কুকথা

1291

কুকথা কখনও ফালতু, কখনও ডেনজারাস। ষখন ডেনজারাস তখন গড়বড়ে পুরুষের পেন্টুলুন নড়বড়ে করে দেয়। টান মারে। আর যেসব মহিলার ঢাক পেটানোর অভ্যেস, তাদের ঢাকে দিতে হয় এক্সট্রা ছাউনি। নইলে ঢাক ফাঁসে ।‌ যারা আত্মপ্রচারের হাঁড়ি নিয়ে হাটে মাঠে ঘুরে বেড়ায়, তাদেরও বিপদ।‌ কুকথায় হাটে হাঁড়ি ফাটে দুম্‌ করে। সব ধরা পড়ে যায়। তবে মিথ্যে ভাবনা, ভাঁওতাবাজ জ্ঞানীগুণী, ধান্দাবাজ পলিটিশিয়ান, ল্যাং বিশারদ্‌ প্রফেশনালস্‌, তেলমারা শিল্পী সাহিত্যিকদের জন্য কুকথার কোনও এফেক্ট নেই। এরা সাধারণত কানকাটা হয়। কুকথা কানে ঢোকে না। অবশ্য কেউ কেউ বলে, কুকথাই একমাত্র সত্যি কথা। যার গায়ে লাগে, তার নিশ্চয় কোনও ‘‌ইয়ে’‌‌ রয়েছে। নইলে সব লোক ফেলে তার গায়ে লাগবে কেন?‌ আবার কেউ বলে কুকথা হল হিংসুটিদের কারবার। অন্যের সাকসেসে রাগ। সেই রাগ কোথাও ফলাতে পারে না, তাই কুকথা বলে। কোনওটা সত্যি কোনওটা মিথ্যে যে শোনে সে জানে।

আজ থেকে বাংলালাইভে শুরু হল নতুন কলম ‘‌কুকথা’‌। নো পারসোনাল কেচ্ছা ,ওনলি ঝুলি থেকে বিড়ালটি বের করে দেওয়া। ম্যাঁও । কুকথা বলবেন শ্রী ঘঞ্চি। ইনি একজন বিশিষ্ট কু বিশারদ্‌। ঘঞ্চি নাম নিয়েছেন কঞ্চি থেকে। লোকে বাঁশ দেয়, উনি দেবেন কঞ্চি। কথায় বলে বাঁশের থেকে কঞ্চি দড়।‌

যাক,আপনারা ওর কথা ‘‌ফালতু ’‌ ভেবে হাসিমুখে মার্জনা করে দেবেন। আর যদি আপনার সত্যি কোনও ইয়ে থাকে, মানে গোলমাল আর কী,‌ তাহলে রাগ করে মার্জনা করবেন। মুখে কিছু বলবেন না। মনে রাখতে হবে এসব নেহাতই রসিকতা।

আসুন, এবার ঘঞ্চিবাবুর কুকথা শুনি।

কুকথা ১

সেদিন ছিল রবিবার।

ভেবেছিলাম বাড়িতে বসে খানিকটা বিদ্যাচর্চা এবং খানিকটা সঙ্গীতচর্চার মধ্যে থাকব। লেখাপড়া তেমন করিনি তাও ভাল চাকরি পেয়েছি, চাকরিতে মোটা ঘুষ পেয়েছি, বসকে চওড়া পেটের ইলিশ মাছ পাঠিয়ে প্রোমোশন পেয়েছি, সুন্দরী বউ পেয়েছি, পার্টিতে বউয়েরে সরু পেট দেখিয়ে বড়লোক বন্ধু পেয়েছি,
শাঁসালো শ্বশুর পেয়েছি, মিনিস্টারের চামচেকে ধরে জামাইবাবুর ব্যবসায় অর্ডার পেয়েছি, তার বদলে শ্যালিকার কাছ থেকে ‘‌ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি’‌ পেয়েছি, নেতা ধরে বাড়ি পেয়েছি, কেতা দেখিয়ে গাড়ি পেয়েছি। কিন্তু শালার সম্মান পাইনি। পথেঘাটে কেউ পোঁছে না। তাই ঠিক করেছি ইনটেলেকচ্যুয়াল হব। সেই কারণে বিদ্যাচর্চা এবং সঙ্গীতচর্চা শুরু করব। যেটা লেগে যায়। ইনটেলেকচ্যুয়াল হওয়ার শর্টেস্ট রুট। এতে যদি জাতে উঠে ভদ্রলোকের পাতে পড়ি মন্দ কী? ঘরে বলে‌ ক্রাই না করে একটা ট্রাই নেওয়া আর কী।

