জেব্রা লাইনে ঘ্যাঁ-চ-চ বাইকের ব্রেক কষল ঋষি। কপাল জোরে বেঁচে গেছে মেয়েটা। একদম সামনে এসে পড়েছিল। ক্রসিং-এর লাল লাইটে তখন গান বাজছিল, ‘যদি তারে নাই চিনি গো ……’

Banglalive

লাইট লাল হওয়ার আগেই বেরিয়ে যাবে বলে ঋষি দূর থেকে বেশ স্পিড তুলেছিল বাইকে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। আচমকা হলদে আলো নিভে যেতেই কষে ব্রেক চাপতে হয়েছিল। রাস্তায় টায়ারের ঘর্ষণজনিত শব্দ উঠতেই ট্র্যাফিক পুলিশ ঘুরে তাকাল ঋষির দিকে। কাঁচুমাচু মুখ করে হাত তুলে দুঃখসূচক একটা ভঙ্গী করাতে পুলিশের বোধহয় দয়া হল। ঋষিকে কেস খেতে হল না। কিন্তু বিপদ এল অন্য দিক থেকে।

সিগনাল লাল হতেই মেয়েটা রাস্তা পার হতে নেমেছিল, ব্রেকের শব্দে চমকে উঠে তার হাতে কাগজে মোড়া একটা ২৪’’ * ১৮’’ ফোটো ফ্রেম ছিটকে পড়ে গেল রাস্তায়। মেয়েটা আগুন চোখে তাকাল ঋষির দিকে। সত্যযুগ হলে বাহনসুদ্ধ ভস্ম হয়ে যেতে পারত ঋষি। অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স – মহাপুরুষের বাণী স্মরণ করে ঋষি হালকা স্বরে বলল, ওপারে না ওপরে ? কোথায় যাবেন ?

আর যাবে কোথায়! মেয়েটা লম্বা শ্বাস টেনে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল, ও, জোকার বুঝি? এক্ষুনি সার্জেন্টের কাছে চলুন, মজা চাখাচ্ছি।’ সে বাইকের পথ আগলে দাঁড়াল। মনে মনে প্রমাদ গুনল ঋষি। লাইট সবুজ হয়ে গেলে ব্যাপক কেলো হবে। অফিস টাইম, চারদিকে হুলুস্থুল পড়ে যাবে। তখন কেস খাওয়া ভগবানও ঠেকাতে পারবে না। আবার হেলমেট নেই মাথায়। ঋষি অনুতপ্ত মুখ করে বলল, স্যরি, ভেরি স্যরি। ব্যাড জোক।

‘স্যরি বললেই সাতখুন মাপ? ভেবেছেন কী?’

‘খুব তাড়া ছিল ম্যাডাম। আসলে আর ঠিক কুড়ি মিনিটের মধ্যে সল্টলেকে একটা সার্ভিস কল অ্যাটেন্ড করতে হবে। আমার কোম্পানি আবার ফোন করে খবর নেয় ঠিক টাইমে পৌঁছেছি কি না।’ যথোপযুক্ত বিনীত কণ্ঠে বলল ঋষি, যদিও একটা কুড়ি-বাইশ বছরের মেয়েকে ম্যাডাম বলতে তার হাসি পেয়ে গেল।

মেয়েটা সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। বাইকটা প্রায় গায়ে এসে পড়েছিল, তাছাড়া বাইক-আরোহী বেটাইমে রসিকতা করার চেষ্টা করেছিল। এত সহজে তাকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সে বলল, ‘সাইড করুন। ওই সার্জেন্টের কাছে কমপ্লেন করব।’

দোষ অবশ্যই ঋষির। সে ট্র্যাফিক পুলিশকে প্রতিহত করে ভেবেছিল ফাঁড়া কেটে গেছে। নারীশক্তি উদ্বুদ্ধ হলে কী ভয়ানক পরিণাম হতে পারে তা বুঝতে পারেনি। পুলিশের থেকেও যে নারীশক্তি আরও বিপজ্জনক তা যে কোনও বিবাহিত পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারত ঋষি। সে অসহায় দৃষ্টিতে লাল মোটরবাইকের সার্জেন্টের দিকে তাকাল। ওদিকে তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ট্র্যাফিক সিগন্যালের গানে জনসাধারনকে শান্তি ও প্রেমের মার্গ দেখাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন, সে কী আমায় নেবে চিনে এই নব ফাল্গুনের দিনে।’ কবি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। সেই কবে সতর্ক করে দিয়ে গেছেন, চিনে নেবে এবং ফাল্গুনেই চিনারা অ্যাটাক করবে। তবে কোন বছরের ফাল্গুনে, তা নস্ট্রাদোমাসের ভবিষ্যদ্বাণীর মতো ধোঁয়াটে রেখে গেছেন।

