হোয়াইট সিটি – উদয়পুর

661
রাজস্থানের হোয়াইট সিটি উদয়পুর

সেবার রাজস্থান ভ্রমনের একেবারে শেষ পর্বে ছিল জয়পুর। তার আগে পথে উদয়পুরে দিন দুয়েকের জন্য থাকার প্ল্যান। মাউন্ট আবু থেকে সরাসরি বাসে উদয়পুর যেতে সময় নেয় ছ’ ঘন্টা মত। আগাগোড়া পাহাড়ে ঘেরা সুন্দর রাস্তা, তাই অতটা পথ তেমন একঘেয়ে লাগে না। তাছাড়া রাজস্থানের এই মেওয়ার অঞ্চলে সবুজ গাছপালাও প্রচুর।

পিনডওয়ারা-র সেই বাজার ফেরত মহিলা

সকাল সাতটায় বাস ছেড়েছে, মাঝে পিনডওয়ারা বলে একটা জায়গায় হল্ট দিল, সাড়ে দশটা নাগাদ। সেই সুযোগে বাস থেকে নেমে বাজার ফেরত এক মহিলাকে দাঁড় করিয়ে চটজলদি একটা স্কেচ করে নিলাম। দু’হাতে থলি আর মাথায় একরাশ কাঠ নিয়ে বেচারা নীরবে আমার আবদার মেনে নিল। উদয়পুরকে বলা হয় রাজস্থানের ‘হোয়াইট সিটি’। অর্থাৎ বাড়ি ঘর- প্রাসাদ- মন্দির সব কিছু একেবারে সাদা। তবে এগুলো যে সাদা পাথর দিয়ে বানানো, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। এরা বাইরের দেওয়ালে আগাপাশতলা সাদা রঙ লাগিয়ে একটা ইউনিফর্ম দেওয়ার চেষ্টা করে মাত্র … ট্যুরিস্টদের টেনে আনতে গেলে এই ধরনের স্টান্টগুলো বেশ কাজে লাগে। মূল উদয়পুর শহরটা বেশ ঘিঞ্জি আর এলোমেলো গোছের – উত্তর ভারতের আর পাঁচটা জায়গার থেকে বিশেষ তফাৎ নেই বললেই চলে। তবে কিনা, রাজা-রাজড়া আর শেঠ-বানিয়াদের খাস তালুক তো, ফলে যথারীতি প্রাচীন সমস্ত হাভেলি  আর অট্টালিকা ছড়ানো অলিতে গলিতে। শহরটার উত্তরে রয়েছে বিশাল এক ঝিল, যার নাম ‘পিছোলা লেক’। এটাকে পিছন দিক ধরা হয়, তাই বোধহয় এই নামকরণ।

যাই হোক, আমি ঠিক করেই এসেছিলাম, এই লেকটার কাছেই থাকব – একটা অটোওলাকে বলতেই ও আমাদের তুলে নিয়ে একটা পুরোনো মহল্লা পেরিয়ে হাজির করলো একটা হোটেলের সামনে।  …… বলল, খুব কাছেই নাকি লেক। যদিও প্রথম ধাক্কায় চারপাশটা দেখে তেমন কিছু বোঝা গেল না।  দুগ্গা বলে মালপত্তর নিয়ে ঢুকে পড়লাম হোটেলে। মালিক নয়, এক মালকিন সব দেখভাল করেন – ওই দুপুরেই যথেষ্ট সাজুগুজু করে বসে ছিলেন। একগাল হেসে আমাদের সোজা তিনতলায় নিয়ে গিয়ে তুললেন …… দেখলাম টানা বারান্দার একপাশে সার দেওয়া ঘর – সব খালিই রয়েছে …… আর গোটা সামনেটা জুড়ে পিছোলা লেক। বুঝলাম, একেবারে তার ধার ঘেঁষেই উঠেছে বাড়িটা। ঘরটা মাঝারি কিন্তু মোটা তাকিয়া, কারুকাজ করা খাট – বড় বড় ঝরোখা – দেওয়ালে মিনিয়েচার পেন্টিং – এ সব দিয়ে চমৎকার সাজানো গোছানো …… ঠিক মনে হবে কোনও হাভেলিতেই রয়েছি। নিচের বারান্দায় যেটুকু আড়াল ছাদে উঠে গেলে তাও নেই। কোনাকুনি  তাকালেই বিশাল সিটি প্যালেসটা দেখা যায় – লেকের ঠিক ওপারে, আর জলের মাঝখানে রয়েছে সেই বিখ্যাত লেক প্যালেস যা বহুকাল হল পাঁচতারা হোটেল হয়ে গিয়েছে। ওখানে যাতায়াত করতে হয় নৌকো চেপে, যেগুলো অনেকটা বজরার মিনি সংস্করণ। হাতে সময় কম তাই চটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম সিটি প্যালেস দেখতে। তার আগে অবশ্য মালকিন আমাদের লাঞ্চ করিয়েই ছাড়লেন। মটর পনির – ঘি মাখানো চাপাটি – ডাল ফ্রাই – দারুন রান্না …… যাক পাচকটি তাহলে ভাল – বলে এলাম রাতে মুর্গি রাঁধতে। তখন কি জানতাম এই পাচক ঠাকুরটি পরদিন সকালেই চম্পট দেবেন আর রান্নায় অষ্টরম্ভা আমাদের মালকিন বেচারি হাত পুড়িয়ে যা বানাবেন তা মুখে তোলা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।

পিছোলা লেকের ধোবিঘাট

প্যালেসের বর্ণনা দিয়ে আর লাভ নেই। এক শ্রেণীর মানুষের জীবনযাত্রা যে কতখানি বিলাসবহুল হতে পারে রাজস্থানে বেড়াতে এসে তার ভূরি ভূরি নিদর্শন দেখতে দেখতে এক সময় ক্লান্তিকর লাগাটা খুবই স্বাভাবিক। প্রাসাদের মাঝখানে ফুটবল গ্রাউন্ডের চেয়েও বড় একটা খোলা চত্বর, যার একটা অংশ বিয়ের জন্য ভাড়া দেওয়া হয় – এক রাতের খরচ নাকি মাত্র এক কোটি টাকা (এটা বছর পনেরো আগের কথা)। ছবি আকাঁর জন্য একটা বেলা সেকেলে গলি ঘুঁজিতে চক্কর লাগিয়ে কেটে গেল …… বেশিরভাগ বাড়ির সামনে খিলানওলা বড় বড় কাঠের দরজা …… সামনে রোয়াক …… ভেতরটা অন্ধকার মত – আর বাইরের দেওয়াল ভর্তি হাতি-ঘোড়া-সৈন্য-সামন্ত সব আঁকা।

জগদীশ মন্দির

এইসব অঞ্চলগুলিতে দেখলাম বিদেশী ট্যুরিস্টরা থাকতে পছন্দ করে বেশি। দু’চারটে গেস্ট হাউসের নাম দেখেই সেটা মালুম হল …… কেক-রুটির দোকান কিংবা কন্টিনেন্টাল রেস্তোরাঁও বাদ যায়নি। স্থানীয় মানুষ তারই মধ্যে প্রচুর হস্তশিল্পের দোকান সাজিয়ে বসেছে। একটা গলি গিয়ে পড়েছে দেখলাম লেকের সেই ধোবি ঘাটে। মুখটাতেই রয়েছে প্রায় চারতলা সমান উঁচু পাঁচিল – যার মাঝখানে কাজ করা বিশাল দরজা আর ছোট ছোট খোপ। দেখেই মনে হলো জায়গাটাকে আঁকতে হবে রংচং দিয়ে।

স্কুটারের সিটে খাতা রেখে করা সেই স্কেচ

অথচ গুছিয়ে বসার তেমন কোনও উপায় নেই, চারপাশে ক্রমাগত লোকজন, ষাঁড়-গরু ঘোরাফেরা করছে …… শেষ কালে একপাশে দাঁড় করানো একটা স্কুটারের সিটের একটায় স্কেচ খাতা অন্যটায় রঙের প্যালেট আর জলের বাটিটা রেখে দিব্যি এঁকে নিলাম। পরের ছবিটা হল ধোবিঘাটে বসে …… সকাল থেকেই এখানে অজস্র রঙিন কাপড় – জামা – পাগড়ি ইত্যাদি কাচাকাচি চলে। তারপর সে সব চারপাশে টাঙিয়ে দেওয়া হয় শোকানোর জন্য।

