বাংলায় বর্ষা আসুক না আসুক‚ পর্দায় আবার ফেলুদা

‘ পাঁচ ভাই সাথ সাথ / মারছে ঘুষি‚খাচ্ছে ভাত / আরও পাঁচ সাথে তার / কেমন আছেন ? নমস্কার !’

কয়েক প্রজন্মের বাঙালি কৈশোর হেঁয়ালির উত্তর দেবে‚ ‘ আপনি যেমন রেখেছেন‚ তেমনই আছি ‘ | যাঁর কল্যাণে সেই কৈশোর ছিল ক্যাপ্টেন স্পার্কের চিলেকোঠার মতোই বর্ণময়‚ সেই ফেলুদা আবার বড় পর্দায় | এর আগে ছোট-মাঝারি-বড় সবরকম পর্দায় এসেছে তাঁর অভিযান | তারবার্তার মতো অতীত আমেজ ছড়িয়ে তিনি এসেছেন বেতারেও | তবে এ বার কোনও অভিযান নয় | পর্দায় আসছে ‘ ফেলুদা’ চরিত্র | অবশ্য নিছক চরিত্র তো নয় | পরিপূর্ণ সত্ত্বাও বটে ! বাংলা ভাষায় প্রথম একজন কল্পিত কাউকে নিয়ে তথ্যচিত্র | ‘ ফেলুদা ; ফিফটি ইয়ার্স অফ রে-জ ডিটেক্টিভ ‘ | মানসপিতা সাগ্নিক চট্টোপাধ্যায় একে জার্নি ফিল্ম বলতেই ভালবাসেন | বইয়ের পাতা থেকে সেলুলয়েড হয়ে হৃদমাঝারে অবধি মগজাস্ত্রধারীর যাত্রাপথ এই ছবিতে | শুভমুক্তি ৭ জুন |

ফেলুদাকে শুধু গোয়েন্দা বলে ভাবতে নারাজ সাগ্নিক | তিনি মনে করেন প্রদোষচন্দ্র মিত্র আদপে তাঁর দীর্ঘদেহী স্রষ্টারই অল্টার ইগো | বহু চর্চিত‚ বহু অনূদিত বাঙালি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরই সাগ্নিকের লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের বর্ণময় বিষয় | ছবি করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে‚ সেটাও কম বিচিত্র নয় | ভাবনাচিন্তার সলতে পাকানো শুরু প্রায় বছর নয়েক আগে | হাতেকলমে কাজ শুরু ২০১৪-এ | কিন্তু শেষ হতে লাগল তিন বছর | মুক্তি পেতে আরও দুই | কারণ অর্থাভাব | শেষে জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রার সন্ধান দিল সোশ্যাল মিডিয়া |

নোটবন্দির জন্য যে কাজ থমকে গিয়েছিল‚ তা এগিয়ে নিয়ে গেল সোশ্যাল মিডিয়া | সোনার কেল্লা ভবানন্দকে হতাশ করলেও ফেসবুক-তহবিল নিরাশ করল না সাগ্নিককে | দুশো পনেরো জন টাকা দিয়েছেন সেখানে |
তাঁদের আশি শতাংশই পরিচালকের অপরিচিত | হাজার হাজার অচেনা ফেলুদা ভক্তের উৎসাহই তখন সাগ্নিকের এগিয়ে চলার নতুন রসদ |

এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই যে মিস্টার মিত্তিরের অনুগামীরা সবাই বাঙালি | দেশের বিভিন্ন প্রদেশ তো বটেই | এক্সট্রা আর্ডিনারি সাড়া বিদেশ থেকেও | পুণে থেকে সুদূর ইতালি | ইংরেজিতে ফেলুদার অভিযান পড়ে মুগ্ধ ভক্তরা | তাঁদের সত্যজিৎ-পরিচয় তাঁর হাত ধরেই‚ যাঁর চোখ তিনতোরেত্তোর নকল ছবিতে শ্যামাপোকা খুঁজে বের করেছিল| আর এদিকে তথ্যচিত্রের জন্য অর্থ খুঁজতে খুঁজতে পরিচালক নিজেই কবে প্রযোজক হয়ে গিয়েছেন | তাঁর এবং সোশ্যাল মিডিয়ার তহবিল মিলিয়ে একেই বলে শ্যুটিং হল | মাত্র পঁয়ত্রিশ দিনের ক্যামেরা রোলিং চলেছে পাক্কা দু বছর ধরে |