মোড়ের আলো সবুজ হতেই পুলিশ ক্রিয়াশীল হয়ে উঠল। ইশারায় বাইক সাইড করতে বলল ঋষিকে। বাইক টেনে রাস্তার ধারে নিয়ে যেতে যেতে মেয়েটিকে ঋষি নম্রস্বরে বলল, ‘আপনিও তো তাড়াহুড়ো করে নিশ্চয় কোনও জরুরি কাজে যাচ্ছিলেন, পুলিশের চক্করে পড়লে দেরি হয়ে যাবে না?’

আরও পড়ুন:  নির্বাসন 

মেয়েটি উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে রোদ থেকে বাঁচতে বাস শেল্টারের নীচে গিয়ে দাঁড়াল। ঋষি এতক্ষণে ওকে মনোযোগ দিয়ে দেখল। তার পরনে টি শার্ট আর জিনস। নরম সুঠাম দেহটাকে আঁকড়ে ধরেছে। জামার হাতায় ফ্রিল। মেয়েটি মাথা ঝাঁকালে তার চুল তুরঙ্গমীর মতো লাফিয়ে ওঠে।

গত কয়েকবছর নতুন ডিজাইনের বাস শেল্টার বানানোর ধুম লেগে গেছে। হকাররা তো ছিলই, এখন ফুটপাতে নতুন দুর্বিপাক। বাস শেল্টার। ‘এল’ শেপের ডিজাইন পথিকের বিভ্রান্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। হয় তাকে রাস্তায় নেমে আবার ফুটপাতে উঠতে হবে, নইলে তাকে বাস শেল্টারের পিছনে যে সংকীর্ণ পথ রয়েছে – যে জায়গাটা জনগণ সাধারণত জলবিয়োগের কাজে ব্যবহার করে থাকে – সেখান দিয়ে শঙ্কিত পদক্ষেপে অতিক্রম করতে হয়। অবশ্য বাদ স্টপের নান্দনিক রূপ অবিসংবাদিত। যাঁর তহবিলের টাকায় নির্মিত তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে।  তাছাড়া মহাপুরুষদের ছবি ও ভালো ভালো কবিতা, মূল্যবান বাণী ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ।

কে বা কারা এই রকম বাস শেল্টারের জন্য দায়ী? তার বা তাদের মাথা মিউজিয়ামে টেরোডাকটিলদের পাশে সসম্মানে রাখা উচিত। ঋষি বাইকটা স্ট্যান্ডে তুলে হাতঘড়ির দিকে অসহিষ্ণু দৃষ্টিপাত করে বলল, ‘শুনুন ম্যাডাম, বাজে রসিকতা করার জন্য আমি দুঃখিত। এবার আমাকে যেতে হবে।’

মেয়েটি নির্বিকার স্বরে বলল, ‘মাথায় হেলমেট নেই, তার উপর সিগন্যাল অমান্য করে জেব্রা ক্রসিং-এ ঢুকে অ্যাক্সিডেন্ট করতে যাচ্ছিলেন। আমার নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে। সঙ্গে নিশ্চয় লাইসেন্স নেই, আপনার মতো বেপরোয়া টাইপ ও সব তুচ্ছ ডকুমেন্টে বিশ্বাস করেন না, তাই না?’

