ নেই |

— কে বলল নেই | এখানে কখনও হাত খালি থাকে না |

— াগে তুমি বলো |

— ামার তো দেখার কিছু নেই | এটা তো কাঁ্চের ঘর্ | শুধু রাস্তার বাবু | তবে বলার কথা একটা াছে | বলতে পারো লেটেস্ট্ |

— কি শুনি?

একটু পজ এবার্ | কি সব যান্ত্রিক কুট্-কাট্ | সামান্য় গলা খুশ খুশ্ | তারপর মন্িষার কথা, গতকালই ামাদের ডিভোর্স মাম্লাটার প্রথম হিয়ারিং হল ালিপুর কোর্টে | মনে হচ্ছে এবার একটা রাস্তা পাওয়া গেল্ |

— যাক | কোর্টে কমল এসেছিল তো? দেখা হয়েছে?

— হবে না কেন্ | সে তার অয়্াডভোকেটের ল্য়াজ ধরে বসেছিল্ | সঙ্গে তার মা-ও ছিলেন্ |

— ার কে ছিল্?

— ামি জানি না | হয়তো বাইরে ছিল্ | ামি খেয়াল করিনি |

এবার দেবু সামান্য় থামে | একটু হাসেও | তারপর বলে, তবু ভালো তোমাদের কোনও ইস্য়ু নেই | তাড়াতাড়ি হিয়ারিং শেষ হয়ে যাবে |

— দেখা যাক | তাহলে এবার বলো — তুমি কি দেখছো?

মস্ত কড়াইয়ে সকালে লুচি-ালুর দমের ব্য়বস্থা ঘটে | এখান থেকে তার শব্দ শোনা যাচ্ছে | কড়া শুকনো লঙ্কা ফোড়নের ঝাঁ্জও | দেবু বলে, যা দেখছি সে তো সবসময়েই দেখি | এ ার নতুন কথা কি |

— তাও বলো | ামার শুনতে ভালো লাগে | বিশেষ করে এই নভেম্বরের প্রথম দিকে দমদমে বসে | ার কোথায় গিজগিজে নাগের বাজার, কোথায় হিমালয়ের কিন্নর দেশ্ |

— তোমার কল্পনা করার ক্সমতা অনেক্ | ামার মনে হয় তুমি দ্ুরে বসেও এখানে চলে াসতে পারো | খুব সহজে |

— অত জানি না বাবা | তবে মামলাটা মিটে গেলে ার তো তোমার কাছে যেতে বাধা থাকবে না |

দেবু সামনে তাকায়্ | সারাদিন দেখতে পাওয়া হিমালয় এখন সকালের ালোয় ঝকঝকে | তবে কোথাও কোথাও কিছু ফগ্-এর বিস্তার রয়েছে | স্থির কুয়াশা | এখান থেকে মনে হয় স্থির, াসলে ওরা চলমান, খুবই পলকা ভাবে |

ওদিক থেকে মন্িষা বলে ওঠে, কি হল্? বলছ না যে |

গলা খাঁ্কারি দিয়ে এবার দেবু বলে, ামার সামনাসামনি যে পিকটা দেখা যাচ্ছে এটা এমন কিছু উঁ্চু নয়্ | ওখানে একটা পাথুরে শিবলিঙ্গ াছে | তার হাই-ট শুনেছি উনত্রিশ ফিট্ | মজার কথা দিনে অনেকবারই এই পাথরটার রঙ বদলে বদলে যায়্ | যেমন ধরো হলুদ, ন্িল, ব্রাউন, তারপর একেবার জেড ব্ল্য়াক্ | তবে ামার কিন্তু ন্িল রঙটা বেশি ভালো লাগে |

— বলো কি

— না না, পার্বত্িও াছেন্ | তবে শিবের কাছ থেকে অনেকটাই দ্ুরে | মাঝখানে ারও অনেক চ্ুড়া | তারপর চড়াই উৎ্রাই | খাদ, ঢালু খাদ্ | এ সব ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দ্ুরে ার এক চ্ুড়ায় পার্বত্ি রয়েছেন্ | শিবের তুলনায় অনেক ছোট্ট খাট্টো তিনি | ার এই দুজনের মাঝখানে াছেন কোলের ছেলে গণেশ্ | তাঁ্র াকার বৃহৎ্ |

— বা, এ কিরকম সং্সার্ | স্বাম্ি-স্ত্র্ি দুজন দু-জায়গায়

— হ্য়াঁ, ওখানে াসলে শিবের সং্সার কেমন যেন শান্ত, উদাস্ | কোনও হৈ চৈ ডামাডোল নেই | তিনি যেন চুপটি বসে দেখে চলেছেন হিমালয়ের বিরাট সং্সার্ | কোনও ব্য়স্ততা নেই | কাজের তাড়াহুড়ো নেই |

— হুঁ, াসলে হয়তো বসে থাকাটাই কাজ মহাদেবের্ | কিন্তু তুমি কি চিরকালই ওই চাকরি করবে?

