সাইবার বাস

সকালে মেয়েকে ডাকলাম, ‘সাড়েআটটা বেজে গেলরে মামনি, এবার ওঠ’।মেয়ে চোখ না খুলেই বলল, ‘আমার মোবাইলটা এট্টু দেবে, বাপিন?’

মামনি এখন শুয়ে শুয়েই হোয়াটসঅ্যাপ-এর মেসেজ দেখবে, ফেবু’র নিউজ ফেড দেখবে তারপর ধীরেসুস্থে আড়মোড়া ভেঙে শয্যাত্যাগ করবে।

সকালে মশারি খোলার আগে ফেসবুক খুলতে হয়। আর এ সময়টায় বিরক্ত করতে নেই। আরে বাবা, কাল রাত দুটো সতেরোয় পোস্টানো ছবিতে ক’জন লাইকালো দেখতে হবে না? এইটুকু সময়ের মধ্যে মিনিমাম তিপ্পান্নটা লাইক না পেলে ব্রেন চলকে যাবে, সকালের ইয়ে ঠিকঠাক হবে না, সারাদিনের জন্য মেজাজ খিঁচড়ে যাবে। বলা যায় না সেরকম উৎপটাং আইডিয়া ঢুকে ব্রেন হ্যাঙিয়ে গেলে একটা দড়ি কিংবা নিদেনপক্ষে একটা ওড়না খুঁজে নিজেকে হ্যাঙানো এমন কী কঠিন কাজ? অবশ্য হ্যাঙানোর আগে গলায় দড়ি লাগানো সিনটার ভিডিও তুলে ফেসবুকে টাঙাতে পারলে সুপার ডুপার হিট পোস্ট হয়ে যাবে। এটা আসলে নিজেকে হ্যাঙানোর আগে দুনিয়াকে মুখ ভ্যাঙানো। তাই এই ভাইটাল সময়টায় মেয়েকে বিশেষ ঘাঁটাই না। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করিও যেন ওই তিপ্পান্নটা লাইক পেয়ে যায়।

তবে দোষ কারও নয় গো মা।নিজের মেয়েকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।এখন আমরা সবাই ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ-এ আছি। এবং সর্বক্ষণ আছি। আমাদের থাকা কিংবা না-থাকাটাও যে এদের হাতেই। আগে ঘুম থেকে উঠে ভগবানের ছবি দেখে দিনের শুরু হত; এখন সাইবার বাবার সমস্ত আপলোড দেখে তবেই দিনের শুরুয়াৎ।আগে নেশা করতে সপ্তাহান্তে বারে যেত এখন টুয়েন্টিফোর ইনটু সেভেন সাইবারে আছে।বার-এর নেশার চাইতে সাইবার-এর নেশায় ধুমকি বেশি।তাই আমরা এখন পাকাপাকি সাইবার-বাসী।

আমি নিজেও সেই সক্কালবেলাতেই হোয়াটসঅ্যাপ-এ মেসেজ চালাচালি পর্ব শেষ করে রেখেছি। গুডমর্ণিং-এর পালা মেটানোর পর সুড়সুড়ি দেওয়া জোকস চালাচালিও হয়েছে। চামেলি-মার্কা মেসেজ যেমন আছে তেমনি ঝামেলিও আছে। ঝামেলিটা হল অফিসের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। তাতে আবার বস-এর সঙ্গে বসবাস কিংবা সহবাস।দুঃসহবাসও বলা যায়। কারণ,বস এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা সকাল থেকেই টানা জ্ঞান বিতরণ করে যাচ্ছে। বিবেকানন্দ থেকে মার্কস, গাঁধী থেকে মোদি,হিটলার থেকে দলাই লামা, সবার কোটেশন দিয়ে আমাদের দলাই মলাই করছে। সেসব মেসেজ দেখে মনে মনে বাপ-বাপান্ত করছি আর মোবাইলে থামপস্‌-আপ আর স্মাইলি ভেজছি। এই ভেজে ভেজেই সকাল থেকে জীবনটা কেমন যেন ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছে।

