কুকথা ২

the black tongue

আমি শ্রীমান ঘঞ্চি ফিরে এলাম একটা ছোট্ট ব্রেকের পর। সঙ্গে নিয়ে এসেছি আরও ছোট্ট একটা ছড়া।

‘‌চুপটি করে, স্পিকটি নট্‌ /‌ ঘঞ্চি শুধু শুনবে ফট্‌।

আঙুল মুখে থাকবে সুখে, /‌ হালকা হাসি আনবে লুকে

তার কী ভয়? তোরটা খায়?/‌ কলার তুলে বঁাচতে চায়।’‌

কিন্তু হল না। আলটিমেটলি চুপ থাকা গেল না। ইচ্ছে করছে, কষিয়ে দিই একটি চড়। একটি চড়ে যদি রাগ না যায়, দু’‌গালে দুই চড়।

আচ্ছা, কটা লোকের পেন্টুলুন আর ধুতি টেনে খুলে দিলে কেমন হয়?‌ যারা বাংলার একটা প্রজন্মকে ঘাড় ধরে জলে ফেলে দিয়েছে, পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে দিয়েছে, গোল্লায় পাঠিয়েছে কয়েক লক্ষ ছেলেমেয়েকে তাদের জন্য এটা কি একটু বেশি শাস্তি হবে ?‌ আপনি কী বলেন?‌ না, হবে না। তবে, খরবরদার নো মারধোর। নো ইনস্টিগেশন। নো ভায়োলেন্স। আমরা যারা পাবলিক তাদের হাতে প্যাঁদানোর ক্ষমতা দেওয়া নেই। পেঁদাবে খালি পলিটিক্যাল নেতারা। দেখছেন না, স্টেজে উঠে কী হুংকার!‌

যাক ভেবেছিলাম, এসবের মধ্যে নো গোয়িং। ঘঞ্চি যাবে না। ভোটের গঁাজায় দম মেরে যে যা খুশি বলুক। ঘঞ্চির কী?‌ আমি মনে মনে ছড়া বেঁেধও ফেলছিলাম। এরপর সুর দেব। কিন্তু ঘটনা শুনে পিত্তি এমন জ্বলে গেল যে দেখলাম অসম্ভব। হাতে কষিয়ে চড় না দিতে পারলেও, মনে মনে তো দেবই। না দিলে‌ ‘‌চড় সিস্টেম’–‌‌এর অপমান হবে। এই সিস্টেম এমনি তৈরি হয় নি। একটা কার্যকারণ ছিল। শিক্ষারম্ভে যতদিন এই সিস্টেমের প্রচলন ছিল, আমাদের বাংলায় বহু মনিষী, জ্ঞানী গুনী, পণ্ডিতের জন্ম হয়েছে। আজ সিস্টেমের অবসান ঘটেছে। এখন ছাত্রছাত্রী এবং গার্জেনরা মাস্টার, দিদিমণিদের চড় মারে। হাতে না মারলে মুখে মারে। পোস্টারে, ঘেরাওতে, শ্লোগানে মারে।

যাই হোক, ভোটপর্বে নেতানেত্রীর সুশ্রাব্য, অশ্রাব্য‌‌, কুশ্রাব্যতে মাঠ ময়দান সরগরম। বেশ লাগছে শুনতে। তাই নিয়ে ঝগড়া, নালিশও কম হচ্ছে না। সেই নালিশ দিয়ে পাল্টা নালিশ। কে বলছে ,‘‌উনি রাতে রঙীন জল খান, কেউ বলছে তিনি নকুলদানা পান।’‌ ঘঞ্চি বলে, ‘‌নকুলদানা, রঙীন জল/‌ ভোটেরবেলায় হরিবোল’‌। সত্যি বলতে কী এসব শুনলে মন্দ লাগে না। রঙতামাশা কারই বা খারাপ লাগে, থুড়ি ভোটতামাশা। এই নিয়ে ঘঞ্চি হ্যাজ নো মাথাব্যথা নেই। যে যা খুশি বলুক/‌ নিজের জ্বালায় মরুক। এসব সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। অন্তত আমি নিই না।

