প্রথম প্রবাসের স্মৃতির সন্ধানে

যে নদীর সাথে কেটেছে ছোটবেলা (ছবি : লেখক)

প্রায় বছর এগারো আগের এক রাতের কথা| চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে তিন বন্ধু হাওড়া থেকে শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে করে সফর করছি| তখন প্রায় রাত একটা| ট্রেনটা কিছুক্ষন আগেই গতি কমিয়েছিলো| এবার ভীষণ অনিচ্ছাভরে আর বিরক্তি সহকারে ঘ্যাঁচ করে একটা আওয়াজ করে দাঁড়িয়ে গেলো| অমর সবার আগে দাঁড়িয়ে ছিল, এবার একটানে কম্পার্টমেন্টের দরজাটা খুলে ফেলল| বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। বেশ কিছুটা দুরে টিমটিম করে একটা আলো জ্বলছে| অমর বাইরে তাকিয়ে আমার দিকে ফিরে বলল “ক্যা মজাক কর রহে হ্যায় অমিতাভদা, প্ল্যাটফর্ম কিধর? লগতা হ্যায় হামলোগ ষ্টেশন কে বাহার হুঁ|”

আমি হেসে বললাম “এহি ষ্টেশন হ্যায়, ইহা কোই ঢং কা প্ল্যাটফর্ম নহি মিলেগা| এহি প্ল্যাটফর্ম হ্যায়, জলদি উতরো – গাড়ি সির্ফ এক মিনিট রুকেগী|”

“চলো ঠিক হ্যায়” বলে অমর সিঁড়ির ধাপে পা রেখে “প্ল্যাটফর্মে” অবতীর্ণ হয়ে এক হাঁকাড় পাড়ল -“আরে বাপ, কিতনা কিচড় হ্যায় ইহাঁ|”

“কিচড় হ্যায়, মানে কাদা হ্যায়|… এই রে, অমিতাভদা এ তুমি কোথায় আনলে?” দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করে উঠলো শৌভিক| “যমের দক্ষিণদূয়ার| শিগগির নাম|” এই বলে শৌভিককে প্রায় ঘাড় ধরে নামালাম| এই ষ্টেশনে একটা প্ল্যাটফর্ম নামক বস্তু আছে ঠিকই, কিন্তু ট্রেনলাইন সেটা থেকে বেশ কিছুটা দুরে| প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে সমতল ভূমিতে একটু হেঁটে ট্রেনে উঠতে হয়|

সবে নেমেছি হঠাৎ মুখে টর্চের আলো পড়ল| ঠাউর করে দেখি কে একজন এগিয়ে আসছে| কেমন একটা ভূতুড়ে গলায় চেঁচিয়ে বলল “হাইল্যান্ড গেষ্ট হাউস| হাইল্যান্ড গেষ্ট হাউস|” শৌভিক হাঁফ ছেড়ে বলল “যাক, আমাদের হোটেলের লোক চলে এসেছে|” আমি আতঙ্কিত গলায় বলে উঠলাম “কি বলছিস! আমাদেরটার নাম তো ঊষাঞ্জলি গেষ্ট হাউস|”

ঠিক এইসময় আমাদের পিছনের কম্পার্টমেন্টের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল! একটা চশমা পরা আশঙ্কিত মুখ দেখতে পেলাম| তারপরেই পরিষ্কার কলকাত্তাই গলায় শুনতে পেলাম “ও দাদা, এটা কি ম্যাকলাস্কিগঞ্জ?” আমি চেঁচিয়ে বললাম “এটাই ম্যাকলাস্কিগঞ্জ| নেমে পড়ুন| এক্ষুণি ট্রেন ছেড়ে দেবে|” দেখলাম দরজা দিয়ে আরেকটা মুখও উঁকি মারছে|

আমাদের দুজন সহযাত্রী ট্রেন থেকে নামার পর জানা গেল তাদের হাইল্যান্ড গেষ্ট হাউসে বুকিং রয়েছে, এবং তাদের জন্যই হোটেল থেকে গাড়ি নিয়ে লোক এসেছে| ঊষাঞ্জলি গেষ্ট হাউস থেকে আমাদের নিতে কেউ আসেনি| আগেই শুনেছিলাম সেটা ষ্টেশন থেকে কিছুটা দুরে|

আমি প্রমাদ গুনলাম| শৌভিক আস্তে করে বলল “এইটা কি তোমার নৈশ অভিযানের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল?” মাথা নেড়ে বললাম “কখনই নয়| চট করে হাইল্যান্ড গেষ্ট হাউসের গাড়ির ড্রাইভারকে বল এদের ছেড়ে আমাদের ঊষাঞ্জলিতে পৌঁছে দিতে পারবে কিনা| না হলে ষ্টেশনে রাত কাটাতে হবে|”

“খেয়েছে!তুমি যখন এখানে থাকতে তখনও কি এই দশা ছিল?” শৌভিক একটু বিরক্তি সহকারে বলল

“আমার তখন বয়স চার ছিলো| কিন্তু যতটুকু মনে আছে, সন্ধের পর বেরোনো বারন ছিল| নে চটপট লোকটাকে পাকড়াও কর| না পারলে আমি যাচ্ছি|”

ষ্টেশনের বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার| ওই টিমটিমে আলোটাই সম্বল| গাড়ির ড্রাইভার আমাদের ঊষাঞ্জলি গেষ্ট হাউস পর্যন্ত ছেড়ে দিতে রাজি হলো|