ভাজার কথায় খেয়াল হল এইমাত্র দেখলাম মালবিকা তার ফেসবুকের দেওয়ালে তোপসে মাছ ভাজার ছবি সাঁটিয়েছে। আজ কি তবে খাবার পাতে তোপসে ফ্রাই পাচ্ছি? ছবিটায় লাইক দিয়ে রান্নাঘরে ঢুঁ মারলাম। দেখি আমার মালু ডানহাতে মোবাইল চালাচ্ছে আর বাঁহাতে আলুসেদ্ধ মাখছে।চটকানো ব্যাপারটায় ওর একটা স্বাভাবিক ঘেন্নাবোধ আছে।তাই ওকাজগুলো মালু বাঁ হাতেই করে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘মালু, তোপসে ফ্রাইটা কী হয়ে গেছে?’

মালু ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘বাড়িতে লাস্ট কবে তোপসে মাছ এনেছ মনে আছে?’

আমি তুতলে যাই, ‘অত ম-ম-মনে থাকে নাকি? তুমি মাছ ভাজার ছবি পোস্ট করলে তাই জিজ্ঞেস করলাম’।

‘লোকে পুরনো ছবি পোস্ট করে না?’

‘তাই বলে ঢপ ছাপিয়ে দেবে?’

‘খবরের কাগজেই যদি রোজ ঢপের খবর ছাপাতে পারেতো আমি করলে দোষ কিসের শুনি। আর ঢপ কি আমি একা দিচ্ছি নাকি? কে না দিচ্ছে ঢপ? আসল চেহারাটা ক’জন দেখাচ্ছে শুনি? একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিলে দাম বাড়ে, লাইক বাড়ে। এই সিজনে তোপসে মাছের দাম কত জান? এই ছবিটাও তাই দামি হয়ে গেল’।

মুখ ব্যাজার করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা সত্যি সত্যি আজকের মেনুটা কী বলতো?’

মালবিকা হোয়াটসঅ্যাপ-এ কোনও একটা মেসেজ পড়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘ভাত-ডাল-আলুসেদ্ধ’। তারপরেই মুখের হাসি মুছে ফেলে গম্ভীর গলায় বলল, ‘এই সকালবেলায় সময় কোথায় যে আর কিছু করব?’ ঠিকই তো। সাইবার দুনিয়া বড্ড সময় খায়। যেটুকু সময় তারপরেও পড়ে থাকে তাতে এর বেশি কিছু হয় না। গত তিনদিন তাই এই এক মেনুতেই পড়ে আছি।

তবে এ নিয়ে এখন আর বাওয়াল করলে চলবে না বাওয়া। কে ঠিক আর কে ভুল ওসব বাকোয়াস ভুলে যাও। এখানে লাইকটাই লক্ষ্য এবং জীবনের আলটিমেট লক্ষ্য ইজ লাইক। বুদ্ধি করে ঠিকঠাক পোস্টালেই লাইকের বন্যা বয়ে যেতে পারে।

জ্যান্ত দুনিয়ার সঙ্গে এই দুনিয়ার ফারাক বিস্তর। মোবাইল হাতে অটোচালক নিজেকে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার বলতেই পারে। কেউ ভেরিফাই করতে যাবে না।আবার সুন্দরী মহিলার সামনা-সামনি দাঁড়ালেও যার হাঁটু হাই ফ্রিকোয়েন্সিতে ভাইব্রেট করে সেই লোকই জলজ্যান্ত গোটা একটা বউকে পাশের ঘরে ঘুম পাড়িয়ে রেখে ফেসবুকে অচেনা কোনও ফেবুলিনার সাথে সেক্স-চ্যাট করে।

এই একটা জায়গাই তো এখনও উদোম পড়ে আছে আমাদের জন্য। তোমরা এ দুনিয়াকে ভার্চুয়াল বলে গলার রগ ফাটিয়ে ফেললেও এ জায়গা ছাড়ব না। আরে বাবা, আমাদের গোটাটাই তো ভার্চুয়াল। ভার্চুয়াল ইন্ড্রাস্টি হচ্ছে, ভার্চুয়াল চাকরি হচ্ছে, ভার্চুয়াল বিপ্লব হচ্ছে এমনকি নিজের বাপ-মা পর্যন্ত ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে আর সাইবার দুনিয়ায় এটুকু ভার্চুয়ালিটি থাকবে না?

