” তোমার ওই দাড়িওয়ালা‚ জোব্বা পরা চেহারাটা আমার দু’ চক্ষের বিষ…”

প্রিয় রবি‚

আজ ঠিক করেছি‚তোমাকে একখানা চিঠি লিখব | লিখে অবশ্য টুপি মাথায় দেওয়া লাল টুকটুকে ডাকবাক্সে ফেলা যাবে না | কারণ ক্রিং ক্রিং সাইকেল বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় চিঠি বিলি যে করে পিওন‚তার তো তোমার ঠিকানার সন্ধান যানা নেই |

যাক গে‚নেই ঠিকানায় কীভাবে চিঠি পাঠানো হবে‚ সে আলোচনা না হয় পরে করা যাবে | তার আগে বলি‚ কেন আজ হঠাৎ তোমায় চিঠি লিখতে বসলাম | আসলে আজ ২৫ বৈশাখ | আজ তোমার জন্মদিন | আর আজ আমারও জন্মদিন‚ তোমার বয়স হল ১৫৫‚ আর আমি এবার অষ্টাদশী | তোমার থেকে ঠিক ১৩৭ বছরের ছোট | আমার চিঠিটা যখন তুমি পড়বে তখন নিশ্চয় এই পর্যন্ত পড়েই তোমার মনে মনে ভারী রাগ হবে | এইটুকু একটা পুঁচকে মেয়ে‚ সে কি না আমাকে নাম ধরে ডাকছে‚ কিন্তু কী করব বলো ? তোমাকে শ্রীচরণেষু‚পূজানীয়েষু‚এরকম সব গুরুগম্ভীর সম্ভাষণ করতে আমার ইচ্ছেই হল না | প্রথমে একবার ভেবেছিলাম রবিবাবু লিখব | সেই যে‚ যখন তুমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা গুরুদেব হয়ে ওঠনি‚ যখন তোমার গানকে লোকে রবীন্দ্রসঙ্গীত না বলে‚বলত রবিবাবুর গান‚ঠিক সেই সময়ের মতো | কিন্তু পরে সেটাও ঠিক পছন্দ হল না | মনে হল বন্ধুকে আবার কেউ বাবু বলে নাকি ? তুমি তো আমার বন্ধু | তোমাকে আমি রবি বলেই ডাকব |

চিঠি পড়তে পড়তে খুব হাসছ নিশ্চয় | কিন্তু আমার কিছু করার নেই‚ তোমার লেখা পড়লেই আমার মনে হয়‚ তুমি আমার খুব কাছের মানুষ | আমার সব দুঃখ‚অভিমান‚হাসি‚কান্না তুমি ঠিকঠাক বুঝতে পারো | তা এরকমটি যে পারে‚ তাকে বন্ধু ছাড়া কী বলা যায় বলো ? সে জন্যই তো তোমার ওই দাড়িওয়ালা‚জোব্বা পরা চেহারাটা আমার দু’ চক্ষের বিষ | কেন যে সবাই তোমাকে বুড়ো বুড়ো সাজিয়ে রাখে আর পুজো করে‚আমি তো ভেবেই পাই না | তোমার যে সেই বাল্মীকি প্রতিভায় অভিনয় করার একটা ছবি আছে না‚ সেইটা আমার ভারী পছন্দ | সেই ছবি আমি রেখেছি আমার বইয়েরে পাতায় | যখনই মন খারাপ করে তখনই খুলে দেখি |

আরও একটা জিনিস অপছন্দ | তোমার কথা উঠলেই‚সবাই যেন কেমন গম্ভীর হয়ে পড়ে | গান গাইতে গেলে চোখ বুজে যায় | মুখে হাসি থাকে না | তোমার প্রেমের গানও এমন করে গায়‚যেন মনে হয় আসলে সেসবও ঈশ্বরের জন্য লেখা | আমি তো এর কোন মানেই বুঝতে পারিনা | আমার তো তোমার প্রেমের গান শুনলে বুকে শিরশিরে কাঁপন লাগে | মনে হয় যেন শীতের হাওয়ায় টুপটুপ করে খসছে শিরীষের পাতা | রোমকূপ শিউরে উঠে আশরীর জাগছে পদ্মকাঁটা | ইচ্ছে করে ধানি রঙের শাড়ি পড়ে‚চুলে শেফালির মালা জড়িয়ে একছুটে চলে যাই তোমার কাছে |

তোমার গানের প্রেম নিয়ে এমন ছুৎমার্গ থাকলেও‚তোমার প্রেম নিয়ে কিন্তু কৌতূহলের কোনও শেষ নেই | নতুন বউঠান আর তোমাকে ঘিরে কত না মুখোরোচক আলোচনা‚কত বই‚ছবি‚লেখালেখি | আর এসব করতে গিয়ে সবাই কেমন ভুলে যায়‚তোমার গান মানে‚শুধু প্রেম কিংবা পূজা না মোটেই | তাতে আছে বিপ্লব‚ আছে বিদ্রোহ | লোকের আজকাল মনেই পড়ে না‚বঙ্গভঙ্গের দিনে কেমন দৃপ্ত পায়ে গান গাইতে মানুষের হাতে রাখী বেঁধেছিলে তুমি | তোমর নাটকের বাউল বৈরাগী ঠাকুরদার দলবল কেমনভাবে মানুষের বুকে চারিয়ে দিতে পারে বিদ্রোহের বীজ | সেসব ভুলে আমরা এখন আন্দোলনের গান ধার করি বিদেশ থেকে |

আছা ‚ এতক্ষণ ধরে আমার পাগলামির কথাবার্তা পড়ে তোমার কেমন লাগল বলো দেখি ? খারাপ লাগলে কিন্তু চলবে না | তুমি নিজেই তো লিখেছ ‚ একশো বছর পরেও তোমার কবিতা পড়বে মানুষ | যদিও যে পড়বে আর যেভাবে পড়বে ভেবেছ ‚ তার সঙ্গে আমার কোথাও কোনও মিল নেই | কিন্তু তা তো থাকবেই না | পৃথিবীটা তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বদলে গেছে | সেই বদলের সঙ্গে তোমাকে মিলিয়ে নিয়েই তো আমি এত এত ভালবাসছি তোমায় | আমার মতো করে ভালবাসছি | তোমার গান কবিতা গল্পের সঙ্গে ভাব জমাচ্ছি | আর চেষ্টা করছি তোমার সঙ্গে মিলেমিশে খুশি থাকতে | কেন বলো তো ? আসলে ‚ আমার ঘরের দেওয়ালে তোমার একটা মস্ত ছবি আছে | সে ছবিটা ভারি অদ্ভুত | ঘরের যেখানেই আমি থাকি না কেন ‚ মনে হয় যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে | আর বলছেখুশি থাকো‚ আমার পানে চেয়ে চেয়ে খুশি থাকো |

ইতি‚
তোমার অষ্টাদশী বান্ধবী
২৫ বৈশাখ‚ ১৪২৩

Advertisements

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.