১৯২ বছর আগে পাল্কি বাহকদের ডাকা প্রথম পরিবহণ ধর্মঘটে স্তব্ধ হয়েছিল কলকাতা

794

সে এক অন্য কলকাতা । মোটর গাড়ি তখন কোথায় ! রাস্তায় ছুটে যায় ঘোড়া-গাড়ি, আর পালকি নিয়ে দৌড়ে যায় বেহারার দল । আজকে যেমন মোড়ে মোড়ে রিকশা স্ট্যান্ড, সে সময় মোড়ে মোড়ে ছিল পালকি স্ট্যান্ড । আর বাকি কলকাতা চলত হেঁটে হেঁটে । ভাবুন একবার, দূষণ নেই, ধোঁয়া
নেই, হর্নের শব্দ নেই—প্রায় নিস্তব্ধে এগিয়ে চলেছে নব্য নগর কলকাতা ।

নগর বলে কথা !  তা কি আর নিস্তব্ধে এগোতে পারে ! একদিন আরও নৈঃশব্দ্য ডেকে এনে জোর গলায় আওয়াজ তুলল পালকি বেহারারা । সমাজের উচ্চবর্ণ ও বিত্তশালী মানুষদের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে কাজ বন্ধ করে দিল নিম্নবর্ণের অন্ত্যজ বেহারার দল । তাও আবার আজকের মত ২৪ ঘণ্টা, ৪৮ ঘণ্টা বা ৭২ ঘণ্টা নয়, টানা এক মাস ।সালটা ১৮২৭ ।

কেন এমন আন্দোলন ? তা জানতে ফিরে যেতে হবে কয়েক বছর আগে রাজা নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুরের আমলে—পলাশির যুদ্ধে ইংরেজ সরকারের পাশে থাকা থেকে শুরু করে অযোধ্যার নবাবের সঙ্গে দিল্লির নবাবের বিবাদের মীমাংসা করে ক্লাইভের আস্থাভাজন হয়েছিলেন নবকৃষ্ণ। ক্লাইভের সুপারিশে দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে ‘রাজা বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন । এর সঙ্গে উপহারের যে রাজকীয় তালিকা ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল পালকি। এছাড়াও কোম্পানি আলাদাভাবে বাহাদুরও নবকৃষ্ণকে পুরস্কৃত করে। সে পুরস্কারের তালিকাতেও ছিল পালকি। এই যে এত পালকি পেলেন নবকৃষ্ণ, সেগুলি বয়ে নিয়ে যাবে কে ? বাংলার গ্রামের পালকি বাহকরা কিন্তু এলেন না । মজার ব্যাপার হল, কলকাতায় পালকি বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক এল উড়িষ্যা থেকে।

এবার প্রশ্ন হল, কেন উড়িষ্যার লোকেরাই এলেন ? কেন এলেন না বাংলার গ্রামের অন্ত্যজ পালকি বেহারারা ? ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন—‘ইহার কারণ মনে হয় এই যে, তখন উড়িষ্যায় কথায় কথায় বন্যা দুর্ভিক্ষ মহামারী প্রভৃতি লাগিয়াই ছিল; দারিদ্র্যের করাল বিভীষিকা উড়িষ্যাবাসীকে
যেন সর্বদা ঘিরিয়া থাকিত । তাই পাল্কী বহিয়া অর্খসঞ্চয় করিয়া দেশে ফিরিয়া অপেক্ষাকৃত সুখে স্বাচ্ছন্দে থাকিতে পারিবে, ইহাতেই তাহাদের আনন্দ ।’

