নারী দিবস না থাকলেও পুলিশের ঘোড়ার লাগামে রাশ টানতে রণরঙ্গিনীর অভাব হয়নি

807

ব্রিটিশ বিরোধিতা তখন তীব্র হচ্ছে । পরাধীনতার শৃঙ্খলা থেকে বেরোতে চাইছে গোটা দেশ। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম ১৮৮৫ সালে । তার ঠিক বছর তিন পরে বোম্বাই অধিবেশনে এগিয়ে এলেন মহিলারা । দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলি এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবী । স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠিত মঞ্চে এটাই প্রথম ভারতীয় নারীদের অংশগ্রহণ । রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারী শৃঙ্খলামোচনের যে সূচনা করেছিলেন, তারই ফসল দেখা গেল সংগঠিত রাজনৈতিক মঞ্চে কাদম্বিনী আর স্বর্ণকুমারীর যোগদানের মধ্য দিয়ে।

শিক্ষা সচেতন করে তুলছিল বাংলার মহিলাদের । পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে সঙ্কল্পবদ্ধ হতে থাকেন তাঁরা । সেই সংগঠিত মহিলাদের নেতৃত্ব দিতে রাজনীতির আঙিনায় প্রথম এলেন সরলাদেবী চৌধুরানি। সরলাদেবীর শরীরচর্চার কেন্দ্র ছিল । বোম্বাইতে মামা সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অরবিন্দ ঘোষের । ১৯০২-এ অরবিন্দের অনুরোধ মেনে সরলাদেবী স্থাপন করেন একটি গুপ্ত সমিতি।

১৯০৩ সালে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের স্বদেশ প্রেমের ভাবনা প্রচার করতেই ভগিনী নিবেদিতা যোগদান করলেন অরবিন্দের বিপ্লবী দলে । পত্রপত্রিকায় ইংরেজ-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে নিবেদিতা লিখে যেতে থাকলেন একের পর এক রক্ত গরম করা প্রবন্ধ । তাঁর সঙ্গে তখনই পরিচয় হয় সরলাদেবীর। গুপ্ত সমিতির অন্যতম ডেরা হয়ে ওঠে নিবেদিতার বাগবাজারের বাসা ।

যুবসমাজকে সেখানে বিবেকানন্দের সেই মন্ত্রটাই শিখিয়ে দিতেন নিবেদিতা—‘তোমার দেবতা চায় আজ তোমার জীবনের বলি, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত তোমার সামনে তোমার জননী জন্মভূমি’ ১৯০৫-এ চরমপন্থী সংগঠন ‘স্বদেশী মণ্ডল’ তৈরি করেন বিপিন পাল। বঙ্গভঙ্গের পরের বছর সংগঠনের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় বরিশালে। অধিবেশনে ছোটলাট ফুলারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন অরবিন্দ ঘোষ। পুলিসের অত্যাচারে সম্মেলন ভেস্তে যায়। এরপরই কলকাতায় যুগান্তরের কার্যালয়ে ফুলার হত্যার ব্লু প্রিন্ট তৈরি হয়ে যায় ।

আরও তীব্র আন্দোলনের রূপরেখায় অরবিন্দের সঙ্গী নিবেদিতা। তবে নিবেদিতার ওপর পড়ল পুলিসের নজর। শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শে দেশ ছাড়লেন নিবেদিতা। ফিরে এলেন ছদ্মবেশ নিয়ে। ১৯১০ সাল থেকে অরবিন্দের ‘কর্মযোগিন’ পত্রিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। কাদম্বিনী, স্বর্ণকুমারী, সরলাদেবী এবং নিবেদিতা—এই চার মহীয়সী যে বীজ বপন করে গিয়েছিলেন, তার ফল মিলল ১৯২০-র দশকে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ আরও ত্বরান্বিত করলেন বাসন্তী দাশ এবং তাঁর আত্মীয় ঊর্মিলাদেবী । ১৯২১-এ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ অসহযোগের আহ্বানে তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দাশ এবং বোন ঊর্মিলাদেবীর যোগদান বাংলার মহিলাদের ব্রিটিশ বিরোধী মঞ্চে এনে দিল।

১৯২৮-এ সাইমন কমিশনের বিরোধিতার সুর যখন চড়া, তখনও মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষণীয় । ব্রিটিশ বিরোধী সংগঠনকে আরও মজবুত করতে কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হলেন অরবিন্দ ঘোষের দাদা মনমোহন ঘোষের মেয়ে লতিকা ঘোষ । স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনীর প্রধান ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু । সে বছরই কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশন । হাওড়া স্টেশন থেকে কংগ্রেস সভাপতি মতিলাল নেহরুকে অধিবেশন মঞ্চে নিয়ে আসা পর্যন্ত এক বিরাট শোভাযাত্রা হয়েছিল ।

