আরাকু…ট্রাইবাল মিউজিয়াম আর সেই অনির্বচনীয় ঝরনা

685
মনে হয় আবার যাই 'আরাকু'

আরাকুর ট্রাইবাল মিউজিয়াম সত্যি একটা দেখার জিনিস। এ অঞ্চলে যে কুড়িটা মতো উপজাতি গোষ্ঠী বাস করে তাদের জীবনযাত্রার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিবরণ খুব সুন্দরভাবে সাজানো আছে মিউজিয়ামটির বিভিন্ন অংশ জুড়ে। অনেকটা সময় হাতে নিয়ে মাথা পিছু দশ টাকার টিকিট কেটে আমরা গিয়ে ঢুকলাম গাছপালা আর ছোট ছোট পুকুর (এখানে বোটিংও করা হয়) ঘেরা বিশাল একটা বাগানে যার মাঝখান দিয়ে বাঁধানো পায়ে চলা আঁকাবাঁকা রাস্তা পৌঁছে দেবে মাটির তৈরি চালাঘরগুলিতে।

ট্রাইবাল মিউজিয়ামের মূল বাড়ি

প্রতিটা ঘর এমন ভাবে সাজানো ভিতরে পা দিলে মনে হবে যেন সত্যি কোনও আদিবাসীর অন্দরমহলে এসে পড়েছি। চারদিকে ছড়ানো কাঠের তৈরি জিনিসপত্র, বেতের ঝুড়ি, মাটির হাঁড়িকুড়ি, গেরস্থালী সরঞ্জাম, মাঝখানে একটা আলপনা আঁকা পিঁড়ি কিংবা মস্ত ধামসা। কোথাও হয়ত প্রমাণ সাইজের একটা মানুষের মূর্তি রাখা যে নিচু হয়ে কাঠ কাটতে ব্যস্ত। সমস্ত জিনিষের গায়ে একইসঙ্গে চলতি আর এদের ভাষায় লেবেল লাগানো। দেখলাম এদের জল রাখার পাত্র হল ‘গড়িয়া’, হামান দিস্তে হল, ‘কলু’। চালাঘরগুলো ছাড়াও গম্বুজঅলা বড় গোল দোতলা একটা বাড়ি রয়েছে যেটা মিউজিয়ামের মূল অংশ। ঘুরে ঘুরে জানতে হয় আদিবাসীদের মধ্যেও রয়েছে কত রকমের শ্রেণীবিভাগ, তাদের ইতিহাস, ভূগোল, সামাজিক রীতিনীতি। যেমন তেলেগু ভাষায় নদী হল ‘গেড্ডা’ আর এই নদীর ধারেই বসবাস করে বলে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নাম হয়েছে ‘গাডাবা’। কিংবা ‘ডিমসা’, ‘কাটকি’, ‘ময়ূরী’ মিলিয়ে এদের নাচের ফর্মই রয়েছে প্রায় দশ রকমের। তবে বোর্ডের ওপর এই সব বৃত্তান্ত কারা যে ইংরেজিতে লিখেছে কে জানে বানান আর ভাষার বহর দেখে রীতিমত ভিরমি খেতে হয়।

এই রকম পথ ধরে হাঁটার মজাই আলাদা

বাগানের একধারে একটা মাঝারি মাপের অ্যাম্পিথিয়েটারও রয়েছে, সেরকম টুরিস্টের দলটল এলে আদিবাসী নাচ গান হয়। আমাদের রিসর্টের বাগানে অবশ্য রোজই লাঞ্চের সময় একদল লোক এসে নানারকম ফুঁ যন্ত্র বাজিয়ে আর মাদল পিটিয়ে আসর বসাত সঙ্গে মেয়েদের নাচ। প্রায় এঁটো হাতে ক্যামেরা বার করে ছবি নিতেও ছাড়িনি। ফেরার সময় মিউজিয়ামের ঠিক বাইরেই রাস্তার পাশে ঝুপড়িগুলোতে দেখলাম সাইনবোর্ড ঝোলানো, ‘ব্যাম্বু চিকেন পাওয়া যায়’। মনটা অমনি নেচে উঠল, ট্রাইবাল ফুডের জায়গাতেই তো এসেছি। বাঁশের মধ্যে মাংস পুরে মাটির ওপর রাখা কাঠের উনুনে তন্দুর করে দেয়, একটু সময় লাগে। লক্ষ্মী আর ওর মেয়ে পালা করে বসে উনুনে ফুঁ দিতে দিতে বাঁশ ঘুরিয়ে গেল। ওর বর ক্যাশটা দেখে, ২০২২ পিসের দাম ২৫০ টাকা। পাশে নড়বড়ে টেবিল চেয়ার ছিল বটে কিন্তু সন্ধ্যে হয়ে আসছে তাই আমরা রিসর্টে ফিরে স্টার্টার হিসেবে ওগুলোর জমিয়ে সদ্ব্যবহার করলাম। খেতে কিন্তু বেশ আর সস্তাও বটে। পরদিন ফেরার পালা, ভাইজ্যাগ থেকে ট্রেন সেই রাত্রে। গাড়ি বলা ছিল, পথে বোররা গুহা ছাড়াও আরও দু একটা জায়গা দেখাবে। প্রথমে কফির বাগান, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গাছপালা আর ঝোপঝাড়, গাড়ি রেখে ড্রাইভার শেখর বলল, ‘দেখ লিজিয়ে’। দেখে উল্লসিত হবার তেমন কিছু নেই,