কিন্তু চর্চা করব কী!‌ ঘুম ভেঙেই শুনি পাশের মাঠে তারস্বরে মাইক বাজছে। হচ্ছে গান, কিন্ত মনে হচ্ছে, কেনেস্তারা পিটছে। এত সকালে মাইক‌ !‌ চোখ কচলে মনে পড়ে গেল, ভোট এসে গেছে। বুঝলাম, সব চর্চার ইয়ে মারা গেল। গান হচ্ছে তিন পর্যায়। রবীন্দ্র, দেশপ্রেম, গণসঙ্গীত। এটা শেষ হয় তো ওটা শুরু হয়, ওটা থামে তো এটা চলে। মাঝেমধ্যে এক গানের মাঝপথে আর এক গান ঢুকে পড়ে। ‘‌প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’–এর‌ তলপেট দিয়ে কে যেন তীক্ষ্মস্বরে চিৎকার করে ওঠে ‘‌সাথীদের খুনে রাঙা পথে দেখ হায়নার হানাহানি’‌। তার মধ্যেই ঝমঝম করে বেজে ওঠে ‘‌মুক্তিরও মন্দিরও সোপানও তলে কত প্রাণ হল বলিদান’‌। তিনরকম গানের এক জগাখিচুড়ি ফিউশন। যেন কুস্তি লড়ছে। একটা মাইকেই কী করে তিনটে গান বাজে!‌ একটা সময়ের পর থেকে পাগল পাগল লাগতে থাকে।

পাড়ার মাস্তান ভল্টুকে মোবাইলে ধরলাম। ভল্টু বাঙালি যুবক। একসময়ে চোঙা প্যান্ট পরে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকত আর স্কুল কলেজের মেয়েদের বুক দেখত। এখন সেই পালা চুকেছে। গলির মোড়ের বদলে এসেছে মোটোরবাইক। গুবরে পোকার মতো পশ্চাতদ্দেশ উঁচু। এই জাতের মোটারবাইকের নাম হল ‘‌ইঁট বালি সুড়কি, চল দিই চড়কি’‌। প্রথমে জানতাম না, পরে জেনেছি, ইঁট, বালি, সুড়কি সাপ্লাইয়ের টাকায় এই জিনিস কেনা যায়। যে যাক, চড়কি চাওয়া মেয়েরাও খুশি। বাইকের পশ্চাতদেশে চটাপট উঠে পড়ছে। সুবিধে হল, ভল্টুকে এখন আর দূর থেকে দেখতে হয় না,
ঝাঁকুনিতে সে নিজেই পিঠে ছোঁওয়া দেয়। কুমার ফানুর গান ছিল না?‌ এই ফুলের ছোঁয়া যদি লাগে.‌.‌.‌।’‌ যাক, পাড়ায় থাকতে হলে ভল্টুকে হাতে রাখতে হয়। মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনের ট্যাগ লাইন হল, ‘‌চোর টু সাধু—হাতে রেখো চঁাদু।’‌

যাই হোক ভল্টুকে মোবাইলে ফোন করলাম। এপাড়ায় যে কোনও অকেশনে ওর কাছ থেকেই মাইক নিতে হয়।

