হাফ বেলার হেরিটেজ ট্যুর

1229
পশ্চিমবঙ্গের অনেক পুরাকীর্তি সাধারনের কাছে অজানা

“দাদা, আমাকে একটা ইউনিক হাফ বেলার হেরিটেজ ট্যুর  প্ল্যান  করে  দাও।”   অনুপম একটু কাতর গলায় আমায় অনুরোধ  করল ।  অনুপমের একটা ট্রাভেল এজেন্সী আছে । আগে বিদেশে দেশী ট্যুরিস্ট পাঠানোর কাজ করত । ইদানিং ভারতে আসা বিদেশী ট্যুরিস্টদের  নিয়ে কাজ করছে ।

“হাফ বেলার হেরিটেজ  ট্যুর?  সেটা কী ?“ আমি অনুপমকে  প্রশ্ন  করলাম |

অনুপম আরও একটু কাতর গলায় বলল  “বুঝলে না? আমি চাইছি একটা সুন্দর লং ড্রাইভ । দারুন রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে আমি আমার কিছু বিদেশী ক্লায়েন্টকে নিয়ে এমন একটা হেরিটেজ ডেস্টিনেশনে নিয়ে যাব যেটা খুব ইউনিক ।  জাস্ট হাফ বেলার।  দু থেকে  তিন ঘন্টা যেতে লাগবে । সাতটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করে বেরোবো। লাঞ্চ টাইমের মধ্যে ফেরৎ চলে আসব । ”

“অ। …… হাফ ডে হেরিটেজ ট্যুর। আদেখলার মতো হাফ বেলা বলছিস কেন ?  তা …সে তো অনেক জায়গা আছে ।  ওই সার্কিটটা  নিয়ে যা যেটাকে লোকে আজকাল “লিটল ইউরোপ ট্যুর” বলছে – ব্যান্ডেল, চন্দননগর, চুচূড়া আর শ্রীরামপুর । সবকটা না পারলে কোনও একটাতে নিয়ে যা ।”

অনুপম একটু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল  “আরে ওটা তো কমন হয়ে গেছে । ইদানিং লোকে ও চারটে ডেস্টিনেশন নিয়ে এত লিখে ফেলেছে, যে সব ট্রাভেল এজেন্সীরা ওখানেই নিয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে আমি বাওয়ালী রাজবাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম। সেটা মন্দ নয়। কিন্তু  রাস্তাটা খুব বাজে । আমতলার মোড়টা যাচ্ছেতাই রকমের জ্যাম হয় । আমার ক্লায়েন্টের পোষাবে না অমন রাস্তা ।”

“বুঝেছি । তোমার ক্লায়েন্টকে চওড়া রাস্তা দিয়ে নিয়ে গিয়ে ঘন্টা দুয়েক বা তিনেকের মধ্যে একটা আনকমন হেরিটেজ ডেস্টিনেশনে নিয়ে যেতে হবে। আচ্ছা, তোর ক্লায়েন্ট চওড়া রাস্তা বলতে কী বোঝে ?  কোনা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৬ আর ন্যাশনাল হাইওয়ে ২ হয়ে যদি নিয়ে যাওয়া যায় সেটা কি চওড়া রাস্তার মধ্যে পড়বে ? ” আমি জানতে চাইলাম |

“ঠাট্টা করছ ? ওগুলো চওড়া  রাস্তা না হলে, কোনটা চওড়া রাস্তা হবে আমার জানা নেই । কিন্তু ডেস্টিনেশনটা কোথায় ? “অনুপমের  গলায় এবার আগ্রহের সুর ।

“যেখানের কথা বলছি সেটা একটা গ্রাম । বর্ধমানের কাছে । গ্রামের নাম দেবীপুর।”

“দেবীপুর?  এই নাম তো আগে শুনিনি।  কী আছে এখানে ? রাজবাড়ি ?”

“ইস, বাওয়ালী রাজবাড়ি দেখে এসে শুধু মাথায় রাজবাড়ি ঘুরছে দেখছি। না, এখানে রাজবাড়ি নেই ।  একটা বিশাল টেরাকোটার  মন্দির আছে । অন্য দেশ হলে এটা বিখ্যাত হয়ে যেতো। আমাদের পোড়া দেশে এর নাম কম লোকেই শুনেছে ।”

“টেরাকোটার মন্দির? বিষ্ণুপুরের মতন?”