সেই শোভাযাত্রায় মার্চ করেছিলেন কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনী । মহিলা বাহিনীকে পথে দাপটের সঙ্গে হাঁটতে দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল কলকাতা। হতবাক হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ রাজ। কলকাতার সেদিনের মহিলা বাহিনীর মার্চ পাস্ট উদ্বুদ্ধ করেছিল দেশের মহিলাদের। ঘরের মেয়েরও ঘরকন্নার কাজ সামলে সামিল হয়েছিলেন রাজনীতিতে । আরও গতি পেতে থাকে স্বাধীনতা আন্দোলন । আরও মহিলারা অংশ নিতে থাকেন ।

লবণ আইন অমান্য আন্দোলনের সময় ১৯৩০ সালে তৈরি হয় নারী সত্যাগ্রহ সমিতি। কংগ্রেসের কয়েকজন নেত্রী এই সমিতি তৈরি করলেও এই সমিতি ছিল কংগ্রেসের বাইরে। সমিতির সভানেত্রী ছিলেন উর্মিলা দেবী, সহকারী সভানেত্রী ছিলেন মোহিনী দেবী। এই প্রথম কলকাতার এই মহিলা সংগঠনে যোগদান করেন কলকাতায় প্রবাসী বিভিন্ন প্রদেশের মহিলারা। সমিতির প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন বিদেশি জামাকাপড় এবং মদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পিকেটিং করা। পুলিসের নজরদারি তাঁদের ওপর ছিল। প্রতিদিন মহিলাদের গ্রেফতার করত পুলিস। কিন্তু ১৯৩০ সালের ২২ জুন ব্রিটিশ পুলিসকে শিক্ষা দিয়ে দিলেন কলতাতার মহিলারা। নারী আন্দোলনকে যে রোখা যাবে না, তা বুঝিয়ে দিলেন কলকাতার মেয়েরা—

“…দেশবন্ধুর বার্ষিক শ্রদ্ধাতিথি দিবসে সমস্ত কলকাতা শহরে ১৪৪ ধারা জারি ছিল । সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না ক’রে ‘নারী সত্যাগ্রহ সমিতি’ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ক’রে শোভাযাত্রা পরিচালনা করেন । শোভাযাত্রা চলছিল কলেজস্ট্রীট থেকে দেশবন্ধু পার্ক পর্যন্ত । অসংখ্য পুলিশ, সার্জেন্ট ও ঘোড়সওয়ার বেষ্টিত বিরাট শোভাযাত্রা সেদিন রণাঙ্গনের সৃষ্টি করেছিল। কলকাতা শহরের বুকের উপর নারী তখন রণরঙ্গিণী মূর্তি ধারণ ক’রে সত্যাগ্রহীদের পদদলিত করতে উদ্যত ঘোড়াকে রুখেছেন, তার লাগাম ধ’রে ঝুলে পড়ে; আলুথালু কেশ তাদের খুলে পড়েছে, দেহমনের অসীম শক্তি যেন ফেটে বেরিয়ে আসছে। পুলিশের নির্মম অত্যাচার থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করতে সবিক্রমে আটকাচ্ছেন তাঁরা পুলিসের লাঠিকে, ঘোড়াকে ও বেটনকে, ঘোড়সওয়ার পুলিশ ও সার্জেন্ট এমন অত্যাচারের নির্মমতা সম্বরণ করতে বাধা হয়েছে। শোভাযাত্রা এসে পৌঁছাল দেশবন্ধু পার্কে। সেখানেও পার্ক ঘেরাও করে দাঁড়িয়ে আছে বৃটিশ শক্তি।…জীবন তুচ্ছ ক’রে অগণিত নরনারী সেদিন ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে পার্কের ভিতর প্রবেশ করেছিল জনস্রোতের মতো । সার্জেন্ট, ঘোড়সওয়ার ও পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁদের উপর। নারী সেদিন অকুতোভয়ে কখনো ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়েছেন, কখনো শুয়ে পড়ে ঘোড়ার অগ্রগতি ব্যর্থ করেছেন, কখনো পুলিশের বেটনে আহত হয়েছেন। এভাবে উত্তেজিত ও উদ্বেলিত জনসমুদ্রের সামনে বক্তাগণ বক্তৃতা দিতে থাকেন।” (তথ্য : এ নগরীর নারীর কথা-কৃষ্ণকলি বিশ্বাস)

২২ জুন যে বীজ বপন হয়েছিল দেশবন্ধু পার্কে, ২৫ অগস্ট তা থেকে বেরিয়ে পড়ল গুল্মলতা । ডালহৌসিতে টেগার্ট সাহেবের ওপর বোমা নিক্ষেপের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন মহিলা বিপ্লবীর দল । পরবর্তী সময়ে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করে বীণা দাস । ১৯৩৮ সালে গুপ্ত সমিতি ভেঙে যায় । ক্রমে অহিংস ও চরম আন্দোলনের দুই স্রোত মিলেছিল একই ধারায় । ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্যায় ।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.