শুনে নিন পৃথিবীর প্রাচীনতম ৮ টি শহরের গল্প

oldest cities in the world

বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো শহরগুলি কোথায় গড়ে উঠেছিল, জানেন? প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার। ঠিক কবে পত্তন হয়েছিল এই শহরগুলির? আনুমানিক সময় নিওলিথিক যুগ । সেগুলির বেশিরভাগেরই আজকের দিনে আর কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু কিছু কিছু পরিণত হয়েছে আধুনিক নগরে। এই সব প্রাচীন শহরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ নগর সভ্যতাগুলি। তাদের মধ্যে কোনও কোনওটির অস্তিত্ব আজও বর্তমান। এইসব প্রচীন শহরগুলির সমৃদ্ধশালী ইতিহাস আমাদের বিস্মিত করে। অনেক ধ্বংসাবশেষ, মিনার আজও এইসব প্রাচীন শহরগুলির অতীতের সাক্ষ্য দিচ্ছে। কত কত পর্যটক প্রতি বছর ইতিহাসের টানে ভিড় করেন এই নগরগুলিতে।

লাক্সর, ইজিপ্ট

প্রাচীন থিবস নগরীতেই অবস্থান করত এই লাক্সর শহর। নতুন শাসনকালে এটিই ছিল ঈজিপ্ট-এর রাজধানী। আনুমানিক ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বে এই শহর স্থাপিত হয়। ছোট্ট একটি বাণিজ্য শহর হিসেবে এটি যাত্রা শুরু করেছিল। ধীরে ধীরে ঈজিপ্ট-এর সবচেয়ে ধনী শহরগুলির একটিতে পরিণত হয়। কারনাক আর লাক্সর শহরের অনেক প্রাচীন মন্দির কাঠামো আর ধ্বংসাবশেষ এখনও রয়ে গেছে। আর আছে থিবস নগরীর গোরস্থান ও ‘রাজা-রানির উপত্যকা’। ১৯৭৯ সালে বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে থিবস নগরীর এই ধ্বংসাবশেষকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেসকো। হাজারে হাজারে পর্যটক এই শহরের ইতিহাসের টানে প্রতি বছর ভিড় জমায় এখানে।

এথেন্স, গ্রিস

পাশ্চাত্যের সভ্যতাগুলির মধ্যে এথেন্স প্রাচীনতম ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলির একটি। নব্যপ্রস্তরযুগ থেকেই এই শহর জনঅধ্যুষিত। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকেই প্রাচীন গ্রিসের অন্যতম বিখ্যাত শহর এটি। গ্রিক পুরাণ বলে, দেবী এথেনার নাম অনুসারে এই শহরের নাম ‘এথেন্স’। পঞ্চম শতকে এথেন্স শহর নানাবিধ সাংস্কৃতিক কৃতিত্বের সাক্ষ্য রেখে উন্নতির শিখরে পৌঁছে গেছিল, এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলিই পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তি রচনা করেছে। এথেনিয়ান গণতন্ত্রের সুবর্ণ যুগ হিসেবে পরিচিত এই সময়টি।

সুসা, ইরান

সুসার প্রাচীন নগরীটি এলাম সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত। খ্রিস্টপূর্ব সাত হাজার থেকে এই অঞ্চলে মানুষের বসবাস, এমন প্রমাণ মিলেছে। তবে প্রাচীনতম বসতি তৈরি হয়েছিল ৪২০০ খ্রিষ্টপূর্বে। সুসার আগে ‘ছঙ্গা মিশ’ নামে একটি জায়গা ছিল এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পীঠস্থান। ছঙ্গা মিশ সহ অন্যান্য গ্রাম পরিত্যক্ত হবার পর সুসা নগরীর পত্তন হয়েছিল। সুসা নগরীর ইতিহাস তিনটি যুগে বিভক্ত। সুসা ১, যখন প্রাচীনতম অধিবাসীরা বসবাস করত এখানে, সুসা ২ ছিল উরুক সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত, (প্রসঙ্গত,সুমেরিয়ান সভ্যতার আগে মেসোটেমিয়ার অধিবাসীরা উরুক নামে পরিচিত ছিল) এবং সুসা ৩, যখন এই শহর এলাম সভ্যতার কেন্দ্র হল।

