আমার এক ঘন্টার স্বর্গদর্শন

1246
গুরুদোংমার লেক (ছবি:লেখক)

“উত্তর পুব, পুবের উত্তর মায়া পাহাড় আছে”|

সিকিমের প্রসঙ্গ উঠলেই আমার ঠাকুরমার ঝুলির এই লাইনটা মনে পড়ে |

ভারতবর্ষের উত্তর পূর্ব দিকে অবস্থিত সিকিম রাজ্যে যে সমস্ত বরফঢাকা পর্বতশ্রেনী আছে তারা কিন্তু কোনো মায়া পাহাড়ের থেকে কম মায়াবী নয় | আরো আকর্ষনীয় লাগে যদি এরকম তুষারশৃঙ্গরাজির সামনে ময়ূরকন্ঠী রঙ এর এক বিরাট সরোবরে দেখা পাওয়া যায় | সমুদ্রতল থেকে ১৭,১০০ ফিট উপরে অবস্থিত উত্তর সিকিমের এই রকম এক স্বর্গীয় সরোবরের নাম গুরুদোংমার | অষ্টম শতাব্দীতে গুরু পদ্মসম্ভব তিব্বতে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেছিলেন | শোনা যায় যে তিনি এই সরোবরের পাশে তন্ত্র সাধনা করতেন | এও শোনা যায় কোনও এক সময় শিখ গুরু নানক এখানে এসেছিলেন |

দশমীর ঠিক পরের দিন সকালে আমরা জলপাইগুড়ি রেল স্টেশনে এসে পৌঁছাই | সেখান থেকে তিস্তা নদীকে সঙ্গী করে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক পৌঁছতে দুপুর পেরিয়ে যায় |

লাঞ্চ সেরে গ্যাংটকের ‘পার্ক স্ট্রিট’ মহাত্মা গান্ধী মার্গ (M G Marg) ধরে হাঁটাহাঁটি করে যখন হোটেলে ফিরি, ট্রাভেল এজেন্ট আমাদের দুটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি আর পরিচয় পত্রের জেরক্স নিয়ে যায় | সিকিম সরকারের অনুমতি পত্রের জন্য এগুলোর প্রয়োজন | গুরুদোংমার সরোবরে আসতে গেলে সিকিম সরকারের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক | সাধারনত সিকিম সরকারের অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্টের সাথেই গুরুদোংমার যেতে হয় | অনেকেই এর সাথে ইউমথাং উপত্যকাও দেখে নেন |

গ্যাংটক শহর (ছবি:লেখক)
গ্যাংটক শহর (ছবি:লেখক)

গুরুদোংমার শেয়ার জিপে গেলে খরচ অনেক কম | দলে ছয়-সাত জন থাকলে অবশ্য  পুরো গাড়ি ভাড়া পুষিয়ে যায় | শেয়ার জিপে সাধারনত দশজন যাত্রী নেওয়া হয় | সামনের সিট্ পেতে হলে আগেভাগে জিপ স্ট্যান্ডে পৌঁছে যাওয়া বাঞ্ছনীয় | তাই ট্রাভেল এজেন্টের সাথে কথা বলে পরদিন আমরা সকাল দশটার মধ্যে স্ট্যান্ডে গিয়ে হাজির হই | বাকি যাত্রীরা ঢিমেতালে এসে পৌঁছয় | সাড়ে এগারোটায় আমাদের যাত্রা শুরু হয় |

গুরুদোংমার লেক যেতে হলে প্রথমে গ্যাংটক থেকে ১২৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে লাচেন গ্রামে (৯,৫০০ ফিট) পৌঁছতে হয় | আমাদের যাত্রাপথের শুরুতেই এক সুন্দরী জলপ্রপাতের দেখা পাই – সেভেন সিস্টার্স ফলস | ৪০ কিলোমিটার পর ফোডং এ দুপুরের খাওয়া সেরে নিই |

সেভেন সিস্টার্স ফলস(ছবি:লেখক)
সেভেন সিস্টার্স ফলস(ছবি:লেখক)

