গ্রেফতার হতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ!?

“অস্ত্র মাটিতে – অস্ত্র আকাশগামী, দিগন্তরাঙা অস্ত্রের মহিমায়; রাঙা অস্ত্রের কিরণ পড়েছে জলে – গ্রন্থসাহেব নদীজলে ভেসে যায়” – জয় গোস্বামীর কলমে …

সেদিন বিকেলে এক বন্ধুর সঙ্গে হাজরার যতীন দাস পার্কে কিছুক্ষণ বসেছিলাম। গল্প করছিলাম। বন্ধুটি অমৃতসর আর মণিকরণের গল্প বলছিল। অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির, সেখানকার কাড়া-প্রসাদ, ওশান অব নেকটার বা অমৃত-সরোবরের জল আর সোনায় মোড়া মন্দিরের শীর্ষভাগ – সেই সবকিছুর গল্প। পাঞ্জাব যাইনি কখনও। স্বর্ণমন্দির দেখবারও সৌভাগ্য হয়নি। বন্ধুটির উপরে হিংসে হচ্ছিল। ক্ষিতিমোহন সেনের বইতে সদ্যই পড়েছি, বাংলার ভক্তিবাদী কবি জয়দেবের লেখা একখানি পদও নাকি গ্রন্থসাহেবে সংরক্ষিত। আমাদের দেশ, আমাদের সংস্কৃতির এমন মিলেমিশে যাওয়ার আশ্চর্য একেকটি উপাখ্যান। বন্ধুটি বলছিলো, ঘণ্টার পর ঘন্টাও নাকি সে অনায়াসে চুপটি করে, অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরের সেই চাতালটিতে বসেই কাটিয়ে দিতে পারত। নেহাত আমাদের এই ক্ষুদ্র জীবনে ‘সময়’ বস্তুটি অত্যন্তই দুর্লভ – তাই তার, আর সে সুযোগ হয়নি। সেই অমৃতসর, (অমৃতের সরোবর এই নাম থেকেই যার নামের উৎপত্তি), কত ইতিহাসেরই না সাক্ষী এই শহর।

আমাদের দেশে এখন সহিষ্ণুতা-অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি অনেক কিছুকে নিয়েই গোলমাল চলছে খুব। বিদেশযাত্রার ভাগ্য হয়নি আমার। কেবল বই আর ইন্টারনেটের দৌলতেই যতটুকু বাইরের দুনিয়ার সাথে পরিচিতি। সেটুকু মূলধনের উপরে ভিত্তি করেই এটুকু বিশ্বাস জন্মাতে পেরেছে যে – আমাদের দেশের মানুষ (মানুষ অর্থে সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া গরিব অথবা মধ্যবিত্ত মানুষ) যুগ যুগ ধরে যে অসম্ভব সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন, তার কোনও সমতুল্য ইতিহাস মেলে না। ৪৭-এর দেশভাগ আমাদের এই উপমহাদেশীয় জীবনকথায় একটি চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন হয়ে থেকে যেতে পেরেছে। যে দুটি রাজ্য বা প্রদেশের উপরে এই আঘাত সবচাইতে গভীর ভাবে নেমে আসতে পেরেছিল – তার মধ্যে একটি পাঞ্জাব, অপর একটি আমাদের অবিভক্ত বাংলাদেশ।

দুর্ভাগ্য এই দুটি রাজ্যের যে, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বারংবার এই দুটি রাজ্যের প্রতিনিধিরাই বিশেষ করে ইংরেজ শাসনকে কঠিন থেকে কঠিনতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন। আর হয়তো বা সেই কারণেই এই দুটি রাজ্যের উপরেই দেশভাগের ছুরিটা সবচাইতে গভীর ভাবে নেমে আসতে পেরেছিল। আমি নিজে অন্তত দৃঢ়চিত্তে বিশ্বাস করি যে, নিজে হাতে লাগিয়ে না দিলে পরে – উসকিয়ে না দিলে পরে, এদেশের মাটিতে ‘স্বতঃস্ফূর্ত দাঙ্গার আগুন’ জ্বালানোটা কোনোদিনে-কোনোকালেই সম্ভব ছিল না বোধহয়। আমার এই বিশ্বাস চিরস্থায়ী এবং অপরিবর্তনশীল।