ঊষাঞ্জলি গেষ্ট হাউস ষ্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দুরে| সারা রাস্তা নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা|
ড্রাইভার জানাল এখানকার ট্রান্সফরমার উড়ে যাওয়াতে ১৫ দিন ধরে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ ও তার আশেপাশের বসতিতে বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ| বুঝলাম তিন দশকের কিছু বেশি সময় আগে যখন এখানে ছিলাম, তার থেকে অবস্থা বিশেষ কিছু পাল্টায়নি| যেতে যেতে ভাবছিলাম এই জায়গাটা নিয়ে কিছু মানুষের কত স্বপ্ন ছিল, আজ শুধুই অন্ধকার| মনের মাঝে ইতিহাসের পাতাগুলো ভেসে আসছিল|


‘লিটল ইংল্যান্ড’ – The promised land

ম্যাকলাস্কিগঞ্জ! আজকাল বাঙালী ডিরেক্টররা চোখ জুড়ানো সিনেমাটোগ্রাফি দিয়ে এত সিনেমা বানাচ্ছেন, কখনো কেউ এই ছোট্ট বসতিটাকে নিয়ে সিনেমা বানাননি – কেন কে জানে!চিত্রনাট্যর পটভূমিকা তো তৈরী করাই আছে! পরাধীন ভারতবর্ষে অ্যাঙলো ইন্ডিয়ানদের “promised land” এর গল্প|

আর্নেস্ট ম্যাক্লাসকি
আর্নেস্ট ম্যাক্লাসকি

ভারতবর্ষে কুলীন ইংরেজদের অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান বিদ্বেষের আবহাওয়ার মাঝে কলকাতার এক প্রকল্পের ব্যাপারী(Real Estate Dealer)আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাক্লাস্কি নিয়ে এলেন এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব| ম্যাক্লাস্কি ১৯৩৩ সালে Colonisation Society of India Limited নামের একটি সংস্থার পত্তন করে বিহারের নাগবংশী রাতু রাজার কাছ থেকে ১০,০০০ একর জমি লিজ নেন| সে জমি লিজ নেওয়ার পর ম্যাক্লাস্কি তাঁর অ্যাঙলো ভাই বন্ধুদের জমির অংশ বিক্রি বাটা শুরু করেন| উদ্দেশ্য
অ্যাঙলো ইন্ডিয়ানদের নিয়ে ইংল্যান্ডের বাইরে ইন্ডিয়াতেই ‘লিটল ইংল্যান্ড’ গড়ে তোলা| কুলীন ইংরেজদের কটু-কাটব্য শোনার দরকার নেই| নিজেদের আপন জায়গা পেতে অনেক অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান পরিবার সমেত হাজির হলেন ‘লিটল ইংল্যান্ড’, যার নাম হলও অ্যাঙলো ধাঁচের – ম্যাকলাস্কিগঞ্জ|

আর্নেস্ট ম্যাক্লাস্কি কিন্তু ম্যাকলাস্কিগঞ্জ বেশিদিন থাকেননি| ১৯৩৫ সালে তার মৃত্যু হয়| অনেকে বলেন এই বসতির ম্যাকলাস্কিগঞ্জ নামকরণ তাঁর মৃত্যুর পর হয়|

১৯৪০ তে ম্যাক্লাস্কিগঞ্জে প্রায় ৩৫০ অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান পরিবার বাস করতেন| মূলত এখানে পয়সাওয়ালা রিটায়ার্ড অ্যাঙলোরা এসেছিলেন, তাই শুরুর দিকে ছবির মত লিটল ইংল্যান্ডে বেশ আনন্দ করেই তাঁদের দিন কাটছিলো| ইংল্যান্ডের মত পোর্টিকোওয়ালা বাংলো বাড়িতে মাঝে মাঝেই জমকালো পার্টি হতো, নাচগানের আসর বসত|

চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি পরবর্তী প্রজন্ম এটা বুঝে গেল যে এই জায়গাটা যতই শান্তিপূর্ণ হোক, তাদের মনের মত কাজ এখানে কোনওদিন পাওযা যাবে না| চাষবাস সকলের জন্য নয়| আস্তে আস্তে পরবর্তী প্রজন্ম এখান থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলো|

তারপরেই এল চরম দু;সংবাদ| ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা পেল| অধিকাংশ অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান তখন আর এদেশে থাকা নিরাপদ মনে করলেন না| কয়েক বছরের মধ্যে ম্যাক্লাস্কিগঞ্জে রইলো মাত্র জনা কয়েক অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান পরিবার| বাকিদের কিছু বাংলো বাড়ি ধনী বাঙ্গালীরা কিনে নিলেন আর কিছু বাড়ি অবক্ষয় হতে হতে চিরতরে হারিয়ে গেল| ধীরে ধীরে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ একটা গরিব বসতিতে পরিণত হল| যেখানে পানীয় জল, বৈদুতিক সংযোগ বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মত মূল জিনিষের সুব্যবস্থা নেই| শুধু রয়েছেন কিছু অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান পরিবার, যাদের অধিকাংশই পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে দিনযাপন করছেন| ম্যাক্লাস্কির সাধের ‘লিটল ইংল্যান্ড’ বহুকাল আগে ‘Gone With the Wind’ হয়ে গিয়েছে|

প্রথম প্রবাস

চিন্তার ছেদ ঘটল| চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে একবিংশ শতাব্দীতে ফিরে এলাম| আমাদের গাড়িটা ঘুরঘুটে অন্ধকারের মধ্যেই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েছে| আবছা আলোর মধ্যে একটা গেট দেখতে পেলাম| গেটটা সুবিশাল| গাড়ি করে ভিতরের ঘন অন্ধকারের মধ্যে ঢোকার সময় শৌভিকের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল “Welcome to Jurrassic Park”. হেডলাইটের আলোয় বুঝতে পারলাম আমরা একটা টিলার উপর উঠছি|

