গল্পভূত (শেষ অংশ)

(সমুদ্র, পাহাড় আর সুর্যাতপের দেশ কোরিয়া | স্বভাব কুশলী সে দেশের মানুষ | গায়ের রং মোমের মতো হলুদ | কোরিও ভাষা চিত্রকল্পে ভরা আর প্রাচীন | কোরিও লিপি যার নাম ‘হানজা’, তা আসলে চিনা বা জাপানির মতোই চিত্রসংকেত নির্মিত | জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সুক্ষ্ম শিল্পিত নির্মান কোরিয়দের জাতধর্ম | সরল অথচ লতাতন্তুময়! আর আমরা পড়তে চলেছি, অন্তত দু’হাজার বছরের পুরনো অবিশ্বাস্য একটি কোরিয় লোকগল্প |)

এতক্ষনে সুধীবৃন্দ সবাই জেনে গেছেন যে পাহাড় চূড়ার দেশের তাঈ চাচার হৃদয় ছিল খাঁটি ! বোধবুদ্ধি বিচারশোচ গোছানো পরিপাটি ! ঠিক সময়ে ঠিক ফন্দী মাথার ভেতর খেলত, বুঝেশুনে চট জলদি  মোক্ষম চাল ফেলত ! পাকদন্ডি ছেড়ে ঢালের পথে সাহস এবং তত্পরতার সাথে তাঈ চাচা তাই ছোটে ! তিনঘন্টার রাস্তা পেরোয় একঘন্টায় মোটে ! ছুটতে ছুটতে শরীর থেকে রক্ত ঝরে পড়ে , পথ চলতি নুড়ি এবং পিছল পাথর ঝোপ কাঁটাতে  হোঁচট খেয়ে ঠোক্করে ঠোক্করে ! বুকের হাপর ফুসফুসিয়ে উঠেছে প্রায় এমনসময় দেখতে পেল চাচা , পথের ধারে নামচি গ্রামের কাছে ডং চিনের চতুর্দোলা নামিয়ে রেখে বাহকরা সব এদিক ওদিক এঁকে বেঁকে বসে তাম্বাকু পান করতে লেগে গেছে ! ডং চিন নেই কোথাও আশেপাশে  ! দেখে আঁতকে ওঠে তাঈ চাচা সন্ত্রাসে ! জিজ্ঞেস করতে হেড বেয়ারা বলল  – “ডং খোকা তো একটু আগেই খাবার জলের খোঁজে গ্রামের ভেতর মিষ্টি জলের কুয়োর দিকে চলল !’’ লাফিয়ে ওঠে চাচা ! ঠিক যেরকম খাঁচার থেকে মুক্তি পেলে চিতা বনের দিকে ছোটে !

korea-rupkotha3নামচি গ্রামের মিষ্টি জলের প্রকান্ড সেই কুয়োর পাড়ে তখন বরবেশী ডং চিন মাথার টোপর খুলে কুয়োর থেকে আঁজলা ভরে জল নিয়েছে তুলে ! তেষ্টায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ , বোঝাই যাচ্ছে পথশ্রমে ডং চিন খুব ক্লান্ত ! কিন্তু তাঈ চাচার নিশানা ছিল আরো বেশি অভ্রান্ত !  দূর থেকে যেই ডং খোকাকে কুয়োর জল মুখে তুলতে দেখেছে  , অমনি তাঈ চাচা মাটির থেকে কুড়িয়ে নিয়ে নুড়ি এক টিপে তাই মেরেছে ডং চিনের হাতে ! আচমকা সেই আঘাতে ‘আব্বাহ’ ব’লে ডং চিন লাফিয়ে আঁতকে উঠল! হাত থেকে জল ছিটকে মাটির ওপর পড়ল ! পাত্র মিত্র আমলা সেপাই বডিগার্ড  সবাই তখন শিং উঁচিয়ে  তাঈ চাচাকে ধরল ! কিল ঘুষি চড় লাথি লাঠি কনুই গুঁতো গাট্টা কয়েকপ্রস্থ পড়ল ! এদিকে তাঈ চাচার পেটের ভেতর কথা বাষ্প হয়ে তখন ফুটছে, গল্প ভুতের বিপদখানা খোলসা করে বললে সবার চোখ কপালে গিয়ে উঠবে, চাচার আসল কেরামতিটা সবাই তখন হাড়ে হাড়ে বুঝবে ! কিন্তু বাপু সত্যি কথা হল, সেই আদিম কাল থেকে এই ভুবনের যেখানে হোক কারবার , দুবলা লোকের চামড়ায় ঢাক পেটাতে এবং হাতের সুখ মেটাতে সব বাবুরই মনের ভিতর গুবরে পোকা কামড়ায় ! তাছাড়া, গল্প ভুতের আজগুবি সব কিস্যা আজব সেই সত্যি কেইবা তখন করতে যাবে বিশ্বাস ! জেরার মুখে তাঈ চাচা তাই ফেলল একটা গভীর শুধু নিঃশ্বাস !

