জনশূন্য মৃতপ্রায় গ্রাম শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় এখন পুতুল উপত্যকা

পৃথিবীর বুকে এমন অনেক স্থান আছে যার কথা শুনলে মনে হবে কোনও  রূপকথার গল্প। বা হয়তো মনে হতে পারে এমন জায়গা আবার হয় নাকি ! কিন্তু জাপানের এই উপত্যকা গল্পের থেকেও অদ্ভুত রকমের। উপত্যকার মাঝ বরাবর চলে গিয়েছে রাস্তা । যতদূর চোখ যায়, জনমানব চোখে পড়ে না । পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই উপত্যকায় যেন কেউ জলরঙ দিয়ে এঁকে  দিয়েছে। এই গ্রামের ছবি খানিকটা এইরকমই ।

জাপানের শিকোকু দ্বীপের লিয়া উপত্যকায় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছবির মতো বিস্তৃত গ্রাম নাগোরো । স্থানীয়রা বলেন ‘নাগোরু।’ আর বিশ্বের কাছে এটি পরিচিত  ‘দ্য ভ্যালি অব ডল’ বা পুতুলদের গ্রাম নামে। গোটা গ্রাম জুড়েই পুতুলদের ভিড়। জাপানের এই প্রত্যন্ত গ্রাম নাগোরোতেই বছরের পর বছর ধরে সেখানকার হারিয়ে যাওয়া বা মৃত মানুষের স্মরণে তৈরি করা হয়েছে বড় বড় সব পুতুল। ক্রমে ক্রমে এইসব পুতিলের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, বর্মানে সেখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে এইসব পুতুল। খানিকটা বর্ণনা দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে। নদীর ধারে তাপ্পি দেওয়া চেক-শার্ট, ঢিলে-ঢালা প্যান্ট, মাথায় টুপি পড়ে মাছ ধরছে একজন। এখন তাঁকে দেখে আপনার যদি খানিকক্ষণ গল্প করার ইচ্ছে জাগে তাহলে ভুল আপনারই। একটু ভাল করে চেয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন এটি একটি পুতুল।

গ্রামের পথ বাঁক নিতেই চোখে পড়বে ঝকঝকে রাস্তা, অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর কিছু এমন মানুষ (আদতে পুতুল) যাঁদের বাক্যালাপের কোনও সুযোগই নেই। মানুষের জীবনযাপনের জন্য একটি গ্রামের মানুষ যা যা কাজ করেন, তার সবকিছুই করছে কিছু প্রাণহীন পুতুল। মাঠে, বাগানে, গুমটি ঘরের সামনে, পার্কে, স্কুলের দালানে ভিড় করে রয়েছেন এমনই কিছু পুতুল, যাঁদের দৃষ্টি স্থির কিন্তু লক্ষ্য অজানা।  সারি সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষের আদলে তৈরি পুতুল। তাঁদের পোশাক, মাথার চুল, নখ এতটাই নিখুঁত যে দূর থেকে দেখলে মনে হবে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

এই গ্রামে বসবাসকারী সবচেয়ে কম বয়সীর নাম সুকিমি আয়োনো। বয়স তার ৬৭-র কাছাকাছি। এই পুতুল গ্রামের সব পুতুলই তাঁর নিজের তৈরি। একটু একটু করে একটা গোটা গ্রামকে তিনি পুতুলের রাজ্য বানিয়ে তুলেছেন। তাঁর শৈশব কেটেছে নাগোরোতে। বাবা-মা গত হয়েছেন শৈশবেই। পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছাড়েন তিনি। ওসাকাতে দীর্ঘ ১১ বছর কাটিয়ে গ্রামে ফিরে রীতিমতো হয়রান হয়ে যান! আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব-হীন গ্রামটা যেন মৃতপ্রায় হয়ে উঠেছে। চারদিক এতটাই জন-মানবহীন যে ছবির মতো গ্রামটি যেন শ্মশানে পরিণত হয়েছে। নিঃসঙ্গ জীবনে মানুষের অভাব পূরণ করতেই পুতুল তৈরির ভাবনা মাথায় আসে তাঁর। উপত্যকার ছোট ছোট জমিতে চাষ করছে পুতুল-চাষী, নদীতে মাছ ধরছে পুতুল-জেলে, দমকল কর্মী থেকে পুলিশ সবাই পুতুল। সুকিমি জানিয়েছেন, দু’বছর আগেই গ্রামের স্কুলে তালা পড়ে গেছে। মানুষই তো নেই, নেই পড়তে আসা শিশুও। সুনসান এই স্কুলটিকে তাই তিনি ভরিয়ে দিয়েছেন পুতুল দিয়ে।

