কস্টের কাটিং আর কাটিংয়ের কষ্ট

কলকাতার একটি নামজাদা বিজ্ঞাপন সংস্থা প্রতি বছর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সময় হলেই তাদের কর্মচারীদের একটি নোটিশ ধরায়। তাতে লেখা থাকে, ‘আমরা এক অভূতপূর্ব আর্থিক সমস্যার মধ্যে রয়েছি। তাই গত বছরের মতো এ বছরও আপনাদের বেতন বৃদ্ধিতে আমরা অপারগ। আমাদের অক্ষমতা ক্ষমা করবেন। মনে রাখবেন, আপনারাই আমাদের ইঁট-পাথর-সুরকি। পাশে থাকবেন, সুহৃদ।’ এহেন নোটিশ পরপর তিন বছর পাওয়ার পর জনৈক কর্মী এইচ আর দপ্তরে গিয়ে সটান প্রশ্ন করেছিলেন, ‘একশ টাকা বেশি দিলেই লেবার পরে রাগ কর, তোমরা যে সব শ্রিউড খোকা, খেলার টিমে বিড কর। তার বেলা?’ তখন একটি দেশ কাঁপানো টুর্নামেন্ট চলছিল। বিজ্ঞাপন সংস্থাটি এক টিমের কো-স্পনসরও হয়েছিল। এইচ আর চোখ রাঙানোয় সেই হতভাগ্য কনটেন্ট রাইটারের চাকরিটি খোয়া যায়। আর তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোষ্ট করেছিলেন—কস্ট কাটিং হয়, কষ্ট কাটিং হয় না।

কস্ট কাটিং—এই দুটো শব্দের বাজার খুব গরম আজকাল। আরও একটু ভাল ভাবে বলতে গেলে, শব্দদুটো বহুলচর্চিত। কোম্পানি ছোট মাঝারি বড় যাই হোক না কেন, সদ্য চাকরিতে ঢোকা অরুণ-বরুণ-তরুণদলও কয়েক মাসের মধ্যেই এই দুটো শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায়। মুশকিলটা হল, আজকের দিনে কোনও কোম্পানিই বলে না—এই বেশ ভাল আছি। সবাই বলে খরচা কমাতে হবে। আর কস্ট কাটিংয়ের অন্যতম হাতিয়ার হল লোক ছেঁটে ফেলা। ভাবটা যেন ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরী। কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনামের মতো এইচ আর ম্যানেজাররা এই দুটো শব্দের মাথায় হাত বুলিয়ে বিভিন্ন নামে ডেকে থাকেন। নামগুলো শুনতে বেশ মিষ্টি। ডাউনসাইজিং, স্লিমসাইজিং, ট্রিমিং, স্মার্টসাইজিং ইত্যাদি ইত্যাদি।

ছাঁটাই হল অন্তিম স্টেশনের মতো, অনুগ্রহ করে গাড়ির কামরা ফাঁকা করে দিন। তবে কস্টে যখন কাটিং কাটিং গন্ধ লাগতে শুরু করে, সেই সময়টা ভয়ঙ্কর সুন্দর। পুরো কোম্পানিতেই তখন এক রকম ‘খরচা বাঁচাই খরচা বাঁচাই’ ভাব। বেশিরভাগ সময়েই এই দায়িত্ব দেওয়া হয় ঘাঘু কোনও এইচ আর ম্যানেজারের উপর। আরশোলা যেমন সামনের দুটো শুঁড় দিয়ে চারপাশের অনেক কিছুই মাপতে পারে, এইচ আর ম্যানেজাররাও এমন আদেশ পেলে শরীরে এমন দুটো অদৃশ্য শুঁড়ের জন্ম দিয়ে মাপামাপির কাজটা শুরু করে দেন। ‘আমরা ছাড়া অপ্রয়োজনীয় সব্বাই’, শ্লোকের মতো এটা জপতে জপতে তাঁরা কাজে হাত দেন! তাঁদের রাগ যে কার বা কিসের উপর গিয়ে পড়বে তা দেবা ন জানন্তি। সেক্টর ফাইভে কর্মরত আমার এক বন্ধু বলেছিল, সন্ধে সাতটা বেজে লেগেই তাঁদের অফিসে নেমে আসে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। এইচ আর নাকি অঙ্ক কষে দেখেছে, আরও ঘণ্টাদুয়েক আলো জ্বালিয়ে কাজ করালে যা পয়সা রোজগার হবে, অফিস চালালে ইলেকট্রিকের খরচা নাকি তার চেয়ে বেশি। কারণ, প্রোজেক্ট বাড়ন্ত। কেউ সাতটার মধ্যে তার কর্মযজ্ঞে ওই দিনের পাপক্ষয় শেষ না করতে পারলে অ্যাডমিনের পারমিশন নিতে হয়। তখন জ্বলে শুধু তার মাথার উপরের এলইডি লাইটটি। বন্ধুটা বলছিল, এমন ঘটনা দূর থেকে দেখলে মনে হবে মঞ্চে কোনও নাটকের ক্লাইম্যাক্স হচ্ছে বুঝি। হলে তবু এসি চলে। ওই অফিসে সাতটার পর আলোর সঙ্গে এসিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে ভুঁড়ি না থাকলে মাথার ঘাম সত্যিই পায়ে পড়ে।