এবার ওর মার্কামারা সরল হাসিটা হেসে ঋষি ওকে তোয়াঝ করতে চাইল, ‘আপনার হাতে ওটা কী কারও ল্যামিনেটেড ফোটোগ্রাফ ? ওটা ড্যামেজ হয়নি ভাগ্যিস। বলুন কোথায় আপনাকে পৌঁছে দিতে হবে …’

‘থানায়। আপনার বিরুদ্ধে ডাইরি করব।’

ঋষি এবার বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কেন ঝুট-ঝামেলা বাড়াচ্ছেন? আমার অনেক লেট হয়ে যাচ্ছে। হাত জোড় করে বলছি, আমি দুঃখিত, অপরাধ ক্ষমা করুন।’

‘আচমকা ব্রেক কষে আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। আমার বুকে প্যাল্‌পিটেশন বেড়ে গিয়েছিল, পালস্‌ রেট এখনও দ্রুত।’

‘তা আমি কী করতে পারি ম্যাডাম ? অসুস্থ বোধ করলে ডাক্তার দেখান, নাকি আমাকে ডাক্তারের ফি দিতে হবে ?’

মেয়েটি অম্লানবদনে বলল, ‘সে তো বটেই, পাঁচশো টাকা ছাড়ুন।’

‘অ্যাঁ?’ ঋষি হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

‘পাঁচশো ! ছবির চল্‌টা উঠে গেছে রাস্তায় পড়ে। রিপেয়ারিং চার্জ। না দিলে থানায় চলুন। মলেস্টেশনের অভিযোগ জুড়ে দিলে আপনার কী অবস্থা হবে বুঝতে পারছেন ?’

ঋষির মুখের হাঁ আরো বেড়ে গেল।

‘ওরকম অবাক কচ্ছপের মতো তাকিয়ে থেকে কোনও লাভ নেই। যত দেরি করবেন, ততই ক্ষতিপূরণের মাত্রা বেড়ে যাবে। এটা একটা ইম্পর্ট্যান্ট ছবি। কার জানেন ? ইনি মহাকবি কালিদাস। ডেলিভারি দিতে যাচ্ছিলাম। আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন। সরকারিভাবে তাঁর জন্মদিন পালন করা হচ্ছে।’

ঋষি কোনওরকমে বলল, ‘কালিদাস? তার ফোটোগ্রাফ পৃথিবীতে কোথাও আছে নাকি?’

‘আমার দাদার স্টুডিওতে অশরীরী বস্তুও ডিজিটালি ডেভেলপ করা যায়। তিনি আসলে কেমন দেখতে ছিলেন তার কোনও সাক্ষী নেই তো, এটাই সুবিধে। শুধু কালিদাস কেন, আমাদের স্টকে ব্যাসদেব, সম্রাট অশোক, ভবভূতি, চাণক্য সকলের ফোটোগ্রাফ আছে। ভারতীয় মনীষীর স্টক আমাদের আড়াইশো। এবার দাদা আন্তর্জাতিক মহাপুরুষ ধরবে। অন্তত শ’ তিনেক রাখতে হবে টোটাল স্টক।’  

আরও পড়ুন:  মানুষের অস্তিত্ব আর ১০০ বছর

‘তিনশো ? কেন?’

‘বাঃ, বছরে কমবেশি তিনশ ওয়র্কিং ডে-র জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে। রোজ একএকজনের জন্মদিন পালন করে উৎসবের মুডে কাজ আরম্ভ করলে সারাদিন মন ভালো থাকে যে ! আমার দাদা তিন বছরের কন্ট্রাক্ট পেয়েছে। দাদা তাই মার্কোপোলো, জোন অফ আর্ক, কলম্বাস প্রভৃতির ছবিটবি তৈরি করছে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আমি রয়েছি।’

   ‘আপনাকে যদি গন্তব্যে পৌঁছে দিই তাহলে কি ক্ষতিপূরণের মাত্রা কমতে পারে ? আমারই ফাটা কপাল, আজ সিক লিভ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অফিসে একটা ফোন করে দিই,’ বলল ঋষি।

মেয়েটির নাম মিমি। বাইকের পিছনের সিটে উঠে সে সাবলীলভাবে ঋষির কাঁধে হাত রেখে বসল। ভাগ্যিস মাঝখানে কালিদাসের ব্যবধান ছিল, নইলে ঋষি বাইক চালনায় সঠিক মনোনিবেশ করতে পারত কি না সন্দেহ। তখন লাল লাইটের রেকর্ডেড মিউজিক বাজছে, ‘একদিন চিনে নেবে তারে, তারে চিনে নেবে …’

মিমি উদাসীন গলায় বলল, চিনেরা নেবার আগে নেটিভরাই সমস্ত পেনড্রাইভ ঝেড়ে দেবে।’