“বিষ্ণুপুরের টেরাকোটার মন্দির আরো পুরানো। এই মন্দির ১৯শ খ্রীস্টাব্দের শেষের দিকে তৈরী। আসলে এই মন্দিরের বৈশিষ্ট্য শুধু এর দেয়ালের গায়ে টেরাকোটার কাজ নয়, এর গড়নশৈলী হল এর আসল বৈশিষ্ট্য।“

“গড়নশৈলী? মানে মন্দিরের স্ট্রাকচার? সেটা কি ইউনিক?”

“মন্দিরের গড়নটা নাগর রীতির রেখ দেউল আর বাংলার চালা রীতির যুগ্ম সমন্বয়। বলতে পারিস উড়িষ্যা আর বাংলার স্থাপত্যর সংমিশ্রন।”

বিদ্যাসাগর  সেতু  ধরে যাত্রা  শুরু
বিদ্যাসাগর সেতু ধরে যাত্রা শুরু

“এটা তো বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। এই রবিবার যাওয়া যায়?”

“নিশ্চই যাওয়া যায়। সাতটা নাগাদ হাওড়া থেকে একটা ব্যান্ডেল লোকাল আছে। দেবীপুর পৌঁছতে দেড় ঘন্টা লাগে। ষ্টেশন থেকে বাসে করে মন্দির যেতে আরও মিনিট পনেরো।”

“লোকাল ট্রেন? খেপেছ নাকি? আমার গাড়িতে করে যাবো।”

অগত্যা অনুপমের সুইফট ডিজায়ার করে পরের রবিবার সকাল সাতটা নাগাদ দেবীপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম । সকালবেলা  বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে কোনা এক্সপেসওয়ে দিয়ে যেতে বেশ ভালই লাগছিল ।

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে আসার পর অনুপম বলল  “আচ্ছা, অন দ্য ওয়ে কি কোনও হেরিটেজ স্ট্রাকচার পড়বে ?”

একটু হেসে বললাম  “একটু পরেই  সিঙ্গুর পড়বে। বাঁ দিকে টাটার অসমাপ্ত মোটর ফ্যাক্টরিটা দেখিয়ে দিতে পারিস । আজ না হয় ওটা  হেরিটেজ নয়,  একশ বছর বাদে নিশ্চই হবে ।”

সিঙ্গুরে  টাটার  পরিত্যক্ত  কারখানা
সিঙ্গুরে টাটার পরিত্যক্ত কারখানা

” তোমার যত সব বাজে ঠাট্টা ।”  গোমড়া মুখে বলল অনুপম |

সিঙ্গুর পেরিয়ে ধনিয়াখালি কানেক্টার বাঁ দিকে রেখে গুড়াপের কাছাকাছি এসে অনুপম গাড়ি থামাল। মনটা চায়ের জন্য আকুল হয়েছিল। আজাদ হিন্দ ধাবায় ঢুকে তরিবত করে চা আর ব্রেকফাস্ট খেলাম ।

“গুড়াপেও কিছু ভালো মন্দির আছে । তবে সেগুলো হাইওয়ে থেকে তিন চার কিলোমিটার ভিতরে ঢুকতে হবে । এখন যেতে চাইলে  যেতে পারিস ।”  চা খেতে খেতে বললাম আমি ।

অনুপম ঘড়ি দেখে বলল  “নাহ, আগে দেবীপুর  চলো ।”

গুড়াপ পেরিয়ে কিছুদুর গিয়ে দুর্গাপুর এক্সপেসওয়ে ছেড়ে বাঁদিকের সার্ভিস রোড ধরে এগিয়ে গিয়ে জৌগ্রাম রোডে পড়লাম ।  ডানদিকে বাঁক নিয়ে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ী ।  জৌগ্রাম রোড শেষ করে স্টেট হাইওয়েতে পৌঁছে ডানদিকে বাঁক নিয়ে কিছুদুর যেতেই  বাঁ দিকে দেবীপুর যাওয়ার রাস্তা পড়ল । একটা রেলগেট পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম । ট্রেনে আসলে এই রেলগেট পেরিয়েই বাস বা ট্রেকারে করে পাঁচ কিলোমিটার অতিক্রম করে শিবতলা বাস স্টপেজে নামতে হয়।

