শিলুর প্রেমিক

Bengali story

ধ্রুবদাটা যে এমন হাঁদার মতো দুম করে মরে যাবে, কে ভেবেছিল। কোথাও কিচ্ছু নেই, ফাঁকা রাস্তায় বেমালুম বাসের তলায় ! শীতের কানা ভোরে বাবু বেরিয়েছিলেন মর্নিংওয়াক করতে । স্বাস্থ্যরক্ষা করছ, কর। একটু তো সাবধান হবে? রঙ-সাইড দিয়ে হাঁটাই বা কেন ? দু-চোখে আগুন নিয়ে ধেয়ে এসেছে স্টিল প্ল্যান্টের দানব বাস। আশপাশের কোনও কিছুকেই রেয়াত করে না মর্নিংশিফ্‌টের বাসগুলো। একটু টাচ হয়েছে কি হয়নি, ছিটকে ফেলে দিয়েছে। উল্টোদিকের কালভার্টে লেগে মাথা ফেটে ঘিলু বেরিয়ে, উঃ বাবারে…! কাঁদতে কাঁদতে এসে খবরটা দিল ছোড়দা। প্রাণের বন্ধু বলে কথা, দুঃখ তো হবেই। শিলুরও খারাপ লাগছে খুবই। কিন্তু কোন মুখে আর প্রকাশ করে। বেঁচে থাকতে ধ্রুবদা যে ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। ছোড়দা ছিল ঘটক। শিলু রাজি হয়নি।

শিক্ষিত ভদ্র ছেলে। বিনয়ী। একার সংসার। নিজের বাড়ি…, এমনই হাজারগন্ডা সার্টিফিকেট ধ্রুবদার নামের পেছনে জুড়ে দিয়েছিল ছোড়দা। কিন্তু ধ্রুবদা ইজ ধ্রুবদা। তার বেশি কিছু ভাবতে পারেনি শিলু। ওই মিহিদানা গলায় মাত্রাতিরিক্ত বিনয়, অসহ্য রকমের মেয়েলি। সেই লোক হবে বর, ভাবা যায় ! না। শিলু রাজি হয়নি। কোনওদিন হতও না। ধ্রুবদার মা নাকি ঢাকার মানুষ ছিলেন। শিলুর মা-ও তাই। একদিন রবিবারের কাগজে একটা গল্প বেরিয়েছে, সেটা এনে মাকে পড়তে দিল। ‘মাসিমা আপনাদের গ্রাম কি এইরকম ’ । বিশ্ব ন্যাকা একটি। ওর নাকি ভীষণ ঢাকায় যাবার সখ। সেখানে নাকি ওর নাড়ির টান। এমন লোকের সঙ্গে প্রেম , ছ্যাঃ !

এখন মানুষটা মরে গিয়ে বিড়ম্বনায় ফেলে গেল শিলুকে। ছোড়দাটাও এমন করছে, যেন শিলু রিফিউজ করেছে বলেই মনের দুঃখে মরে গেছে ধ্রুবদা। উল্টোটা হত যদি ? শিলু বিয়েতে রাজি হয়ে গেল, বা হয়েই গেল বিয়েটা, তারপরে এমন ঘটনা ঘটত যদি? …বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছে শিলু। কিন্তু আশ্চর্যের আরও কিছু বাকি ছিল। দিনকয়েক পরেই লাফাতে লাফাতে ছোড়দা এসে খবর দিল, ধ্রুবদা নাকি ওর টাকাকড়ি সবকিছুরই নমিনি করে গেছে শিলুকে। ‘দ্যাখ, ভালোবাসা কাকে বলে। আর তুই…’

এমনকি বাড়ির দলিলেও শিলুর নাম। কী আশ্চর্য ! লোকটা কি পাগল ? অন্য কারও সঙ্গে যদি বিয়ে হয়ে যেত শিলুর ? কেমন যেন খটকা লাগে। এটা অ্যাক্সিডেন্ট, নাকি সুইসাইড …? যাইহোক ওইসব সম্পত্তি-টম্পত্তি শিলু নেবে না, ব্যস।

কিন্তু ছোড়দা নাছোড়। বেঁচে থাকতে কিছুই পেল না বেচারা। ওর শেষ ইচ্ছেটা অন্তত রাখ। তাছাড়া কোনও আত্মীয়-স্বজনও নেই…।

‘কী ব্যাপার বল তো ছোড়দা ? একজন মৃত মানুষের সম্পত্তি নিয়ে তোর এত চিন্তা কীসের ? বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু না বলেও পারছি না। এই সবকিছুর পেছনে তোর হাত নেই তো কোনও…’ ?

