সাধুর বাজার কী আনন্দময়

1027

পর্ব ১

সাধুজীবন ও সদাচার নিয়ে এ পযন্ত বইপত্তর কম লেখা হয়নি। তার পাঠকসংখ্যাও নেহাত অঙ্গুলিমেয় নয়। তারপরও সাধু-মহতের অতিরহস্যময় গুণপনা বা নিগূঢ়তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা ঝুঁকিসঙ্কুল। কারণ নিবিড় অধ্যাবসায়ে সাধুভাব অনুভব ও অনুধাবনের আগ্রহের চেয়ে আমাদের বদ্ধজীবসুলভ কুতর্ক ও কুস্বভাব সেখানে বেপরোয়া রকমের বড় হতে গিয়ে সত্যকে খাটো করে দেখে। চরম হিংসা-হানাহানিভরা যুধ্যমান সমাজসংসারে প্রেমদগ্ধ আত্মহারা সাধুর শুদ্ধতর জীবনমর্ম ও মহানুভব সত্যধর্ম প্রকারান্তরে অস্বীকৃত এবং কোণঠাসা হয়ে আছে। তাই আসলের নাম ভাঙিয়ে ভেজালে চারদিক সয়লাব। ভক্তবেশে অসাধুরাই এখন সমাজে সাধুর কর্তৃত্ব ছিনতাই করে নির্বোধ মানুষকে এদিকওদিক ছুটিয়ে মারছে।

সাধু চরিত্র নির্মোহ, বন্ধনভয়মুক্ত ও সর্বত্রগামী হয়েও সর্বহারা। ভাগাভাগির দেয়াল তুলে তাঁকে আটকে রাখে কার সাধ্য সন্তর্পণে যিনি নিজেকে ঢেকে রাখতে স্বস্তিবোধ করেন নির্বিরাম দমে ও সংযমে। পলকেই ঘটে যেতে পারে তাঁর অভাবিত অভ্যুত্থান। কিংবা হাজারও বছরের নীরব তপস্যা পেরিয়ে অকস্মাৎ জেগে উঠতে পারেন তিনি অলঙ্ঘনীয় ভূমিকম্পের মতো তীব্র মোচড় দিয়ে।

ফকির লালন শাহ অখণ্ড বাঙলা ও বাঙালি জাতিসত্তার তেমনই এক বিরলপ্রজ সাধু যিনি ভারতীয় আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের মহোত্তম ধারক, বাহক প্রতিভুপুরুষ। যদিও বহুকাল যাবৎ শহুরে মধ্যবিত্ত বিদ্যৎসমাজে অত্যন্ত অপরিজ্ঞাত ও অনালোচিত এক চরিত্র ছিলেন তিনি। কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (পদকর্তা ফিকির চাঁদ) সম্পাদিত ও প্রকাশিত গ্রামবাংলার প্রথম পত্রিকা ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় লালন শাহের মুসলমান ফকির পরিচয়ের উপর ১৮৭২ সালে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৮৮৫ সালে তাঁর ‘কাঙালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ’ গ্রন্থের প্রথম ভাগের প্রথম সংখ্যায় ‘কে বোঝে শাঁইয়ের লীলাখেলা’ শীর্ষক পদটি মুদ্রিত অক্ষরে সর্বপ্রথম প্রকাশিত লালনসঙ্গীত।

এর অর্ধশতাব্দীকাল পরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে ভারতীয় দর্শনমহাসভার মহাঅধিবেশনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রদত্ত ‘ফিলসফি অব আওয়ার পিপল’ এবং নোবেলপ্রাপ্তির পর ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যায়ের আমন্ত্রণে ম্যানচেস্টার কলেজে প্রদত্ত ‘রিলিজিয়ন অব ম্যান’ শীর্ষক বিখ্যাত ‘হিবার্ট বক্তৃতা’র সুবাদে বাঙলার সাধুশিরোমনি লালন ফকিরকে নিয়ে পাশ্চাত্যের অভিজাত পণ্ডিতসমাজ ও ভারতবর্ষের বিদগ্ধসমাজের আগ্রহ ক্রমে বাড়তে থাকে।

তার ঠিক চব্বিশ বছর পর ১৯৪৯ সালে ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রী ‘বাঙলার বাউল’ শীর্ষক কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ‘লীলা বক্তৃতা’য় বলেন,“এইসব নিরক্ষর দীনহীনের কথা বহুকাল ভারতের কোনও বড় পণ্ডিতজনের লেখায় আত্মপ্রকাশ করিতে পারে নাই।পরে এমন একটি ঘটনা ঘটিল যাহাতে আমারও কিছুটা সাহস হইল।…কবিগুরু জগতের শ্রেষ্ঠ বিদ্যৎসমাজের আহ্বানে দুই-দুইবার এই নিরক্ষরদের কথা বলায় আমরা বিস্মিত হইলাম। আমাদের সাহস ইহাতে বাড়িয়া গেল্।তবু তাহার পর যখন ‘অধর মুখার্জি বক্তৃতা’ ও ‘লীলা বক্তৃতা’মালার জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতজনেরা আমাকে ডাক দিলেন তখন একটু বিস্ময় যে না হইল তাহা নয়”।

