আকাশপথে ঝুলন্ত দড়ি বা সাঁতরে নদী পেরিয়েই প্রাণ হাতে স্কুলে যাওয়াই যখন দস্তুর

119

বাবা-মা’য়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়া নয়, বা আরামদায়ক পুল কার-এ বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে করতে যাওয়াও নয়, এই বিশ্বে শুধুমাত্র পড়াশোনা করবে বলে রীতিমতো প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যায় পড়ুয়ারা। এই প্রতিবেদনে রইল, সেইসব দুর্গম জায়গার কথা, পড়াশোনার জন্য যেসব ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা অতিক্রম করতে হয় পড়ুয়াদের।

* লেবাক, ইন্দোনেশিয়া- সাইবেরাং নদীর গতিপথের কারণে লেবাক এলাকার বাসিন্দারা ইন্দোনেশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই সেখানকার স্কুল পড়ুয়াদের অতিক্রম করতে হয় একটি ঝুলন্ত কাঠের সেতু, যা একেবারেই ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। খরস্রোতা নদীর ওপর হওয়ায়, প্রশাসনের পক্ষে এই সেতু সারানোও সম্ভব নয়। প্রতিদিন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পরিত্যক্ত এই সেতু পারাপার করে চলেছে সেখানকার পড়ুয়ারা। যদিও এই সেতু ছাড়াও অন্য পথ রয়েছে। কিন্তু তা অপেক্ষাকৃত দূর হওয়ায় অনেকখানি রাস্তা পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয়।

* পিলি, চিন- চিনের পিলি এলাকায় গ্রামের সব বাচ্চারাই থাকে বোর্ডিং-এ। গ্রাম থেকে বোর্ডিং-এ যাওয়ার পথ অত্যন্ত দুর্গম। বেশিররভাগ রাস্তাই উঁচু পাহাড়ের ঢাল কেটে বানানো হয়েছে। পাহাড়ের গা কেটে বানানো রাস্তা এতটাই দুর্গম যে, রীতিমতো প্রাণ হাতে করে নিয়ে যায় পড়ুয়ারা। বিপদসংকুল এই পথে কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেই। কেবলমাত্র পড়াশোনার তাড়নায় জীবনকে বাজি রেখেই প্রতিনিয়ত চলে এই ভয়ের পারাপার।

* মিনহোয়া, ভিয়েতনাম- ভিয়েতনামে মিনহোয়া নামের একটি গ্রামের পড়ুয়াদের স্কুলে যাওয়ার জন্য পার হতে হয় প্রায় কুড়ি মিটার গভীর নদীপথ। এই নদীপথ সাঁতরে পৌঁছতে হয় স্কুলে। বই-খাতা এবং স্কুল ইউনিফর্ম যাতে জলে ভিজে না যায়, সেজন্য সেগুলি প্লাসটিকের প্যাকেটে মুড়িয়ে নিয়ে সাঁতার কাটে তারা। বিষয়টা আশ্চর্যের মনে হলেও, তাদের কাছে বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক।

* ঝাং যিওয়ান, দক্ষিণ চিন- জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি সরু বাঁশের মই বেয়ে প্রায় ১০০০ মিটার উঁচু পাহাড় পেরিয়ে স্কুল যেতে হয় দক্ষিণ চিনের ঝাং যিওয়ান প্রদেশের স্কুল পড়ুয়াদের। এইভাবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পঠন-পাঠন চললেও তাদের এই ঝুঁকির পারাপারে নেই কোনওরকমক নিরাপত্তা। একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই ঘটে যেতে পারে মারাত্মক বিপদ।

* ম্যানিলা, ফিলিপাইন্স- ফিলিপাইন্সের ম্যানিলাতে পড়ুয়াদের স্কুলে যাওয়ার পথে একটি নদী রয়েছে। সেখানে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে নেই কোনও নৌকো। তাই চলাচলের মাধ্যম হিসেবে তারা ব্যবহার করে টায়ার। ছোট ছোট শিশুরা টায়ার জলে ভাসিয়ে তাতেই রওনা দেয় স্কুলে । তবে এই পারাপার যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। এইভাবে পারাপার করতে গিয়ে বহু শিশু দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। যাতায়াতের মাধ্যম এতটাই কঠিন যে, এখানকার ছেলেমেয়েরা না চাইতেও পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

* কিলাংক্যাপ, ইন্দোনেশিয়া- ইন্দোনেশিয়ার কিলাংক্যাপ গ্রামের চিহেরাং নদীর ওপর একটি ব্রিজ ছিল। সেটাই ছিল ওই এলাকার যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। ২০১৩ সালে ব্রিজটি আচমকা ভেঙে পড়লেও ইন্দোনেশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে তা মেরামতের কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। আর সেই কারণে, একটি কাঠের পাটাতনের ওপর ভর করেই সেখানকার পড়ুয়ারা স্কুলে যায়। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ভয়ে মাথায় নিয়ে এইভাবে ঝুঁকির রাস্তা পারাপার করে এখানকার স্কুল পড়ুয়ারা।

* রিও নেগরো নদী, কলম্বিয়া- নদীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছতে এখানকার স্কুল পড়ুয়ারা আকাশপথে ঝুলন্ত দড়ির সাহায্যে পারাপার করে। এমন দৃশ্য রূপোলি পর্দায় বিস্তর দেখতে পাওয়া যায়। বাকিদের জন্য এই পারাপার রোমাঞ্চকর বলে মনে হলেও আদতে এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর ৪০০ মিটার উচ্চতায় ৮০০ মিটার বিস্তৃত ঝুলন্ত কেবলের সাহায্যে নিত্যদিন পারাপার করে এখানকার পড়ুয়ারা। তাদের একহাতে থাকে বইয়ের ব্যাগ এবং অন্য হাতে থাকে একটি কাঠের খাঁজ কাটা বস্তু যার সাহায্যে দড়ির ওপর দিয়ে চলাচলের সময়ে গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

* গল ফোর্ট, শ্রীলঙ্কা- শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যমন্ডিত গলে ফোর্ট-এর দেওয়ালের ওপর কাঠের তক্তা রেখে ঝুঁকির পারাপার করে স্কুল পড়ুয়ারা। ষোড়শ শতকের এই দুর্গের দেওয়াল খুব একটা পোক্ত নয়। তাও পড়াশোনার তাড়নায় চলে এইরকম ঝুঁকির পারাপার।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.