ঊষাঞ্জলি গেষ্ট হাউস (ছবি : লেখক)
ঊষাঞ্জলি গেষ্ট হাউস (ছবি : লেখক)

ঊষাঞ্জলি গেষ্ট হাউসে পৌঁছে অনেক হর্ন বাজানোর পর ঘুমচোখে একজন বেরিয়ে এল| সেই কেয়ারটেকার, সেই রুম সার্ভিস এবং রান্নার দায়িত্বও তারই| সে জানত আমরা আসব, কিন্তু সে ১৫ই অগাস্ট রাত ১টা কে ১৬ই অগাস্ট রাত একটা ভেবে নেওয়াতে এই বিপত্তি|

আমরা ট্রেনেই ডিনার সেরে নিয়েছিলাম, তাই চটপট ঘরে ঢুকে গেলাম| ট্রিপল বেড রুমটা বেশ বড়সড়, সাথে প্রমান সাইজের জানালা| কেয়ারটেকার মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেল|

হাত মুখ ধুয়ে পথের ক্লান্তি কিছুটা লাঘব হলো| খাটে পা ছড়িয়ে সবে বসেছি, এই সময় শৌভিক অনেকক্ষন ধরে চেপে থাকা প্রশ্ন করে বসল “আচ্ছা অমিতাভদা, তোমার ম্যাকলাস্কিগঞ্জে আসার আসল কারণটা কি?”

আমি একটু সময় নিয়ে বললাম “আমি ছোটবেলাটা প্রবাসেই কাটিয়েছি| আর আমার প্রথম প্রবাস ছিলো এই ম্যাক্লাস্কিগঞ্জেই| আমার বাবাকে পাকেচক্রে এইখানে এক ইঁট তৈরীর কোম্পানীর ম্যানেজার হয়ে কিছুদিন চাকরী করতে হয়েছিল| আমরা প্রথমে উঠেছিলাম স্টেশনের কাছে একটা বাংলো বাড়িতে| সেটাই ছিল আমাদের প্রথম প্রবাসের বাসস্থান| এতদিন বাদে আমার মনে হয়েছে সেই বাড়িটা একবার খুঁজে বের করি| ওটার কোনও ছবিও নেই আমার কাছে|”

“উরিব্বাস, এযে একেবারে নস্টালজিক মিশন!” বেশ উৎসাহ দেখিয়ে বলল শৌভিক “তা বাড়ি খুঁজতেই যখন মূলতঃ আসা, দিনের বেলায় এলে ভালো করতে না? খামোখা রাতের অভিযান করতে গেলে কেন ?”

আমি হেসে ফেলে বললাম “আমার ম্যাকলাস্কিগঞ্জের প্রধান স্মৃতি হলো লোডশেডিং| তখনো সারা রাত লোডশেডিং থাকত, মা রাত জেগে পাখা দিয়ে হাওয়া করে আমাদের ঘুম পাড়াতেন| রাতের বেলা বাইরেটা ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকত, এই স্মৃতিটাই প্রবল| তাই ভাবলাম প্রথম প্রবাসে অন্ধকারের স্মৃতি নিয়েই ফিরি|”

“ঠিক আছে, প্রবাস পরবাস সব বুঝে গেলাম| কিন্তু সওয়াল ইয়ে হ্যায়, ও মকান আপ পহচানেঙ্গে
ক্যায়সে? তোমার কাছে তো সেই বাড়ির কোনও ফটো ভি নহি হ্যায়|” জানতে চাইল অমর |

“এইটুকু জানি একতলা বাড়ি| Flat roofed. পিছনে প্রচুর আমগাছ ছিল আর বাতাবি লেবুর গাছের জঙ্গল ছিল| সামনে সন্ধ্যামালতি ফুল ফুটে থাকত| রেলওয়ে ষ্টেশনের কাছে| এইটুকু সম্বল নিয়েই খুঁজতে হবে|” বললাম আমি

“তবে জায়গাটা বেশ নিরিবিলি| উইকএন্ড কাটাবার জন্য মন্দ নয়| এই গেস্ট হাউসটা বোধ হয় বেশিদিনের নয়| হাইল্যান্ডটা পুরানো| লোডশেডিংটাই বিরক্তিকর| আজ আমরা ছাড়া এখানে আর কেউ নেই|” হাই তুলে বলল শৌভিক “তোমার আর কিছু মনে আছে ?”

“আমার মনে নেই, তবে বাবা মার কাছে শুনেছি এই চত্বরে তখন প্রচুর জন্তু জানোয়ার ছিলো| দুরের পাহাড়ের গায়ে চিতাবাঘ নামতে দেখা যেত| মায়ের তখন প্রথম প্রবাসের ঠেলায় প্রাণ ওষ্ঠাগত| কলকাতায় জীবনে কখনও উনুন ধরায়নি| আর এখানকার অধিবাসীরা বাঙালী রান্না কিছুই জানত না| সেই সব সামলে কুল পায়না, তার মধ্যে একরাতে ঘরের মধ্যে একটি কাঁকড়া বিছের আবির্ভাব| সেই সোনার কেল্লার স্যাম্পেল| তার মধ্যেই লোডশেডিং|” একটানা বলে থামলাম|”

– “সর্বনাশ করেছে| তারপর ?”