সে তো নয় বোঝা গেল—উড়িষ্যার মানুষেরা অভাবের তাড়নায় ছুটে এসেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু বাংলার বেয়ারাদের কি অভাব ছিল না ? নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ আছে ? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে ক্যালকাটা গেজেটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে । ১৭৮৯ সালের ১ অগাস্ট ইংরেজিতে লেখা সেই প্রতিবেদনটি এরকম—”এক ব্রাহ্মণ গঙ্গাস্নান করে ফিরছিলেন । আর সেই পথ ধরেই যাচ্ছিল সেকালের কলকাতার অন্যতম ধনী ব্যক্তি নিমাই মল্লিকের পালকি বেহারা । ব্রাহ্মণের গায়ে গা ঠেকে তার । আর এতেই ক্ষুব্ধ ব্রাহ্মণ ঠাঁটিয়ে একটি চড় কষিয়ে দেন বেহারাকে । বেহারাও পাল্টা থাপ্পড় মারে ব্রাহ্মণকে । মল্লিকমশাইয়ের বাড়িতে নালিশ করতে যান ব্রাহ্মণ। কিন্তু বেহারাকে ডেকে সব শুনে ব্রাহ্মণকে ফিরিয়ে দেন নিমাই মল্লিক । পরদিন মর্মাহত ব্রাহ্মণ একটি বন্দুক নিয়ে এসে মল্লিকমশাইয়ের বাড়ির সামনেই আত্মহত্যা করেন ।”

ধুন্ধুমার কাণ্ড ! স্বজাতীয়রা সেই ব্রাহ্মণের সত্কার করেন মল্লিক বাড়ির সামনে । গোটা মহল্লায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে । শেষ পর্যন্ত পুলিস এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনে । জাতপাতের কারণে পালকি বেহারাদের রাখা দায় হয়ে উঠল কলকাতার ধনী ব্যক্তিদের । এর থেকে মুক্তির উপায় কী ? যোগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় লিখছেন—“সেকালে দুলেরাই পাল্কী বহন করিত…দুলে জাতি হিন্দু সমাজে অস্পৃশ্য ছিল, সেই জন্য নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণগণ ও উচ্চবর্ণের নিষ্ঠাবতী মহিলারা যে-বস্ত্রে পাল্কীতে আরোহণ
করিতেন সেই বস্ত্র পরিবর্তন না করিয়া পূজা, আহ্নিক বা আহার করিতেন না।…ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান রাজা ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী স্থানীয় (পড়ুন চন্দননগর ও সংলগ্ন অঞ্চল) ব্রাহ্মণ সমাজের নেতৃস্থানীয় ছিলেন ।…অস্পৃশ্য দুলের দ্বারা বাহিত পাল্কীতে বসিয়া তম্বুল-চর্ব্বণ ব্রাহ্মণের
অনুচিত বলিয়া তিনি উড়িষ্যা হইতে একদল গোপজাতীয় বাহককে আনাইয়া চন্দননগের স্বীয় বাটীর কাছে বাস করাইয়াছিলেন।”

রাজা ইন্দ্রনারায়ণই পালকিতে উঠে বিলাসের পথটা বাতলে দিয়েছিলেন কলকাতার বাবুদের। আর তার সঙ্গে ‘অশুদ্ধ’ পালকিকে উড়িয়াদের কাঁধে তুলে দিয়ে করে দিলেন ‘শুদ্ধ’ যাত্রা । এরপর কলকাতায় জাঁকিয়ে বসল উড়িয়ার লোকেরা । পালকি বেহেরারা । আর তাদের নেতাও তৈরি হয়ে গেল। সেই বেহারা সর্দারদের নাম ‘পরামানিক’। এক কথায় আজকের শ্রমিক সংগঠন যাকে বলে, তেমনই
বেহারাদের ছোট ছোট শ্রমিক সংগঠন তৈরি হয়েছিল সে কলকাতায় । এই পরমানিকরাই নিয়ম ঠিক করে দিতেন, ভাড়া এবং মজুরিও নির্ধারণ করে দিতেন ।

উড়িয়াদের জন্যই কলকাতায় পালকি হয়ে উঠল গণ পরিবহণ। অফিস কাছারি স্কুল কলেজ যাত্রা তখন পালকি নির্ভর । আর এই গণ পরিবহণ ব্যবস্থায় সরকারি হস্তক্ষেপ থাকবে না, তা কি হয় ? ১৭৯৪ সালে প্রথম সরকারি হস্তক্ষেপটা এল। আইন করে পালকি ভাড়া ঠিক করে দিল সরকার। তাতে সম্মত হল পরামাণিকরা । সরকারি সিদ্ধান্তে সই করে দিলেন তাঁরা ।