এখানে আমাদের গুচ্ছের ফলোয়ার। ছবি পোস্টালেই লাইক পাওয়া যায়। সারা জীবনে যার কাজ কোনওদিনও কেউ লাইক করেনি তাকেই তো ফেসবুক রোজ একষট্টি লাইক দিচ্ছে, নাকি? এ নিয়ে অত হিংসে করলে চলবে? তোমার হিংসা আমার জয়। অরিজিনালি কার ডায়লগ জানি না, তবে অটোর পেছনে লেখা থাকে দেখেছি।

লক্ষ্য করে দেখেছি কলকাতার অটো, বাস, রিক্সাগুলো অনেক সম্ভাবনাময় কবিতা পেছনে সাঁটিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওখান থেকে ঝেড়ে আর তার সাথে দু’চার লাইন জুড়ে দিয়ে ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ-এ ছেড়ে দেখেছি লোকে ভাল খাচ্ছে। তবে খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না।

আসলে ইউজেসটা ঠিকঠাক জেনে ফেললে ফেসবুক আপনার যৌবনের উপবন, ফষ্টিনষ্টির নাইটক্লাব। হোঁচট খাওয়া প্রেজেন্টের রুখু জমিতে দু’চার ফোঁটা রোমান্সের বর্ষা নামানোর মোক্ষম সাইবার মলম।

তবে সাইবার দুনিয়ারও কিছু নিয়মকানুন আছে।এখানে আপনি কবিতা লিখুন, ছবি পোস্টান, কমেন্ট লটকান, ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে ব্রাজিলের ফাজিল মহিলার সঙ্গে ইন্টুমিন্টু করুন কেউ কিচ্ছুটি বলবে না।কিন্তু খবরদার নেতা-নেত্রীর ছবি সাঁটিয়ে ইয়ারকি মারবেন না, ওটি সাইবার-বাসে অশ্লীল।ধরা পড়লে আপনার হ্যাপা ভগবানেও সামলাতে পারবে না।

****

আলুসেদ্ধ ভাত চটকে অফিস গিয়েছিলাম।সেখানে মনে মনে সারাদিন বসের পিণ্ডি চটকে অফিস থেকে ফিরছি।পথে হঠাৎ গানুদার সঙ্গে দেখা।বছর কুড়ি আগে ওরা হালিশহর চলে গিয়েছিল।তারপর থেকে আর যোগাযোগ ছিল না।এত বছর পর দেখা হয়ে গানুদাও দেখলাম আমার মতই উৎফুল্ল।নামের পেছনে দা যোগ করে ডাকলেও গানুদার সঙ্গে বন্ধুর মতই মিশতাম।গানুদাও আমাদের যথেষ্ট আশকারা দিত।এক সময় হেব্বি ফুটবল খেলত।ফুটবল মাঠে আমাদের মারাদোনা।কিন্তুএখন দেখি মধ্য পঞ্চাশেই কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে।কপালে, গালে বয়সের ভাঁজ।এক মাথা ঝাকড়া চুলের জায়গায় সামান্য ক’টি পাকাচুল পড়ে আছে।

আমার চোখের ভাষা পড়তে পেরে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলল, ‘সংসারের চাপ বুঝলি, সব ছিবড়ে করে দেয়’।

রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে বসে গেলাম দুজনে।পুরনো সব দিনের কথারা ফিরে আসতে লাগল। তারপর ফোন নম্বর দেয়ানেয়া।আর ঠিক তক্ষুনি গানুদার চোখেমুখে হাজারওয়াট ঝলসালো, ‘আরে আমি ফেসবুকে আছি তো।ওখানে চলে আয়, রোজ কথা হবে’।

ফেসবুকে গানুদা নাকি রমরমিয়ে আছে।এক ফেসবুক ফ্রেন্ড গানুদাকে একটা ব্লগ বানিয়ে দিয়েছে।সেখানে গানুদা ফুটবল নিয়ে লেখালেখি করে।বহু বিখ্যাত খেলোয়াড়ও নাকি সেই ব্লগে কমেন্ট করে।নিষ্ঠুর সময় আর সংসার ফুটবলপাগল গানুদার পায়ের ফুটবল কেড়ে নিলে কী হবে, সাইবার দুনিয়ায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে গানুদার ফুটবল জীবন আজও টিকে আছে।আরও শুনলাম, সব পুরনো বন্ধুদেরকেই নাকি খুঁজে পেয়েছে ফেসবুকে।এমনকি মলিদিকেও!

মলিদির কথা শুনে ব্যাপক চমকালাম।গানুদা যখন আমাদের পাড়ার মারাদোনা, মলিদি তখন শ্রীদেবী।দুজন দুজনকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখে।সোজাসুজি চোখে চোখ পড়ে গেলে দুজনারই গাল লাল হয়ে যায় লজ্জায়।কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কাউকে কিছুই বলতে পারেনি।

সেই নীরব প্রেমের গল্প আমরা ছাড়া কেউ জানত না।শেষ পর্যন্ত মলিদির বিয়েতে গানুদাকে পরিবেশনও করতে হয়েছে।বিয়ের পিঁড়িতে বসে গানুদার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থাকা মলিদির চোখের কোণায় চিকচিকে জলবিন্দু আমরা দেখেছি।সেই মলিদি আর গানুদা ফেসবুক ফ্রেন্ড!

‘কথাহয়?’

‘বারে, কথা হবে না? কত কথা হয়।আর মলি কী ভাল গান করতে পারে জানিস না’।

‘মলিদি গান গায়!আগে জানতাম না তো!’

‘তুই কেন, আমরা কেউই জানতাম না।অথচ ওর যে কী ভাল গলা।হোয়াটসঅ্যাপ-এ একদিন গুনগুনিয়ে এক লাইন শুনিয়েছিল।তারপর আমিই তো উৎসাহ দিলাম।এখন ইউটিউবে ওর একটা গান আপলোড করেছে।খুব ভাল রেসপন্স পেয়েছে, জানিস।আমি তোকে লিংক দিয়ে দেব, শুনিস একবার’।গানুদাকে এখন আর একটুও বুড়োটে দেখাচ্ছে না।চোখে মুখে এক অপার্থিব আলো মেখে বলে চলেছে,‘মলি বলে, আমার জন্যেই নাকি ও গানের ভিতর দিয়ে আবার নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছে’।

‘ইস্‌ এমনি করে যদি সেসময় কথা বলতে পারতে। তোমাদের জীবনটা হয়ত —-’

‘ছাড় ওসব কথা।তখন তো আর ফেসবুক ছিল না।কিন্তু এখন আমরা ফ্রেন্ড’।

‘সামনাসামনি দেখা করতে পার তো’।

‘দূর বোকা।ফেসবুকের ফিনফিনে পর্দাটা না থাকলে রোমান্স থাকবে?’

আবার সেই দেড়েলবুড়োটার কথা মনে পড়ল।সেই কত বচ্ছর আগেই লিখে গেছে, বিশ্বজোড়াআআআআ ফাঁদ পেতেছোওও, কেমনে দিইইই ফাঁআআআকি।

আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

Advertisements

5 COMMENTS

  1. পরিণত সুন্দর লেখা। পড়ে খুব ভালো লাগল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.