– “ তারপর আর কি? টর্চ ফেলে সেটাকে খুঁজে খতম করা হল| ও বাড়িতে আমরা মাসতিনেক ছিলাম| পরে ওই ইঁট তৈরীর কোম্পানীর ফ্যাক্টরির চত্বরেই একটা বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম| সেটা অনেক নিরাপদ ছিলো| মা ওর মধ্যেই পৃথিবী সিং বলে একটা ছেলেকে ভালো করে রান্না বান্না শিখিয়ে নিয়েছিলো| চল, রাত অনেক হল এবার ঘুমিয়ে পড়া যাক|”

বাকি দুজন আর দ্বিরুক্তি না করে শুয়ে পড়ল|


ছোট নদী নয়, ম্যাকলাস্কিগঞ্জের
 চট্টি নদী

আন্দাজ করেছিলাম সকালের আলোয় ঘুম ভাঙবে| কাঁচের জানালা দিয়ে আলো পড়ল ঠিকই, কিন্তু সে আলো খুব ফ্যাটফ্যাটে| আসলে আকাশ মেঘলা থাকলে যা হয়| গেস্ট হাউসের বাইরেটা বেশ সুন্দর লাগছিলো| চারপাশে সবুজ বনানীর মধ্যে দাঁড়িয়ে পাখির কলতান শুনে মনটা বেশ চনমনে হয়ে উঠলো| অমর আর শৌভিকও উঠে পড়েছিল|

“এখানে এক সপ্তাহ থাকলে শরীর আর মন দুই ভাল হয়ে যাবে” ঘোষণা করল শৌভিক| তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল “চলো গিয়ে দেখা যাক ব্রেকফাস্টে কি পাওয়া যায়| ওই গাড়িটাকে কাল রাতেই বলে দিয়েছি সকাল নটা নাগাদ আসতে| সাইট সিইং এ বেরুবো| আর তোমার সেই বাড়িটাও খুঁজবো|”

বাড়ির মালিকও এর মধ্যে রাঁচী থেকে এসে গিয়েছিলেন| ভদ্রলোক বাঙালী| পদবী গাঙ্গুলি| আমাদের কাল রাতের অসুবিধের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন| টোস্ট, অমলেট, আপেল আর কলা দিয়ে ব্রেকফাস্ট মন্দ হলো না| নটার মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম|

“পহেলে চট্টি নদী কে পাস ডেগাডেগি চলেঙ্গে, ফির রেলব্রিজ, ফির সেন্ট জন চার্চ আউর ফির কুছ বাংলো দিখায়েঙ্গে|” টুরিস্ট গাইডের মত একনাগাড়ে বলে চলল আমাদের ড্রাইভার পাপলু|

“ছোট্টি নদী?” অমর প্রশ্ন করল “মানে সেই আমাদের ছোট নদী|”

“না না, নদীর নাম চট্টি| ডেগাডেগিটা এখানকার জনপ্রিয় পিকনিক স্পট| পিকনিক করতে  এখানে আসা হতো|” বল্লাম আমি| তারপর পাপলুর দিকে তাকিয়ে বললাম “ষ্টেশনকে পাস কোই বাংলো হ্যায়?”

পাপলু বলল “”ষ্টেশনকে পাস বাংলো? এক তো হাইল্যান্ড গেস্ট হাউস হ্যায়| দুসরা হ্যায় গর্ডন সাহাব কা বাংলো|”

Flat roofটা পাপলু ঠিক বুঝলো না| অমর ওকে সমতল ছতওয়ালা মকান, চাপ্টি ছতওয়ালা মকান ইত্যাদি বলল| “ছত? য়া ছপ্পর? খাপড়াওয়ালা?” জানতে চাইল পাপলু

খাপড়া মানে tiles| বুঝতে পারলাম যে ও জানতে চাইছে “tiled flat roof” কিনা? কিন্তু আমার সে উত্তর জানা নেই, আমি শুধু flat roof জানি|

অচিরেই গর্ডনের বাংলোর সামনে পৌঁছালাম| যদিও খুব সুবিশাল বাংলো, সামনে বড় বাগান – আমার সেই প্রথম প্রবাসের flat roofed বাসার সাথে কোনও মিল নেই| হাইল্যান্ড গেস্ট হাউসের মাথায় তেকোনা টালির ছাদ| তাছাড়া পাপলু যখন বলল এইটা আগে ক্যামেরুন সাহেবের বাংলো ছিল, তখন আমার মনে পড়ে গেল যে এটা আমার ছোটবেলাতেও গেস্ট হাউস ছিল| তখন এটা ম্যাক্লাসকিগঞ্জের একমাত্র গেস্ট হাউস ছিলো| নাম ছিলো কার্নে গেস্ট হাউস| তারপর একসময় হাত ঘুরে ক্যামেরুনদের সম্পত্তি হয়ে যায়|

আমরা ষ্টেশনের দিকে চললাম| ম্যাকলাস্কিগঞ্জের এখানে সেখানে পরিত্যক্ত বাড়ি ছড়িয়ে আছে| স্টেশন থেকে দুদিকে দুটো রাস্তা চলে গেছে| একটা জলের ট্যাঙ্কের পাশ দিয়ে, অন্যটা চলে গেছে হাইল্যান্ড গেস্ট হাউস আর গর্ডনের বাংলোর দিকে| “ষ্টেশনটা দিনের বেলায় একবার দেখতে ইচ্ছে করছিলো|

“অমিতাভদা ওই দ্যাখো, একজন অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান “ষ্টেশন চত্বরে বসে ফল বিক্রি করছেন|” বলল শৌভিক| পাপলু পিছনেই দাঁড়িয়েছিলো| এবার সে আস্তে করে বলল “ও তো কিট্টি মেমসাব হ্যায়|” আমি শৌভিকের দিকে তাকিয়ে বললাম “অবাক হওয়ার কিছু নেই| এখানে অনেকের নিজের বাগানের ফল বিক্রি করে দিন গুজারন হয়| ওই মহিলার আসল নাম Catherine Teixeira. ওনাকে নিয়ে অনেকবার কাগজে লেখা হয়েছে| উনি কিন্তু নিজের জমিতে চাষবাসটা চালিয়ে যাচ্ছেন এখনও|”