এক এক কোম্পানি এক এক সুরে বাজে। বাজে করুণ সুরে। দুর্দিনে কেউ খাতা খোলে বাথরুম দিয়ে। রেচনের বিলাসিতা উড়িয়ে দিয়ে কোম্পানির ভাঁড়ারে যতটুকু ক্যাশ সেচন করা যায় আর কি। যে ওয়াশরুমে বেসিনের পাশে রাখা থাকত হ্যান্ড স্যানিটাইজার, কমোডের পাশে দুলকি চালে নেচে বেড়াত পেপার রোল, হাত ধোয়া কিংবা নাক ঝাড়ার পরেই সাহেবের মতো মেশিন থেকে টকাস করে টেনে নেওয়া যেত টিস্যু পেপার, কস্ট কাটিং শুরু হওয়ার পরে সেখানেই শোভা পায় পাঁচ টাকার লাল সাবান। টিস্যু মেশিনের হাতল থেকে ঝুলে থাকে রসমালাই থেকে কালোজাম হতে থাকা সাদা টাওয়েল। সুদিনের স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে থাকে এয়ার ফ্রেশনারের শূন্যগর্ভ বাক্স। একটি গুঁড়ো মশলা কোম্পানির গুপ্ত কথা বলি। সংস্থাটির বিক্রি ছিল ভাটার দিকে। গুজরাতি মালিক নাকি অফিসের বাথরুমের ফ্ল্যাশ খারাপ হওয়ার কথা শুনে বলেছিলেন, পেহলে সেল বাড়াও। ফির ফ্ল্যাশ। বাবুর অবশ্য আলাদা ওয়াশরুম ছিল অফিসে।

বড় বড় কোম্পানির আবার বড় বড় ব্যাপারস্যাপার। প্রবল ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়ে চেন্নাইয়ের একটি আইটি কোম্পানি বিকেল তিনটে নাগাদ সব কর্মচারীদের ইমেল করল, ‘যাঁরা যাঁরা এসেন্সিয়াল ডিউটিতে নেই, তাঁরা বাড়ি চলে যেতে পারেন। খুব ঝড় আসছে। এইচআর থিঙ্কস ফর ইউ।’ বহু লোক পরমানন্দে বাড়িমুখো হলেন। পরের দিন অফিসে যেতেই তাঁদের ডাক পড়ল। এইচ আর মুচকি হেসে বলল, ‘আপনারা এ বারে পাকাপাকি ভাবে রাস্তা দেখতে পারেন। নিজেরাই তো স্বীকার করলেন, আপনাদের কাজ এসেন্সিয়াল নয়!’