অচিরেই আমরা শিবতলা বাস স্টপেজের সামনে এসে পৌঁছালাম।

অনুপমের দিকে তাকিয়ে বললাম “গাড়িটা এখানেই কোথাও পার্ক করে রাখ। আমাদের বাঁ দিকের সরু রাস্তাটা দিয়ে ঢুকতে হবে”।

অনুপম গাড়িটাকে একটু এগিয়ে পার্ক করে বলল “সে তো বুঝলাম। কিন্তু ওই রাস্তার  মোড়েও তো একটা  মন্দির  দেখতে পাচ্ছি। ওটা কী মন্দির? ওটার কথা তো বলোনি ।”

“আরে, সব বলে দিলে আসার মজাটাই তো মাটি হয়ে যায়। আয় এদিকে।” একটু হেঁটে  মন্দিরের কাছে গিয়ে পৌঁছালাম। “আরিব্বাস, এতো দেখছি একটা বেদীর উপর তিনটে মন্দির? এটাও কি ইউনিক?”  জানতে চাইল অনুপম |

জোড়া শিব ও বামাকালীর মন্দির
জোড়া শিব ও বামাকালীর মন্দির

একই ভিত্তিবেদীর উপর তিনটে মন্দির কেন, তার অনেক বেশিই দেখেছি। কিন্তু এই মন্দিরেরবৈশিষ্ট্য হল তিনটি মন্দিরই পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই পাশে রয়েছে দুটি শিবালয় আর মাঝে একটি ছোট দালান মন্দিরের উপরে রেখ দেউলের আকৃতির একটি দোলমঞ্চ। এই “ত্রি-মন্দিরের” প্রতিষ্ঠা-ফলক অনুযায়ী এটি বাংলা ১২৮৩ (১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে) নির্মিত হয়েছিল ।

অনুপমের দিকে তাকিয়ে বললাম  “এটিকেও ইউনিক বলতে  পারিস। একই ভিত্তিবেদীর উপর তিনটে মন্দির অনেক দেখেছি কিন্তু এই কম্বিনেশন কখনো দেখিনি। এই মন্দির তিনটি জোড়াশিব ও বামাকালীর মন্দির নামে খ্যাত। ওই দ্যাখ মন্দিরের সামনে লেখা আছে।”

বামাকালীর  মন্দিরের  গায়ে  প্রধানত: ফুল পাতার  মোটিফ
বামাকালীর মন্দিরের গায়ে প্রধানত: ফুল পাতার মোটিফ

দুটি  শিবালয়ের সামনের দিকের দেওয়ালের অনেক টেরাকোটার অলংকরণ রয়েছে। তবে দুটির অলংকরণের ধরন মোটামুটি একই ধরনের। দুটিতেই অনেক ফুল্ পাতার নক্সা রয়েছে। রয়েছে টেরাকোটার অসংখ্য পাখি। দুটি শিবালয়ের সম্মুখে কাঠের দরজা রয়েছে। দালান মন্দিরের দরজাটি কিন্তু আসল দরজা নয়। ওটি টেরাকোটার অলংকরণ মাত্র ।

অনুপম খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মন্দিরের ছবি তুলছিল। একসময় সে ছবি তোলা বন্ধ করে বলল  “চল এবার লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরটা দেখে আসি।”  আমরা মন্দিরের পাশের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে  চললাম। এই রাস্তাটার পাশেই রয়েছে একটা পুকুর। সেটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে অনুপম বলল “আচ্ছা, ওই মন্দিরের দেওয়ালে একটা অদ্ভুত টেরাকোটার কাজ দেখলাম। একটা  মানুষের মুখ দিয়ে অজস্র লতাপাতার মতো জিনিসপত্র বেরিয়ে আছে। ওটা কী কেস?”

বামাকালীর  মন্দিরের দেওয়ালে  কীর্তিমুখের  মোটিফ
বামাকালীর মন্দিরের দেওয়ালে কীর্তিমুখের মোটিফ

“বাঃ, বেশ  খেয়াল করেছিস তো।” তারিফ  করে  বললাম  আমি।  “ওটা শুধু শিবমন্দিরে বাইরেই দেখতে পাবি । উড়িষ্যা আর দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে এই মোটিফ প্রচুর সংখ্যায় দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার মন্দিরে এই মোটিফ তুলনামূলক ভাবে কম দেখা যায় । একে বলে কীর্তিমুখ।”

কীর্তিমুখ কথাটা একটা ছোট নোটবইতে লিখে নিয়ে তার বিশদ বিবরণ জানতে চাইল  অনুপম।

“আগে তোর হাফ বেলার  বিদেশী ক্লায়েন্ট আসুক, তখন নাহয় তোকে বিশদ বিবরন দেব। কীর্তিমুখ নিয়ে এত সংক্ষেপে বলা মুশকিল। এইটুকু আপাতত জেনে রাখ আমাদের দেশে কীর্তিমুখ কনসেপ্টটা এসেছে স্কন্দ পুরান থেকে।  নে, আমরা লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরের সামনে  এসে গেছি।”

প্রবেশ দ্বার  থেকে লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরের  দৃশ্য
প্রবেশ দ্বার থেকে লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরের দৃশ্য

৬০ ফুট উঁচু লক্ষী জনার্দন মন্দিরটি সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মন্দির প্রাঙ্গনের প্রবেশপথের  দুধারের থামগুলো দেখে বোঝা যায় যে একসময় প্রবেশপথটি অনিন্দ্যসুন্দর ছিল। অনুপম হাঁ  করে তাকিয়ে মন্দিরটা দেখছিল। একসময় সে হাঁ মুখ বন্ধ করে বলল “এতটা আশা করিনি। এ যে এক অসমান্য স্থাপত্য | ”

অনুপমের কথায় আমি বিস্মিত বোধ করলাম না। প্রথম দর্শনে দেবীপুরের লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির অধিকাংশ লোককেই মুগ্ধ করে। মন্দির প্রাঙ্গনের ভিতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় প্রাচীরের গায়ে অসংখ্য দরজা রয়েছে। এক সময়ে হয়ত ভিতরে চলাচলের রাস্তা ছিল, এখন দেওয়ালের ইঁট বেরিয়ে গেছে। আগেরবার দেখেছিলাম প্রাচীরের অবস্থা শোচনীয়, এবার দেখে মানে হল দেওয়ালটি যে কোন দিন পড়ে যাবে।

আগেই বলেছি লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরটি রেখ দেউল ধাঁচের। সামনের দিকে রয়েছে মন্দির সংলগ্ন ত্রিখিলান প্রবেশপথ যুক্ত একটি এক বাংলা (অথবা এক চালা) মন্ডপ, প্রচলিত ভাষায় যাকে জগমোহন বলা হ্য়। এই জগমোহনের দেওয়াল গাত্রে অসামান্য টেরাকোটার কারুকার্য রয়েছে। এইরকম গড়নশৈলী বাংলার অন্য কোনও মন্দিরে দেখা যায়না। দুবরাজপুরের দিকে এইরকম একটা মন্দির আছে বটে, কিন্তু সেটার দেউলের অংশটা এটার মতো নয়| মুর্শিদাবাদ জেলার ব্যাসপুরের মন্দিরের গঠনশৈলী কিছুটা এই মন্দিরের মতন|

হাতি সহ গজলক্ষ্মী
হাতি সহ গজলক্ষ্মী

টেরাকোটা কারুকার্যগুলি অসাধারণ মুন্সিয়ানার সঙ্গে রুপায়ন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য  কাজের মধ্যে হল মাখনচোর শিশু কৃষ্ণর সাথে মা যশোদা, শ্রীকৃষ্ণের কালীয়দমন দৃশ্য, হাতি সহ গজলক্ষ্মী, দূর্গার অন্নপূর্না রূপ, মা যশোদার সাথে কৃষ্ণ ও বলরাম, কৃষ্ণের অক্রুরের রথে মথুরার পথে যাত্রার সময় ক্রন্দনরত ও মূর্ছিত গোপিনীগণ, যুদ্ধ দৃশ্য।

যুদ্ধ  দৃশ্য
যুদ্ধ দৃশ্য

মন্দিরের প্রতিষ্ঠা ফলকের ডান পাশে শোভা পাচ্ছে শিবঠাকুরের বিয়ের দৃশ্য এবং বাঁ পাশে রয়েছে কৃষ্ণর ইন্দ্রের বাগান হতে পারিজাত হরণের দৃশ্য। কিছু কিছু টেরাকোটার কাজ কালের স্রোতে কিছুটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

অনুপমকে একে একে টেরাকোটার বিভিন্ন কারুকার্য বোঝাচ্ছিলাম। একসময় সে প্রচন্ড  উত্তেজিত হয়ে বলল – “উরেব্বাস, এত নিখুঁত কাজ ! এই মন্দির কোন শিল্পীর তৈরী করা ?”