“দো বাংলো তো দেখ লিয়ে| অব ক্যা করনা হ্যায়?” জানতে চায় অমর |

চট্টি  নদীর ধরে  পিকনিক স্পট ডেগাডেগি (ছবি : লেখক)
চট্টি নদীর ধরে পিকনিক স্পট ডেগাডেগি (ছবি : লেখক)

“চলো একটু সাইট সিইং করা যাক| চলো পাপলু, ডেগাডেগি চলতে হ্যায়|” বলে গাড়ির দিকে এগোলাম| ডেগাডেগির কাছে বর্ষাকালেও চট্টি নদীতে বিশেষ জল থাকে না| আমরা জলে একটু পা ভিজিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে কিছু ছবি তুললাম| ফিল্ম বেশি আনিনি তাই খুব বেশি তোলা গেল না|(সে সময় আমার ডিজিটাল ক্যামেরা ছিল না)|

রেল  ব্রিজ (ছবি : লেখক)
রেল ব্রিজ (ছবি : লেখক)

রেললাইন ধরে রেল ব্রিজ পর্যন্ত হাঁটা হলো| রেললাইনগুলো কি পরিষ্কার| মনে হয় যেন শুয়ে থাকা যায়| সেন্ট জন চার্চটার খুব জরাজীর্ণ দশা| ম্যাক্লাস্কিগঞ্জে ১৯৯৭ থেকে একটা স্কুল খুলেছে, নাম ডন বস্কো| শুনলাম অনেক ছাত্র পড়তে আসে| এখানে জাগৃতি বিহার বলে একটা সুন্দর প্রতিষ্ঠান হয়েছে যার কাজ হলো এখানকার স্থানীয় লোকজনকে শিক্ষিত এবং পরিবেশ সচেতন করা| পরিবেশটি বেশ সুন্দর|

ফেরার সময় আমরা আরও কয়েকটা বাংলো দেখলাম| পটার সাহবের বাংলো, পার্কিনস সাহেবের বাংলো, মিলার সাহেবের বাংলো| পার্কিনসটা সবচেয়ে দেখতে সুন্দর কিন্তু আমার সেই বাড়ির বর্ণনার সাথে মিলছে না|

পার্কিনসের  বাংলো (ছবি : লেখক)
পার্কিনসের বাংলো (ছবি : লেখক)

“ইঁহা এক ফ্যাক্টরি হুয়া করতা থা ? উসকা কুছ বচা উচা হ্যায় ?” জানতে চাই আমি

পাপলু একটু অবাক হয়ে বলল “ফ্যাক্টরি? কিস চিজ কা ফ্যাক্টরি?”

ইঁটের ফ্যাক্টরি শুনে পাপলু খুব চিন্তায় পড়ল| আমি বুঝলাম ও ব্যাপারটা পুরো বোঝেনি| এই সময় উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে অমর প্রশ্ন করলো “ইঁহা পুরানা চিমনি কিধর হ্যায়?”

পাপলুর জড়তা সাথে সাথে কেটে গেল| দশ মিনিটের মধ্যে আমরা ইঁটের ফ্যাক্টরির ধ্বংসাবশেষের সামনে পৌঁছে গেলাম|

‘ইঁটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যাথা’

“ষ্টেশনের পাশের সেই বাড়িটায় আমরা মাস তিনেক ছিলাম| তারপর ফ্যাক্টরি চত্বরের ভিতরে কোয়ার্টারে চলে আসা হয়েছিল” ইঁটের ফ্যাক্টরির ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম আমি| রাস্তা থেকে শুধু চিমনীটা দেখা যাচ্ছিল| পুরো এলাকাটা ঘন জঙ্গলে ঢাকা| সামনের দিকে একটা  ভাঙ্গা বাড়ির কংকাল দাঁড়িয়ে আছে| কংক্রিটের রডগুলো দেখা যাচ্ছে|

“এই বাড়িটাই কি সেই কোয়ার্টার?” প্রশ্ন করল শৌভিক|

“সম্ভবত না| বাবার কাছে শুনেছি ওটা একটু ভিতরে ছিলো|” বললাম আমি |

পাপলু আমাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিল| এবার সে প্রশ্ন করল “আপলোগ ভিতর যাওগে ক্যা? বহুত জঙ্গল হ্যায়| সাঁপ রহ সকতা হ্যায়|”

“একটু তো ঢুকতেই হবে| ফ্যাক্টরিটা দেখে আসি|” বলে পা বাড়ালাম| একটু এগোতেই ফ্যাক্টরির  ভাঙ্গা অফিস বাড়িটা চোখে পড়ল| শুধু দেওয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে| তার পিছনে ঘন ঘাস বন| প্রচুর আগাছা| অনেক গাছ রয়েছে| অদূরে চিমনীটা দেখা যাচ্ছে| ওই জঙ্গলের ভিতরে কোথায়  আমাদের কোয়ার্টার ছিল তা খুঁজে বের করা মুশকিল| জঙ্গলটা সুবিধের ঠেকছিল না|

ইঁটের ফ্যাক্টরির চিমনী (ছবি : লেখক)
ইঁটের ফ্যাক্টরির চিমনী (ছবি : লেখক)

“উধর বহুত জঙ্গল হ্যায় অমিতাভদা| জানা ঠিক নেহি হোগা|” আশঙ্কা প্রকাশ করল অমর|

“না, ওদিকে যাচ্ছি না| ফ্যাক্টরির ভিতরেই ঢোকা যাক|” বলে ভাঙ্গা অফিস বাড়িটার ভিতরে ঢুকে পড়লাম|

