রবীন্দ্রনাথকে নাকি হত্যার চক্রান্ত হয়েছিল!?

1928

চেনা কবি – অচেনা রবি ( ৮ )

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর দু বছর পর ১৯১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পিয়ার্সন ও মুকুলচন্দ্র দে’কে সঙ্গে নিয়ে জাপানি জাহাজ ‘কানাডা মারু’তে চাপলেন রবীন্দ্রনাথ। এই প্রথম প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছেন। সুদূর আমেরিকায় পৌঁছাতে কম করে দশ দিন লেগে যেতই। ওয়াশিংটন স্টেটের সিয়াটেলে ‘কানাডা মারু’ নোঙর করল ১৮ সেপ্টেম্বর। কবি আমেরিকার নানা শহরে প্রায় সাত মাস ধরে বক্তৃতা দিয়ে অর্থ উপার্জন করবেন। লক্ষ্য তাঁর সাধের বিশ্বভারতীর উন্নয়ন। স্থানীয় একটি লেকচার ব্যুরো, পন্ড লিসিয়ামের সঙ্গে কবি চুক্তি করেন সর্বমোট ৪০টি বক্তৃতা দেবেন এবং বক্তৃতা পিছু ৫০০ ডলার বা আনুমানিক ১৫০০ টাকা করে পাবেন। উদ্যোক্তাদের বলেছিলেন,
‘…তুমি যত বক্তৃতার ব্যবস্থা করিবে, আমি দিব।..যতই বক্তৃতা হইবে ততই আমার বিদ্যালয়ের জন্য টাকা হইবে।…’
চুক্তি অনুযায়ী সিয়াটেল শহরেই ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম বক্তৃতার ব্যবস্থা হল। বক্তৃতার বিষয় ছিল The Cult of Nationalism.
আমেরিকা পাড়ি দেবার আগে রবীন্দ্রনাথ জাপানে তিন মাস টানা ছিলেন, এবং সেখানকার উগ্র ও উদগ্র ন্যাশনালিজমের রূপ দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে আমেরিকা অভিমুখে জাহাজে যেতে যেতেই ন্যাশনালিজম সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। আমেরিকার বুকে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে বললেন,
“ন্যাশনালিজম অপদেবতা, ইহার পক্ষে নরবলি দিও না।”
কবির বক্তৃতা শুনতে ভিড় উপচে পড়ছে সভাগুলিতে। একটি চিঠিতে এমন জনসমাগম নিয়ে উৎফুল্ল হয়ে প্রাচ্যের ঋষিকবি লিখেছিলেন,
“…কখনো এমন লোকের ভিড় ওরা দেখেনি। জায়গার অভাবে লোক ফিরে ফিরে যাচ্চে। আমার বোধ হচ্চে ঠিক সময়েই বিধাতা আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।…”
এইভাবেই এক শহর থেকে আরেক শহরে কবি চলেছেন মহোৎসাহে। সিয়াটেল থেকে পোর্টল্যান্ড হয়ে ইউজিন শহর হয়ে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটের সানফ্রানসিসকো শহরে পৌঁছন ৩০ সেপ্টেম্বর। এখানে দিন কয়েক থাকার সময়েই কবিকে নিয়ে একটি অবাঞ্ছিত কুৎসিত বিক্ষোভ দেখা দিল। সেই ঘটনার কথা বিস্তারিত জানার আগে একটু ইতিহাসের পাতা দেখে নেওয়া যাক ।
১৯১৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় লালা হরদয়ালের নেতৃত্বে প্যাসিফিক কোস্ট হিন্দুস্থানি অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি বিপ্লবী দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । সেই সময়ে ব্রিটিশ শাসকদের হাত থেকে বিপ্লবী পন্থাকে কাজে লাগিয়ে দেশমুক্তির পরিকল্পনা নিয়েছিল জাতীয়তাবাদী কিছু প্রবাসী উগ্র-দেশপ্রেমিক । এই দলটি ‘গদর’ নামে একটি ঊর্দু পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকে এবং পরে দলটির নামও বদলে যায়, হয় ‘গদর পার্টি’ । ১৯১৬ সালে এই দলের নেতা ছিলেন জনৈক রামচন্দ্র । এই দলটি জাপান, জার্মানি দেশগুলিকে মিত্র দেশ বলেই স্বীকার করত। ওদের বিচারে দেশদুটি ছিল বন্ধুস্থানীয় । এদিকে ওই সময়ে আমেরিকার সভাগুলিতে রবীন্দ্রনাথ জাপানের জাতীয়তাবাদকে খুবই ধিক্কার দিচ্ছিলেন তাঁর লেখায়, বক্তৃতায় । প্রবাসী এই দলের সদস্যদের কবির সেসব মন্তব্য মোটেই পচ্ছন্দ ছিল না । তিনি যখন সানফ্রানসিসকো সফরের কথা জানান, তখন রামচন্দ্র মহাশয় স্থানীয় Call পত্রিকায় একটি পত্র লিখে প্রবাসের সমস্ত ভারতীয় বিপ্লবীদের কবির ভ্রমণের উদ্দেশ্যে সতর্ক করে দিলেন, এই বলে যে ‘The present trip to the United States is for other purpose than merely to deliver aesthetic lectures. One of his purpose is to place a check upon Hindu revolutionary propaganda….”