ভারী সুদৃশ্য লাইটপোস্ট লেগেছে রাস্তার দু’পাশে। শার্লক হোমসের সিনেমায় দেখা লন্ডনের পুরনো গ্যাসবাতির কথা মনে পড়ে যায়। রাত্রিবেলা চেনা কলকাতার রাস্তা স্বপ্নের সরণী হয়ে ওঠে। আলোয় আলোয় ভরে যায় রাস্তাঘাট। খানাখন্দ পার হতে খুব সুবিধা হয়েছে। অপর্যাপ্ত বিদ্যুতের জোগান। ভালো হয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প নেই। লোডশেডিং এখন ইতিহাসের পাতায়।

নতুন ডিজাইনের লাইটপোস্ট অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। নিঃসঙ্গ পোস্ট থেকে যেন তিনটে সাপ বেরিয়ে পড়েছে, তাদের ফণায় তিনটে মণি। ক’বছরে অবশ্য অনেক ফণাই মণিহারা। মুণ্ডু বেপাত্তা, কিন্তু ধড় অবশিষ্ট আছে। তাই বা কম কী?

মিমি বলল, ‘তবু তো পোস্টগুলো এখনও খাড়া আছে। স্ক্র্যাপ মার্কেটে লোহার কত দাম জানা আছে কি ?’

যথাস্থানে পৌঁছে মিমি কালিদাসকে বগলদাবা করে বলল, ‘মহাকবিকে ডেলিভারি করে একবার বাড়ি ফিরতে হবে কয়েকটা টুকিটাকি জিনিস আনার জন্য। ফুলের দোকানেও তাগাদা দিতে হবে। আমাকে লিফ্‌ট দিলে ক্ষতিপূরণ আরও কমে যেতে পারে। আজ অফিসের পাট তো চুকেই গেছে।’

কী আর করা, এই মেয়েকে ঘাঁটাতে ভয় পাচ্ছে ঋষি। তাছাড়া এমন ঝকাস্‌ আইটেম পিলিয়ন সিটে বসিয়ে ঘুরতে কার না ভালো লাগে ?

বাইকটা পার্ক করে ঋষি অপেক্ষা করতে লাগল। মেয়েটা কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। যদি বলে রানাঘাট ?  কিংবা তিব্বত ? তেলের খরচা তাহলে ক্ষতিপূরণের মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে না ? এইসময় দেখতে পেল মিমি রাস্তা পার হয়ে দ্রুত পায়ে ওর দিকেই আসছে। আঁটোসাটো টপের নীচে ব্যাপক আন্দোলনের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল ঋষি।

মিমি এসেই বলল, ‘আমি ঠিক করেছি তোমাকে তুমি বলব, ইচ্ছে করলে তুমিও আমাকে তুমি বলতে পার। তবে নো ন্যাকামো প্লিজ, মনে রাখবে আজকেই আমাদের প্রথম ও শেষ দেখা। এই যে তোমার সঙ্গে ঘুরছি তা কেবল তোমার পেনাল্টি লাঘব করার জন্য। ’

ঋষি বলল, একটা খুব সিরিয়াস চিন্তা করছিলাম। গুগ্‌ল বলছে সমীক্ষায় দেখা গেছে, পৃথিবীর ১৪০ টা শহরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বাসযোগ্য শহর হচ্ছে মেলবোর্ন। দ্বিতীয় ভিয়েনা, ভ্যানকুভার তৃতীয় স্থানে। এই লিস্টে ভারতের একটা মাত্র শহর আছে। মুম্বই, তা-ও ১১৬ নম্বরে। লন্ডন আছে ৫৩ নম্বরে। তাই ভাবছিলাম, আমরা আর সব শহর ছেড়ে কেন লন্ডন হওয়ার চেষ্টা করছি বলো তো? একে কী কলোনিয়াল হ্যাঙওভার বলা যায়? তোমার দাদা এই বিষয়ে কী বলে?’

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (দ্রোহজ ২) পর্ব ২

মিমি কিন্তু কিন্তু করে বলল, ‘এই বিষয়ে আমাদের লেভেলে কেউ মুখ খুলবে না। মানা আছে।’

‘তুমি  কোথায় থাকো, মিমি?’