দরজা দিয়ে ঢুকতেই প্রথমে যেটা চোখে পড়ল সেটা একসময় একটা হল ঘর ছিলো| হয়ত এখানে সারি সারি চেয়ার টেবিল ছিল, টাইপ মেশিনের খট খট শব্দ শোনা যেত| আজ শুধুই নিস্তব্ধতা| ভিতরে কয়েকটা ছোট ছোট ঘরের দেওয়াল চোখে পড়ল, বোধহয় অফিসারদের কেবিন ছিল| এর মধ্যে কোনও একটায় বসে বাবা কাজ করতেন| এখন শুধু ইঁটের পাঁজর আর কংক্রিটের খাঁচা ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই ।

বৃষ্টি আসছিল| তাই আমরা চটপট গাড়িতে উঠে গেষ্ট হাউসের দিকে রওয়ানা দিলাম| পৌঁছতে পৌঁছতে বৃষ্টি নেমে গেল| লাঞ্চে চিকেন ছিল, অমর ভেজিটেরিয়ান বলে ওর জন্য পনীরের তরকারী ছিল| খাবারের উপাদান সবই টাটকা ছিল| কিন্তু আমাদের কেয়ারটেকার/কুকের যা জঘন্য রান্না, আমরা কোনও ক্রমে খাওয়া শেষ করলাম|

একেই বাড়িটা খুঁজে পাইনি বলে মন মেজাজ খিঁচড়ে ছিল, তার উপর এই রান্না| বারান্দায় বসে একটু বৃষ্টি উপভোগ করার ইচ্চ্ছে ছিল, কিন্তু কলকাতার এক পাল বাঙালী যুবক যুবতী গুচ্ছের গান বাজনার সরঞ্জাম নিয়ে রাঁচী থেকে গাড়ী নিয়ে হাজির হল| তারা তাদের ঘরে বসে জগঝম্প বাজনা বাজিয়ে কিছু দুর্বোধ্য গান গাওয়া শুরু করে জঙ্গল মাথায় করল| আমার বৃষ্টি উপভোগ করা মাথায় উঠল| ঘরে গিয়ে বালিশে কান গুঁজে ঘুমোবার চেষ্টা করলাম|

‘তৃষাতুর শেষে পহুঁচিনু এসে আমার বাড়ির কাছে’

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না| ঘুম ভাঙল সেই সন্ধ্যা সাতটায়| অমরও ঘুমোচ্ছিল| শৌভিক এর মধ্যে গিয়ে চা আর ভেজ পকোড়ার ব্যবস্থা করেছে| চা খেতে খেতে শুনতে পেলাম আমাদের পড়শীরা খালি গলায় গান গাইছে| যদিও অধিকাংশর গলা ভেঙ্গে গেছে| শৌভিক এর মধ্যে গিয়ে ওদের সাথে আলাপ করে এসেছে| সবাই কোন একটা বাংলা ব্যান্ডের সদস্য|”

“গানগুলো কিন্তু খারাপ গাইছিল না|” শৌভিক ওর ব্যান্ড প্রীতি ব্যক্ত করে বলল “তুমি চটেমটে ঘুমোতে চলে চলে কেন? ওরা তো ওদের মত এনজয় করছিল|”

“ওদের এনজয়মেন্টটা আমি এনজয় করছিলাম না|” ব্যাজার মুখে বললাম আমি “ষ্টেশনের ওপাশে  কোনও গেষ্ট হাউসে থাকতে পারত| মনে হয় এরা হাইল্যান্ডে থাকলেও এদের কালোয়াতি শুনতে  পেতাম|”

“ষ্টেশনের ওপাশে কোই গেষ্ট হাউস নেহি হ্যায়|” হাই তুলে বলল অমর| তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ক্যা বাত, আপ কিঁউ স্ট্যাচু হো গয়ে?”

আমি দ্রুত ভাবছিলাম| মা আর বাবা দুজনেই বলেছিলেন বাড়িটা ষ্টেশনের কাছে ছিল| কিন্তু  কোন দিকে সেটা বলেননি| আচ্ছা, বাড়িটা ষ্টেশনের ওপাশে নেই তো?

ঝটপট পাপলুকে ফোন করলাম| ও ভেবে চিন্তে বলল ষ্টেশনের ওপাশে একটা বাড়ি আছে বটে| কিন্তু ও সেদিকে অনেককাল যায়নি| আমি ওকে পরের দিন সকাল ন’টায় আসতে বলে দিলাম|

পরদিন সকাল সকাল উঠে পড়লাম| আমাদের যাওয়া পরের দিন, সুতরাং বাংলোটা খুঁজে বের করার জন্য হাতে গোটা একটা দিন সময় আছে| প্রথমে ঠিক করলাম ষ্টেশনের ওপাশের বাংলোটা দেখতে যাব| পথে কিছু ভাঙ্গা এবং পুরানো বাংলো চোখে পড়ল, কিন্তু আমি সেগুলোর দিকে দৃকপাত না করে পাপলুকে বললাম কোথাও না থেমে সোজা রেলওয়ে ক্রসিং পেরিয়ে ওপারে চলো| আমার মন বলছিল ওখানেই রয়েছে আমার প্রথম প্রবাসের প্রথম নীড়|

রেলওয়ে ক্রসিং পেরিয়ে মূল সড়ক ছেড়ে গাড়ি গাছপালা ঘেরা একটা রাস্তা দিয়ে অল্প একটু গিয়েই পাপলু গাড়িটা একটা বাগানের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল| সেরকম কোনও গেট নেই, সোজা রাস্তা দিয়ে একসময় গাড়ি থামিয়ে বলল “ও দেখিয়ে, বাংলা হ্যায়|” গাছপালার আড়াল থেকে একটা বাড়ি চোখে পড়ল। দূর থেকে Flat roofed ই মনে হচ্ছিল| আমরা তিনজনে ঝটপট গাড়ি থেকে নামলাম|