ফোডং এর পর রাস্তার অবস্থা শোচনীয় | সরু রাস্তায় বহুদূর ধরে গভীর কাদা জমে আছে | প্রায় হামাগুড়ি দিতে দিতে উত্তর সিকিমের হেডকোয়ার্টার মাঙ্গন এ পৌঁছই | একপ্রস্থ চেকিং হয় এখানে | মাঙ্গন পেরোবার প্রায় কুড়ি কিলোমিটার বাদেই আরেক অপূর্ব জলপ্রপাত চোখে পড়ে | সে এক দামাল মেয়ের মত পাহাড়ের গা বেয়ে এসে গাড়ি চলার রাস্তার তলা দিয়ে অতলস্পর্শী খাদে ঝাঁপিয়ে পড়ছে | রাস্তার অবস্থা এখানে এতটাই খারাপ যে গাড়ি থামিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করা হয় না | তিন কিলোমিটার বাদেই আবার এক চেক পোস্টে গাড়ি থামে | আবার একপ্রস্থ চেকিং হয় |

মাঙ্গন এর পথে(ছবি:লেখক)
মাঙ্গন এর পথে(ছবি:লেখক)

এরপর লাচেন নদী আর লাচুং চু নদীর সঙ্গমস্থল চুংথাং থেকে বাঁ দিকে রাস্তা দিয়ে লাচেন গ্রামের দিকে এগিয়ে চলি | ডান দিকে সোজা গেলেই লাচুং গ্রাম | ওই পথ দিয়েই ইউমথাং উপত্যকা যেতে হয় | অন্ধকার রাস্তা দিয়ে যখন লাচেন গ্রামে পৌঁছই তখন সাড়ে সাতটা বাজে | ভালো ঠান্ডা থাকা স্বত্বেও গরম জলের ব্যবস্থা আছে দেখে স্নান করে খেতে যাই | পরদিন সকালে উঠতে হবে বলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি |

থাঙ্গু (ছবি:লেখক)
থাঙ্গু (ছবি:লেখক)

পরদিন সকাল চারটের সময় ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যখন গুরুদোংমার অভিমুখে রওয়ানা হই, ঠান্ডাটা বাড়াবাড়ি রকমের বেশি লাগে | আগের দিনের থেকে আজ রাস্তা বেশি বিপজ্জনক মনে হয় | চারপাশে মিলিটারি বাঙ্কার চোখে পড়ে | সাড়ে ছ’টা নাগাদ আমরা থাঙ্গু পৌঁছাই | বিদেশী নাগরিকদের এর পরে যাওয়া নিষেধ | তাঁরা এখান থেকে চোপতা উপত্যকা চলে যান |

ব্রেকফাস্টের জন্য একটি নেপালি রান্নাঘরের ভিতর ঢুকি | সেখানে সিলিং থেকে ঝুলছে ইয়াকের শুকনো ঠ্যাং এবং সাদা সাদা কিছু বস্তু | গৃহকর্তা জানান ওগুলোকে বলে ছুরপি – অনেকটা চুইং গামের মত খেতে |

থাঙ্গু থেকে আসতে আসতে সবুজ কমে আসে | আকাশ সকাল থেকে মুখ গোমড়া করে বসে আছে | অল্প স্বল্প বৃষ্টির ফোঁটাও পড়তে থাকে | একটু বাদে আমরা গিয়াওগঙ্গ পৌঁছাই | এখানে মিলিটারি বাঙ্কার চোখে পড়ে | দুজন মিলিটারি প্রশ্ন করে –‘তবিয়ত ঠিক হ্যায়?’ –

দিগন্তব্যাপী মাঠ (ছবি:লেখক)
দিগন্তব্যাপী মাঠ (ছবি:লেখক)

গিয়াওগঙ্গ থেকে রাস্তাটা অবিকল লাদাখের মত | একটা দিগন্তব্যাপী মাঠের মধ্যে দিয়ে জীপ ছুটে চলে | ডান দিকে বরফ ঢাকা পাহাড় | বাঁ দিকে বহুদূরে একটা ধুলোর ঝড় | ঠাওর করে দেখি এক পাল ইয়াক ছুটছে | সকাল ন’টা নাগাদ গুরুদোংমার সরোবর পৌঁছে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি | আকাশের মেঘ একটু একটু করে সরে গিয়ে নীল আকাশ আর পাহাড় দেখা যায় | কিন্তু সব রঙ ছাপিয়ে দেয় সরোবরের ময়ূরকন্ঠী রঙ | স্বর্গ সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণা নেই | কিন্তু স্বর্গ নিশ্চই এই রকমই হবে | হায়, শেয়ার প্যাকেজ ট্যুরে এই স্বর্গের জন্য বরাদ্দ মাত্র এক ঘন্টা |