তাঁরা ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজমের বিরুদ্ধে বলা মানেই দেশের পরিপন্থী।
রবীন্দ্রনাথ সেই সফরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ভারত এখনও স্বায়ত্বশাসনের উপযুক্ত নয়। ব্যস্, আর যায় কোথায় ? রামচন্দ্র মহাশয় স্থানীয় Examiner পত্রিকায় লিখলেন এক বিশাল পত্র!! প্রশ্ন তুললেন,
“How did Tagore secure the Nobel Prize??”
অভিযোগের তির তুললেন তাঁর জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম নিয়েও!!
” Let us note further that Tagore’s literary works were largely written on half of the Nationalist cause. This activity was considered inimical to English ascendancy in India….”
আরো অভিযোগ করে বলেছেন,
” selling Tagore’s “humanity” for a few silver coins to the foreign oppressor…” ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানেই সেই রামচন্দ্র মহাশয় এবং তাঁর দলীয় সতীর্থরা থেমে থাকেননি । এরপর একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে!! স্টকটন শহর থেকে খালসা দিওয়ান সোসাইটির পক্ষ থেকে এক প্রবীন অধ্যাপক, বিষেণ সিং মাট্টু , দুই সতীর্থকে সঙ্গে নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে সানফ্রানসিসকোর হোটেলে আমন্ত্রণ জানাতে এলে প্যালেস হোটেলের সামনে জীবন সিং এবং সিং হোতেসি নামে দুই ব্যক্তি তাঁদের বাধা দেয়, বচসা হয়, ধাক্কাধাক্কি হয়!! তারা চায় না রবীন্দ্রনাথ স্টকটনে যান। আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তার করা হলে তারা রামচন্দ্রের কর্মচারী বলে পরিচয় দেয়!! এবং রামচন্দ্রের দেওয়া মাথা-পিছু কুড়ি ডলারের বিনিময়ে আততায়ী দুজনে জামিনে মুক্তি পায়!! এদিকে সারা বিশ্বে তখন খবর ছড়িয়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথকে হত্যার ষড়যন্ত্রের!! রামচন্দ্র মহাশয় বেগতিক দেখে কাগজে বিজ্ঞপ্তি দিতে বাধ্য হন,
“Sir Rabindranath Tagore is not and has not been since his arrival here in any danger of assassination by the Hindus of the Gadar Party!!”
এও বলেন,
“পথে মারামারির কারণ এই যে, আমরা চাইনি লোকটি এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমাদের একমাত্র আপত্তি এই যে ব্রিটিশের সম্মান ‘স্যর’ তাঁকে কিনে নিয়েছে। তাই তিনি ব্রিটিশ শাসনে ভারতের মঙ্গল হয়েছে প্রচার করছেন।…” খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে ১৯১৮ সালে এর দু’বছর পর এই রামচন্দ্রকেই নিজের দলের বিপ্লবীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছিল।
এরপর কবি আবার আমেরিকার নানা প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছিলেন। সান্তা বারবারা শহরে যাবার আগেই এইমর্মে স্থানীয় কাগজ Los Angeles Examiner. এ ৭ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরসহ একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়,
“…As for a plot to assassinate me, I have the fullest confidence in the sanity of my countrymen, and shall fulfill my engagements without the help of police protection…”

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.