সমতল ছাদ ও টানা বারান্দা সহ বাংলো (ছবি : লেখক)
সমতল ছাদ ও টানা বারান্দা সহ বাংলো (ছবি : লেখক)

একটু হেঁটে বাড়ির সামনে যেতেই বুঝলাম সেটা একটা সমতল ছাদ বিশিষ্ট বাড়ি বা Flat roofed বাংলো| মাথায় কোনও টালি নেই, কিন্তু রেলিং দেওয়া ছাদ আছে| সামনে টানা বারান্দা| কয়েকটা ফুলের টব রয়েছে| দরজা জানালা বন্ধ| একটা মালি বাগানে কাজ করছিল| তাকে প্রশ্ন করতে যে বলল যে এখানে লোক থাকে, আদতে কার বাংলো তার জানা নেই-বোধহয় কোনও এক গ্রাহাম সাহেবের| অনেকটাই মিলছিল, বাড়ির পাশে বাগান ছিলো সেটা তো জানি| ম্যাক্লাস্কিগঞ্জে এখন পর্যন্ত একটাই সমতল ছাদ বিশিষ্ট বাংলো চোখে পড়েছে।

শৌভিক জানতে চাইল যে বাড়িটার বর্ণনা মিলছে কিনা এবং সামনে এরকম টানা বারান্দা ছিল কিনা| বারান্দা নিয়ে আমার কোনও স্মৃতি নেই, কিন্তু ম্যাকলাস্কিগঞ্জে একটা লম্বা বারান্দায় বসা অবস্থায় আমার একটা ছবি বাড়ির অ্যালবামে রয়েছে|

“তাহলে তো এটাই! কোনও ল্যান্ড মার্ক গাছ ছিল?” জানতে চাইল শৌভিক

“চার বছরের স্মৃতি আর কতটুকু? শুনেছি পিছনে অনেক বাতাবি লেবুর গাছ ছিল|” বললাম আমি |

বাড়ির পিছনে গিয়ে দেখলাম ছোট ছোট অনেক গুলো বাতাবী লেবুর গাছ| মালিটা জানাল আগে এখানে বড় বড় বাতাবী লেবুর গাছ ছিলো, কিন্তু বছর পাঁচেক আগে সেগুলো রোগে ধরে শেষ হয়ে যায়|এই গাছগুলো তারই পরবর্তী বংশধর|

“সব মিলে যাচ্ছে| এটাই তোমার সেই হারানো বাড়ি|” উত্তেজিত স্বরে বলল শৌভিক

ক্যামেরার ফিল্ম মাত্র গোটা তিনেক অবশিষ্ট ছিলো| বাড়িটার একটা ছবি তুললাম| অমর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল| আমাদের মুখের ভাব দেখে বলল “মিল গয়া? চলিয়ে আচ্ছা হুয়া, আপকা মকান মিল গয়া|” তিনজনে বিজয় গর্বে গাড়িতে উঠে পড়লাম|

ঊষাঞ্জলীতে ফিরে জানতে পারলাম যে মাওবাদীরা পরের দিন বনধ ডেকেছে, ষ্টেশন পর্যন্ত যাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আর গেলেও ট্রেনে উঠতে পারব কিনা তাতেও সন্দেহ আছে| কিন্তু আমরা তখন যেরকম খোশমেজাজে ছিলাম একটুও ঘাবড়ালাম না| আমরা পাপলুকে ভজিয়ে ভাজিয়ে ওর গাড়িটাতে মালপত্র তুলে সোজা রাঁচী স্টেশন পৌঁছলাম|

টিকিট কাউন্টার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল| কিন্তু কপাল ভালো একজনকে পেয়ে গেলাম যিনি সেদিনের দুটো টিকিট ক্যানসেল করাতে এসেছিলেন| কাউন্টার বন্ধ দেখে ফেরৎ যাচ্ছিলেন| আমরা তাঁর টিকিটটা নিয়ে আমাদের পরের দিনের ম্যাকলাস্কিগঞ্জের টিকেটটা দিয়ে দিলাম| তখন এত প্যান কার্ড, আধার কার্ডের ঝকমারি ছিলো না| ট্রেনে উঠে কিছু এক্সট্রা দিয়ে দুটো টিকেট থেকে  নিমেষের মধ্যে তিনটে টিকিট হয়ে গেল| স্থানমাহাত্ম্য বলে কথা| ছোটবেলাটা যে রাঁচীতে কেটেছে সেটা ভুলে গেলে চলবে?

পরিশিষ্ট

লেখাটা আগের পরিচ্ছেদে শেষ করলেই ভালো হত| কিন্তু এটা একদম সত্য কাহিনী| আর সত্যিকারের জীবনে কোনও পোয়েটিক জাস্টিস হয়না| বাড়ি ফিরে ছবি প্রিন্ট করে মা আর বাবাকে বিজয়্গর্বে সেই বাংলো বাড়ির ছবি দেখিয়েছিলাম| কিন্তু তাঁরা আমায় মর্মাহত করে বলেছিলেন এটা আমার সাধের প্রথম প্রবাসের সেই বাড়ি নয়|

বাড়িটার সমতল ছাদ ছিলো ঠিকই, কিন্তু টালি দিয়ে ঢাকা ছিল। ছাদে কস্মিনকালে রেলিং ছিলো না আর বাড়ির সামনে টানা বারান্দাও ছিল না| রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে সোজা উঠে যেতে হত| পাশেই একটা পাতকুয়া ছিল|

