অফার জোয়ারে অকূল পাথারে

পাঁজিতে নাই বা রইল, তবু পাব্বন বলাই যায়। মাস- ভর অফার, বত্রিশের বাহার, ব্যাগঠাসা সস্তাসম্ভার – পাব্বন হতে গেলে আর কী ই বা লাগে? চৈত্র-সেল না বলে দিব্যি বলা যায় “সেল-পাব্বন”। ঝুকি একটু আছে বটে তবে অফারের মহিমায় সেসব কেউ তেমন গায়ে মাখে না। বেগুন-পোড়া গরম, দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ, মুষ্টি-যুদ্ধ, ঠেলাঠেলি, চুলোচুলির মত ঝুঁকিকে ট্যাঁকে গুঁজে পথে নেমে আসেন খেঁদির মা, মৌ এর মাসি, এমনকি পটাই, জটাই এর হাত ধরে তাদের ঠাকুমা দিদিমারাও। পায়ে ব্যস্ততা, চোখে “হায়রে ফস্কে গেল” মার্কা উদ্বেগ। হাতিবাগান, গড়িয়াহাটের মত সেল-সেন্টার গুলো মাস খানেকের জন্য চলে যায় অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় নারী বাহিনীর দখলে।

তবে না, একচেটিয়া মহিলা-পাব্বন অবশ্য বলা যাবে না। ঢাকির পিছনে ঢুলির মত গিন্নীর আঁচল ধরে কিছু গৃহকর্তাও আসেন। কিন্তু তাদের “পায়ে পায়ে আনন্দ” যেন সেভাবে ফোটে না। গিন্নীর চোখে হাতিবাগান গ্রাসের আগ্রাসী নেশা দেখে আখেরির মাসে আঁতকে ওঠেন হিসেবী গৃহকর্তা। প্রতিবাদীর ভুমিকা অবশ্য নিতে পারেন না। কবিগুরুর লাইন ধার করে মিন মিন করে বলে ওঠেন ” প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস/ তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।”

মল সংস্কৃতি এসে অবশ্য ভাগ বসিয়েছে চৈত্রের সেই দাদাগিরিতে। মলে মলে বছরভর সেল। “গিরগিটি সেল” বলা যেতেই পারে, কেননা ফি ঘণ্টায় অফারের ভোলবদল। ঘোষকের গালভরা ঘোষণা – “আর মাত্র পাঁচ মিনিট, তিন টের দামে পেয়ে যান চারটে বেবি স্যুট।” ক্রেতার হাবভাবে কিন্তু সেই চৈত্রের তৎপরতা। বেবির আগমনে ঢের দেরী আছে জেনেও নবদম্পতি পর্যন্ত হোঁচট খেয়ে ছুটছেন বেবি স্যুটের অফার ধরতে। ফস্কে যাওয়ার সেই উদ্বেগ আজও যেন চোখে মুখে।

সেদিন অফার মিস করা এক প্রতিবেশীর আক্ষেপের সাক্ষী হলাম নিজে। কলকাতার এক নামকরা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে মুখ লটকে বসে থাকতে দেখলাম পাড়ার সত্য দাকে।
এগিয়ে গিয়ে বললাম, “কি ব্যাপার সত্যদা, এখানে বসে?

-আর বোলো না ভাই, মাত্র হাফ মিনিট লেট করার জন্য কি আক্কেল সেলামীটাই না দিতে হচ্ছে আমাকে। এসেছি ইলেভেনথ আওয়ারে। স্টোরের দরজা খুলে ঢোকা মাত্রই আগের সেল এর সময় শেষ হয়ে গেল।
– সেল মিস করলেন? কিসের সেল?
-মগের সেল – দু টোয় দুটো ফ্রি দিচ্ছিল। এখন চলছে পাপোষের সেল। কখন আবার মগ আসে সেই অপেক্ষায় বসে আছি।
মলে “মগের মুলুক” আসার অপেক্ষায় মুখিয়ে রইলেন সত্যদা। মগ না পেয়ে শেষ মেস পাপোষের সাথেই আপোষ করে বাড়ি ফিরবেন কিনা কে জানে।

সেকালে মল না থাকলেও, অফার ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই কিন্তু বেশ ছিল। চোখ বুজে ছোট বেলাকে একবার ভেবে নিন। ফুচকা ওয়ালার কাছে প্রথম প্রশ্নটাই থাকত, “টাকায় ফ্রি কটা?”। এই অফারের দৌলতে ফুচকাওয়ালার সাথে সেকালের নাইন টেন ইলেভেনের লিলি মিলি পলিদের একটা অদ্ভুত সম্পর্কের সমীকরণ দেখা যেত। এখনো মনে পড়ে ইস্কুলের গেটে দাঁড়ানো সদ্য গোঁফ ওঠা কিশোর ফুচকাওয়ালাকে। টিফিনের সময় ইস্কুলের স্বনামধন্য সুন্দরীদের সাথে তার দুষ্টু মিষ্টি রসালাপ জ্বালা ধরাত অনেক রোমিওর প্রানে। গুজবে প্রকাশ, টাকায় দুটো ফ্রি পেত ডাকসাইটে সুন্দরী মধুমিতা। মধুর গুণগ্রাহী শিবু তো প্রায়ই শোনাত, ” শালা এই ফুচকাওয়ালাকে একদিন গুছিয়ে পেদাতে হবে। শালা ফুচকা ফ্রি দিয়ে আমাদের মার্কেটে একেবারে ধ্বস নামিয়ে দেবে দেখছি”