“ক’দিন ধরে দিনরাত্রি চব্য চোষ্য গিলে বায়ু উঠেছে মাথায়, নইলে বিয়ের দিনে মনিবকে কেউ এমনি করে খেপায় !” বলল ডং চিনের আব্বাহ ,  “এক্ষুনি এই লপ্তে দেশে ফিরে যাও সরকার, তোমার মত পাগল ছাগল কক্ষনো নেই দরকার!’’ তাঈ আঙ্কল চোখটি মুদে ডং চিনের পা জড়িয়ে ধরল , ফিসফিসিয়ে শুধু একটা কথাই বারংবার বলল – “খোকাবাবু, মাস্টার ! সামনে তোমার ভীষন বিপদ আসছে , হয়তো কোনো উপকারে লাগতে পারি আমি , মাইরি বলছি জানেন অন্তর্যামী!”

যদিও ডং চিন আসলে বড়লোকেরই  পোলা তবুও তার বয়স কিনা অল্প তাই বোধহয় তেনার মনের ভেতর একটুখানি দোলা লাগল , তাঈ চাচার করুন আর্তি দেখে ! তাঈ চাচাকে সঙ্গে নিল খোকা ! এবং সেই দৃশ্য দেখে সবাই ধন্য ধন্য করল মহান ডং চিনের , সবাই যে ঠিক কত রকম ভাষায় তার গুনের কথা ফলাও করে বলল , সবটা গুনে লিখে রাখার আগেই নামচি থেকে ডং চিন বেরিয়ে পড়ল কনের বাড়ির রাস্তায় ! চলতে চলতে পথ যেন আজ হচ্ছেনা আর শেষ , সাতটা পাহাড় পেরিয়ে শেষে কনের বাড়ির নাগাল পেতে সন্ধে হল বেশ !

korea-rupkotha2সানাই–ভেঁপু, আলোর মালা, খানাপিনা, বরণডালা ! গন্ধে বর্ণে শব্দে ঘ্রাণে উত্সবে আর আপ্যায়নে রাখেনি কোনো কসুর , সদর দ্বারে দাড়িয়ে আছেন স্বয়ং ডং চিনের হবু শ্বশুর ! “বাবাজীবন ,মধু মাধ্বী কর সেবন !” – নিয়মমত ডং চিনকে বরণ করল কনের মাসি কাকিমা ! রেশমি সাদা জাজিম পাতা , তার ওপরে রঙিন ফুলের পাপড়ি বিছানো পথ , পা বাড়িয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতে যাবে বরের সাজে ডং চিন , এমন সময় পেছন থেকে কেউ তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল ! গলাটা তাঈ চাচার , মরিয়া এবং নাচার ! সবাই এমন অবাক হল, যেন রাগ করতেও ভুলেছে ! বেচারী  হবু শ্বশুর ভয়ে চোখ কপালে তুলেছে ! এবং অবাক হবার তখনো ছিল অনেক বাকি ! তাঈ চাচা যে এমন বেয়াক্কেলে কান্ড করে বসবে কেউ ভেবেছে তা কি ! একধাক্কায় লোক সরিয়ে ততক্ষনে ডং চিনের পাশে এসে দাড়িয়েছে তাঈ চাচা ! এবং পরক্ষনেই জাজিম সমেত পথের ওপর বিছানো গালচে হ্যাঁচকা টানে উল্টে হুলুস্থুলু বাধিয়ে দিল ! তাঈ আঙ্কেল বলল, “ইস! জাজিম তো নয় যেন আস্তাবলের পাপোষ , ডং চিনের সঙ্গে কিনা এমন ব্যবহার ! দেখে প্রচন্ড  আফশোষ হচ্ছে !”        অনেক কষ্টে রাগ সামলালো ডং চিন ! এবং মুখে অপ্রস্তুতের ক্ষীন হাসি টেনে উল্টোনো সেই জাজিমটাকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল !

