দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |
হোটেল ‘সিল্ভার ফার’ এর ঘর থেকে আঁকা গ্যাংটক শহরের প্রধান সড়ক

আমার পাহাড়প্রেমী বন্ধু খোকন কলকাতার হিমালয়ান ক্লাবের ভেটারেন, মাঝে মাঝেই রেকি করতে যায় ওদের পরবর্তী অভিযানের জন্য। সেবার বলল, ‘চলো তোমায় থোলুং গুম্ফা দেখিয়ে আনি।’ জায়গাটা উত্তর সিকিম শুনে নেচে উঠলাম, দারুণ সুন্দর হলেও বেশ ধকলের জার্নি বলে তখনো খুব বেশি লোক ওদিকে যেত না। সেটা ছিল ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আমাদের আগে যেতে হবে মঙ্গন তারপর ওখান থেকে ট্রেক করে থোলুং। উত্তর সিকিমের হেডকোয়ার্টার এই মঙ্গন ছাড়িয়ে কোথাও যেতে হলে পারমিট লাগে কারণ এর উত্তরে গোটাটাই তিব্বত সীমান্ত।

টিবেট রোডে হোটেল ছুম্বি-র সামনে জিপ স্ট্যান্ড

পারমিট দেবে গ্যাংটকের পুলিশ, ফলে আগে ওখানকার লালবাজারে গিয়ে আমরা ধর্না দিলাম। প্রায় ঘণ্টা তিনেক বসে থাকার পর ডি.জি. রমেশ হাণ্ডা ওঁর ঘরে ডেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের থোলুং যাওয়ার কারণ। খোকন চৌকস ছেলে পটাপট জায়গাটার ইতিহাস, ভূগোল সব বলে দিল। খুশি হয়ে মিঃ হাণ্ডা আমাদের সামনেই ফোনে মঙ্গনের এস.পি. কে সরাসরি জানিয়ে রাখলেন উনি আমাদের পাঠাচ্ছেন কথাটা। পারমিট বগলে সেদিনকার মত গ্যাংটকের হোটেলে ফিরে আমরা ‘ছাং’ সহযোগে ডিনার করলাম। তখন কাছেই টিবেট রোডে হোটেল ছুম্বি-র সামনে ছিল উত্তর সিকিমের জিপ স্ট্যান্ড, পরদিন সকাল দশটায় আমাদের গাড়ি ছাড়ল। পথে জনবসতি প্রায় চোখেই পড়ল না, শুধু রাস্তার ধারে দু’একটা সুন্দর সাজানো গোছানো খাবারের দোকান ছাড়া।

মঙ্গন যাবার পথে ‘বাকচা’য় থেমেছিলাম

আমরা ‘বাকচা’ বলে একটা জায়গায় ওরকম দোকানে বসে কফি খেলাম সঙ্গে একটা স্কেচও হল। উত্তর সিকিমে যত ঢুকছি দেখছি ঢাউস ঢাউস পাহাড়গুলো যেন ক্রমশ আমাদের ঘিরে ফেলেছে, ইচ্ছে করছিল আরও ছবি আঁকি। এদিকে আকাশ ঘনিয়ে এলো, দুপুর একটায় যখন মঙ্গন পৌঁছলাম বেশ জোরে বৃষ্টি নেমেছে। ওরই মধ্যে প্রথমে এখানকার থানায় গিয়ে এস.পি.-র সঙ্গে দেখা করলাম, উনি খাতির করে বসিয়ে, চা খাইয়ে ডেকে পাঠালেন এস.ডি.পি.ও ‘কে.এল.তেঞ্জিং’ কে। ছেলেটি কম বয়সী আর স্মার্ট, ওকে বলা হল এখানে আমাদের যাবতীয় থাকা, খাওয়ার দেখভাল করতে, আমরা হচ্ছি হাণ্ডা সাহেবের লোক। দেখলাম উনি বুঝতে গণ্ডগোল করেছেন, আমরাও ব্যাপারটা চেপে গেলাম। মুফতে কিঞ্চিৎ সুবিধে পেয়ে গেলে মন্দ কী? তেঞ্জিং আমাদের থাকার ব্যবস্থা করল এখানকার পাওয়ার গেস্ট হাউসে।

মঙ্গনের এস.ডি.পি.ও তেঞ্জিং

আদতে তিব্বতি এই তেঞ্জিং-এর সঙ্গে দিব্যি জমে গেল আমাদের, ট্রেকিং, ছবি আঁকা, টিবেটলজি সবেতেই ওর উৎসাহ, ছুটি পেলে থোলুং যেত আমাদের সঙ্গে সেটাও জানাল। গেস্ট হাউসটা দিব্যি বড় আর আরামদায়ক ঘর, সামনে টানা বারান্দায় বসলে উলটো দিকে পাহাড়ের দৃশ্য। এস.পি. সাহেব আমাদের থোলুং যাবার ব্যাপারটা নিয়ে বলে রেখেছিলেন মিঃ পালদেন কে। ওঁদের পরিবারই নাকি কয়েক পুরুষ ধরে ওই গুম্ফায় রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে, সবাই বলে ‘থোলুং পরিবার’। পরের দিন আমরা চলে গেলাম পালদেনের কাছে। ফার্নিচার, হোটেল ইত্যাদি অনেক রকম ব্যবসা ওদের, রাস্তার মোড়ে বিশাল বাড়ি। পালদেনের পুরো নাম পালদেন গিয়াতসো নাংপা, বয়স চল্লিশের আশে পাশে, সুপুরুষ চেহারা, পাক্কা সাহেব এবং অতিশয় ভদ্র, সব শুনে বলল চিন্তা নেই যাতায়াতের সব বন্দোবস্ত ওরাই করবে। দেখলাম কলকাতা থেকে আমরা এই গুম্ফার টানে এসেছি বলে ভারি খুশি হয়েছে পালদেন। বসে বসে পাঁচশো বছরের এই প্রাচীন ধর্মস্থানটির ইতিহাস শোনালো আমাদের। এরপর বাকি দিনটা আমরা মঙ্গনের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালাম। তিন কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের ওপর রিংঝিং গুম্ফা দেখতে গেলাম রিঙ্ঘেম বস্তি হয়ে।

Banglalive-8
রিংঝিং গুম্ফার মুখোশ আর আমাদের গাইড মহেন্দ্র

পথের ধারে স্কেচ করতে বসেছি, আশপাশ থেকে একপাল ছেলেমেয়ে এসে আমাকে প্রায় ঘিরে ধরে আবদার জুড়ল ওদেরও আঁকতে হবে। ওই দলের মহেন্দ্র বলে ছেলেটি গাইড হয়ে আমাদের একটা শর্টকাট পথে গুম্ফা ওঠানামা করাল। প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন গুম্ফার লাগোয়া স্কুল আর বড়সড় লাইব্রেরি রয়েছে যেখানে দেখলাম তিব্বতি পুঁথির এক বিশাল সংগ্রহ। অন্য একটা ঘরের দেওয়াল জুড়ে শুধু বিকট দেখতে মুখোশ আর বড় বড় সব টুপি টাঙ্গানো। লামা নাচের উৎসব হলে এগুলো কাজে লাগে। সন্ধ্যের মুখে গেস্ট হাউসে ফেরার পর নতুন করে বৃষ্টি শুরু হল এদিকে কাল সকালেই আমাদের থোলুং যাত্রা। দেখা যাক কী হয়।

Banglalive-9

NO COMMENTS