একটু বড় হয়ে যখন বাজারে পা রাখলাম, সেখানে দেখলাম ক্যাশ-ব্যাক অফারের জন্য আপ্রান লড়াই। আর্গুমেন্টের দাপটে অনেক ঝানু ক্রেতাই ক্যাবলা করে দিতেন সবজি বিক্রেতাকে। বলে উঠতেন, “বলিস কিরে, এই ঢ্যাঁড়শ পঞ্চাশ ? মামদোবাজি নাকি? তাও দেশী হত বুঝতাম, বেচছিস তো হাইব্রিড মাল। নালিকুলে তো কুড়ি করে ঢেলে বিকোচ্ছে। ভাঙড়ে আরও কম। আর তুই হাকছিস পঞ্চাশ? দিনে দুপুরে গলা কাটবি নাকি?” লড়াইয়ে লাভ যে কতটা হত তা দেখতে পেতাম হাতেহাতে। ব্যাজার মুখে বাজারদরে ভাটা ফেলতেন বিক্রেতা। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা ম্যাজিক ঘটে যেত। সেই ঝানু ক্রেতা তো বটেই, আশপাশের আরো কিছু ভুঁইফোঁড় সস্তা শিকারির দল নিমেষে হামলে পড়তেন মালের ওপর। বেশ কয়েক ডজন ফিঙ্গার এগিয়ে এসে লেডিস-ফিঙ্গার ধরে নির্বিচারে টান মারত। তবে না, শ্লীলতাহানির অভিযোগ আসত না। গন বিবাহের কায়দায় লেডিস ফিঙ্গার হাতিয়ে সানন্দে বাড়ী ফিরতেন জোয়ান থেকে বৃদ্ধ সকলেই।

সবজি বাজারের খেলা বিয়ের বাজারেও। কমন ফ্যাক্টর হল সেই অফার। সেকালে রাজকন্যার সাথে ফ্রি থাকত অর্ধেক রাজত্ব। একালে রাজকন্যারা উধাও হলেও অফার কিন্তু বেঁচে আছে। “খাট, বিছানা, ড্রেসিং টেবিল” হল “কমন মিনিমাম অফার”। অফার-লোভী আইবুড়ো খোকারা আছেন লাখে লাখে। এদের দুর্দশা নিয়ে “রহেনে কো ঘর নেহি, শোনে কো বিস্তর নেহি” গান লেখা হয় না কেন কে জানে। তবে একালে অফারের গল্প শুধু এক তরফা নয়। পাত্রীর বাবা মা এর মত অফারের ঝুলি দোলান শাঁসালো পাত্ররাও। আর অনেক ছলনাময়ী তাদের পানসে প্রেমের বলি চড়িয়ে দিব্যি ভেসে যান সে রসালো অফার জোয়ারে। বোতল খুলে দুঃখ ভোলেন দাড়িমুখো ভ্যাবলা দেবদাস। ভাগ্যিস বেঁচে নেই কবিগুরু, নয়ত তাকে লিখতে হত, “অফার জোয়ারে ভাসাবে দোহারে………।”

তবে শুধুই কি প্রেমিক যুগল? সমাজবন্ধুদেরই বা কি দশা? কত অকথা কুকথাই তো ভেসে আসে তাদের নামে। শুনতে পাই ছাত্রকে দেওয়া ইস্কুল শিক্ষকের অ-সামান্য অফার- “হাফ ইয়ারলির রেজাল্টের তো এই দুর্দশা! অ্যানুয়ালে নির্ঘাত ধ্যাড়াবি! শ পাঁচেক অ্যাডভান্স দিয়ে আমার কোচিং ক্লাসে এখনি ভর্তি হয়ে যা। পাশ ফেল নিয়ে আর ভাবতে হবে না।” একই সুরে ক্রিমিন্যালকে দারোগা বাবু বলে ওঠেন, ” লাখ দশেক ছাড়ুন, কেস তুলোর মত হালকা হয়ে যাবে।” ডাক্তারবাবুরাও অফার দেন বৈকি! তাদের অফারের পোশাকি নাম প্যাকেজ। নিঃসন্তান এক দম্পতিকে স্পেশ্যাল প্যাকেজ হেঁকে এক ডাক্তারবাবু বললেন, “গর্ভ ভাড়া নিচ্ছেন যখন, তখন জমজ সন্তান নিচ্ছেন না কেন? একই খরচায় যখন জোড়া সন্তান পাবেন তখন সিঙ্গেলের জন্য আব্দারটা বোকামি ছাড়া আর কী?” বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি’র কথা শুনে চিন্তায় পড়ে যান নিঃসন্তান দম্পতি। “সিঙ্গেল বেব না টুইন?” – কোনটা ভালো অফার? – সে তো রীতিমতো গবেষণার বিষয়।

