রত্নগিরিতে নির্বাসিত প্রাক্তন রাজার শেষ দিনগুলো গুজরান হত পারিবারিক রত্ন বেচে

11267

মুঘল বংশের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের পরিণতি ইতিহাসে বেশ আলোচিত | সিপাহি বিদ্রোহের পরে তাঁকে বন্দি হিসেবে রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশরা | ওখানেই প্রয়াত হন শক্তিহীন ভারত সম্রাট | কিন্তু অনেকেই জানেন না এই একই পরিণতি হয়েছিল পরাধীন দেশের আরও এক রাজার | বর্মা বা ব্রহ্মদেশের শেষ রাজা থিবো-কেও সিংহাসনচ্যুত করেছিল ইংরেজরা | যুদ্ধবন্দি হিসেবে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে | দক্ষিণ মুম্বই থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে রত্নগিরি সবথেকে বিখ্যাত তার আলফানসো আমের জন্য | ১৯১৬ সাল অবধি এই শহর ছিল সিংহাসন হারানো বন্দি রাজা থিবো-র শেষ ঠিকানা |

অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল ব্রিটিশ ঔপনেবেশিকদের স্বর্ণযুগ | ভারতীয় উপমহাদেশের একের পর এক রাজ্য তাদের হস্তগত হয়ে চলেছে | বর্মার উপকূলীয় অংশ আগেই দখল করেছিল ব্রিটিশরা | আপার বার্মা বা ব্রহ্মদেশের উচ্চ অংশ ছিল স্বাধীন | সেখানে ছিল আভা রাজবংশের শাসন | এই বংশেরই শেষ শাসক ছিলেন থিবো | তিনি সিংহাসনে অসীন হয়েছিলেন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে‚ একুশ বছর বয়সে |

তাঁর পতনের জন্য অনেকটাই দায়ী পাটরানি সুপায়ালাত | তিনি ছিলেন খুবই ক্ষমতালোভী এবং তিনি রাজাকে তথা নিজের স্বামীকে বশে দমিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন | সিংহাসনের বাকি উত্তরাধিকারীদের নির্মম ভাবে হত্যা করিয়েছিলেন এই রানি | নিজেদের ক্ষমতা কায়েম রাখতে রানি নিজের ঘনিষ্ঠ অমাত্যদের নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করলেন | হাত মেলালেন ব্রিটিশ বিরোধী শক্তি ফরাসিদের সঙ্গে | 

এদিকে ব্রহ্মদেশ নিয়ে তো ব্রিটিশদের চোখ লোভে চকচক করছে | বনের কাঠ‚ খনিজ তেল‚ রবার ও বর্মী রুবি‚ সব মিলিয়ে এই দেশ ছিল গুপ্তধনের ভাণ্ডার | বর্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য উপলক্ষ খুঁজছিল ব্রিটিশরা | সেটা দিয়ে দিল আভা রাজবংশই | ব্রিটিশ মালিকানাধীন বম্বে বার্মা ট্রেডিং কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে আয়করজনিত মামলা ঠুকে দেওয়া হল | বর্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল ব্রিটিশ |

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় ইঙ্গ-বর্মা যুদ্ধ ছিল সংক্ষিপ্ত | আগের দুটি যুদ্ধে হাতছাড়া হয়েছিল উপকূলীয় বর্মা | এ বার পতন হল বাকি অংশের | রাজধানী মান্দালয়ের অধিকার নিল ব্রিটিশরা |

এবার বর্মার রাজারানির কী হবে ? তাঁরা তখনও বেশ জনপ্রিয় | তখন বন্দি রাজাদের দূর দেশে নির্বাসনে পাঠানো ছিল চেনা রেওয়াজ | সিংহলের শেষ রাজাকে পাঠানো হয়েছিল ভেলোরে | মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর রেঙ্গুনে নির্বাসনেই প্রয়াত হন ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে | বর্মার বিতাড়িত রাজা থিবো-র লাঞ্ছনার শেষ ঠিকানা হল রত্নগিরি | কোঙ্কন উপকূলে ওই শহর তখন ছিল অগম্য |

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে সেই শহরে এসে পৌঁছন সিংহাসনচ্যুত থিবো‚ তাঁর রানি সুপায়ালাত ও তাঁদের চার মেয়ে | ত্রিশ ঘরের একটি বিশাল বাড়ি তৈরি হয়েছিল তাঁদের বসবাসের জন্য | থিবোর প্রাসাদ নামে সেই বাড়ি আজও আছে | তবে তা নামেই প্রাসাদ | থিবো যে অট্টালিকাভবনে থাকতেন বর্মায়‚ তার তুলনায় নতুন ঠিকানা ছিল নগণ্য |

সেই বাড়িতেই থিবো সপরিবারে থাকতেন অত্যন্ত অর্থকষ্টে | শোনা যায়‚ তিনি একের পর এক বর্মীয় রুবি বেচে দিন কাটাতেন | রত্নগিরিতে এখনও আছে বেশ কিছু প্রাচীন সাহুকার পরিবার | তাদের আদি পেশা সুদে টাকা খাটানো | সেরকম কিছু পরিবারে এখনও পাওয়া যায় সেই বর্মীয় রুবি | যা নাকি অভাবে পড়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন হৃতরাজ্য রাজা থিবো |

রাজ্য হারিয়ে নির্বাসনে থাকার শোক সামালতে পারেননি রাজা থিবো | ভগ্ন মনোরথ রাজা প্রয়াত হন ১৯১৬ সালে | রত্নগিরিতে খ্রিস্টানদের সমাধিক্ষেত্রের পাশে সমাধিস্থ করা হয় ৫৮ বছর বয়সী প্রাক্তন সম্রাটকে | এরপর ১৯১৯ সালে রানি সুপায়ালাত ও তিন মেয়ে ফিরে আসেন বর্মা | এক মেয়ে বিয়ে করে থেকে যান রত্নগিরিতেই | তবে কয়েকদিনের মধ্যেই বর্মার রাজপ্রাসাদ রূপান্তরিত হয়েছিল ব্রিটিশ অফিসে | পরে সরকারি পলিটেকনিক কলেজে |

তবে বর্মার সামরিক জুন্টা সরকার দীর্ঘদিন স্বীকৃতি দেয়নি সম্রাট থিবো-কে | পরে বর্মায় গণতন্ত্র স্থাপিত হয় | ২০১২ সালে বর্মার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন শেইন রত্নগিরিতে এসে রাজা থিবো-র সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানান |

সবথেকে চিত্তাকর্ষক হল‚ যে বম্বে বর্মা ট্রেডিং কোম্পানি থেকে ইঙ্গ বর্মা যুদ্ধের সূত্রপাত ১৮৮৫-তে‚ সেটি এখনও আছে‚ ওয়াদিয়া শিল্পগোষ্ঠীর অংশ হয়ে | 

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.