চোপতা-য় দু’দিন ও মুখার্জিবাবুর স্মৃতি

কেদার থেকে নেমে আসাটাও হলো পায়ে হেঁটে বেশ তরতরিয়ে এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই | গোটা রাস্তা হাতের লম্বা লাঠিগুলো ঠুকতে ঠুকতে এলাম আওয়াজ করে | গৌরীকুন্ডর গলি থেকে কুড়ি টাকা করে কেনা জিনিস‚ ওরা বলেছিল যাত্রা শেষে ওয়াপস করলে দশ টাকা ফেরত পাব‚ আমরা ঝামেলা না বাড়িয়ে “জয় কেদার” বলে হাঁক ছেড়ে উঠতি একদল দেহাতি তীর্থযাত্রীর হাতে ওগুলো গুঁজে দিলাম | ওরা হাসবে কি কাঁদবে ভেবে পেল না | সেটা ছিল ২০০৪ সাল অর্থাৎ তখনও হাতে হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ঘোরার যুগ শুরু হয়নি তবে আমাদের ড্রাইভার বলে দিয়েছিল গাড়ি থাকবে শোনপ্রয়াগে‚ গৌরীকুন্ড থেকে বেরিয়ে যাওয়া যে কোনও গাড়ির ড্রাইভার মারফত খবর পাঠালেই ও গৌরীকুন্ডর নির্দিষ্ট জায়গায় চলে আসবে | আমরাও ততক্ষণে সামান্য পেটপুজো সেরে তৈরি | 

পাহাড়ে উঠতে যেমন বুকের দম লাগে নামতে গেলে পায়ের ওপর চাপ পড়ে সব থেকে বেশি | পথে আসতে তেমন বুঝিনি কিন্তু গাড়ি চেপেই সেটা ক্রমশ মালুম হতে লাগল | প্রথমে আমরা দুদিনের জন্য যাব ‘চোপতা’ তারপর সেখান থেকে বদ্রীনাথ | গৌরীকুন্ড ছাড়তেই বেশ বেলা গড়িয়ে গিয়েছিল ফলে তিন ঘন্টার রাস্তা চোপতা পৌছতেই বিকেল তিনটে বেজে গেল‚ পথে উখিমঠে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার জানাল কোনও জরুরি জিনিস-টিনিস দরকার থাকলে এখান থেকে নিয়ে নিতে‚ চোপতায় তেমন দোকানপাট নেই | হুঁশিয়ার ড্রাইভার মাত্রই দেখেছি সওয়ারিদের জরুরতগুলো ঠিক খেয়াল রাখে | খুব বড়সড় জায়গা না হলেও উখিমঠের গুরুত্ব আছে কারণ শীতের ছ”টা মাস কেদারনাথের দেবতাকে এখানেই নামিয়ে এনে পুজো করা হয় | চোপতায় থাকার জায়গা ঠিক ছিল না‚ ড্রাইভারই সব ব্যবস্থা করল |

রাস্তার ধারে নেগীর ঝুপড়ি

মূল বাজার এলাকার কিছুটা আগেই বড় রাস্তার ধারে একটা ঝুপড়ি বানিয়ে চা আর টুকিটাকি জিনিস বেচে এক ছোকরা‚ সম্প্রতি পাহাড়ের ঢালুতে খানকয়েক ঘর বানিয়ে (কটেজ বললে বোধহয় আরও ভালো শোনায়) ভাড়া দিচ্ছে | ওই ঝুপড়িতেই রানাবান্না চালায় আর রুম সার্ভিস দেয় | ব্যবস্থা খারাপ নয় তাছাড়া ঘরে বসেই সামনে তিন দিক জুড়ে হিমালয়ের দৃশ্য |

নেগী

ছোকরা জানাল ওর নাম নেগী‚ আসলে এটা ওর পদবি এবং এ অঞ্চলে সবারই তাই | নাম বলেনি তাই আমরা ওকে নেগী বলেই ডাকতাম | দেখলাম আজ ওদের খুব ফুর্তি‚ আমাদের জন্য নয়‚ ওদের ঘরগুলোতে বিদ্যুৎ এসেছে বলে | 