কিছু কিছু বহুজাতিক আছে, যারা আবার সব কিছুই করে খুব কেতায়, গেঞ্জি কোম্পানির নবাবপুত্তুরের মতো। আমেজে বাঁচে। কস্ট কাটিংটাও তাদের কাছে অনেকটা স্টাইল স্টেটমেন্টের মতো। এমন এক কোম্পানির কোটি টাকার প্যাকেজের এইচআর হেড ঠিক করেছিলেন, এ বারে একেবারে কব্জি ডুবিয়ে কস্ট কাটবেন। নিজের উপরে ভরসা ছিল না। কোটি পাঁচেক দিয়ে এক বিশ্বখ্যাত কনসালট্যান্ট গ্রুপকে নিয়োগ করে ফেলেছিলেন। ছ’মাস ধরে কোম্পানির পয়সায় পাঁচতারা হোটেলে থেকে সেই গ্রুপ রিসার্চ চালাল। তেষ্টা পেলেই স্পার্কলিং মিনারেল ওয়াটার খেল। আশি টাকা লিটার। বিজনেস ডেইলি, বিজনেস টেলিভিশন চ্যানেলগুলিতে ‘স্মার্টসাইজিং কি ও কেন’, ‘ট্রিমিংয়ের উপকারিতা’ এ সব নিয়ে সেই এইচ আর হেড গালভরা ইন্টারভিউ দিলেন। ‘কুলিং অফ’ করার জন্য দিনসাতেক ঘুরে এলেন আইসল্যান্ডে। ফেরার দিন কয়েক পরেই ওই কনসালট্যান্ট গ্রুপ রিপোর্ট দিল। সবার উপরে ওনার নাম ছিল।

এসব খরচাপাতি কমানোর ব্যাপার নিয়ে যাঁরা মাথা ঘামান, তাঁদের মধ্যে আবার অনেকগুলো লবি আছে। এর বিরুদ্ধে যাঁরা, তাঁরা বলেন এগুলো চোখে ধুলো দেওয়ার একটা দারুন রাস্তা। ভাঁড়ে মা ভবানী অথবা দ্যাখো আমি কি কষ্টে আছি, সংস্থার অন্দরমহলে সব সময় এমন একটা মালকোষ রাগের এস্রাজ বাজাতে পারলে কর্মচারীদের অন্তরমহলের আশাটাকে বেশ আধমরা করে দেওয়া যায়। ফলে কোম্পানির পকেটে দু’হাজারের নোট থাকলেও খুচরোর ঝনঝনটাই কানে আসে।

আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর কথা বলে দাড়ি টানি আপাতত। সোমদীপ। একটি নাম করা দৈনিকের ডেস্কে আছে বছর দুয়েক হল। সাব এডিটর। জয়েন করার দিন থেকে ও শুনে আসছে, কোম্পানির নাকি পয়সা নেই বিলকুল। বিজ্ঞাপন আসছে না। মাইনেতে অনেক টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুটি বরাবরই দরদী। মরমিয়া। এ দিকে হয়েছে কি, প্রথম পাতার লে আউট, মানে পাতা সাজানোর কাজ করতে গিয়ে ও এক দিন রুল দিতে ভুলে যায়। যাঁরা এই ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত তাঁরা জানেন, এটা বেশ বড় ধরনের ভুল। তার ওপরে আবার প্রথম পাতা! বার্তা সম্পাদকের কাছে খবরটা যায়। উনি সোমদীপকে খিস্তিখাস্তা দাওয়ার পরে প্রিন্টিং সেকশনে ফোন করে জানতে পারেন, তিরিশ হাজার কাগজ ছাপা হয়ে গিয়েছে। ‘ফেলে দাও সব’ বলে, সোমদীপকে আরও একবার রক্তচক্ষু দেখিয়ে তিনি হনহন করে হাঁটতে থাকেন। সোমদীপের ততক্ষণে দুচোখ দিয়ে গঙ্গা যমুনা। তখন রাত দেড়টা। হঠাৎ টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটি স্কেল তুলে নিয়ে ও বার্তা সম্পাদকের পিছন পিছন হাঁটতে থাকে। সম্পাদক ‘হোয়াট’ বলে ফুঁসে উঠতেই ও স্কেলের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘কাগজগুলো ফেলে দেবেন না স্যার। অনেক টাকা লোকসান স্যার। আপনি বাড়ি যান প্লিজ।’ ‘আর তুমি কি করবে?’, গর্জে ওঠেন সম্পাদক। সোমদীপ স্কেলটা দেখিয়ে বলেছিল, ‘আমি বাড়ি যাব না স্যার। প্রিন্টিং সেকশনে গিয়ে যতগুলো কাগজে পারব রুল টেনে দি। কোম্পানির অবস্থা ভাল না স্যার। অনেক টাকার নিউজপ্রিন্ট..।’

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

4 Responses

  1. তরতরব লেখা.. তবে ‘কস্ট’ আর ‘কষ্ট’-এর পাশে পোস্ট-এর বানানটা চোখে লাগছে….

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই