গা ধুয়ে কাঁচা হলুদ বেগমবাহার শাড়ি পরেছি…তুমি কুঁড়ি সুদ্ধ স্বর্ণচাঁপা আমার খোঁপায় গুঁজে দিয়ে বললে‚ বউঠান আজ আমি কবিতা পড়ব শুধু তোমার জন্য

দুর্জনেরা বলে‚ তাঁর সুইসাইড নোট সামনে আসতে দেয়নি ঠাকুরবাড়ির  প্রভাবশালী হাত  | কিন্তু এরকম কি হতে পারত‚ শ্রীমতি হে‚ তাঁর মনের সব লুকিয়ে থাকা অবহেলা-অপমান-অভিমান-দুঃখ-কষ্ট জানিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন শুধু তাঁর আদরের ঠাকুরপো রবির কাছ থেকে  ? হয়তো‚ আর কাউকে কিচ্ছু জানানোর ছিল না এই কালো মেয়েটির  | তাই‚ শুধু রবিকে জানিয়েই বিদায় নিতে চেয়েছিলেন নীরব এই অভিমানিনী  | কেমন হত সেই চিঠি‚ যেটা কাদম্বরী দেবী লিখতেন কবি ভানুসিংহকে  ? ভাবলেন দীপান্বিতা রায়  |

প্রিয় রবি‚

আজ সকাল থেকেই বড় উন্মনা লাগছে | কেমন যেন মনে হচ্ছে তোমাকে কিছু কথা জানানোর আছে | সেগুলো তাড়াতাড়ি জানিয়ে দেওয়া দরকার | দিন যত গড়াল‚ মনের অস্থিরতাও দেখি তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে | শেষকালে‚কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়লাম চিঠি লিখতে | কী জানি পরে হয়তো আর বলার সময় পাব না | কিংবা হয়তো ভুলেই যাব | আজকাল তো অনেক কথাই মনে রাখতে পারিনা | মনের ভিতরটা সবসময় কেমন যেন ফাঁকা | যেন একটা শূন্য গহ্বর‚যার তল খুঁজে পাওয়া কঠিন |

আজ বাড়িটাও বড় ফাঁকা ফাঁকা | কে কোথায় গেছে কে জানে ? আজকাল বাড়িটা ফাঁকাই থাকে | অথচ আগে কেমন গমগম করত | আমার যেদিন বিয়ে হল‚কত লোক কত লোক | কাউকে তো তখন চিনিই না | ভয় পেয়েছিলাম খুব | মাত্র যে ৯বছর বয়স | খুব কাঁদছি দেখে‚মা পিঠে হাত বুলিয়ে চুপিচুপি বলল‚ কাঁদছিস কেন বোকা ? ঘর থেকে দু পা গেলেই তো শ্বশুরবাড়ি | যখন ইচ্ছে হবে তখনই চলে আসবি | কক্ষণও যাওয়া হয়নি‚ জানো | আসলে মা তো জানতই না যে ঠাকুরবাড়ির এই সিঁড়ি বেয়ে একবার উপড়ে উঠে এলে‚ সেরেস্তার শ্যাম গাঙ্গুলির বাড়ি আর যাওয়া যায় না |

তোমার মনে আছে রবি‚বিয়ের দিন আমাকে দেখে তোমার মনে হয়েছিল ঠিক যেন রূপকথার রাজকন্যেটি | আসলে তখন তো আমার গা ভরা অনেক গয়না | গলায় সীতাহার‚ হাতে বাজুবন্ধ‚ গায়ে নূপুর | মিথ্যে বলব না | মনে মনে একটু গর্বও হয়েছিল | ছোট থেকে শুনেছি আমি কালো মেয়ে | অথচ দ্যাখো আমার কপালেই কী না জুটল রাজপুত্তুর |

একটু আগেই আমার ঘরের সামনের খোলা ছাদে কাপড় মেলে দিয়ে গেল দাসীরা | এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি রোদদুরে দেওয়া আছে আচারের বোয়েম | নেহাতই একটা কেজো খোলা জায়গা | অথচ জানো‚ বিয়ের পর‚ একদিন রাতে এই খোলা ছাদের দাঁড়িয়েই তোমার জ্যোতিদাদা আমাকে বলেছিলেন‚

তুমি আমার স্ত্রী‚আমার সহধর্মীণী | তোমাকে আমি আমার মনের মত করে গড়ে নেব | সেদিন ছিল অমাবস্যা | চাঁদ নেই | কিন্তু আকাশ জুড়ে তারার ফুল ছড়ানো | অস্পস্ট দেখা যাচ্ছে ছায়াপথ | মনে হচ্ছিল যেন আমরা দুজনে তারার আলোয় আকাশগঙ্গার স্রোতে নৌকা ভাসিয়েছি | বাবামশাইয়ের নির্দেশ আর তোমার দাদার ইচ্ছেয় বিয়ের পরেই তো পড়াশোনা শুরু হল আমার |

তোমার সঙ্গে বসে মেঘদূত পড়তাম | তুমি ইস্কুল থেকে ফিরে আমার মাখা চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি দিয়ে পান্তাভাত খেতে ভারী ভালবাসতে | সেসব দিনে আমার পুতুলের বিয়েতে তুমিই ছিলে একমাত্র অথিতি | তখন বড় হচ্ছিলাম আমরা | তোমার নাকের নিচে রোমের রেখা ঘন হচ্ছিল | ঢেউ জাগছিল আমার বুকে | বদলে যাচ্ছিল ঠাকুরবাড়িও |

বাবামশায়ের ইচ্ছেয় মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে | অন্দরের পর্দা উঠে গেছে অনেকখানি | গান আর কবিতা পাঠের আসর বসছে ঘন ঘন | তুমি তখনও শ্রোতা‚আমিও তাই | দিনগুলো যেন অনায়াসে সোনালি ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যেত প্রজাপতির মতো | কেন জানি মনে হয়‚সেসব দিনে তোমার দীঘল চোখে থাকত কীসের যেন অনমনা স্বপ্ন | আমাকে দেখলেই গাঢ় হত সেই স্বপ্নের রঙ |

একদিনের কথা আজ ভারী মনে পড়ছে | শ্রাবণী পূর্ণিমা | ছাদে বসবে কবিতার আসর | বিহারীলাল আসবেন | গা ধুয়ে কাঁচা হলুদ বেগমবাহার শাড়ি পরেছি | তুমি এলে ঘরে | হাতে কুঁড়ি সুদ্ধ স্বর্ণচাপা | আমার খোঁপায় গুঁজে দিয়ে বললে‚ বউঠান আজ আমি কবিতা পড়ব শুধু তোমার জন্য | তুমি কিন্তু আজ অন্য কারুর কবিতা শুনতে পারবে না |

শিউরে উঠেছিল আমার সমস্ত শরীর | এমন অধিকারের দাবি যে আমার স্বামীও কোনদিন করেননি | আমারও কখনও সাহস হয়নি এমন নিবিড় করে তাঁর কাছে কিছু চাওয়ার |

জানো রবি‚ আজকাল আমার বড় একলা লাগে | ইচ্ছে করে কোলজুড়ে থাক কচি একখানা মুখ | কিন্তু ঈশ্বর কেন জানি না সে সাধ মেটাতে একটুও রাজি নন | এই বেম্মবাড়িতে মনের মত করে তাঁকে যে একটু ডাকব‚তারও তো উপায় নেই | ঊর্মিলাও চলে গেল আমার কোল খালি করে | স্বর্ণঠাকুরঝি কত ভরসা করে দিয়ে ছিল আমায় | ঊর্মিলা যেদিন চলে গেল বড় ইচ্ছে করছিল স্বামীর কোলে মুখ গুজেঁ কাঁদি | কিন্তু তাঁকে তো কাছেই পেলাম না | তুমি শুধু ছিল আমার কাছে | সবার কাছ থেকে যেন আড়াল করে রাখতে চাইছিল আমায় |

আজ একটা গোপন কথা তোমায় বলি | আমার স্বামী যখন সরোজিনী নাটক লিখলেন‚তখন ভারী আনন্দ হয়েছিল | রোজ উনি যতটুকু লিখতেন‚ পড়ে শোনাতেন আমাকে | কিন্তু সেই নাটক এখন আমার দুচক্ষের বিষ | সরোজিনী নাটক করতে গিয়েই তো বিনোদিনীর সঙ্গে আলাপ হল তোমাদের নতুনদাদার | এখন সেখানে তাঁর নিত্য যাতায়াত | সে নাকি খুব সুন্দরী | রামবাগানের মেয়ে | ছলাকলাও জানে কত | তুমিই বলো কী করব আমি ?

বাবামশাই তো এখন বাড়িতেই | তাঁর কাছে গিয়ে নালিশ করি ? কথাটা লিখে হেসে ফেললাম নিজের মনেই | আমি তো জানি এবাড়ির ছেলেরা রাজপুত্তুর | ওসব সামান্য দোষে তাদের গায়ে ধুলো লাগে নাকি !

তবে ঠাকুরবাড়ির বউয়ের মত করে স্বামীর মন ঘোরানোর চেষ্টা কিন্তু আমি করেছি | ছাদের আসরে ফিরোজা রঙের বালুচরী পরে খোঁপায় পাতাসুদ্ধ গন্ধরাজ লাগিয়ে বসেছি | অক্ষয় আর বিহারীলালের মুগ্ধ দৃষ্টি ঘুরেফিরে এসেছে আমার দিকেই | আমি ইচ্ছে করে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি হেসে হেসে | নিজের হাতে এগিয়ে দিয়েছি জলখাবারের থালা | আমার স্বামীও আছেন সেখানে | চাইছি ঈর্ষা হোক তাঁর | ছাদের আসর তাড়াতাড়ি ভেঙে দিয়ে চলে যেতে বলুন অক্ষয় আর বিহারীলালকে | কিন্তু জানো‚ কিচ্ছুই খেয়াল করলেন না তিনি | আমার অমন মোহন রূপ‚কাজলপরা চোখের কটাক্ষ‚কিচ্ছু না | বরং সন্ধে একটু গড়াতেই বললেন‚ তোমরা তাহলে কবিতা পড়‚আমি বরং একটু ঘুরে আসি | আমি জানতাম কোথায় যাবেন তিনি |

সেদিন রাতে আসর ভাঙার পর তোমাকে দেখে চমকে উঠেছিলাম | যে দৃষ্টি আমি স্বামীর চোখে দেখতে চেয়েছিলাম তারই যেন প্রতিফলন সেখানে | খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে আমার হাতদুটি ধরে তুমি বললে‚ বউঠান তোমার নামের মানে তুমি জানো ? আমি বলেছিলাম‚ অনেক কাল আগে তোমার দাদা বলেছিলেন‚ এই নামে নাকি এক কাব্যগ্রন্থ আছে | বাণভট্টের লেখা | তুমি বললে‚ তোমার নামের আরও একটা মানে আছে‚ সুরা | আজ থেকে মনে রেখ সুরাপানের অধিকার সবার থাকে না‚ সুরা উপভোগ করার সৌভাগ্যও সবার হয় না |

তুমি বিলেত যাওয়ার আগে আমরা গেলাম শ্রীরামপুরের বাড়িতে | তোমার জ্যোতিদাদার সেখানে মন বসত না | তিনি চলে আসতেন কলকাতায় | বর্ষার আকাশের মত নিবিড় ঘন বিষণ্ণতা জুড়ে বসত আমার মনে | সেই মেঘ ভেঙে জল ঝরিয়ে চারদিকে বানভাসি করিয়ে দিতে তুমি | ভরা বাদরে আমার মনের শূন্য মন্দির ভরে উঠত তোমার মনের কোমল ছোঁয়ায় | ভেসে যাচ্ছি বুঝেও বাঁধ দিতে পারিনি | তুমি যে আমার বড় আদরের | আমার একলা মনের একমাত্র সঙ্গী |

সেইজন্যই তো তুমি যখন বিলেতে ছিলে দিন যেন কাটতেই চাইত না আমার | একটা মানুষ নেই যার সঙ্গে মনের কথা বলি | অন্দরের মেয়েরা আমার উদাস ভাব দেখে কানাকানি করত | স্বামী তো তখন বাড়িই আসেন না | ভারী নাকি ব্যস্ত | অথচ মেজ বউঠানের বাড়ি যাওয়ার সময় হয় তাঁর | আসর বসে সেখানেই | আমি যে একলাটি পড়ে থাকি বাড়িতে‚ তা নিয়ে আপত্তি করে না কেউ | আমি কালো‚ আমি বাঁজা | স্বামীকে আমি ধরে রাখতে পারিনি | অথচ দ্যাখো স্বামী যেমনটি চেয়েছিলেন তেমনটিই তো তৈরি করেছি নিজেকে | আমি তো জ্যোতি ঠাকুরের বায়না দেওয়া কুমোরপাড়ার পুতুলটি | তবু কেন পছন্দ হয় না তাঁর ?