মাখনচোর শিশু কৃষ্ণর সাথে মা যশোদা
মাখনচোর শিশু কৃষ্ণর সাথে মা যশোদা

“হায়, আমাদের দেশের অধিকাংশ পুরাকীর্তির মতো এই মন্দিরের শিল্পীর নাম ইতিহাসের অতলে তলিয়ে গেছে।” একটি দীর্ঘ:শ্বাস ফেলে বললাম আমি “তবে এই মন্দিরের ইতিহাস  কিছুটা জানা আছে। এই পরিবারের সদস্য রনজিত সিংহ আমায় জানিয়েছিলেন যে ১২৪০ বঙ্গাব্দে (১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে) বর্ধমানের দেওয়ান বনবিহারী কাপুরের কাছ থেকে দেবীপুরের জমিদার নরোত্তম সিংহ কিছু জমি গৃহদেবতা লক্ষ্মী জনার্দনের নামে কিনে নেন। ১২৪৭ বঙ্গাব্দের (১৮৪০খ্রিস্টাব্দে) ১৫ই বৈশাখ তিনি এই মন্দির নির্মান শুরু করেন। আনুমানিক ১২৫১ বঙ্গাব্দে (১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে) মন্দিরের নির্মান শেষ হয়।”

কৃষ্ণের অক্রুরের রথে মথুরার পথে যাত্রার সময় ক্রন্দনরত ও মূর্ছিত গোপিনীগণ
কৃষ্ণের অক্রুরের রথে মথুরার পথে যাত্রার সময় ক্রন্দনরত ও মূর্ছিত গোপিনীগণ

“এত সুবিশাল মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ কী করে হয়? সরকার থেকে অনুদান আসে?” অনুপম খুব সরল ভাবে প্রশ্ন করল |

“না, এই অসাধারণ মন্দির রাজ্য পুরাতত্ব বিভাগের সংরক্ষিত মন্দিরের তালিকায় নেই। ভারতীয় পুরাতত্ব বিভাগের তালিকায়ও এই মন্দিরের নাম নেই। সম্প্রতি প্রকাশিত হেরিটেজ কমিশনের তালিকাতেও এটি ব্রাত্য। এই মন্দিরের সংরক্ষণ আর নিত্য পূজাপাঠের খরচ আসে মন্দিরের নিজস্ব ট্রাস্ট থেকে। এটা কতদিন চলবে জানা নেই।” একটু দু:খিত ভাবেই জানালাম আমি |

মা যশোদার সাথে কৃষ্ণ ও বলরাম
মা যশোদার সাথে কৃষ্ণ ও বলরাম

“আমি নিশ্চিত আমার বিদেশী ক্লায়েন্ট এটা দেখে খুশি হবে। কিন্তু ধরো যদি এটা দেখে যদি আরও এরকম মন্দির বা হেরিটেজ স্ট্রাকচার দেখতে চায়?  তাহলে তো গুড়াপ নিয়ে যেতে হবে, কী বলো?”  জানতে  চাইলো অনুপম |

“আহা, আবার এখান থেকে অতটা ঘুরে গুড়াপ যাবি কেন? যে বড় রাস্তা দিয়ে দেবীপুর  ঢুকলি, ওই রাস্তা  ধরে আর ৬ কিলোমিটার গেলেই বাঁদিকে পড়বে  বৈঁচী স্টেশন।  বৈঁচীর রেলগেট পেরিয়ে সোজা ৮ কিলোমিটার গেলেই পড়বে বৈদ্যপুর। বৈঁচী স্টেশন থেকে বৈদ্যপুরের বাসও পাওয়া  যায়।”

লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা ফলক
লক্ষ্মী জনার্দন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা ফলক