কফির বাগানে দোকান সাজিয়ে বসেছে ‘ভুজ্জি’
‘থাডিগুড়া’ ঝরনার পথে কাঠি কাবাবের দোকান

একমাত্র রাস্তার ধারে দোকান সাজিয়ে বসা হাসিখুশি ছেলেমেয়েগুলো ছাড়া। কেনার মধ্যে প্যাকেটে করে নানারকম কফি পাউডারের সঙ্গে পোস্ত, গোলমরিচ এই সব। গিন্নী ঝোঁকের মাথায় টুকটাক কিনল বটে কিন্তু পরে বেচারি পস্তাল। নেক্সট স্টপ, ‘থাডিগুড়া’ ঝরনা। পাহাড়ের গা বেয়ে সিঁড়ি বানানো আছে দিব্বি নেমে যাওয়া যায় একেবারে পায়ের কাছে। দুদিকে খাড়া পাহাড় আর ঘন জঙ্গল, যাকে বলে গা ছমছমে পরিবেশ তবে তারই মধ্যে দেখলাম দু জোড়া হাজব্যান্ডওয়াইফ (আন্দাজ করলাম অবশ্য) ঝরনার তলায় এক কোমর জলে নেমে তুমুল হুটোপুটি জুড়েছে। পুরুষদের কথা ছেড়েই দিলাম মহিলারাও এতটা স্বল্পবসনা হয়ে ছিলেন যে লজ্জায় কাছ থেকে ঝরনার ছবি নেওয়াটা মুলতুবি রাখতে হল। আমরা আরও কিছুটা এগিয়ে জঙ্গলের শেষে একটা খাঁদের ধারে পাথরের ওপর বসে অদ্ভুত নির্জনতা উপভোগ করলাম অনেকক্ষণ ধরে। এরপর বোররা গুহা। কয়েক কোটি বছরের পুরনো বলে কথা, ফলে প্রচুর লোকে ভিড় করে দেখতে আসে। পাথর টাথর না বুঝলেও গুহার আঁনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে বেশ লাগে। কখনো হাতল দেওয়া সিঁড়ি বেয়ে টঙে চড়ে ফাঁকে ফোকরে আবিষ্কার করলাম ছোট ছোট সব শিবের মূর্তি, চারপাশে নৈবেদ্য ছড়ানো এমনকি পুরুত মশাই অবধি গুটিসুটি মেরে হাজির। আবার কখনো সরু আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ ধরে সেঁধিয়ে গেলাম অন্ধকারাচ্ছন্ন স্যাঁতস্যাঁতে আলিবাবার রত্নভাণ্ডারে। গুহার মধ্যে অল্পবিস্তর আলোর ব্যবস্থা তো রাখতেই হবে তাই বলে অত চড়া আর ক্রমাগত বদলাতে থাকা লাল, নীল, হলুদের কি কোনও দরকার ছিল? এতো প্রায় থিম পুজো বানিয়ে ছেড়েছে মনে হল। গুহা থেকে বেরলাম ঘণ্টা দেড়েক পর, লাঞ্চ হয়নি, দুচারটে খাবারের দোকানের সামনে লম্বা লাইন দেখে আমরা ধীরে সুস্থে একটা ডাবওলার কাছে গিয়ে একটা করে শাঁসালো ডাব খেয়ে নিলাম। বিশাল সাইজের ডাব আমাদের মতো খাইয়েদের পেট ভরানোর পক্ষে যথেষ্ট। হাতে এখনও অনেক সময়। শেখর বলল, ‘চলুন টয়ডা জঙ্গল রিসর্ট দেখিয়ে দিই’। রাস্তার ধার দিয়েই শুরু হয়েছে পাহাড়ি জঙ্গল আর ধাপে ধাপে গাছপালার মধ্যে বানিয়ে রেখেছে ছবির মতো সুন্দর সব একতলা কটেজ। লোকজন অবশ্য বিশেষ দেখলাম না, আমরাই কায়দা মেরে ছবি টবি তুলে নেমে এলাম। একদিনে ঘোরাঘুরি কম হয়নি, ভাইজ্যাগ স্টেশনে পৌঁছে হাত পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে বসা গেল। এবার ট্রেনের অপেক্ষা তারপর রাত ফুরলে বাড়ি ফেরা।

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.