১৯১৯ – জালিয়ানওয়ালাবাগ, এবং ১৯৪৩ – বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। দুটিই আমাদের পরমশ্রদ্ধেয় ব্রিটিশ প্রভুদের ভালোবাসার দান। পাঞ্জাব এবং বাংলার উপরে তাঁদের কৃপাদৃষ্টির চরমতম উদাহরণ। প্রথমটিতে তাঁদের পেশীশক্তির নির্লজ্জতম প্রকাশ – দ্বিতীয়টি তাঁদের মহা-ধুরন্ধর কূটবুদ্ধির ফলে সংঘটিত, আরও একটি গণহত্যার নিকৃষ্টতম নিদর্শন। দ্বিতীয় ঘটনাটির ৭৫ বছর পেরিয়েছে, আর ১৩ই এপ্রিল ২০১৯ – জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের ১০০ বছর। ইতিহাসকে ভুলতে নেই।

আমার মধ্যে মধ্যে অবাক বোধ হয়, কিছু কিছু মানুষ এমন ইঙ্গিত করেন। আজকাল তাঁদের একাংশ প্রশ্ন তুলতে চান যে, ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে শিখ এবং গোর্খা সৈন্যরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের এত সাহায্য করা সত্ত্বেও পাঞ্জাব পেল জালিয়ানওয়ালাবাগ, এ কেমন প্রতিদান ? অথবা, ব্রিটিশদের কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়েও অনেক সমালোচনা করে ফেলেন। আমার তাঁদেরকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, যে বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনাকে জুড়ে দেখাতে চাইলে, দ্বিতীয় ঘটনাটিকে এবং সেটির ষড়যন্ত্রকারীদের ভয়ানক অপরাধটিকেই লঘু করে দেখানো হয় না কি ? যাঁদের কাছে আমরা পরাধীন ছিলাম, তাঁদের কাছ থেকে কোনও কৃতজ্ঞতাবোধ আশা করাটাই অপরাধ। আর বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সাহসিকতার পরিচয় কোনও জাতি দিক বা না দিক, জালিয়ানওয়ালাবাগের ঔদ্ধত্যকে কোনোদিন কোনোভাবেই ক্ষমা করা যায় না। সেটি সবদিক থেকেই একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় – এবং সেই ষড়যন্ত্রের ষড়যন্ত্রীদের, ষড়যন্ত্রী বলেই চিহ্নিত করা উচিত।

আশ্চর্য এই যে, সেই ঘটনার ১০০ বছর পরেও কেমন যেন রেগে উঠতে ইচ্ছে করছে। অথচ, ১৯১৯এর জালিয়ানওয়ালাবাগ, এমনকি তার পরেকার পাঞ্জাবও যে ধৈর্য আর সংযমের পরিচয় দিয়েছিল, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয় বোধহয়। হ্যাঁ, পাঞ্জাবকে বুলেট আর বোমাতেই শান্ত করে রাখতে হয়েছিল। ব্রিটিশ-প্রভুরা এটা বললেও, তার সঙ্গে এটা যোগ করেন না যে – পাঞ্জাবের নিরস্ত্র মানুষ সেদিন বেয়নেটের সামনে, বুলেটের সামনেও অকুতোভয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। এটাও তাঁরা বলেন না যে, ১৩ই এপ্রিলের হত্যাকান্ডের পর – মাত্র ৪৮টি ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই, ১৫ই এপ্রিল, ১৯১৯এর তারিখে গুজরানওয়ালার বিক্ষোভে ব্রিটিশ সরকারকে মিলিটারি যুদ্ধবিমান থেকে অবধি গুলি চালাতে হয়েছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে আর কলমের কালি নষ্ট করা উচিত নয়। আমরা বরং তার পরে যে প্রতিবাদ হলো, তার কথায় যাই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রেফতার হতে চেয়েছিলেন। ঘনিষ্ঠ শুভানুধ্যায়ী ও বন্ধু সি এফ এ্যান্ড্রুজকে তিনি মহাত্মা গান্ধীর কাছে প্রস্তাব দিয়ে পাঠান যে, জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এবং গান্ধীজী যদি অমৃতসরে যাবার চেষ্টা করেন তবে নিশ্চিতভাবেই ব্রিটিশ পুলিশ তাঁদেরকে গ্রেফতার করবে, এবং সেইটিই হবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। গান্ধীজী এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বোলপুরের রেল-সংগ্রহশালায় আমার এই বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সহায়তা প্রার্থনা করে, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় সভা করতে চেয়েছিলেন। সহায়তা মেলেনি। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের স্মৃতিচারণায় এর উল্লেখ রয়েছে। এরপরেই গুরুদেব ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এর চেয়েও অনেক বড় কিছু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময় এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে কেবল উপাধি-ত্যাগের মাধ্যমেই তার প্রতিবাদকে সীমাবদ্ধ রাখতে হলো।

জালিয়ানওয়ালাবাগ। বিশিষ্ট ঊর্দু সাহিত্যিক কৃশন চন্দরের কলমে এই জালিয়ানওয়ালাবাগের স্তুতিতে একখানি আশ্চর্য গল্প, ‘অমৃতসর’ থেকে একখানি উদ্ধৃতি দেবার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। তিনি লিখছেন, “কেউ কখনও এই বিস্তীর্ণ আকাশের নীচে আজ পর্যন্ত এমন ভিন্ন ভিন সভ্যতা, ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম এবং ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসকে একই রক্তে রাঙিয়ে উঠতে দেখেনি। এতে ছিল শহীদের রক্তের পাকা রঙ, এতে ছিলো ঔজ্জ্বল্য, সৌন্দর্য – স্বাধীনতার সৌন্দর্য” (অনুবাদঃ কমলেশ সেন)।

‘অমৃতসর’ গল্পটির শেষটুকু বড়ই বেদনার। বাস্তবের অমৃতসরের মতোই। আর বাংলার উপরেও ব্রিটিশদের প্রতিশোধ নেমে এসেছিল। মানবসৃষ্ট (পড়ুন ব্রিটিশদের হাতে সৃষ্ট) ভয়াবহ ৪৩-এর মন্বন্তরের কারণে শ্মশান হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। মৃণাল সেনের কলমে, “একটা গুলিও চলেনি, একটা বোমাও পড়েনি – স্রেফ না খেতে পেয়ে সেদিন মরে গিয়েছিল পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ”, ১৯৪৩। এরপর, মাত্র চার বছরের মাথাতেই – সাতচল্লিশে ভাগ হলো দেশ। যে জালিয়ানওয়ালাবাগ, যে অমৃতসর এককাট্টা হয়ে, জাতিধর্ম নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের সাক্ষী থেকেছিল  – সেই অমৃতসরেই ঘটতে থাকল একের পর এক সাম্প্রদায়িক গণ্ডগোল। একে অন্যের বুকে ছুরি বসাতেও দ্বিধা করল না কেউ। ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, আর এককোটি উদ্বাস্তুর দগদগে ঘা নিয়েই আমরা স্বাধীনতা পেলাম।

দাঙ্গা কখনও সত্যি হয় না। অমৃতসরের দাঙ্গার গল্প কখনও সত্যি নয়। আপনার ভাবছেন কাব্যি করছি ? আমার কবিতাই ভালো। জালিয়ানওয়ালাবাগের শহরকে, স্বর্ণমন্দিরের শহরকে দাঙ্গার ইতিহাস দিয়ে মনে রাখতে নেই। আমার কাছে পাঞ্জাব আর বাংলাদেশ মানে – শিখ ট্যাক্সি-ড্রাইভারের সামনে পাশাপাশি সাজানো সুভাষ বোস আর ভগৎ সিং। আমার কাছে পাঞ্জাব আর বাংলাদেশ মানে শুকদেব, রাজগুরু আর যতীন দাস। পাঞ্জাব আর বাংলাদেশ মানে, গ্রন্থসাহেব আর জয়দেবের গান। এই ভারতবর্ষে দাঙ্গা নয়, সহিষ্ণুতাই শেষ সত্যিটা প্রকাশ করে থাকে। আর তা-ই সে প্রকাশ করে এসেছে আজন্মকাল।

আমরা যতীন দাস পার্কে ফিরে এলাম। বিকেল গড়িয়ে গিয়েছে। আমি মণিকরণ আর স্বর্ণমন্দিরের গল্প শুনছিলাম … জালিয়ানওয়ালাবাগের ১০০ বছর। অ্যানিভার্সারিতে কখনও বিশ্বাস করতে নেই। কেবল মনে রাখতে হয় তার শিক্ষাটুকুকে। বিশ্বাস রাখতে হয়, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সংযম আর অহিংসার মন্ত্রটুকুতে। জালিয়ানওয়ালাবাগের শহীদেরা, অথবা বাংলাদেশে না খেতে পেয়ে মরে যাওয়া ৪২-৪৩এর মন্বন্তরের মৃত মানুষেরা, অ্যানিভার্সারির দ্বারা সম্মানিত হতে চাননি। তাঁদের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে, তাঁদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, আমরা যা এবং যেটুকু অর্জন করতে পেরেছি – সেটুকুর মর্যাদা রক্ষা করে চলতে পারলে, সেটুকুই হবে তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠতম শ্রদ্ধার্ঘ্যের নিদর্শন। আমরা যেন আর ভাগ না হই, আমরা যেন এক থাকতে পারি। আর, জালিয়ানওয়ালাবাগের অমৃতসরকেই যেন আমরা মনে রাখতে চেষ্টা করি, কারণ – ৪৭এর অমৃতসরকে – আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.