“বৈদ্যপুর? সেখানে কী আছে?” অনুপমের  চোখ  চকচক  করে উঠলো।

“বৈদ্যপুরে অনেক কিছু আছে। ১৬শ খ্রীস্টাব্দের সুবিশাল দেউল, নবরত্ন মন্দির, পঞ্চরত্ন মন্দির, কিছু সুবিশাল রাজবাড়ি, নাটমন্দির, কাছারিবাড়ি – সব মিলিয়ে একটা গোটা দিনের ট্যুর। বৈদ্যপুরের দেউল অবশ্য ভারতীয় পুরাতত্ব বিভাগের তত্বাবিধানে  রয়েছে।”

“বৈদ্যপুর এখান থেকে তো মাত্র ২০ কিলোমিটার?  চলো ঘুরে আসি….এখন তো সবে সোয়া  দশটা বাজে |” অনুপম যাওযার জন্য পা বাড়াল |

“কিন্তু তুই তো হাফ বেলার হেরিটেজ ট্যুর চাইছিলি ? তোর ক্লায়েন্টও তো তাই চায়। তাহলে  আর এখন গিয়ে কী লাভ?”  ঠাট্টার সুরে বললাম আমি |

“আরে শুধু হাফ বেলার ট্যুর প্রোমোট করবো নাকি? এটা হিট করলেই গোটা দিনের ট্যুর করাবো। চলো, চলো দেরী করে লাভ নেই। আজ দুপুরে তোমায় আজাদ হিন্দ ধাবায় লাঞ্চ করাব ।”

এরপর আর না করা যায়না। অনুপমের গাড়িতে করে বৈদ্যপুরের দিকে রওয়ানা দিলাম।

বৈদ্যপুরের ট্যুর কেমন হলো?  সে গল্প নাহয় আরেকদিন শোনাবো। আপাতত: হাফ বেলার হেরিটেজ ট্যুরের এখানেই ইতি ।

(সবকটি ছবি তুলেছেন লেখক)

কীভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন লাইনের ট্রেন ধরে দেবীপুর যেতে লাগে দেড় ঘন্টা। স্টেশন থেকে বাস বা ট্রেকার ধরে শিবতলা স্টপেজ পৌঁছতে লাগে মিনিট পনেরো।

দেবীপুর গাড়ী করে যেতে হলে বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৬ আর ন্যাশনাল হাইওয়ে ২ হয়ে যেতে হবে। গুড়াপ পেরিয়ে কিছুদুর গিয়ে দুর্গাপুর এক্সপেসওয়ে ছেড়ে বাঁদিকের সার্ভিস রোড ধরে এগিয়ে গিয়ে জৌগ্রাম রোড ধরে ডান দিক নিতে হবে। জৌগ্রাম রোড শেষ করে স্টেট হাইওয়েতে পৌঁছে ডানদিকে বাঁক নিয়ে কিছুদুর যেতেই বাঁ দিকে দেবীপুর যাওয়ার রাস্তা পড়বে।

কোথায় খাবেন

দেবীপুর স্টেশনের আশে পাশে কিছু ছোট খাটো খাবারের দোকান আছে। গাড়ী করে গেলে গুড়াপের একটু আগে অবস্থিত আজাদ হিন্দ ধাবায় ব্রেকফাস্ট সেরে নিতে পারেন ।

Advertisements

3 COMMENTS

  1. সুন্দর হেরিটেজ ট্যুর! ভাবা যায়না মন্দির রাজ্য পুরাতত্ব বিভাগের/ ভারতীয় পুরাতত্ব বিভাগের সংরক্ষিত মন্দিরের তালিকায় নেই| মন্দিরে টেরাকোটার বিভিন্ন কারুকার্য দেখে বিদেশী ক্লায়েন্ট খুশি? বৈদ্যপুরের ট্যুর কেমন হলো? এই অসাধারণ আরও বেড়ানোর ছবি ও গল্প চাই।

  2. খুব সুন্দর লেখা। এটা পুরাতত্ব বিভাগের সংরক্ষিত মন্দিরের তালিকায় নেই ভাবতে খারাপ লাগে। আরো লেখা আর ছবি চাই। হাফ থেকে ফুল ডে হবার জন্য শুভেচ্ছা রইল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.