‘তোমাকে আমি পার্সোনাল কোশ্চেন করার অনুমতি কি দিয়েছি?

‘কী মুশকিল! তখন যে বললে বাড়ি থেকে কী সব জিনিস আনতে হবে। তোমার বাড়ি কোথায় না জানলে …’

‘আমি থাকি মাইকেল মধুসদনের কাছাকাছি।‘

‘মানে, পার্ক স্ট্রিটের কবরখানায়?’

‘দাদা আর আমি লং-টার্মে প্ল্যানিং করে থাকি। জোকা থেকে মেট্রো রেল হচ্ছে জানো তো? কয়েক বছরের মধ্যেই চালু হয়ে যাবে। তখন স্টেশনগুলোর কী নাম হবে এখনও যদিও ঘোষণা করা হয়নি, তবে নিশ্চয় ঠাকুরপুকুর শখের বাজার চৌরাস্তা কিংবা তারাতলা বা মাঝেরহাটের মতো সাদামাটা বোকা-বোকা নামের বদলে বাংলার আইকনদের নামে স্টেশনের নাম রাখা হবে। এখনও শুনছি উত্তরের লোকেরা কবি নজরুল আর কবি সুভাষের মধ্যে গোলমাল করে ফেলছে। তাই দাদা আর আমি আগে থেকে মাইন্ডসেট বদল করার চেষ্টা করছি। নিজেরাই ওই রুটের স্টেশনের নতুন নাম রেখে দৈনন্দিন অভ্যাস করছি। আমরা থাকি মাইকেল মধুসুদন আর গোষ্ঠ পালের মাঝামাঝি।

ঋষি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমি বরং ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে চালাচ্ছি, কোথায় নামবে, বোলো।’

মিমি বাইকের পিছনে বসতেই তৎক্ষণাৎ ঋষির অনুভবে পাল্‌টে গেল পৃথিবী। পিঠে কদাচিৎ এক দৈবী স্পর্শ পেলেই চারদিকের হট্টগোল গানে গানে ভরে উঠতে লাগল। পরিচিত দুনিয়ার বর্ণ গন্ধ এক নিমেষে বদলে গেছে। নন্দনকাননের সুবাস নিয়ে বইছে মন্থর মলয় বাতাস।

রাজভবনের ট্র্যাফিক লাইটে ওরা দাঁড়িয়েছে। মাথা একটু পিছনে হেলিয়ে ঋষি পারিজাতের সুঘ্রাণ বুক ভরে টানছে। সৃষ্টির আদি থেকে জীব পরস্পরের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে এসেছে। মিমি বোধহয় কোনও বিদেশি পারফিউম মেখেছে, নাকি ওটা ওর সহজাত স্বাভাবিক গন্ধ! ক্রসিং-এ তখন গান বাজছে, ‘মন যে বলে চিনি চিনি / যে গন্ধ বয় এই সমীরে কে ওরে কয় বিদেশিনী …’

একটা মিছিল যাচ্ছিল রানি রাসমণি রোডের দিকে। তবে সৌভাগ্যবশত ছোট। স্কুলের নাবালকদের রোদে-রোদে হেঁটে প্রতিবাদ জানানোর রেওয়াজ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে মিছিলরা ইদানীং সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। ট্র্যাফিক চালু হলে নেতাজি সুভাষচন্দ্র যেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন সেদিকের রাস্তা ধরল ঋষি।

তারাতলা উড়ালপুল অতিক্রম করে কিছুটা যেতে মিমি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ‘স্টপ, স্টপ, যাঃ আমার সেলফোনটা কি ফেলে এলাম? ব্যাগে নেই তো। তোমার ফোনটা দাও, আমার নম্বরটা বাজিয়ে দেখি।’

মিমির জিন্‌সের পকেটে রিং বেজে উঠল। বলল, ইশ্‌ পকেটে রেখে ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি এখানে নামব। আচ্ছা, বাই ঋষি, উই আর কুইটস্‌ …’

বাইক ঘুরিয়ে ফিরতে ফিরতে কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ঋষির মনে হল, তবে কি মিমি ছল করে ওর মোবাইলে নিজের নম্বরটা তুলে দিয়ে গেল ? মিমি কি তাহলে ঋষির কলের প্রতীক্ষা করবে?     

1 COMMENT

এমন আরো নিবন্ধ