পালকি কাঁধে ভালই চলছিল কলকাতা। কিন্তু গোল বাঁধল ঠিক ৩৩ বছর পর ১৮২৭-এ। সে বছর ১২ মে ঘোষণা হল ৩টি সিদ্ধান্ত—১) পালকি বেয়ারাদের লাইসেন্স নিতে হবে, অর্থাত্ তাদের পুলিশের খাতায় নাম তুলতে হবে। ২) পুলিশের দেওয়া ব্যাজ পড়ে কাজ করতে হবে । ৩) ভাড়া বিন্যাস।

প্রথম দুটিতে আপত্তি ছিল না বেয়ারাদের। কিন্তু তৃতীয়টিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল বেয়ারারা। কারণ ভাড়া বিন্যাসের নামে বেয়ারাদের মজুরিই কমিয়ে দিয়েছে সরকার । নয়া হারে মজুরি ৩৩ বছর আগে সরকারের ঠিক করে দেওয়া মজুরির চেয়ে অনেকটাই কম । এর জন্য সরকার বেশ মতলবি। মজুরি ঘণ্টা হিসেবে ধার্য করা হয়েছে । কিন্তু প্রশ্ন উঠল, অশিক্ষিত পিছিয়ে পড়া বেহারাদের কাছে ঘড়িও নেই আর তাঁরা ঘড়ি দেখতে পারে না । তাহলে ঘড়িটা থাকল আরোহীর হাতে। আর আরোহী যদি দেড় ঘণ্টা
পালকি চড়ে সময় কমিয়ে এক ঘণ্টার মজুরি দেন, তাহলে বেহারার আর কিছু বলার থাকে না । ব্যাস, আর যায় কোথায় পালকি বেহারারা ! তারা কাজ বন্ধ করে দিল। কার্যত অচল হয়ে গেল জনজীবন। কলকাতার ইতিহাসে প্রথম লেখা হল ‘ধর্মঘট’ শব্দটি ।

কিন্তু সরকার কেন এমন একটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিল ? এই কালা কানুনের জন্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি বাবুরা ধোঁয়াটি দিয়েছিল, তা কার্যত স্পষ্ট হয়ে যায় ১৮১৯-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘সমাচার দর্পণ’-এর একটি প্রতিবেদন । সেই প্রতিবেদনে লেখা হচ্ছে—‘হিসাব করিয়া নিশ্চয় জানা গিয়াছে যে উড়ে বেহারার প্রতি বৎসর কলিকাতা হইতে তিন লক্ষ টাকা আপন দেশে লইয়া যায় ও তাহার কিঞ্চিৎও ফিরাইয়া আনে না।’

এটি ভাবার কোনও কারণ নয় যে এটা বাংলা-উড়িষ্যার লড়াই । লড়াইটা আসলে ছিল উচ্চবর্ণের সঙ্গে নিম্নবর্ণের। নিম্নবর্ণ যদি কাজ করেও আয়ের দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে যায়, তাহলে তো উচ্চবর্ণের শোষণের যন্ত্রে মরচে পড়ে যাবে । সম্ভবত সে কারণেই পালকি বেহারাদের রোজগার নিয়ে এত মাতামাতি করেছিল তৎকালীন সংবাদপত্রও । তবে যাই হোক, বেহারাদের ধর্মঘট সেদিন মিলিয়ে দিয়েছিল বাংলা-উড়িষ্যার অন্ত্যজ শ্রেণিকে । বেহারাদের ধর্মঘটে সমর্থনের হাত বাড়িয়েছিলেন মাঝি-মাল্লা, গাড়োয়ান সহ তখনকার শ্রমজীবী মানুষ ।