পায়ের টনটনানিতে সেদিন বেশি হাঁটাহাঁটি করা না গেলেও গোটা সন্ধে ঘরের সামনে পাহাড়ের ধারে আকাশের নিচে বসে তারা গুনে চমৎকার কাটল | পরদিন যাবার কথা তুঙ্গনাথ | চোপতা থেকে পাহাড় বেয়ে চার কিলোমিটার পথ উঠে প্রায় ১২ হাজার ফিট ওপরে রয়েছে পৃথিবীর সব থেকে উঁচু শিবমন্দির | সকাল সকাল হাঁটা শুরু করলে তুঙ্গনাথ তো বটেই সেই সঙ্গে একধাপ ওপরে চন্দ্রশিলা পাহাড়চূড়োটা অবধি গিয়েও ঘুরে আসা যায় দিনে দিনে | কিন্তু পায়ের এই ব্যথা নিয়ে দেখলাম হাঁটা খুব মুশকিল‚অগত্যা চলো খচ্চরের পিঠে | দেব দর্শন ছাড়াও তুঙ্গনাথের আকর্ষণ হলো এখান থেকে চৌখাম্বা কিংবা নন্দাদেবীর মতো বিখ্যাত চুড়োগুলো যেন হাতের নাগালের মধ্যে এসে যায় | অথচ আমরা কিচ্ছু দেখতে পেলাম না কারণ গরমকালে মাঝে মধ্যেই নিচ থেকে একটা ভাপ মতো উঠে এসে চারদিক একেবারে এমন ঘোলাটে করে তোলে‚ মনে হবে যেন একটা রংচটা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছি‚ কথায় বলে না “পাহাড় কা মর্জ্জি” |

দুত্তোর বলে আমরা চন্দ্রশিলা অবধি আর কষ্ট করে উঠলামই না‚ তার ওপর ঠান্ডা কনকনে হাওয়া প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে‚ খামোখা সেটা হজম করার কোনও মানে হয় না | মন্দিরে ওঠার পথে নিয়মমাফিক বেশ কিছু দোকানপাট ছাড়াও পাথরের চালওলা খান কয়েক বাড়িঘর চোখে পড়ল | এগুলো থাকার জন্য ভাড়া পাওয়া যায়‚ দুজন মাঝবয়সি বাঙালি মহিলার সঙ্গে আলাপ হলো যাঁরা এখানে এসে রয়েছেন বেশ কয়েকদিন হলো এবং যদিও এরকম ঝাপসা অবস্থার মধ্যেই কাটাচ্ছেন নাহলে এমন জায়গায় রাত্রিবাস করার মজাই আলাদা |

আমাদের ঘর থেকে দেখা যেত এই দৃশ্য

চোপতা থেকে সূর্যাস্তের যে দৃশ্য নাকি একেবারে ধন্য ধন্য করার মতো এ যাত্রায় সেটাও আমাদের অদেখা থেকে গেল স্রেফ প্রকৃতির এক গভীর ষড়যন্ত্রে | হাতে সময় থাকলে আশপাশের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যেত‚ তাও হলো না‚ তবে এখানে সত্যি চোখে পড়ার মতো জিনিস কেঁদো চেহারার কালো মিশমিশে কাকগুলো যা সুকুমার রায়ের সেই কাকেশ্বরকে অনায়াসে লজ্জায় ফেলে দিতে পারে |

মঙ্গল সিং‚ যাঁদের বাড়িতে এসে উমাপ্রসাদবাবু থাকতেন

ওরই মধ্যে কাছেপিঠে ঘুরে ঘুরে স্কেচ করছি‚ অনেকে দাঁড়িয়ে দেখছে‚ কথায় কথায় যেই না জেনেছে আমি কলকাতার বাঙালি অমনি হইহই করে একজন বলে উঠল”উধার বাঙ্গালীবাবু হ্যায়‚ যাইয়ে”‚ তারপর নিজেই নিয়ে গিয়ে হাজির করল তুঙ্গনাথ ওঠবার রাস্তায় একটা একতলা পুরনো কাঠের বাড়ির সামনে যেখানে পাহাড়ি টুপি পরা এক বয়স্ক লোক বসেছিলেন‚ ভাবলাম ইনিই বোধহয় সেই বাঙ্গালীবাবু‚ তারপর জানা গেল এঁর নাম মঙ্গল সিং এবং ওই বাড়ির সামনের ঘরটায় এসে থাকতেন উমাপ্রসাদ মুখার্জি‚ গোটা গাড়োয়াল যাঁকে চেনে মুখার্জিবাবু বলে |

ঘরটা মঙ্গল সিংদের এবং ওই হিমালয়প্রেমী আশ্চর্য মানুষটির অনেক কথাই উনি জানেন যা চোপতায় কোনও বাঙালি টুরিস্ট এলেই অমনি বলার জন্য ছটফট করেন | ঘরটায় একটা ন্যাড়া তক্তপোষ আর মাঝারি সাইজের নড়বড়ে টেবিল ছাড়া বিশেষ কিছুই দেখলাম না তবু সেই উমাপ্রসদের চোপতার আস্তানার হদিস পেয়েছি ভেবে সামান্য রোমাঞ্চিত বোধ করলাম বৈকি | চৌখাম্বা না দেখতে পারার দুঃখ এতে কিছুটা লাঘব হয়ে গেল হয়ত |

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

3 Responses

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই