বেলা গড়িয়ে গেল…গাড়ির সময় পেরিয়ে গেল…ভাই তো আসছে না…

1889

দুর্গার চলে যাওয়ার অনেক বছর পর অপুর বড় সাধ হল দিদির হাত থেকে ভাইফোঁটা নেওয়ার  | ব্যস্ত কলকাতার মেসবাড়িতে বসে খেয়ালী অপু চলে গেল নিশ্চিন্দিপুর  | দিদির সাহচর্যে‚ নিজের শৈশবে  | অজান্তেই বোধহয় তার হাতে উঠে এল কাগজ-কলম  | নেই রাজ্যের দেশে চলে যাওয়া দিদিকে চিঠি লিখতে বসল সে  |
এমনই এক কাল্পনিক পরিস্থিতির কথা কল্পনা করে সেই চিঠির কথা ভাবতে বসলেন দীপান্বিতা রায়  |

শ্রীচরণেষু দিদি‚

এত ভক্তিভরে আমি অবশ্য তোকে কখনওই ডাকিনি | কিন্তু কী করব‚ চিঠিতে এমনতর সম্বোধন করাটাই তো রেওয়াজ | বয়সে যে বড় | ভক্তি ভরে না বললে যদি আবার রেগে যাস ! যদিও রেগে যে তুই আছিস‚ সে তো আমি জানি | তোর পোস্টকার্ডের চার ছত্রের চিঠিখানা ঠিক সময়েই পেয়েছিলাম | কিন্তু একবার চোখ বুলিয়েই সেটা যে কোথায় রাখলাম‚ সেকথা এখন আর মনেই করতে পারছি না | চোখের সামনে না থাকায় যা হওয়ার তাই হল | ভুলেই গেলাম চিঠিখানার কথা | আসলে জানিস তো এরজন্য দায়ী এই কলকাতা শহরখানা | বড় বেশি নানারকম আওয়াজে ভরপুর |

বৈঠকখানা বাজারের কাছে যে মেসবাড়িটায় আমি থাকি‚ তার কাছেই একখানা ছোট লোহালক্কড়ের কারখানা আছে | ভোর না হতেই সেখানে ভোঁ বাজে বিকট সুরে | কানের ওপর বালিশ চাপা দিয়ে যে একটু ঘুমোনর চেষ্টা করব‚ তারও উপায় নেই | রাস্তা দিয়ে ঘড়ঘড় ঘড়ঘড় আওয়াজ করে শুরু হয়ে যায় ট্রামের আনাগোনা | তাদের টংটং ঘণ্টার আওয়াজেরও জোর কিছু কম নয় | এরমধ্যেই আবার চলে রাস্তা ধোয়ার কাজ‚ মেথরদের ঝাড়ুর ঝড়াং ঝড়াং | তারপর আসতে শুরু করে বৈঠকখানা বাজারের ব্যাপারীরা |

সব আওয়াজ মিলেমিশে মাথার মধ্যে এমন তালগোল পাকিয়ে যায় যে ভুল হয়ে যায় অনেক কিছুই | জানিস দিদি‚ মা বেঁচে থাকতে আমি যখন মনসাপোতা যেতাম‚ সকালে ঘুম থেকে না উঠলে‚ মা ডালে সম্বরা দিত না | যদি ফোড়নের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায় | মা যদি একরাত আমার এই মেসের ঘরখানায় কাটাত‚ তাহলেই বুঝে যেত‚ আজকাল আর তার অপুর অত সহজে ঘুমের ব্যাঘাত হয় না |

আমি জানি‚ এতক্ষণে মায়ের মত তুইও ভাবতে শুরু করেছিস‚ আহা রে‚ এত গোলমালের মধ্যে আমার ভাইটা ঘুমোয় কী করে ? আমাদের নিশ্চিন্দিপুরে তো সকাল থেকে পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দই শোনা যেত না | বাড়িতে ঢোকার মুখে যে বাঁশঝাড়টা ছিল‚ তার শুকনো কঞ্চিতে বসে রোজ সকালে শিস দিত হলুদ রঙের ল্যাজঝোলা পাখিটা | শুনলেই বুঝে নিতাম আলো ফুটে গেছে | আমাদের বাড়িটাও অবশ্য ছিল একেবারে একটেরে | পাশে নীলমণি রায়ের ভিটে | তাতে তো আবার কোনওকালে লোকজন থাকতে দেখিনি | বাবার মুখে শুনেছি তিনি মারা যাবার পর বাড়ির লোকজনরা নিশ্চিন্দিপুরের পাট তুলে দিয়েছিল | ভাঁটশেওড়ার জঙ্গল গজিয়েছিল | একটু বৃষ্টি পড়লেই কচু গাছের কালচে পাতাগুলো চকচক করত | সন্ধের মুখে সেদিকে তাকালে আমার কেমন যেন ভয়ভয় করত | ভুবন মুখুয্যেদের বাড়িও তো কতটা দূরে | পটলিদের রোয়াকে পিদিম জ্বাললে গাছ-পালার ফাঁকে দেখা যেত ঠিকই‚ কিন্তু কথাবার্তা শোনা যেত না | তবে সেজ জেঠিমার কথা অবশ্য আলাদা | ওনার গলাতো সেই গাবতলা থেকেই শুনতে পেতাম |

তোর মনে আছে‚ সেই কালবোশেখী ঝড়ের পর আমরা দুজন সোনামুখী আমগাছের তলায় আম পড়েছে কীনা দেখতে গিয়ে একটা নারকেল কুড়িয়ে পেয়েছিলাম | বাব্বা ! আমাদের নারকেল কুড়োতে দেখে সেজ জেঠিমার কী চিৎকার‚ কী চিৎকার | শেষকালে মা বলল নারকেল ফেরত দিয়ে আসতে | আমার খুব রাগ হয়েছিল | কেন ফেরত দেব ? ও নারকেল তো আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি | মা বলেছিল আমায় নারকেলের বড়া করে দেবে | কিন্তু সেজজেঠিমার শাপ-শাপান্ত শুনে ভয় পেয়ে গেল | পাড়ার লোকে তো মাকে মুখরাই বলত | কিন্তু আমার কেমন যেন মনে হয়‚ মা আসলে চিরকালই ভারী ভীতু ছিল |

গরিব ঘরের বউ‚ ভীতু না হয়ে উপায় কী বল ? তবু বাবা যতদিন বেঁচে ছিল‚ ততদিন মনে খানিকটা জোর ছিল | বাবার মৃত্যুর পর বড় অসহায় দেখাত মাকে | দ্যাখ দিকিনি‚ কী কথা থেকে কোথায় এসে পড়লাম | হচ্ছিল কলকাতার গণ্ডগোলের কথা‚ যে গোলমালে মাথা গুলিয়ে যায় আমার‚ সেখান থেকেই এসে পড়লাম নিশ্চিন্দিপুরে | আসলে এমনটাই হয় আমার | এক কথা ভাবতে ভাবতে অন্য কথায় এসে পড়ি | তুই হয়তো ভাবছিস‚ এতই যখন ঝামেলা‚ তখন কলকাতায় থাকা কেন বাপু ? মনসাপোতায় তো ভিটেখানা আছে এখনও | আসলে কী জানিস দিদি‚ এই ধোঁয়া-ধুলো আর ট্রামের ঘড়ঘড়ে আওয়াজে ভরা কলকাতাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি | এখন আর মাঝে মঝে বিরক্তি লাগলেও ছেড়ে যেতে মন চায় না |

কতরকম মানুষ থাকে এখানে | মেসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক একদিন দেখি | কত রকম কাজে লেগে থাকে সবাই | ভারী ব্যস্ত | হনহনিয়ে হাঁটছে | মশমশিয়ে ছুটছে | কারুর পরনে ফর্সা ধপধপে ধুতি-জামা‚ কারুর আবার খাটো কাপড় আর উড়ুনিটুকুই সম্বল | দুবেণী বেঁধে‚ আঁটসাঁট করে কাপড় পরে মেয়েরা ইস্কুলে যায় | তাদের দেখলেই আমার তোর কথা মনে পড়ে | ছোটবেলায় তোর কপালে ওপর দু-তিন গোছা রুক্ষ চুল সর্বদা উঁচু হয়ে উড়ত | দেখলেই কেমন যেন মায়া হত আমার | সেই যে যেদিন টুনুদিদির পুঁতির মালা চুরি করার জন্য মা তোকে খুব মারল‚ সেদিনও তোর কপালের ওপর এক গোছা রুক্ষ চুল উড়ছিল | স্পষ্ট মনে আছে আমার | কানের পাশে খুব জোরে মেরেছিল মা | রক্ত বেরিয়ে গেছিল | সেদিন রাতে তুই ঘুমিয়ে পড়লে আমি চুপিচুপি উঠে পিদিমের তেল লাগিয়ে দিয়েছিলাম |

অনেক কথা লিখছি তোকে | কিন্তু আসল কথাতেই আর আসতে পারছিনা কিছুতেই | আসলে জানি তো আসল কথাটা শুনলে তুই আমার ওপর খুব রেগে যাবি | তাই এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি‚ তুইয়ে-বুইয়ে তোর মনটাকে একটু নরম করার | নিশ্চিন্দিপুরের কথা‚ আমাদের ছোটবেলা‚ তোর পুণ্যিপুকুর ব্রত‚ চিনিবাসের মেঠাই‚ এইসব গল্প শুনলে তোর যে মন নরম হয়ে যাবে সে তো আমি জানি | এইবার তাহলে বলি শোন‚ তোর লেখা পোস্টকার্ডখানা আমি আসলে হারিয়ে ফেলেছি | সেই যে পিওন এসে দিয়ে গেল আর আমি পড়ে নিয়ে কোন বইয়ের মধ্যে গুঁজে রাখলাম‚ সে তো আর মনেই নেই | তারপর তো তার কথা ভুলেই গেছি |

এদিকে আজ সকালে হঠাৎ শুনি চারপাশের বাড়ি থেকে ঘনঘন শাঁখের আওয়াজ আসছে | ব্যাপারখানা বুঝতে পারছি না | মেসে আমার ঘরে যে ছেলেটা থাকে সে কাল রাতে বাড়ি গেছে | তাই কাউকে জিজ্ঞাসা করারও উপায় নেই | এমন সময় ছোকরা চাকরটা এসে বলে কীনা‚বাবু আমায় একটা টাকা ধার দেবে ?

আমি বললাম‚ কেন রে‚ হঠাৎ টাকার দরকার হল কেন ?

একমুখ হেসে বলল‚ কাজ সেরে দিদির বাড়ি যাব তো‚ মিষ্টি কিনতে হবে না ?

অমনি মনে পড়ে গেল‚ আজ তো ভাইফোঁটা | ফোঁটা দিতে যাওয়ার জন্য চিঠি লিখেছিলি তুই | সে চিঠি হারিয়ে ফেলেছি | তারিখও ভুলে গেছি | যাওয়ার ট্রেন ইস্টিশন ছেড়ে চলে গেছে কোন সকালে | কী হবে তাহলে ? আর কোনও উপায় না দেখে চিঠি লিখতে বসলাম তোকে | জানি এ চিঠিও ডাকবাক্সে দিতে পারব না | দেব কেমন করে বল ? তোর ঠিকানাই যে জানি না আমি | সেই কত্তদিন আগে আমাদের সবাইকে ছেড়ে কোন এক নেই ঠিকানার দেশে পাড়ি দিয়েছিস তুই | তোর পুতুলের বাক্স‚ সিঁদুরকৌটো গাছের আম‚ বেত ফলের ঝোপ‚ রেললাইনের ধারে কাশফুলের জঙ্গল সব যেমন ছিল ঠিক তেমনটি আছে‚ শুধু তুই কোথাও নেই |

প্রথম প্রথম রাতে ঘুম আসত না | তারপর আস্তে আস্তে সয়ে গেছে | কিন্তু তবু ভাইফোঁটার দিনটা এলে মন যেন কিছুতেই বাঁধ মানে না | ভাবতে ভারী ভাল লাগে‚ আমারও দিদি আছে | ফোঁটা নিতে যাওয়ার জন্য চিঠি লিখেছে আমাকে | চিঠি আমি হারিয়ে ফেলেছি | কিন্তু সে তো জানে না | তাই চন্দন বেটে‚ দুব্বো গুছিয়ে‚ পায়েস রেঁধে অপেক্ষা করছে আমার জন্য | উপোস করেছে সকাল থেকে | মনে মনে মাঝে মাঝে আওড়ে নিচ্ছে দুছত্রের মন্ত্রটা | কিন্তু বেলা গড়িয়ে গেল | গাড়ির সময় পেরিয়ে গেল | ভাই তো আসছে না | একসময় সাজানো থালার সামনেই মাটিতে আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়লি তুই | ক্লান্ত-উপোসী শরীরে ঘুম নেমে এল | তারপর সেই ঘুমের রেলগাড়িতে চেপে আমরা দুজনে পৌঁছে গেলাম নিশ্চিন্দিপুরে | সেখানে তো মা সব ব্যবস্থা করেই রেখেছে | সামনে বসে বাঁ হাতের কড়ে আঙুল ঠেকালি আমার কপালে | আর অমনি যমের দুয়ারে কাঁটা পড়ল আমার |

নেই ঠিকানার দেশে ভাল থাকিস দিদি | একদিন তো আমিও সেখানে যাব | তখন আমরা দুজনে মিলে রেলগাড়ি দেখতে যাব‚ কেমন |

–ইতি
তোর অপু

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.