‘কী বললি তুই’ ? রেগে উঠেও নিজেকে সামলে নিল ছোড়দা। বলল, ‘কাল ওর অফিসে গিয়ে খোঁজ নিস। তোর সন্দেহের কথাও জানাস। ওরা যা করার করুক। তুই না চাইলে সম্পত্তি ব্যাঙ্কের হয়ে যাবে’।

ছোড়দা সিরিয়াস। নিজের কথা নিজেই গিলে পরদিন ব্যাঙ্কে গেল শিলু। বিভৎস রাগ হচ্ছে ধ্রুবদার ওপর। এভাবে মরে গিয়ে কী লাভ হল লোকটার ? শিলুকে বিয়ে করা তো হলই না, ওদের ভাইবোনের মধ্যে সন্দেহের বীজ পুঁতে রেখে গেল। কী দেখেছিল শিলুর মধ্যে, না সুন্দরী। না গৃহকর্মে নিপুনা।

দুই

মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল ওরা। মধুমিতা আর জুনি। জুনি ওদের ব্যাচের ফার্স্ট গার্ল। ডাক্তারি পড়ছে। মধুমিতা এখানেই ম্যাথ-অনার্স। বাংলা অনার্সের শিমুলকে ওরা কেন পাত্তা দেবে। তাছাড়া, লেখাপড়ায় ভালো হলে কী হবে, খুব হিংসুটে জুনি। আর মধুমিতাটা ওর এক নম্বরের চ্যালা। স্কুলে পড়তেই শিলুর সঙ্গে ঝামেলা লেগেছিল জুনির। আসলে শিলুর বাংলা হাতেরলেখা ভালো। জুনির রাগের কারণ সেটাই। সব ভালো কেবল ওরই হবে। সব প্রশংসা ওর চাই। বকুনিও খেয়েছিল ক্লাসটিচার সুনন্দা মিস-এর কাছে। কিন্তু শিলু ভীষণই অবাক হল, জুনি আর মধুমিতাকে ফিরে আসতে দেখে। এবং ‘কী রে কেমন আছিস’, বলে এমন ঢলে পড়ল, যেন আত্মার আত্মীয়। আশেপাশে কোথাও কি সুনন্দাদি আছেন, খুঁজতে গিয়ে তপু যাকে দেখল, তাতে নিজেই ভেবলে গেল আরও। ওদের থেকে সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে আছে ধ্রুবদা। হাসছে।

এরপর থেকে এমন অনেক ঘটনাই ঘটতে থাকল, যার কোনও যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা নেই। যেদিন ধ্রুবদার সম্পত্তির অধিকার নিজের দখলে নিল শিলু, ফিসফিস করে ওর কানের কাছে কেউ বলল, ‘আমি খুশি আমি খুশি’। সেই ফিনফিনে গলা। ‘থামো তো তুমি’ রাগের চোটে বলেই ফেলেছে শিলু। বলেই দ্যাখে আশপাশ থেকে সবাই ওবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে। অস্বস্তিতে নিজেই মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। ছোড়দার পাল্লায় পড়ে, মাঝেমধ্যে ধ্রুবদার বাড়িতেও যেতে হচ্ছে এখন। যে গেছে সে গেছে। ভাইবোনের সম্পর্কটা অন্তত টিঁকে থাক। বাড়িটা এখন শিলুরই। খানিকক্ষণ থাকে। জানলা দরজা খুলে ঘরে আলো বাতাস ঢোকায়। আলগা ধুলো ঝেড়ে ফেলে। কেমন টিপটপ গোছানো সংসার। শুধু যেন কারও প্রতীক্ষার প্রহর গুণছে। কিন্তু সে আর আসবে না। চোখে জল আসে শিলুর। এই প্রথম, ধ্রুবদার জন্যে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি তালাবন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে আসে ও। কিন্তু কটাদিন যেতে না যেতেই আবারও যায়। সঙ্গে কখনও ছোড়দা, কখনও মা। এতেই যদি মানুষটার আত্মা শান্তি পায়…, পাক।

একদিন ছোড়দার সঙ্গে বসে গল্প করতে করতে দেখল কাঁচুমাচু হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ধ্রুবদা। ইঙ্গিতে বসতে বলল শিলু। একটা খালি চেয়ার টেনে বসে পড়ল ধ্রুবদা। ছোড়দা ওকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু চেয়ার টানার শব্দে ফিরে তাকাল। তারপর শিলুকে দেখল। ভাবলেশহীন মুখে বসে আছে শিলু। ছোড়দাও আর কথা বাড়াল না। তবে একটা ব্যাপার উপলব্ধি করে বেশ ভালো লাগছে, ধ্রুবদাকে দেখে ও ভয় পায়নি। একবারের জন্যেও না। ছোড়দাকে ছাড়াই এল একদিন। একা থাকায় ধ্রুবদা অনেক কথা বলল ওর সঙ্গে। বলল, ‘তুমি আসাতে আমি খুব খুশি হয়েছি। এখানেই থেকে যেতে পার না’ ?

‘কিন্তু ছোড়দা কি রাজি হবে, এমনিতেই তোমার মৃত্যুর জন্যে ওকে একবার সন্দেহ করে বসেছিলাম ..’.।

‘তুমি একাই থাক। তাহলে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারব’।

‘আমি একা ! একা একটা মেয়ে এতবড় বাড়িতে থাকতে পারে কখনও ?’

‘আমি তো আছি। মাসিমাকে নিয়ে চলে এসো’।

‘বাহ্‌ রে, একা একা ছোড়দা হাত পুড়িয়ে খাবে, আর আমরা এখানে বসে থাকব, তাই হয়। ’

তিন

ধ্রুবদার সঙ্গে একই অফিসে চাকরি ছিল ছোড়দার। কিন্তু ধ্রুবদার ভূত কিছু কলকাঠি নাড়ল কিনা, কে জানে, প্রোমোশন নিয়ে বদলি হয়ে গেল ছোড়দা। আর শিলু ওর মাকে নিয়ে পাকাপাকি ভাবে শিফ্‌ট করে গেল ধ্রুবদার বাড়িতে।

প্রথম প্রথম ওরা মা মেয়ে একঘরেই শুতো। তারপর ফাইনাল পরীক্ষার সময় নিজের পড়ার ঘরটা আলাদা করে নিল শিলু। কারণ রাতে বেশিক্ষণ আলো জ্বললে ঘুমের ব্যাঘাত হয় মায়ের। আর ওর পরীক্ষা যখন শেষ হল, শিলু দেখল একা শোয়া ওর বেশ পছন্দ হয়ে গেছে। ধ্রুবদাও খুশি। ইচ্ছে মতো বকবক করতে পারে ওর সঙ্গে। ক্রমশ এটাতে অভ্যস্থ হয়ে পড়ছে শিলুও। নিজেই যেন অপেক্ষায় থাকে, কখন ধ্রুবদা আসবে, সারাদিনের কত কথা যে জমে থাকে। আসলে ধ্রুবদার সঙ্গে গল্প করে মজা আছে। এখন একটু-আধটু আফসোসও হয়। প্রথম চোটেই মানুষটাকে হঠিয়ে না দিয়ে একটু মিশে দেখলে হত। আসলে তখন মাকে তেল দেওয়ার জন্যে যে ন্যাকামিগুলো করত, তাইতেই ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠেছিল। ‘কেন করতে বলো তো ওরকম’ ?

‘কী করব, তুমি তো আমাকে পাত্তাই দিতে না। তাই ভাবতাম মাসিমাকে ম্যানেজ করে যদি হয়। কিন্তু তোমার যা স্ট্রং পার্সোনালিটি…, অতটা আমার ছিল না’।

‘এখন ভূত হয়ে হয়েছে, নাকি’ ?

‘কিছুটা’। বলে বিছানায় শিলুর পাশে এসে শুয়ে পড়ল ধ্রুবদা। ‘খুব টায়ার্ড লাগছে। শুয়ে শুয়ে গল্প করি’।

ব্যস, এরপর থেকে শিলুর পাশে শোয়াটাও অভ্যেস করে ফেলল ও। তারপরেও আবদার তার বাড়তেই থাকে। আদর করতে চায়। শিলু টের পায় ওর মুখে গালে হাত বোলায় ধ্রুবদা। কাঁধ গলা ঘুরে সেই হাত ক্রমশ জামার ভেতর ঢোকার চেষ্টা করতেই রেগে ওঠে শিলু। ‘এ তো ভারি অন্যায় ধ্রুবদা ! তোমার মন ভালো রাখার জন্যে এবাড়িতে থাকছি। মনে মনে ভেবেওছি যে বিয়ে করব না। অ্যানম্যারেড থেকে তোমার ভালোবাসার মর্যাদা দেব। আর সমাজসেবা করব। খাওয়া পরার চিন্তা তো নেই, তুমি সবই গুছিয়ে দিয়ে গেছ। কিন্তু তাই বলে যাকে ভালোবাসি না, তার সঙ্গে…’ কথা শেষ করে না শিলু। এই রে, আবারও বোধহয় মনে দুঃখ দিয়ে ফেলল।