গুরুদোংমারের তীর থেকে(ছবি:লেখক)
গুরুদোংমারের তীর থেকে(ছবি:লেখক)

খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি সরোবরের পাশে | সঙ্গীরা কেউ নেমে আসতে উত্সাহ দেখায় না | গুরুদোংমারের উচ্চতার জন্য অনেকের শ্বাসকষ্ট হয় | সাধারনত লোকে নিচে নামার ঝুঁকি নিতে চান না | সরোবরের পাশে নানা রঙের প্রার্থনার পতাকা | বাঁ দিক ধরে একটা সাঁকো পেরিয়ে হাঁটতে থাকি | কিছুক্ষণ বাদে থামি | সরোবরের কাছে গিয়ে আঁজলা করে জল নিয়ে মুখে মাথায় দিই | ক্যামেরার শাটার ক্রমাগত পড়তে থাকে | দূরের মেঘে ঢাকা পাহাড়গুলোকে সতিই মায়া পাহাড় বলে মনে হয় |

দূরে দেখি বন্ধুরা ইশারা করে ফিরতে বলছে | এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় না ফিরে হাঁটতে থাকি | স্বর্গের জন্য আমাকে কি ওরা আর এক ঘন্টা দেবে না?

 

প্রয়োজনীয় তথ্য

১| যাওয়ার ভাল সময় :-মে-জুন মাস বা অক্টোবর-নভেম্বর মাস

২| যাঁদের হার্টের সমস্যা আছে বা যাঁরা শ্বাসকষ্ট জনিত অসুখে ভুগছেন, তাঁদের গুরুদোংমার লেক যাওয়া উচিত নয় |

৩| উত্তর সিকিমের জন্য ট্রাভেল এজেন্ট দেখে শুনে নেওয়া ভাল | রাস্তা বেশ দুর্গম আর বিপজ্জনক | এই রাস্তায় ফোর হুইল ড্রাইভ সম্পন্ন গাড়ি (মাহিন্দ্রা ম্যাক্স, স্করপিও, পাজেরো) করে না গেলে বিপদের আশংকা আছে | যে সময়ই গুরুদোংমার যান না কেন, যাওয়ার আগে সিকিম টুরিজমের অফিস থেকে রাস্তার অবস্থা জেনে নেবেন |

৪| লাচেন এবং লাচুং দু’জায়গাতেই সব বাজেটের হোটেল আছে | আপনার প্যাকেজের দামের উপর হোটেলের মান নির্ভর করবে |

৫| বাড়তি গরম জামাকাপড় নিয়ে যাওয়া ভাল | ভাল গ্রিপের High Ankled Sports Shoe পরলে হাঁটতে সুবিধে হবে |

Advertisements

5 COMMENTS

  1. Bachor ashtek agey Ei Gurudongmar lake-er khub kache gieo rastae barof thakar jonyo firey chole aste hoechilo…ei lekha ar chobi dekhe sei dukhho abar jege uthlo.

  2. উত্তর বংগ এর মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমার গ্যাংটকে যাওয়া হয়নি ।তাই লেখা টা পড়ে খুব মন খারাপ ।

  3. My experience :
    This morning the pulse was running 20% faster than at in the plains, at Thangu it rose to 25% and now at 5,148M Gurudongmar is was racing at 200%. Took it for granted, that the system was trying to make up for thin air, thus low oxygen. One feels nothing strange until one gets out of the car and stands on one’s own feet. Everybody looks at the ladies & gents toilette. Both locked. The under-pressure at this altitude seems to drag out the bowl contents, which did not make a proper exit this early morning. Some could defer the output to a more suitable time and occasion. Some could not and rushed to the backside of the toilettes. The temperature is freezing most of the year, but rainfall is low. So, whatever was left behind at the toilettes remains undisturbed for the posterity, unless blown away. The wind is said to be so strong, that it drives off pebbles. Some of its strange wind on ice architecture can be seen alongside the roads.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.