তখন তো আর ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড ছিল না, ছিল ময়দান । ময়দানেই এক সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা । সেই সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন পাঁচু সুর । প্রধান বক্তা ছিলেন পাল্কি বেয়ারাদের নেতা গঙ্গাহরি। বক্তব্য রেখেছিলেন মাঝি মাল্লাদের নেতা তিনকড়ি । তবে শুধু সমাবেশ
নয়, ধর্মঘটের সে দিনগুলিতে আন্দোলনকারীরা এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। গণস্বাক্ষর গ্রহণ কর্মসূচিও ছিল। আর সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লালবাজারের সামনে বিক্ষোভ দেখান (আজকের দিনে যাকে বলা হয় লালবাজার অভিযান) । অবশ্যই উল্লেখ্য, লালবাজারের সামনে সেদিন কিন্তু বিক্ষোভকারীদের
সংখ্যাটা কয়েক হাজার ছিল ।

বাঈ নাচ, পাখির লড়াইয়ে মত্ত উচ্চবিত্ত বাঙালি অবশ্য সেদিনের এই আন্দোলনকে তেমন একটা আমল দিতে চায়নি । কিন্তু ব্রিটিশরা এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেখেছিল ভবিষ্যৎ। তাই আন্দোলনকে কড়া হাতে দমিয়ে দিতে চেয়েছিলেন । ইংরেজি সংবাদপত্রগুলিও গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়েছিল বেহারাদের আন্দোলনের খবর । পালকি বেহারাদের সেই আন্দোলন চলেছিল প্রায় একমাসেরও বেশি সময়। আন্দোলন করে প্রতিবাদের ভাষা জোরালো হয়েছিল ঠিকই, টলিয়ে দেওয়া গিয়েছিল একটা ব্যবস্থাকে, কিন্তু বেহারাদের অবস্থার উন্নতি খুব একটা হয়নি ।

এর মধ্যেই ঘটল একটা মজার ঘটনা—কলকাতার চলাফেরা বন্ধ করে দিয়েছে বেহারারা আর বেহারাদের আন্দোলনকে লাঠি দিয়ে দমাতে চাইছে প্রশাসন, দুপক্ষেই নিজেদের অবস্থানে অনড়। কিন্তু কলকাতা কীভাবে সচল হবে ? এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ব্রাউন লো নামে এক সাহেব সমস্যার পথ দেখালেন । তিনি পালকির দুপাশে দুটি চাকা লাগিয়ে সামনে একটি ঘোড়া জুড়ে দিলেন। ব্যাস, আবার কলকাতা চলতে শুরু করল—বাঙালি চলল পালকি গাড়িতে আর ইংরেজরা চলল ব্রাউনবেরি গাড়িতে
(সৃষ্টিকর্তার নামেই নাম হয় পালকি গাড়ির) ।

তাহলে এত কিছু করার পর বেহারারা কোথায় গেলেন ? পালকি ক্রমশ হারিয়ে যেতে লাগল কলকাতার বুক থেকে । বেহারাদের অবস্থা করুণ থেকে করুণতম হল। সে তথ্য দিয়েছেন রাজা রামমোহন রায়—‘কলকাতার ছুতোর ও কামার ইত্যাদির মধ্যে ভাল কারিগররা…মাসে ১০ টাকা থেকে
১২ টাকা মজুরি পায়…, সাধারণ কারিগর যারা একটু নিম্নমানের কাজ করে তারা মাসে ৫ থেকে ৬ টাকা মজুরি পায়…রাজমিস্ত্রিরা মাসে ৫ থেকে ৭ টাকা পেয়ে থাকে । সাধারণ শ্রমিকরা পায় মাসে সাড়ে ৩ টাকা থেকে ৪ টাকা, মালি বা জালকর্ষকরা পেয়ে থাকে মাসে ৪ টাকার মতো, আর পাল্কিবাহকেরা ওই রকম মজুরি পায় ।’

ব্রাউন লো সাহেব যথার্থই ভেবেছিলেন । কলকাতার গতি চলে গেল ঘোড়াদের নিয়ন্ত্রণে। মুখ বুজে ঘোড়ার টানে এগিয়ে যেতে থাকল কলকাতা । সত্যিই তো মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে, ঘোড়া তো আর বিদ্রোহী হবে না !

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.