— সে াবার কি

— কেন, বড়সড় হোটেল কি কলকাতায় নেই | ওখানকার এক্স

দেবু একটুখানি চুপ করে | সামনে হিমালয়ের মস্ত সং্সার দেখে | টের পায় ওইদিক থেকে পাহাড়ি হাওয়ার ঝাঁ্ক ছুটে াসছে | সে গলার মাফলারটা টেনে দিতে দিতে বলে, াসলে এটা তো পাহাড়্ | এখানকার অভিজ্ঞতা সমতলে কি কাজে াসবে

মন্িষা এবার একটু শব্দ করেই হাসে, বা, ামি তো রয়েছি | ামার তো দু-দুটো সং্সার করার অভিজ্ঞতা হবে তাই না?

— তার সঙ্গে সমতল্-পাহাড় এ সবের কি তুলনা হচ্ছে | ামার মাথায় কিছু ঢুকছে না |

মন্িষা বলে, একটু রাখছি | লোক এসেছে | বিকেলে াবার কথা হবে |

নতুন নতুন মানুষ াসছে বাস, সুমো ইত্য়াকার গাড়ি চড়ে | এই ড্রাইভার ছাড়া সবাই সমতলের — এ কথা সকলের চোখ মুখ বলে দিচ্ছে যার বেশির ভাগই বাঙালি | কলকাতা বাদ দিয়েও দ্ুর গ্রামদেশের লোকজনও াছে | নিচের ডাইনিং হলে হরেক কথাবার্তা | কে জানে এদের মধ্য়ে নাগেরবাজারের লোক াছে কিনা |

এ কথাটা মনে হতে নিজেকে হঠাৎ ছোটো মনে হয়্ | এখানে বসে কেবল মানুষের কথাই তো মনে করা ভালো | সেখানে হঠাৎ করে নাগের বাজার কেন

সব ারম্ভের মতো এটাও ছিল নিছক্ | তারপর াস্তে াস্তে দেখা, ফোনে কথা — এমনকি তখনও স্বাম্ির সঙ্গে গন্ডগোল না শুরু হলেও |

মানুষের জ্িবন তো এমনই | মেপেজুপে হিসেব কষে তাকে বেঁ্ধে রাখা যায় না | অনেকটাই ওই হিমালয়ের হিমপ্রবাহের মতো | দ্ুর থেকে দেখে মনে হয় সে বুঝি নড়াচড়া করছে না | বরফের জমাট পুঞ্জ এক জায়গায় থমকে রয়েছে | াসলে বরফ গলে ওই পাহাড় শিখর থেকে নেমে াসছে ন্িচে — নদ্ি হয়ে | তারপর ারও ারও এগোতে এগোতে সমতল বেয়ে সে গিয়ে পড়ছে সাগরে | জ্িবনের কারবারটাও অনেকটা এ রকম্ | দেবু এমন গুরুতর করে এই সব ব্য়াপারগুলো ভাবতে চায়নি কখনও | াসলে সে টের পায়নি এত বছর পাহাড়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে তার জেরে এমনই সব গম্ভ্ির চিন্তা গেড়ে বসে গেছে | কে জানে, এ বরফ কি কথা হয়ে গলে যায়

বিকেলের দিকে কলকাতার যে দুজন এল তারা কপাল গুণে তেতলার সিঙ্গল ঘরটা পেয়ে গেল্ | দুজন্ | স্বাম্ি স্ত্র্ি বা াত্ম্িয় কিছুই তেমন পরিচয় খোলসা করে ভিজিটরদের খাতায় লিখল না | শুধু লিখল ফ্রেন্ড্ | এই বন্ধু কথাটার মানে তো বহুরকম হয়্ | এ নিয়ে অবশ্য় মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই | হোটেলের ব্য়বসায় — বিশেষ করে এই পাহাড়ে — এত ভাবার দরকার নেই |