হঠাৎ এতরকমের ঝলমলে রঙ দেখলে মনে হবে নির্ঘাৎ কোনও ‘ফ্লাওয়ার শো’তে ঢুকে  পড়েছি। ১৯৮০র দশকে জেমসবন্ড সিরিজের ‘অক্টোপুসি’ সিনেমার অনেকটাই তোলা হয়েছিল উদয়পুরে – এই ধোবিঘাটেও অনেক দৃশ্য ছিল, ফলে জায়গাটা তখন থেকেই বিদেশিদের কাছে একটা বড় আকর্ষণ হয়ে আছে। সবাই দল বেঁধে আসছে আর ক্যামেরা বার করে ছবি তুলে যাচ্ছে। লেক প্যালেস যাওয়াটা অবশ্য বেশ খরচের ব্যাপার …… কমপক্ষে লাঞ্চ করা চাই, তবেই ঢুকতে দেবে …… ওসব আমাদের পোষাবে না। নিজেদের হোটেলের ছাদে বসে লেক প্যালেসের খোলসটা দেখেই কাটাতে হল। সামান্য দূরে পাহাড়ের ওপর আরও একটা প্যালেস …… ওখানেই নাকি রাজাদের গ্রীষ্মকালটা কাটত। পশ্চিম দিকের পাহাড়ের ফাঁকে সূয্যিমামা ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেক প্যালেসের মধ্যে কোথাও ঝাঁইঝপাঝপ করে কাড়া-নাকাড়া সমেত সানাই বাজানো শুরু হল …… একেবারে খাঁটি ভারতীয় অর্কেষ্টা – বিদেশী মেহমানদের ষোল আনা পয়সা উসুল যাকে বলে …… এ সব জায়গায় থাকার রেস্ত আর কাদেরই বা আছে ?

হাভেলির দেওয়ালে হাতি-ঘোড়া আঁকা

উদয়পুর এলে রনকপুর মন্দিরটা অবশ্যই দেখতে হয় – এখান থেকে নব্বই কিলোমিটার দূরত্ব – যেতে আসতে ঘন্টা চারেক। দিলওয়ারার সঙ্গে জোর টক্কর দিতে পারে এই মন্দির – সুক্ষ্ণ কারুকাজের জন্য যদি দিলওয়ারা হয় তবে আর্কিটেকচারের জন্য এগিয়ে থাকবে এই রনকপুর। জৈনদের এই মন্দিরে কোনও কড়াকড়ি নেই। মনের সুখে ছবি তোলা যায়। আলাপ হল মন্দিরের এক পূজারি রামেশ্বর ভাইয়ের সঙ্গে – বসে বসে আমাদের এই মন্দিরের অনেক খুঁটিনাটি ইতিহাস বললেন। লিখে টিখে নিলে তবু হত …… শোনা কথা কতই বা আর মনে রাখব ! উদয়পুরে মুসলিম জনসংখ্যা খুবই কম। তাও সন্ধের মুখে হালকা আজানের শব্দ ভেসে এলো …… আশেপাশে কোনও মসজিদ আছে নিশ্চয়ই । হল কি আজান বন্ধ হওয়া মাত্রই চারদিক থেকে মাইকে তারস্বরে শুরু হয়ে গেল  …… ‘ রাম-রাম-রাম-রাম’ বুলি – নিদেনপক্ষে একটা ভজন হোক …… তাও না। ছেঁদো রেষারেষি আর কাকে বলে।

খারাপ লাগল এটা দেখেও যে এখানকার কিছু বেকার ছেলে ছোকরা কীভাবে বিদেশীদের কাছ থেকে নানা ভাবে পয়সা হাতাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অন্য অনেক জায়গাতেই অবশ্য এটা দেখেছি, কিন্তু এখানকার এতসব রাজপ্রাসাদ আর ঐশ্বর্যর পাশাপাশি সারাক্ষণ ভিখিরিপনা করতে থাকা মানুষগুলো যে অদ্ভুত কন্ট্রাস্ট তৈরি করে  – সেটাই হয়তো সবার মনে ভারতবর্ষের স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।

Advertisements

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.