‘‌ভাই, এটা কী হচ্ছে। ভোর হতে হতেই একি চিল্লানি‌‌!‌’‌

ভল্টু বলে,‘‌দাদা, আজ মাঠে তিনপার্টির মিটিং আছে।’‌

আমি অবাক হয়ে বলি,‘‌একসঙ্গে!‌’‌

ভল্টু বলে,‘‌নানা। তিন পার্টির তিন টাইম। ম্যাটিনি ইভনিং নাইট।’‌

আমি বললাম,‘‌তা বাপু, সকাল থেকে মাইকের এই অত্যাচার শুরু করলে কেন?‌’‌

ভল্টু অবাক হয়ে বলে,‌‘‌অত্যাচার কি !‌ এতো জানান দেওয়া। পাড়ায় তুলকালাম তুলছি। এখন ভল্যুম কম, বেলা যত বাড়বে মাইকের ভল্যুম তত বাড়বে।’‌

আমি আতঙ্কিত গলায় বলি,‘‌তা বলে তিনরকম গান যে জড়িয়ে মড়িয়ে একাকার কাণ্ড।’‌

ভল্টু বলে,‘‌তিনপার্টি তিনরকম গান চেয়েছে। পার্টি যা চেয়েছে তাই তো সাপ্লাই করতে হবে। একেক পার্টিরএকেক গান‌। গান বাজানোর দায়িত্বে আছে ঝড়ি।’‌

আমি বলি,‘ঝড়িটা কে?‌’‌

‌ভল্টু হেসে বলে,‌‘‌কাকা, আপনি মাইরি একদম ব্যাকডেটেড। ঝড়ি হল এই সময়ের সুপারহিট ডিজে। মেয়ে ডিজে। হট প্যান্ট, টাইট গেঞ্জি, চোখে গগলস্‌। সেই তো গানের মধ্যে গান ঢোকাচ্ছে। তিন পার্টিই ওকে মিলেনিশে টাকা দিয়েছে। মাঠ এক, স্টেজ এক, মাইক এক, ডিজে এক। শুধু পার্টি আলাদা, গান আলাদা।’‌

আমি হতাশ হয়ে বলি,‘‌ভাই ভল্টু এই অত্যাচার কখন থামবে?‌’

‌ভল্টু বলে, ‘‌কাল ভোরে। মিটিং শেষ সারা রাত বাজানো হবে আর না, আর না, আর না। গা গরম করা হবে। খাটাখাটনি হবে তো।’‌

আমি আঁতকে উঠে বলি,‘‌আর না!‌ সেটা কী ?‌’‌

ভল্টু বলে, ‘‌কাকা, আপনি মাইরি সত্যি পটকা আছেন। আর না হল গানের কথা। এই কথা দিয়ে সব পার্টিই এবার ভোটে গান বেঁধেছে। ওই দল আর না, আর না,আর না, সেই দল আর না, আর না,আর না।’

ভল্টু মোবাইলেই গাইতে লাগল। মনে হল, নাচছে। আমি ফোন কেটে দিলাম।

সারদিন ঘরে বসে চিল্লানি শুনছি। খানিক আগে খবর পেয়েছি, পাড়ার দুই অসুস্থ বৃদ্ধ গানের গুঁতোতে হাসপাতালে গেছে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা দরজা জানলায় কম্বল ঝুলিয়ে লেখাপড়া করবার বৃথা চেষ্টা করছে। সন্ধেবেলা মনে হল, বাইরে গিয়ে বারণ করি। পরক্ষণেই ভাবলাম, দরকার নেই বাবা। আমার শালা প্রচুর ঘাপলা আছে। কে কোথায় টান মারবে। পেন্টু খুলে যাবে। চুপ কর থাকাই ভাল। তারওপর কাল কোন পার্টিকে কাজে লাগে কে জানে। আমি হলাম মিডল্‌ ক্লাস, সব কিছুতেই হেঁ হেঁ প্লাস।

একটাই চিন্তা গানের গুঁতোয় পাগল না হয়ে যাই।

বেশি রাতের দিকে সত্যি পাগল হয়ে গেলাম। ঘরের ভিতর দু’‌হাত তুলে কীর্তনের মতো ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগলাম আর গাইতে লাগলাম,‘‌আর না, আর না,আর না.‌.‌.‌।’‌‌

Advertisements

1 COMMENT

  1. ভালো লাগল আপনার কুকথা । আরও অনেক কুকথা শোনবার জন্যে অপেক্ষায় রইলাম ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.