ক্যামেরা ঘুরেছে কলকাতার আনাচে কানাচে | ফেলুদা-তোপসে-জটায়ুর অভিযানে কলকাতাও একটা চরিত্র হয়ে ওঠে | এই তথ্যচিত্রেও কল্লোলিনী চরিত্র | তার রজনী সেন রোড‚ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান‚ নিউ মার্কেট ঘুরে শান্তিনিকেতন হয়ে ক্যামেরা পৌঁছেছে রাজস্থানের জয়শলমীর‚ বারমের আর পোখরান | লম্বা সময় ধরে লেন্সের ঘোরাঘুরি চলেছে কাশীর অলিগলি‚ দশাশ্বমেধ ঘাট আর জ্ঞানবাপী | জয় বাবা ফেলুনাথের ঘোষালবাড়ি আজ ছোটদের স্কুল | সাগ্নিকের ক্যামেরা চক্কর দিয়েছে পাথুরে ঘাটের সেখানেও, যেখানে এক ঝাঁক পায়রা ঢেকে রেখেছিল মগনলাল মেঘরাজের খেল খতম |

অর্থাভাব মোকাবিলা করে চিত্রনাট্য এগিয়েছে লন্ডনের যত্রতত্র | ফেলুদার গুরুর শহর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সাগ্নিকের কাজে | সেরকমই রয়েছে শান্তিনিকেতন | লালমাটির দেশেই তো ফেলুদার শেষ অভিযান‚ রবার্টসনের রুবি | তবে যা শেষ হয় ‚ তা তো কেবলই চোখে আর খাতায় কলমে | তাই ফেলুদার চারমিনারের ধোঁয়া উঠতেই থাকে কুণ্ডলী পাকিয়ে | ঠিক যেরকম স্মৃতি উঁকি দেয় কুশল চক্রবর্তীর মনে | সন্দীপ রায়ের সঙ্গে সোনার কেল্লায় পা দিয়ে | নকল ডাক্তার হাজরার সম্মোহনের বদলে সাগ্নিকের তথ্যচিত্রই বড় বয়সে ফিরিয়ে আনে মুকুলের পূর্বজন্মের স্মৃতি |

স্মৃতিচারণ করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়‚ সব্যসাচী চক্রবর্তী‚ আবির চট্টোপাধ্যয়‚ তিন ফেলুদা ও সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়‚ শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, সৌরভ দাস‚ তিন তোপসে | ধরা দিয়েছেন মোহন আগাসে‚ যিনি মগনলাল মেঘরাজ ও জটায়ু‚ দুই ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয়েছেন | তবে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন‚ তাঁরা কেউই ফেলুদা নন | তাঁরা চরিত্রের রূপকার মাত্র | ফেলুদা আসলে সেই দীর্ঘদেহী | যিনি নিজেকে ভেঙে গড়ে ধরা দিয়েছেন কখনও ফেলুদায়‚ বা সিধু জ্যাঠায়‚ জ্যাঠতুতো দাদার গুণমুগ্ধ তোপসেতে এবং অবশ্যই রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ লিখিয়ে জটায়ু হয়ে | নিক্তিতে মেপে নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছেন তাঁর কলমের চরিত্রদের মধ্যে | উপলব্ধি সাগ্নিকের | তিনি নিজের ভবিতব্য ফিল্ম ছড়া অন্যকিছু ভাবতে পারেননি কোনওদিন | সহকারী পরিচালক হিসেবে সন্দীপ রায়ের বেশ কিছু ছবিতে | এখন বানান বিজ্ঞাপনের ছবি | তার মাঝেই বহু প্রতীক্ষিত ও আকাঙ্ক্ষিত ফেলুদা তথ্যচিত্র |

তবে ফেলুদার অভিযান নিয়ে ছবি করার ইচ্ছে এই মুহূর্তে নেই সত্যজিৎ অনুরাগী সাগ্নিকের | নেই প্রোফেসর শঙ্কু বা তারিণীখুড়োকে পর্দায় আনার ইচ্ছেও | বরং তাঁর সাধ‚ সত্যজিতের অন্য কোনও গপ্পোকে বড় পর্দায় রূপদান | আপাতত রুদ্ধশ্বাস প্রহর | বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত ফেলুদার এই তথ্যচিত্র দেখে দর্শকরা ‘ নাজুখ ‘‚ ‘নাজুখ’ বলে শুভেচ্ছা জানিয়ে হাতের আঙুলগুলো বাড়িয়ে দেন কিনা‚ সে অপেক্ষায় |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.