“বাড়িটা তাহলে ষ্টেশনের ওপারে ছিল না?” নিরাশ কন্ঠে বলেছিলাম

“না না, এপারেই ছিল| গর্ডনের বাড়ি আর লেভেল ক্রসিং এর মাঝামাঝি| আর টানা বারান্দা তো ফ্যাক্টরীর ভিতরে যে কোয়ার্টার সেটায় ছিলো| তোমার তো ওই দোষ, সব কথা না শুনেই চলে যাবে|” বলেছিলেন বাবা|

আবছা মনে পড়েছিল সেদিন সকালে রেল ক্রসিং এর দিকে যেতে অনেকগুলো ভাঙ্গা বাড়ি দেখেছিলাম| আগ্রহ দেখাইনি| আমার প্রথম প্রবাসের সেই বাড়ি তার মধ্যেই ছিল না তো! কে বলতে পারে|

তারপর আর কোনদিন ম্যাকলাস্কিগঞ্জ যাওয়া হয়নি| তবে মাঝে মাঝে বাড়িটার কথা মনে হয়| ভাবছি এই শীতে আরেকবার সেই প্রথম প্রবাসের বাসা খুঁজতে যাব কিনা|

 
প্রয়োজনীয় তথ্য

যদি কেউ উইকএন্ডে শুধু হাত পা ছড়িয়ে সবুজ বনানীর মাঝে আয়েস করতে চান, ম্যাকলাস্কিগঞ্জের জুড়ি মেলা ভার| সকালে উঠে মিঠে রোদের প্রলেপ মেখে গাছ গাছালির মাঝে হাঁটতে ভালই লাগবে| পুরানো বাংলো বাড়ি, লম্বা জঙ্গুলে রাস্তা কিংবা ডেগা ডেগির পাশে চট্টি নদী- এই সব নিয়ে এবং  অনেক পুরানো স্মৃতি আঁকড়ে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ এখনও টুরিস্টদের আকর্ষণ করে|

ম্যাকলাস্কিগঞ্জের শেষ কয়েক বছরে অবস্থার বেশ কিছুটা উন্নতি হয়েছে| ডন বস্কো স্কুলটাকে কেন্দ্র করে অনেক বাংলোকে স্টুডেন্ট হোস্টেলে পরিণত করা হয়েছে| লোডশেডিং এর দাপট অনেকটাই কম । মাওবাদী উপদ্রব এখন আর সেরকম নেই| সি.আর.পি.এফ পোষ্টিং বসেছে| তবে রাতে এখনো বাইরে বেশি চলাফেরা না করাই ভালো|

হাইল্যান্ড গেষ্ট হাউস আর গাঙ্গুলী বাবুর উষাঞ্জলী গেষ্ট হাউস অনেক কাল হলো উঠে গেছে| এখন থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো সুবিশাল বাগান ঘেরা গর্ডন সাহেবের বাংলো| থাকার জন্য সাজানো গোছানো গোটা পাঁচ ছয়েক ঘর রয়েছে| ববি গর্ডন খুব অতিথি বৎসল মানুষ| ওনার ওখানে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও আছে| তবে কেউ নিজেদের কুক আর রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে গেলে, রান্না করার জায়গার ব্যবস্থাও আছে|

ঘর বুক করার জন্য এই নাম্বারে ফোন করতে পারেন: (+91)9470930230, 9835770679, 9430149692 বা ইমেল করতে পারেন bobbygordon.gunj@gmail.com

ম্যাকলাস্কিগঞ্জ যেতে হলে আমার মত শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে গভীর রাতে সরাসরি ম্যাকলাস্কিগঞ্জ পৌছনোর চেষ্টা না করাই ভালো| ট্রেনটা হামেশাই লেট করে|

তার চেয়ে ভালো উপায় হলো হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে সকাল বেলায় বা দুপুরবেলায় রাঁচী পৌঁছে যান| সকালের ট্রেন (হাওড়া হাতিয়া ক্রিয়া যোগ এক্সপ্রেস) ৭:০৫ এ রাঁচী পৌঁছায়| দুপুরের ট্রেন (শতাব্দী এক্সপ্রেস) পৌঁছায় দুপুর ১:১০ এ| রাঁচী থেকে ম্যাকলাস্কিগঞ্জর দূরত্ব ৬৪ কি.মি.| প্রাইভেট  গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।

অমিতাভ গুপ্ত
ছিলেন নামী কোম্পানির দামী ব্র্যান্ড ম্যানেজার | নিশ্চিত চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে পথের টানেই একদিন বেরিয়ে পড়া | এখন ফুলটাইম ট্র্যাভেল ফোটোগ্রাফার ও ট্র্যাভেল রাইটার আর পার্টটাইম ব্র্য্যান্ড কনসাল্টেন্ট | পেশার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছেন নেশাকেও | নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হয় বেড়ানোর ছবি এবং রাইট আপ |

6 COMMENTS

  1. Such vivid writing! Bringing back memories of innocent childhood days. The picture of river reminds me the poem” Amader chhoto Nadee”. Looking forward to more fascinating travel logs like this.

  2. লেখা পড়ে আমি মুগ্ধ! সত্যি সত্যি এবার কলকাতা গেলে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে যেতেই হবে। ধন্যবাদ অমিতাভ গুপ্ত।

  3. এটা একটা সুন্দর সময়ের সুন্দর স্মৃতি। পরে বিভিন্ন সময়ে এলাকাটার ক্রমান্যয় প্রভূত উন্নতি অ অবনতি হয়। এক সময়ে মাওবাদী আক্রান্ত এলাকার মধ্যে পড়ে, এক সময়ে প্রবল জলাভাবে পড়ে। তাই, সর্বশেশ খবর নিয়ে যাওয়াই ভাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here