তুমি আমার নাম দিয়েছিলে হেকেটি ঠাকরুণ | ভুলেই গেছিলাম সে নাম | সেদিন হঠাৎ মনে পড়ল | তোমার জ্যোতিদাদার উদ্যোগেই বেরোন হয়েছিল স্টিমারযাত্রায় | অনেকদিন পর মনে হচ্ছিল আমিই যেন ম্যাকবেথের ডাইনি | পুরুষদের মুণ্ডু চিবিয়ে খেতে পারি অনায়াসে | সে কী উন্মাদনা | জ্যোতি ঠাকুর সুর করছেন আমার দিকে তাকিয়ে | অক্ষয় কথা বসাচ্ছে তাতে | লেখা হল মানময়ী | তুমি ফিরলে বিলেত থেকে | মেজ বউঠানও | বাড়িতেই হবে মানময়ীর অভিনয় | আমি শচী | ইন্দ্র হবেন আমার স্বামী | এ যেন আমার অগ্নিপরীক্ষা | অভিনয়ের মঞ্চে বিনোদিনীকে  হারিয়ে জিতে নিতে হবে আমার স্বামীকে | আসর ভেসে গেল করতালির বন্যায় | তোমার দুচোখ যেন পুড়িয়ে দিল আমায় | কিন্তু ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি‚ হার হয়েছে আমার | যাঁকে জয় করার জন্য এত আয়োজন তাঁর মনে আঁচড়টুকুও কাটতে পারিনি | পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেছে আমার কাছে | বেঁচে থাকা এখন মূল্যহীন |

তবু তোমার হাত ধরেই ফিরেছিলাম জীবনে | মোরাম সাহেবের বাংলোয় আবার আমরা তিনজনে | কিন্তু অন্ধকার যেন কাটছে না কিছুতেই | বিলেত যাত্রা বাতিল করলে তুমি | শুনলাম আমার আফিম খাওয়ার ঘটনায় বাবামশাই নাকি বিরক্ত হয়েছেন | আচ্ছা রবি‚ বাবামশাই তো মহাজ্ঞানী‚ ঋষি‚ আমার বেদনা তাঁকে ছুঁয়ে গেল না এতটুকুও ?

এরমধ্যেই তোমার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল | যশোরের গ্রামের মেয়ে ভবতারিণী | আজকাল জানো‚ এবাড়ির ছেলেদের বিয়ের কথা শুনলেই আমার ভয় হয় | আবার একটা কচি প্রাণকে তার শিকড় থেকে উপড়ে আনা | তাকে নিয়ে পুতুলখেলা | খেলা শেষে কী হবে কেউ জানে না | সবাই তো আর মেজবউঠান হতে পারে না | আমিও পারিনি |

মাঝে মাঝে মনে হয় আমি বোধহয় বড্ড আলাদা রকম | ঠাকুরবাড়ির মাজাঘষা সত্ত্বেও পালিশ যেন ঠিকমত গায়ে লাগেনি |  বিয়ে হয়ে গেল তোমার | ভবতারিণী নাম বদলে হয়েছে মৃণালিণী | এবার মানুষটাকেও বদলে ফেলা হবে | মেজবউঠানের বাড়িতে চলছে তারই প্রস্তুতি | স্বামীর মনের মত হয়ে উঠতে হবে তো তাকে | মাঝে মাঝে মনে হয়‚ এ বাড়ির এই স্বামীর মনের মত হয়ে ওঠার কথাটায় একটা মস্ত ফাঁক আছে | মনের মতন অমন একা একা হয়ে ওঠা যায় নাকি ? স্বামীকেও তো আসতে হবে স্ত্রীর মনের কাছাকাছি | হৃদয়ে হৃদয় স্পর্শ করলে তবেই না মিলন |  

জানো রবি‚ আজকাল মাঝে মাঝেই আমার বড় রাগ হয় | বুকের ভিতরটা অভিমানে ফুলে ফুলে ওঠে | আচ্ছা কী দরকার ছিল বলো তো‚ বহুদূর সম্পর্কের আত্মীয় শ্যাম গাঙ্গুলির কালো মেয়েটাকে এবাড়ির বউ করে আনার ? বাবা তো কন্যাদায় উদ্ধারে বাবামশায়ের কাছে হাত পাতেননি | বেশ তো সাধারণ গেরস্তবাড়িতে বিয়ে হত | এত গান-কবিতা-নাটক এসব থাকত না সেখানে | রেঁধে-বেড়ে‚ বাসন মেজে দিব্যি কাটিয়ে দিতুম | হয়তো আমার মাটির বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে ফিটন গাড়ি হাঁকিয়ে যেতেন ঠাকুরবাড়ির রাজপুত্তুররা | দূর থেকে দেখতুম তাদের | সেই বেশ ভাল হত |

তুমি আজকাল নতুন বউয়ের সঙ্গে মেজবউঠানের ওখানেই থাকো | মাঝে মাঝে ভারী ইচ্ছে করে তুমি এ বাড়িতে আসো | দক্ষিণের বারান্দায় বসে আমায় নতুন কবিতা পড়ে শোনাও | তোমার চোখের তারার অন্তহীন প্রেম আমাকে আনন্দের গহনে ডুবিয়ে দিক | ইচ্ছে করে তোমাকে আঁকড়ে ধরে এই গহীন অন্ধকার থেকে ভেসে উঠি | বড় ইচ্ছে করে | কিন্তু তা হয় না | তোমার জীবন তোমার জ্যোতিদাদার মত হবে না | হতে দেব না আমি‚ কিছুতেই না | তুমি যে আমার বড় আদরের‚ কাঙালের একমাত্র ধন | আমার প্রাণভোমরা | আমার মনের ভিতরের তুমিটাকে সোনার কৌটোয় পুরে রেখে দেব দীঘির অতল জলের নীচে | জ্যোতি ঠাকুর কোনওদিন সন্ধানই পাবে না |

আজ বড় মেঘ করেছে | কালবোশেখি আসছে বোধহয় | দিনমানেও কেমন অন্ধকার হয়ে এল চারিদিক | বাড়ির লোকজন সব গেল কোথায় ? আচ্ছা রবি‚ আজই কি তোমার জ্যোতিদাদার জাহাজের উদ্বোধন ? সবাই কি সেখানেই গেছে নাকি ? আজকাল দিনক্ষণ ঠিক মনে থাকে না | কিন্তু কই আমায় তো কেউ ডাকতে এল না ?

জানো তো এই বোশেখ মাসেও আজ আমি ভোর থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ পাচ্ছি | সেই যে ভোরবেলায় দিদির সঙ্গে ফুল কুড়োতে যেতুম | ষষ্ঠীতলায় ঢাক বাজত

অনেকক্ষণ থেকে মনে হচ্ছে কে যেন ডাকছে আমায় | তাহলে কি ওদের শেষ পর্যন্ত মনে পড়ল‚ ডাকতে এল আমায় ?

কিন্তু এ তো রোজকার চেনা গলা নয় | কেমন যেন চেনা চেনা‚ কিন্তু মনের গভীরে হারিয়ে যাওয়া | কে ডাকছে বলোতো আমায় রবি

এইবার ঠিক বুঝেছি | আসলে মা ডাকছে আমায় | ছোটবেলায় খেলায় মেতে দেরি হয়ে গেলে যেমন ডাকত | আসলে তোমাদের বাড়িতে সংসারের খেলা খেলেতে খেলতে বড় দেরি করে ফেলেছি যে | তাই মা ডাকতে এসেছে | তোমায় চিঠি লেখা শেষ করে‚ এক্ষুণি চলে যেতে হবে আমায় | ওরা বাড়ি ফেরার আগেই | নইলে আমায় আটকে দেবে যে | ঠাকুরবাড়ির বউকে সেরেস্তার শ্যাম গাঙ্গুলির বাড়ি যেতে নেই তো | আমার খেলনাবাটি‚ পুতুলের বিয়ে সব পড়ে রইল | আমি পালালাম রবি | এই ঠাকুরবাড়ি চৌহদ্দি ছাড়িয়ে অনেক দূরে‚ যাতে তোমরা আর কোনওদিন আমায় খুঁজে না পাও |

ইতি‚
নতুন বউঠান

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

2 COMMENTS

  1. মনোগ্রাহী লেখনী,,,,এভাবে ভাবা ও ভাবানো দুটোই প্রশংসনীয়। সম্পর্ককে
    রগরগে শব্দ দিয়ে লেখকের মনবাঞ্ঝা পূরণ হলেও , স্নিগ্ধতার মৃত্যু ঘটে এটা যদি অন্য লেখকেরা বুঝতেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.