বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও ৩২ বছর ধরে হাতিদের চিকিৎসায় নিয়োজিত তিনি‚ নেননি কোনও ছুটি

elephant man of asia

৩২ বছরের কর্মজীবনে এমনকী সপ্তাহান্তেও নেননি ছুটি। কুশল কোঁয়ার শর্মা, হাতিদের ডাক্তার তিনি। প্রতি বছর অন্তত ৭০০ হাতিকে শুশ্রূষা করে ভালো করে তোলেন। ‘আমি সবচেয়ে ভালো থাকি যখন হাতিদের সঙ্গে থাকি। শহুরে জীবন আমার ভালো লাগে না। যখনই হাতিদের কোনও বিপদ শুনি বা অসুস্থতার খবর পাই, আমি ছুটে চলে যাই। এই মুহূর্তে শুনলেও যাব’, বন্য হাতির আক্রমণ থেকে প্রায় ২০ বার বেঁচে ফিরে আসা এই মানুষটি জানান।

ছেলেবেলার বুড়ো হাতি লক্ষ্মীর স্মৃতি তো এখনও দিনের আলোর মত স্পষ্ট। লক্ষ্মীর সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে অনেক বারণ করতেন তাঁর বাবা মা। কিন্তু আসামের কামরূপ জেলায় বারামার গ্রামের বাড়িতে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ছিল ওই লক্ষ্মীই। তার সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ত কিশোর কুশল। ‘সবুজ বন জঙ্গল ক্ষেতের মধ্য দিয়ে আমি আর লক্ষ্মী হেঁটে যেতাম। ফলের বাগানে ফল ঝুলত, লক্ষ্মী আর আমি খেতাম, পাখি আর মৌমাছিদের পেছন পেছন দৌড়ে বেড়াতাম। অবিচ্ছেদ্য বন্ধু ছিলাম আমরা, যতদিন না অন্য শহরে বাবার বদলি হল’। বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেলে লক্ষ্মীকে ছেড়ে যেতে বড় কষ্ট হয়েছিল তাঁর। দু’বছর বাদে ঠাকুমার কাছে আবার ঘুরতে এলে জানতে পারে লক্ষ্মী আর নেই, মরে গেছে। তাও লক্ষ্মীর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার মিথ্যে আশা তাঁকে ছেড়ে যায় না। কাঠ বইবার কাজ করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছিল লক্ষ্মী। তারপর সংক্রমণ হয়ে মারা যায়। কোনও পশু চিকিৎসক পাওয়া যায়নি তাকে শুশ্রূষা করার জন্য। ‘যখন লক্ষ্মীকে হারাই তখন আমার বয়স আট বছরের বেশি নয়। এর ২০ বছর পরও লক্ষ্মীর স্মৃতি আমাকে তাড়া করে বেড়াত।

লক্ষ্মীকে চিকিৎসা করার কেউ ছিল না বলেই হয়ত আজ আমি পশু চিকিৎসক হয়েছি’ জানান ডাক্তার শর্মা। বিগত ৩২ বছর ধরে তিনি এই পেশায় আছেন কিন্তু কখনও সপ্তাহের শেষে ছুটির দিনগুলোতেও নেননি অবসর। বছরে ৭০০ রুগ্ন হাতি দেখেন তিনি। এর মধ্যে বন্য হিংস্র হাতিও আছে। ১৯৮৩ সালে পশু চিকিৎসক হন কুশল শর্মা। ১৯৮৬ সালে স্নাতকোত্তর। ভেটেরিনারি সার্জারি নিয়ে পিএইচডি করেন তিনি। হাতিদের অ্যানাস্থেসিয়া বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ কুশল। উত্তর পূর্বাঞ্চলে তিনিই প্রথম হাতিদের দূর থেকে ইঞ্জেকশন দিয়ে অবশ করার পদ্ধতিটি চালু করেন। দূর থেকে বন্য হাতিকে ইঞ্জেকশন দিয়ে অবশ করে ধরে এনে চিকিৎসা করার এই পদ্ধতি তাঁরই মস্তিস্ক প্রসূত। এই অঞ্চলে প্রায় ১৩৯ টি বন্য হাতিকে ধরে এনে বন্দী করে শুশ্রূষা করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই কাজটি করে যাচ্ছেন তিনি। ভারতবর্ষে এশীয় হাতিদের সংরক্ষণে বিশাল ভূমিকা রেখেছেন ডাক্তার শর্মা। গড়েছেন বিশ্ব রেকর্ডও।