ভদ্রলোক মেয়েটিকে চিনু বলে ডাকছেন — এই খেয়ালটুকু করেছে দেবু | লোকটির ধার একটু পুষ্টর দিকে হলেও মেয়েটির কিন্তু সুন্দর ফিগার্ | ার মুখ চোখ বেশ শার্প্ | সন্ধের পর ও ঘরে ডাক পড়তে দেবু গেল এবং দেখল দুজনেই ড্রিং্কস

মেয়েটি দেবুকে দেখে হাসল্ | তারপর বলে উঠল, স্য়রি, াপনাকে একটু জ্বালাচ্ছি | বাঙালি তো তাই |

দেবুও হাসল, না না, বলুন না ম্য়াম্ |

— এখানে বেড়াবার জায়গাগুলোর কোনও বুকলিস্ট াপনাদের কাছে াছে কি?

— াছে |

সেই ফাঁ্কে লোকটি ফোনে কাকে যেন বলে, কলকাতা থেকে দিল্লি — এমন কি দ্ুর বলো মিমি | ফিরবো তো চারদিন পরেই | তারপরেই াবার —

লোকটি ঠোঁ্ট কুঁ্চকে চুমু খাওয়ার শব্দ করে | তারপর বলে, তুমি দেবে না? দাও — দাও —

এ দিকের সোফা থেকে মেয়েটি বলে, ার রাত্রে ডিনার একটাই দেবেন্ |

লোকটি ফোন বন্ধ করে তার দিকে তাকায়, একটা কেন্? তুমি খাবে না?

সে গ্লাসে লম্বা করে চুমুক দিয়ে বলে, এতেই ামার পেট ভরে যাবে |

দেবু ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এল্ | তার মাথায় এল মন্িষা বিকেলে ফোন করবে বলেও করেনি | ভুলে গেল নাকি

পর পর টানা তিনদিন মণ্িষার দিক থেকে কোনও ফোন নেই | দেবুও যে এক্-দুবার চেষ্টা করেনি তা নয়্ | কিন্তু যোগাযোগ নেই | এদিকে এই নভেম্বরের প্রথমে এখানে াস্তে াস্তে াবহাওয়া গা খুশি ভাব্ | ডিসেম্বরেই তো পাততাড়ি গুটিয়ে নেমে পড়তে হবে | প্রতিবারের মতো দমদম যাবে না মা

এই পাহাড়ি অঞ্চলে সেই অবাক মিথটির কথা মনে মনে উঁ্কি দেয়্ | উঁ্কি দিয়ে বসে এই সকালে মাঝখানে, সামনে হিমালয়ের চিরকেলে সাইলেন্স্ | কখনওই তার ভাবগতিক বোঝা যায় না | তারই মধ্য়ে লোককথার ছটা পাহাড়ের চ্ুড়া থেকে চ্ুড়ান্তরে যায়ায়াত করে | পাহাড়বাস্ি দেবতারা াসলে পুরুষ্ | তবে একটু রাজক্িয় স্বভাব্ি | হঠাৎ করে এক দেবতা পুরোহিতের মাধ্য়মে জানান দেন তিনি কৈলাস পর্বতে বেড়াতে যেতে চান্ | পুরোহিত অমনি লোক্-লস্কর ডেকে ডুগিতে চড়িয়ে দেবতাকে নিয়ে যান পায়ে হেঁ্টে, বন্-জঙ্গল, বরফ ঢাকা পাহাড় ভেঙে | কৈলাসে পৌঁ্ছে সেখানে তাঁ্র প্ুজাপাঠ হয়্ | তারপর াবার সেই ডুলিতে চড়িয়ে দুর্গম পথ ভেঙে ঘরে ফেরা | দেবতার রাজক্িয় হুকুম বলে কথা |

দেবু াসলে জানে না এই মামলার পাহাড় টপকে যেতে াসতে কত পথ্ | মন্িষার সঙ্গে হঠাৎ ক

মামলার শুনানি সবে শুরু হল্ | কিন্তু ওই হিমালয়ে মহাদেবের চেয়ে অনেক দ্ুরে পার্বত্ি যে বসে াছেন্ | যোগাযোগও নেই | এই অবস্থায় পার্বত্ি কবে াসবেন মহাদেবের সং্সারে?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.