বাঁশের তৈরি সুরেলা এক ভেঁপুর আওয়াজ হচ্ছিল , মন্ত্র তন্ত্র যত্সামান্য ছিল এবং যত মান্যগন্য সবাই হাসিখুশি ভিড় জমিয়ে দেখল ! ডং চিন এবং তার পাহাড়ি রাজকন্যের বিয়ে রেওয়াজ মত সাড়ম্বরে চুকল ! মস্ত খানাপিনা, গানবাজনার শেষে ডং খোকা আর কন্যে বাসরঘরে ঢুকল প্রেমের জন্যে ! ফুলের বাগান, নীচু জলের ধারে নীরবতায় গড়া সে ঘর, অপূর্ব এক নিরালায় ! মৃদু আলোর ফানুস জ্বলা , দুটো নতুন শরীর খেলার আয়োজন !

সবে দু’জন একটা দুটো কথায় ভাঙছে আগল, ভাঙছে নীরবতা ! কন্যে খুলে রাখছে ফুলসাজ ,আস্তে খুলে ফেলবে সব লাজ লজ্জা ওরা দু’জনে ! তাড়া কিসের , গা এলিয়ে পালঙ্কে  বসেছে ডং চিন ! এমন সময় হা রে রে রে রে রে ! লাফিয়ে ঘরে ঢুকল তাঈ চাচা ! হাতে খোলা ছুড়ি ! আমূল চমকে  উঠল দুইজনে, ভয়ে কাঁপছে ! খাটের ওপর লাফিয়ে উঠল চাচা এবং ডং চীনের ঠিক মাথার পেছনে  গাঁথল  ছুড়ি …আবার… আবার …বালিশ ফালা ফালা ! রক্ত উঠল ছিটকে  !  পরক্ষনেই তাঈ চাচা  জ্ঞান হারিয়ে লটকে পড়ে গেল  ! অবাক হতভম্ব ডং চিন এবার উঠল , এবং বালিশ সরিয়ে যা দেখল তাতে পিলে চমকে  যাবার জোগাড় ! তাঈ চাচার ছুরির কোপে ছিন্নভিন্ন কাল কেউটে সাপের রক্তমাখা শরীর! ততক্ষনে রাজকন্যের চিত্কারের চোটে  ভিড় জমেছে! এবং ডং চিনের এতক্ষনে মনে পড়ল ছোট্ট থেকে তাঈ আঙ্কেল তাকে কতটা ভালোবেসেছে !

korea-rupkotha1পরে যখন বউকে নিয়ে ডং চিন নিজের ঘরে ফিরবে , সময় করে নিশ্চয়ই তাঈ চাচা তাদের গল্পভুতের চক্রান্ত সবিস্তারে বলবে, এবং শুনতে শুনতে কৃতজ্ঞতায় তখন ডং খোকার চোখে অশ্রুনদী হড়পা বাণের মত দূড়দাড়িয়ে গলবে ! কিন্তু আপাতত এ ব্যাপারে পরিষ্কার একটা বোঝাপড়া দরকার যে গল্প হল নদীর মত ! শহর গ্রাম বন্দর একাল সেকাল পেরিয়ে মনের থেকে অন্য মনে অনন্ত তার যাত্রা ! বাঁধ লাগিয়ে সিন্ধুকেতে বন্ধ করে রাখলে ভুতের বোঝা মনের ভেতর পচে ! জ্যান্ত গল্প চলতে চলতে নতুন হয়ে বাঁচে!

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/galpobhoot-a-fascinating-korean-folk-tale/

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.