প্রথম জীবনের স্বাধীনতা সংগ্রামী পরে বড় মা‚ চলে গেলেন অগণিত সন্তানকে অনাথ করে

518

সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষকে সামনের সারিতে নিয়ে আসাই প্রধান লক্ষ্য ছিল মতুয়া মহাসংঘের।  মতুয়া মহাসংঘ এবং বীণাপাণি দেবী নামদুটো যেন একে অপরের পরিপূরক। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসার জন্য যে সামাজিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন বীণাপাণি দেবী তা যে মূল ধারার রাজনীতির অংশ হয়ে উঠবে তা হয়তো প্রাথমিক স্তরে বোঝা যায়নি।

তবে এই অভিযান একদিনে সফল হয়নি। এর জন্য আমাদের কিছুটা সময় পিছিয়ে যেতে হবে। ১৯১৯ সালে অবিভক্ত বাংলাদেশের বরিশালে জন্ম হয় বীণাপাণি দেবীর। এরপর ১৯৩৩ সালে ফরিদপুর জেলার ঠাকুরবাড়ির প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের সঙ্গে বিয়ে হয় । মতুয়া মহাসংঘের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশধর হলেন এই প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। দেশভাগের পূর্ববর্তী সময়ে গণপরিষদের সদস্য ছিলেন প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। সেইসময়ে তাঁর নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গী ছিলেন বীণাপাণি দেবী।

দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে সপরিবারে এদেশের মাটিতে আশ্রয় নেন বীণাপাণি দেবী । এখানে এসে শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম । উত্তর চব্বিশ পরগনায় গড়ে তোলেন এক উদ্বাস্তু কলোনি, যার নাম ঠাকুরনগর । এরপর ১৯৫২ সালে নবদ্বীপ থেকে কংগ্রেসের সাংসদ নির্বাচিত হন প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি চলতে থাকে মতুয়া মহাসংঘের কাজকর্মও। মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রাপ্য সম্মান ফেরাতে স্বামীর সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন বীণাপাণি দেবীও। এরপর ১৯৯০ সালে স্বামী প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের মৃত্যুর পর মতুয়া মহাসংঘের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন বীণাপাণি দেবী। ধীরে ধীরে মতুয়া সম্প্রদায়ের ‘বড় মা’ হয়ে ওঠেন বীণাপাণি ঠাকুর। মতুয়া সম্প্রদায়ের একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেই এই ‘বড় মা’। তাঁর নির্দেশেই মহাসংঘের সভাপতি হিসেবে কাজ করতেন তাঁরই বড় ছেলে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর। ঠাকুরনগরের মানচিত্রের বাইরে বেরিয়ে সারা দেশে মতুয়া সম্প্রদায়ের বিস্তৃতির জন্য কৃতিত্ব তাঁরই।

২০১৪ সালে বড় ছেলের মৃত্যুর পর মনে মনে ভেঙে পড়লেও থমকে যাননি বীণাপাণি দেবী। পুত্রশোককে সঙ্গী করেই মতুয়া মহাসংঘের মেরুদণ্ড হয়ে থেকেছেন । এরপর সময় পেরিয়েছে। রাজ্য রাজনীতিতে নিজেদের পোক্ত জায়গা করে নিয়েছে মতুয়ারা । আর এই রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব পড়েছে তাঁর পরিবারেও। বীণাপাণি দেবীর ছোট ছেলে যেখানে বিজেপি-তে যোগ দিলেন, সেখানে বড়ছেলের পরিবার তৃণমূলের ভাবধারায় বিশ্বাসী। রাজনীতি তাঁদের পরিবারের অন্দরে বিভেদ সৃষ্টি করলেও ‘বড়মা’র ভাবাদর্শে তা কোনও বদল আনতে পারেনি।

গত বছরেই বেশ জাঁকজমক করেই তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালন করা হয়েছিল। তবে বয়সের ভারের কাছে হার মানতে হয়েছিল তাঁকে। বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন বেশকিছুদিন ধরেই। গত বুধবার শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নিয়ে আসা হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। সেখানে এসেও তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হতে থাকে। মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। শুধু মতুয়াদের কাছে নয়‚ তিনি সবারই ‘বড় মা’ | তাঁর প্রয়াণে মাতৃহীন অগণিত সন্তান |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.