অফার হাতিয়ে যেমন সুখ, অফার হারিয়ে তেমনি আক্ষেপ। রোগজর্জর এক বৃদ্ধ সেদিন বললেন, “ইস কি আপসোসটাই না হচ্ছে! মোটে নশো টাকায় পঞ্চাশ রকমের ব্লাড টেস্টের কী ফ্যান্টাস্টিক অফার! এদিকে ডাক্তারবাবু কী যে সব আগডুম বাগডুম টেস্ট লিখেছেন কে জানে! অফারের টেস্টের সাথে মিলছে কই!” খবরের কাগজ উল্টে চোখে পড়ল এক হিরোইনের আক্ষেপের কথা। সন্তানসম্ভবা হবার পরে এক ফিল্মে নায়িকা হওয়ার অফার ছেড়ে দেওয়ার কারনে তিনি নাকি ডিপ-ডিপ্রেশনে ডুবে গিয়েছিলেন। সদ্য ছানি কাটানো বৃদ্ধ দিনপ্রতি তিন জি বি ইন্টারনেটের অফার মিস করে আহা উহু করছেন – এ আমার নিজের চোখে দেখা। ঐ ঝুনো বয়সে দিনপ্রতি তিন জি ‌বি কোন কাজে লাগে, হিসেব পাইনা। ধাক্কা লেগেছিল এক যুবকের আপশোষের পরিণতি জেনে। একলাখি ন্যানো কেনার অফার মিস করেছিলেন সেই যুবক। পরে “শোনা গেল, লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে……।”

অফারের এক ভয়ানক নমুনা দেখেছিলাম “যমালয়ে জীবন্ত মানুষ” ছবিতে। সেখানে যমরাজের দরবারে বিচারপ্রাথী হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁকর-মনি চালের বিক্রেতা। যমরাজ রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, “ছি ছি, চালে হাফ কাঁকর। এ তো নরাধম।” তিনি যখন চাল বিক্রেতার জন্য কঠিন শাস্তির কথা ভাবছেন, ঠিক তখনি চিত্রগুপ্ত ,মানে যমরাজের অ্যাসিস্ট্যান্টকে, ইশারায় অফার দিলেন কাঁকর মনি চালের বিক্রেতা। আর নিমেষের মধ্যে চিত্রগুপ্তের কারসাজিতে পাপের দায় অর্ধেক হয়ে গেল। চিত্রগুপ্ত বলে উঠলেন, “কাঁকর যখন অর্ধেক, তখন পাপও অর্ধেক।” মনে মনে ভাবি, বিচারকেরাও যদি অফারের স্বাদ নিতে নামেন, তাহলে কোন ছাতার তলায় ঠাই হবে আমাদের?

“জুড়াইতে চায়, কোথায় জুড়ায়” – গাইতে গাইতে চোখ রাখি ইন্টারনেটে। সেখানে চোখে পড়ে অনলাইন শপিংয়ের বছরভর ২৪x৭ এর অফার আর সাথে বিজ্ঞাপন ” spend more to save more।” “বেশি খরচে বেশি সাশ্রয়? – এপিগ্রামের গুঁতোয় গুরু মস্তিষ্কে যেন গুরুতর বিপর্যয় ঘটে যায়। অবচেতনে টের পাই এক অদ্ভুত মায়াপুরী গড়ে উঠছে আমাদের চারপাশে, গড়ে উঠছে চির চৈত্রের দেশ। সেখানে অফারের জাদু কাঠিতে জেগে উঠছে ভেতরের চাহিদা-দানব। আর তার লোলুপ চাহিদায় সেলের পণ্য হয়ে উঠছে প্রেম, ভালোবাসা, সমাজ, সংসার। মাতৃভুমিকে সেলের র‍্যাম্পে তুলে কত শত কু-সন্তানেরা মজা লুটে গেল – তার সাক্ষী হয়ে আছে বিবর্ণ ইতিহাস। বর্তমানেই বা আলো কই? দেশ বিকোচ্ছে দল-দাসদের হাতে। ঘৃণ্য কোন অফারের টোপে সরকার ভাঙছে, গড়ছে – তা আর কে না জানে? কিন্তু তোমার, আমার – আমাদেরই বা কী দশা? বুকে হাত রেখে কে বলবে অফারের কাছে বিকোইনি, বিকোব না? দুঃখের মুহূর্তে মনে আসে এই বাংলার এক গায়কের জীবনমুখী গান – সবাই পণ্য সেজে/ কাকে কিনবে কে যে/ গোটা দেশ জুড়ে সোনাগাছি,/কেন বেঁচে আছি , বলো কেন বেঁচে আছি?”

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়
জন্ম ১৯৭৩ সালে | বাঁকুড়া খ্রিশ্চান কলেজ থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতক | স্নাতকোত্তর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে | পড়াশুনা শেষে সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা | সাহিত্যের প্রতো ভালোবাসা ছেলেবেলা থেকেই | সাহিত্য পাঠের আনন্দই মৌলিক লেখালেখির অনুপ্রেরণা | আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত গল্প 'সন্ধি' |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here