এশীয় হাতিরা মহাদেশের সবচেয়ে বড় স্থলচর স্তন্যপায়ী। পাঁচ টনের মত ওজন হয় এদের। প্রচণ্ড তাণ্ডব চালায় এই বুল হাতিগুলো। অনেক ক্ষয় ক্ষতি করে। ‘মস্ত’ অবস্থায় এদের শরীরে টেস্টস্টেরন হরমোনের পরিমাণ এত বেশি যে প্রায় মত্তের মতো আচরণ করে। মানুষদের ও অন্যান্য প্রাণীদের পেলে প্রাণে মেরে ফেলে। ষাট বছর বয়সেও ডাক্তার শর্মা প্রতি সপ্তাহান্তে চলে যান জঙ্গলে। পূর্ব ভারতের নানা অরণ্যে, উদ্যানে ঘুরে ঘুরে হাতিদের পর্যবেক্ষণ করেন, চিকিৎসার দরকার হলে ধরে আনার ব্যবস্থা করেন। প্রতিটি রাজ্যের সরকারি কর্তৃপক্ষের অধীনে কাজ করেন তিনি। বন্য হাতি ধরার জন্য তাদের কিছুটা কাছাকাছি তো পৌঁছতে হয়ই, যারা এই কাজ করে, নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করে। দূর থেকে ছুড়ে ওষুধ প্রয়োগ করার কাজটি বেশ শক্ত এবং বিপজ্জনক। সব মিলিয়ে বন্য হাতিদের উদ্ধার করার কাজটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই বিপজ্জনক কাজটির সঙ্গেই যুক্ত প্রবীণ ডাক্তার শর্মা। প্রতিদিন প্রায় বারো ঘণ্টা করে তিনি কাটান ভেটেরিনারি সায়েন্স কলেজে। আসামে গৌহাটির সার্জারি ও রেডিওলজি বিভাগের প্রধান তিনি। নিত্য কাজের দিন বাদ দিয়েও সপ্তাহের শেষে ছুটির দিনগুলিও উৎসর্গ করেছেন হস্তী সেবার কাজে।

একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান ‘ মানুষ ও হাতির সংঘর্ষ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বন্য অসুস্থ হাতি ধরতে গিয়েও এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রায়ই। আমি কতগুলি এনজিও-র সঙ্গে কাজ করছি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে। মানুষকে শেখাতে হবে কীভাবে তারা নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়েও হাতিদের সংরক্ষণ করতে পারে। দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ার কারণে মানুষ ও হাতিদের বেঁচে থাকার লড়াই বাড়ছে। মানুষও জঙ্গল কেটে সাফ করে দিচ্ছে, হাতিরাও মানুষের থাকার এলাকায় ঢুকে পড়ে ক্ষয় ক্ষতি করছে। মূল সমস্যা হল বাসস্থানের, জায়গা জমির। হাতিরাই বা কী করবে তাহলে? কোথায় যাবে? এই সব ভাবনা ভাবায় ডাক্তার শর্মাকে। তিনি তাই সাধ্য মত জন সচেতনতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সারা জীবনটাই প্রায় কেটে গেল হাতি নিয়ে। ২০ বার বন্য হাতির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ফিরে এসেছেন মৃত্যুর মুখ থেকে। তবু হাতিদের নিয়েই তাঁর বেঁচে থাকা আর কাজ।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.