পায়ে হেঁটে থলুং যাত্রা

1308
আমাদের বাসস্থান থেকে আঁকা থলুং গুম্ফা

সকালে দেখলাম কি ভাগ্যি আকাশ পরিষ্কার | দশটার মধ্যে পালদেনের বাবা মি: নরবু নিজে জিপ্সি চালিয়ে এলেন আমাদের নিতে | মঙ্গন থেকে প্রথমে যাওয়া হবে লিংজা | ওই অবধি গাড়ির রাস্তা, জিপ সার্ভিসও আছে, ঘন্টা দুই লাগে, ওখান থেকে তারপর থলুং- এর জন্য ট্রেকিং শুরু | খুব ছোট্ট গ্রাম
লিংজা , পালদেনদের এখানে জমি জমা আর খামার বাড়ি আছে, ওর মা আর এক বোন থেকে সব দেখাশুনো করেন | মাকে সবাই বলে জেঠি | আমাদের আর এক রাউন্ড চা খাইয়ে সঙ্গে একজন গাইড কাম পোর্টার মুখিয়াকে দিয়ে মি: নরবু মঙ্গন ফিরে গেলেন, আমরাও পাহাড়ে চড়া শুরু করলাম | প্রায় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ, কখনো উঠছে কখনো নামছে, মাঝে মাঝে এত সরু যে একজনকেই বহুকষ্টে পেরোতে হয় | আমি তো একবার পা হড়কে প্রায় পপাত চ হচ্ছিলাম | রীতিমত মোটা শরীর নিয়েও খোকন আমার হাত পাকড়ে টেনে তুলল | ঘন্টা খানেক যাবার পর হুড়মুড়িয়ে অনেক নিচে চওড়া নদী পর্যন্ত নামতে হল | সবটাই হাঁটু জল, বড় বড় পাথর ফেলা রয়েছে | আমরা কিছুক্ষণ বসে হাঁফ ছাড়লাম, খানিক ফোটো সেশন হল | এবার উল্টো দিকের পাহাড়ে ওঠা |

লিংজার একটা চটজলদি স্কেচ
লিংজার জেঠি

বিকেল চারটে নাগাদ আমরা এসে পৌঁছলাম ‘ছানা’ বলে একটা জায়গায় | পালদেনদের এখানেও একটা কাঠের দোতলা বাড়ি রয়েছে | আজ রাতটা এখানে কাটিয়ে কাল থলুং যাওয়া | বাড়িটা আর চারপাশের ঘন জঙ্গল ঘেরা অদ্ভুত নিবিড় পরিবেশ দেখে আর স্থির থাকা গেল না, আধো অন্ধকারের মধ্যেই বসে গেলাম স্কেচ করতে | এখানে ব্যবস্থা ভালোই, বাড়ির দোতলায় দিব্যি সাজানো গোছানো খান তিনেক ঘর, দুজন কেয়ারটেকার আমাদের আপ্যায়ন করতে উঠে পড়ে লাগল, মোমবাতির আলোয় ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, সবজি, টক দই এল থালা সাজিয়ে | বোঝা গেল আমাদের আগমন বার্তা আগেভাগেই এদের কাছে চলে এসেছে | বাইরে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা হলেও কাঠের ঘরে পুরু কম্বলের মধ্যে শুয়ে আরামেই রাত কাটল | পরদিন ‘ছানা’ থেকে বেরিয়ে আরো ভাঙাচোরা আর পিছল রাস্তা পেরিয়ে সকল সাড়ে দশটার মধ্যে আমরা থলুং পৌছে গেলাম | খাড়া পাহাড় আর গভীর জঙ্গলের মাঝখানে ছোট্ট এক চিলতে সমতল জায়গা, একদিকে গুম্ফা অন্যদিকে একটা পুরনো কাঠের বাড়ি | এটাও পালদেনদের এবং এখানেই আমাদের রাত্রিবাস | বহুকাল যাবত এই পথ ছিল তিব্বতের সঙ্গে ভারতের গোপন সংযোগস্থল, লামারা মূল্যবান সব জিনিসপত্র সঙ্গে করে পালিয়ে এসে এই গুম্ফায় লুকিয়ে রাখত | এতদিন ধরে সম্পূর্ণ অরক্ষিত এই গুম্ফার সম্প্রতি দুজন পাহারাদার জুটেছে ডি-আইজি হান্ডা সাহেবের কৃপায় | খুব হালকা একটা ঝর্নার শব্দ ছাড়া গোটা জায়গাটা অদ্ভুত নিঝুম, চারদিকের পাহাড়গুলো যেন হাঁ করে গিলতে আসছে, তার ওপর অন্ধকার করে ঝিরঝিরে বৃষ্টি নামল | দিনের বেলাও ভুতুড়ে পরিবেশ, তারই মধ্যে আমরা গুম্ফায় হানা দিলাম |


জঙ্গলে ঘেরা ‘ছানা’র দোতলা বাড়ি

বলা হয় সিকিমের জনক লাচেন চিম্পোর তৈরি পাঁচশো বছরের এই গুম্ফায় ধীরে ধীরে তিব্বতি জিনিসপত্রের এক দুষ্প্রাপ্য আর্কাইভ গড়ে উঠেছে | তবে সবই তালাবন্দি, দুবছরে একবার এখানে মেলা বসে তখন এগুলো বার করা হয়, দলে দলে ভক্তরা এসে তাঁবু খাটিয়ে থাকে | গুম্ফায় ছবি তোলা বারণ, এবং মানুষ বলতে এক বৃদ্ধ লামা যিনি মন্ত্রপড়া থেকে নিয়ে কাঠি দিয়ে ঢাক পেটানো সব কিছু একাই করে চলেছেন | আমাদের মতো বিধর্মী টুরিস্ট দেখে মনে হল বিশেষ খুশি হননি, তাও অনুমতি নিয়ে একটা স্কেচ করলাম |


থলুং গুম্ফা


গুম্ফার একাকি লামা

দুপুরের পর জোর বৃষ্টি আসায় আর ঘর থেকে বেরোনো গেল না, কম্বল জড়িয়ে বসে কাটালাম প্রায় ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে | ওই পাহারাদারগুলোই আমাদের রাতের খাবার যা বানিয়ে দিল মুখে তোলা গেল না, খালি মানে হচ্ছিল এ কোথায় এলাম রে বাবা | এই বনবাদাড়ের মধ্যে দিয়ে খোকনের দলবল কোথায় গিয়ে পৌঁছবে কে জানে | আমরা পরদিন ভোর হতেই হাঁটা লাগলাম ফিরতি পথে | তখনো বৃষ্টি পড়েই চলেছে | তারই মধ্যে মাঝে মাঝেই দেখলাম ভক্তিপ্রাণ পুরুষ, মহিলারা ছোট ছোট দলে থলুং যাবার জন্য উঠে আসছে | পথে ছানায় এসে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা বিকেলের মধ্যে লিংজা পৌঁছে গেলাম | আমাদের পোর্টার মুখিয়ার এবার ছুটি, ওকে দুশো টাকা দেওয়া হল এবং ও তৎক্ষণাৎ নাচতে নাচতে নেশা করতে ছুটল | লিংজায় রাতটা কাটিয়ে কাল আমরা মঙ্গন ফিরব | ওখানে দিন কয়েক স্রেফ বিশ্রামের মেজাজে থাকার ইচ্ছে আছে |

গত পর্বের লিংক –

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.