বিবলস, লেবানন

প্রত্নতাত্বিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, নিওলিথিক যুগ অর্থাৎ ৮৮০০-৭০০০ খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে বিবলসে মানুষের বসবাস শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে প্রথম বসতি গড়ে উঠেছিল এই শহরে। পুরাণ অনুযায়ী, ফোয়েনিসিয়ার প্রথম শহর হিসেবে ক্রোনাস তৈরি করেছিলেন এই বিবলস শহর। প্রাচীন ইজিপ্সিয়ান সভ্যতায় এই বিবলস নগরী মুখ্য বাণিজ্য কেন্দ্রস্থল হিসবে পরিচিত হয়। সিডার ও অন্যান্য মূল্যবান কাঠ রপ্তানি করত এই বাণিজ্য শহরের ব্যবসায়ীরা। ফোয়েনিশিয়ান বর্ণমালার প্রচলন এই শহরেই শুরু হয়। ১৯২১ সালে বিবলস শহর খুঁড়ে বের করেন পিয়ের মন্টেন্ট। ১৯৮৪ সালে একে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা দেওয়া হয়।

আরগোস, গ্রিস

বিগত ৭০০০ বছর ধরে আরগোস শহর বারে বারে জনঅধ্যুষিত হয়েছে। মাইসিনিয়ান যুগের প্রধান কেল্লা হিসেবে ব্যবহৃত হত এই নগরী। পেলোপনিস-এ স্পার্টানরা ক্ষমতায় আসার আগে প্রভাবশালী ছিল এই শহর। পেলোপনিস-এর দখলদারি নিয়ে দুটি রাজ্য যুদ্ধ করলেও এক তৃতীয় শত্রু এসে দখল করে এই শহর। রোমান শাসনকালে আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এইস শহরটি। বাইজানটাইন যুগে আবার সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে এই নগরী।

গ্রিস সরকার আরগোসকেই দেশের রাজধানি করবে ঠিক করেছিল প্রথমে কিন্তু পরে ১৮৩৪ সালে এথেন্সকে বেছে নেয়। গ্রিক পুরাণে আরগোস শহরের অনেক উল্লেখ আছে। দেবতা জিউস-এর পুত্র পারসিয়াসের জন্ম এই শহরে বলেই বিশ্বাস করা হয়।

আলেপ্পো, সিরিয়া

সাম্প্রতিক ইতিহাসে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মূল ঘাঁটি ধরা হয়েছে আলেপ্পো শহরকে। এই শহর সাংঘাতিক ক্ষয়ক্ষতি প্রত্যক্ষ করেছে এবং যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির পরেও বলা যায়, প্রাচীনত্বের দিক থেকে আলেপ্পোর বেশ ঐতিহ্য রয়েছে। এই শহরকেও ইউনেসকো ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই শহরের সঠিক বয়স জানা না গেলেও মনে করা হয়, ৫০০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে এই অঞ্চলে মানুষের বসবাস শুরু হয়। মানুষের ধারাবাহিক জীবিকার কারণে এই অঞ্চলে ভালো করে খনন কাজ চালাতে পারে নি প্রত্নতাত্ত্বিকরা। এবলা সভ্যতার ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বের পুরনো ফলক থেকে প্রথম আলেপ্পোর উল্লেখ জানা যায়।

প্লভদিভ, বুলগেরিয়া

প্লভদিভ, ইউরোপের প্রাচীনতম শহরগুলির একটি। ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বের নিওলথিক যুগে প্রথম পত্তন হয়েছিল এই শহরটির। দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য বার নানা জাতি আক্রমণ করে দখল করেছে এই শহর। থ্রাসিয়ান, মেসিডোনিয়ান, রোমান, বাইজানটাইন, বুলগেরিয়ান এবং ওটোমান টার্ক – নানা সময়ে নানা মানুষ এসে অধিকার করেছে প্লভদিভ। এই শহরের মিশ্র সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এর বৈচিত্র্যময় অতীতের সাক্ষ্য দেয়।

জেরিকো, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক

জেরিকো শহরের পত্তন কবে হয়েছিল, তাও ভালো করে জানা যায় না। খুব প্রাচীন এই শহর বার বার অধিকৃত হয়েছে। ব্যাপক হারে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া যায়, এই অঞ্চলের প্রাচীনতম বসতি আনুমানিক ৯৫০০ থেকে ৯০০০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ হয়েছিল বা তারও আগে থেকে। দ্য ওয়াল অব জেরিকো অথবা জেরিকোর প্রাচীর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। মনে করা হয়, এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম নগর প্রাচীর যা প্রায় ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বে নির্মিত হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে নানা মানুষ জেরিকোকে জয় করেছে। বাইবেলেও এই শহরের কথা বলা হয়েছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.