কিন্তু সেদিন হঠাৎ এক মন্তব্যে চমকে উঠলাম। মাথায় সাঁই সাঁই করে রক্ত চড়ে গেল। এক বাম (‌নিজেদের বলে কমিউনিস্ট আর ধনীদের পা চাটে)‌ নেতা দেখি ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে কাকে যেন ব্যঙ্গ করেছেন! বলেছেন, ইংরেজি উচ্চারণ শুদ্ধু করতে বামপন্থীদের ভোট দিতে হবে!‌ হারামজাদার সাহস বোঝ!‌

কাকে বলেছেন, কেন বলছেন, সত্যি না মিথ্যে বলেছেন সেসব নিয়ে চর্চা করা আমার বিষয় নয়। আমার কুকথা অন্য। এই বেটা কত বড় বদ একবার ভেবে দেখুন‍‌!‌ একসময়ে, এই রাজ্যের লেখাপড়া থেকে ইংরেজি তুলে দিয়ে লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের সর্বনাশ এরা করেছে। কেন করছে‌ না, চিনেও তো ইংরেজি পড়ানো হয় না। এখানে কেন হবে?‌ আমার কেন ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শিখতে দেব?‌ আমরা না কমিউনিস্ট?‌ এর ফল কী হল?‌ এই বাংলার দুটো প্রজন্ম রসাতলে চলে গেল। এই বামপন্থীরা এখন ইংরেজি উচ্চারণের ঠিক ভুল নিয়ে কথা বলে!‌ শালা।‌ ইংরেজি তুলে দেওয়ার সময় মনে ছিল না?‌ বাংলার লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে গোটা দেশের সঙ্গে না পেরেছিল কম্পিটশনে নামতে, না পেয়েছিল কাজকর্ম। ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াতে হত। আমাদের বাংলার ছেলেমেয়েদের মাজা ভেঙে গেল। সেই সময় লুকিয়ে অল্প কয়েকজন ইংরেজি শিখতে পেরেছিল। তারা শহরে থাকা, কিছু শিক্ষিত, স্বচ্ছল বাড়ির ছেলেমেয়ে। তাদের বিচক্ষণ বাবা–‌মায়েরা বুঝেছিলেন, ইংরেজি না জানলে না খেতে পেয়ে মরতে হবে। বাকিরা পড়ল অথৈ জলে। আজ যারা ভোটের জন্য ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে ঠাট্টা করছে, হারামজাদাগুলো একবার ভাবেনি, রাজ্যটার কী সর্বনাশ করে দিয়েছে!‌‌‌ এখন ইংরেজি নিয়ে ফুটানি!‌ কত বড় অডাসিটি!‌ চড়িয়ে গাল লম্বা করে দিতে হয়। শুধু কি এইটুকু?‌ একবারেই নয়। এই বদেদের জন্য ভাল ছেলেমেয়েরা দলে দলে বাংলা মিডিয়াম স্কুল ছেড়েছিল। এদিকে বাম নেতাদের বউ, শালী এবং যারা যারা ঘু্ষ দিতে পারল, পাড়ায় পাড়ায় বেসরকারি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল খুলে বসল। একেবারে নার্সারি লেভেল থেকে। মোটা টাকা দিয়ে পড়তে হবে। নেতারা বেনামে ব্যবসা শুরু করল। বেচারি দরিদ্র, মধ্যবিত্তরা হাজার হাজার টাকা খরচ করে সেইসব স্কুলে ‘‌এ, বি, সি, ডি’‌ শিখতে ছুটল। যাবে কোথায়? গোটা রাজ্য জুড়ে তো তখন দুটো ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে। পয়সা থাকলে ইংরেজি , না থাকলে নো ইংরেজি। এই ঘা‌ আজও দগদগ করছে।

ভেবে দেখুন, এরা কত বড় ক্ষতি করেছে।‌

এক পণ্ডিতকে দেখি, এক পত্রিকায় ইংরেজি শেখায়!‌‌‌ এই ধুতি পণ্ডিতটা একসময় বাম নেতাদের দোসর ছিল। ইংরেজি তোলবার কুচক্রীদের একজন। এখন বিড়াল তপস্বী হয়ে ইংরেজি শেখাচ্ছে!‌ বেটার ধুতি খুলে দিতে হয়।

এদের চড় মারবার দরকার নেই, আসুন ঘেন্না করি।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here