কিন্তু ধ্রুবদা এরপরও কুঁইকুঁই করে বলল, ‘এখনও কি তুমি আমায় ভালোবাস না ? মুখে স্বীকার না করলেও ভালোবাস। তা নইলে এসব করতে না’।

‘যদি তা মেনেও নিই, তুমি এখন মৃত। এটা তো ঠিক। ভূতের সঙ্গে সেক্স…! না বাবা, ওই রিস্কে আমি নেই। জোর করলে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, বলে দিলাম’।

আবারও কুঁইকুঁই করে কাঁদতে শুরু করল ধ্রুবদা। শেষে বলল, ‘না না থাক। আমি জোর করব না’।

ওই বাড়িতেই রয়ে গেছে শিলু। বিয়ে করেনি। একটা এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সে ছাড়াও এলাকার লোকজনের বিপদে-আপদে সবসময় ফিট শিলু। সবাই ওকে ভালোবাসে। শিলুও ভালো আছে। তবু একা একটা মেয়ে পাথেঘাটে বিপদে পড়তে কতক্ষণ ? একদিন সন্ধের পর পিছু নিয়েছে কয়েকটা মাতাল ছেলে। রাস্তাটাও নির্জন। ভয় পেয়েছে শিলু। ভীষণ ভয়। তবু ওদের দিকেই ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। মরিয়া হয়েই। ছুটে পালিয়েও তো বাঁচাতে পারবে না নিজেকে। দাঁড়িয়ে পড়েছে ছেলেগুলোও। আর তখনই একজনের প্যান্ট সরসর করে নেমে এল কোমর থেকে। প্যান্ট সামলাতে সামলাতে অন্ধকারে দৌড় দিল ছেলেটা। তারপরে একই কারণে পিঠটান দিল অন্যেরাও। এতক্ষণে শিলু বুঝে গেছে, কীভাবে কী ঘটছে। মুচকি হেসে নিশ্চিন্ত মনে হাঁটা লাগাল ও।

শিলুর নিরাপত্তা বলয় সংক্রান্ত খবরটা চাপা থাকল না। ফলত শিলুকে লোকজন এখন বেশ ভয়-ভক্তি করে। স্কুল কলেজ পাড়ার বান্ধবীরাও ভজিয়ে রাখে শিলুকে। এরকম একটা প্রেমিক পাওয়ার ধান্দাতেও ঘেঁসতে আসে অনেকে। কারণ সঙ্গই বলো, আর সুরক্ষা, দুটোতেই ডাহা ফেল জীবিত প্রেমিকরা। ধ্রুবকে দেখ, শিলুর সঙ্গেই সেঁটে আছে। কোনও জায়গায় কোনও সমস্যাতেই পড়তে হয় না শিলুকে। ভিড় বাসে দাঁড়াতে অসুবিধে হয় না, পকেটমারি হয় না। আবার বাড়িতেও শিলুর কাজ সম্পর্কে জরুরি আলোচনায় একঘর ধ্রুব। একেবারে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক দুজনের। এই তো সেদিন, প্রচণ্ড গরম। মে মাস। তারমধ্যে সকালে বেরিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আটটা। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে জামা ছেড়ে নাইটি পরে তবে একটু ফ্রি হবে । কামিজটা মাথা গলিয়ে খুলছে, চেনের লকটা আটকে গেল চুলে। মুখ ঢাকা। দুইহাত উপরে তোলা। একেবারে বেকায়দা। গরম আর ক্লান্তিতে ছটফট করছে বেচারা। এমন সময় ধ্রুব এসে সাবধানে ছাড়িয়ে দিল চুলটা। ‘উহ্‌ বাঁচালে’, বলে পরমুহূর্তে ধ্রুবকেই ধমকে উঠল শিলু। অর্থাৎ সাহায্যের সঙ্গে সঙ্গে এখন দুষ্টুমিতেও দড় ধ্রুব। আর শিলুর ধমকেও ঝাঁঝ কোথায়…? আহা ! প্রেমের ঝরনা ঝরিয়ে সেখানেও যে প্রশ্রয়ের মিষ্টি সুর…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here