ক্লাসরুমে বেঞ্চে সারিবদ্ধভাবে বসে রয়েছে একঝাঁক পড়ুয়া। তাদের সামনে পরিপাটি করে রাখা রয়েছে বই, খাতা, রঙ-তুলি, পেন্সিল। কেউ কেউ আবার হাতে পেন্সিল ধরে আঁকার খাতায় মনোনিবেশ করেছে।  ক্লাসে গম্ভীর মুখে পড়াচ্ছে পুতুল-শিক্ষক। সবই রয়েছে নেই শুধু কোলাহল। রয়েছে ছোট্ট একটি সরকারি দফতর। সেখানে চোখে চশমা পড়ে ফাইলপত্র ঘাটছেন পুতুল-কেরানি। সামনে একরাশ বিরক্তি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু বয়স্ক পুতুল। বাস স্ট্যান্ড, রেস্তোরাঁ, বাজার সর্বত্রই নীরব পুতুলদের আনাগোনা।

পুতুলদের মধ্যেও বৈচিত্র্য রয়েছে। শিশু, কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নানা বয়সের পুতুলই চোখে পড়বে এই গ্রামে। মানুষও যে একেবারে নেই তা নয়, তবে তাঁদের সংখ্যা খুবই কম। গ্রামজুড়ে মানুষের সংখ্যা সাকুল্যে ৩০, যাঁদের অধিকাংশই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। প্রথম থেকেই সুকিমি হাতের কাজে যথেষ্ট পারদর্শী। একদিন নিজের বাগানের জন্য একটি কাকতাড়ুয়া তৈরি করে সে, সেটি বানানোর সময়ে সেটিকে নিজের বাবার আদলে তৈরি করে সে। সেই শুরু। তারপরে একে একে মানুষের আদলে পুতুল তৈরি করা শুরু করেন তিনি। গত দশ বছরে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি পুতুল। বর্তমানে গ্রামে মোট ৪০০ টির মতো পুতুল রয়েছে। এমনকী সুকিমির নিজের আদলেও রয়েছে পুতুল। সেই পুতুল আবার নাকি খুব অলস প্রকৃতির।

সুকিমির কথায়, হাতের কাছে তিনি যা পান তাই দিয়েই পুতুল বানান তিনি। তারপরে সেইসব পুতুলের কারওর মুখে হাসি আবার কারওর মুখে রাগ ফুটিয়ে তোলেন তিনি। তবে সুকিমি জানিয়েছেন, পুতুলদের মুখে অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা খুব সহজ কাজ নয়। প্রত্যেক বয়সের মানুষের মৌখিক আবেদন এক এক রকমের। একজন বৃদ্ধ মানুষের মুখের আবেদন যেমন, আবার একজন স্কুল-পড়ুয়ার মুখের আদল আর এক রকম। আবার একজন শিক্ষকের মুখের আদল একরকম আবার একজন প্রেমিক-প্রেমিকার মুখের আদল একরকম। সাদা চুলের বয়স্ক মানুষের পুতুল। তাঁর কথায় বয়স্ক মহিলার আদলে গড়া পুতুল যেন তাঁর মায়ের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। প্রতিটা পুতুল তিন মাসের জন্য রাখেন সুকিমি। তারপরে আবার সেই কাঠামোয় তৈরি হয় নতুন পুতুল। সুকিমির কথায় এই পুতুলরা তাঁর সন্তানতুল্য। এই পুতুলের সংসারই তাঁর পৃথিবী। ২০১৪ সালে নাগোরো গ্রামকে নিয়ে ‘দ্য ভ্যালি অব ডল’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন ফ্রিৎজ স্ক্যুম্যান। তারপর থেকেই গ্রামে ভিড় জমতে থাকে পর্যটকদের। ক্যামেরা হাতে ভিড় জমান সাংবাদিকরা। হিংসা, হানাহানি বর্জিত এই পুতুলদের রাজ্যেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চান পুতুল-স্রষ্টা সুকিমি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here