এভাবে ক্রমান্বয়ে শতবর্ষের বিস্মৃতির বিচিত্র আড়াল পেরিয়ে শাঁইজি লালন আজ বিশ্বব্যাপী বাঙালি সাধুপ্রকৃতির প্রবাদপ্রতিম আইকনরূপে প্রতিষ্ঠিত। সাম্প্রতিক কালে অবশ্য জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি কমিশন ‘ইউনেস্কো’ লালনসঙ্গীতকে বিশ্বঐতিহ্যের সংরক্ষণযোগ্য অমূল্য মহাসম্পদ বলে কাগুজে ঘোষণা দিয়েই তাদের মহান দায়িত্বটি সুসম্পন্ন করেছে। অথচ বাস্তবে তৃণমূল স্তর থেকে অগ্রন্থিত লালনসঙ্গীতমালা সংগ্রহ, পুনরুদ্ধার, সঙ্কলন ও সংরক্ষণে কারও কোনও আন্তরিক উদযোগেই আর চোখে পড়ে না। সবাই কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা করছে। “সত্য কাজে কেউ নয় রাজি, সবই দেখি তা না না না”!

আমি আর কি বসব এমন সাধুর সাধবাজারে।

না জানি কোন সময় কোন দশা ঘটে আমারে ॥

সাধুর বাজার কী আনন্দময়

অমাবম্যায় পূর্ণচন্দ্র উদয়

সেথা ভক্তির নয়ন যার

সে চাঁদ দৃষ্ট তার

ভববন্ধন জ্বালা যায় গো দূরে ॥

দেবের দুর্লভ পদ সে

সাধু নাম যাঁর শাস্ত্রে ভাসে

গঙ্গা মা জননী

পতিত পাবনী

সেও তো সাধুর চরণ বাঞ্ছা করে ॥

দাসের দাস তার দাসযোগ্য নই

কোন ভাগ্যেতে এলাম সাধুর সাধসভায়

লালন ফকির কয়

ভক্তিশূন্যময়

এবার বুঝি পলাম কদাচারে ॥

সাধুবাদ মানেই চিত্তশুদ্ধির মহাপাঠ। এর অন্য নাম ঋষিবাদ বা সুফিবাদ বা অতিমানববাদ বা নির্বাণতন্ত্র । অতিমানবগণই পূর্ণমানব অর্থাৎ সিদ্ধযোগী মহাপুরুষ তথা সম্যক গুরু। প্রেমভক্তিযোগই এখানে পারাপারের কড়ি।সাধুগুরুর সাধসভায় সাধু-সজ্জন ছাড়া আর কেউ কাউকে প্রবেশাধিকার দিতে পারে না। সাধু তাঁর ভাবরাজ্যে প্রবল প্রেমাকর্ষণে যাকে আমন্ত্রণ করেন তিনি বাহ্যত কেশবেশধারী সাধু না হলেও তাকে অসাধু বলা নিষেধ। শিষ্য, আশেক, ভক্ত বা দিওয়ানাÑযে নামেই আমরা তাকে ডাকি না কেন তিনি সাধুর মহাজাগতিক চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে অখণ্ডভাবে সংযুক্ত। সাধুর প্রেমোন্মাদ ভক্ত যখন যেখানে যায় আর গুরুকীর্তন গায় তখন তিনি সেখানে স্বয়ং এসে উপস্থিত হন। সৃষ্টিরাজ্যে শাঁইজির বিচিত্র রূপরসময় প্রকাশবিকাশ এবং লীলাবিলাস ভক্ত ও ভক্তি বিনে অপূর্ণই থেকে যায়। তাই দ্বৈতাদ্বৈতে এমন মাখামাখি। সাধু ও ভক্তের মধ্যে অনির্বচনীয় সম্বন্ধচর্চার গুপ্ত রতœভাণ্ডার গোপন আছে যা লোকসমাজে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। “ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই/ হিন্দু কি যবন বলে জাতের বিচার নাই”।

‘সাধুর সাধবাজার’ অর্থ পরম আলোকিত সত্তাসমূহের মিলন মোহনা। ‘আনন্দ’ বলতে নিরেট ভোগবাদী-মর্ডানিস্টরা যেখানে কামাসক্তিপূর্ণ ‘বিনোদন’ মোচ্ছবকে বুঝে থাকে সেখানে নিস্কলুষ উপভোগবাদী সাধুর কাছে তা ‘নিবেদন’। সাধকের সত্তামূলে যখন মহাজাগতিক দিব্যজ্যোতির বিকাশ বা বিস্ফোরণ ঘটে তখনই নির্মল আনন্দময়তা। কেবল গুরুমুখি আত্মদর্শনের সাধনপথে এ দিব্যজ্যোতি দ্রষ্টব্য। অশুদ্ধ দেহমন গুরুকেন্দ্রিক সাধনার শুদ্ধিক্রিয়ায় বিশুদ্ধিমার্গে উত্তীর্ণ হলে তিনি স্বয়ং ‘আলোকিত’ স্বরূপে মহাসত্যের প্রকাশক একজন ‘বুদ্ধব্যক্তি’ হয়ে উঠেন।

সাধু মহাজন সূর্যের মতো প্রখর তেজশক্তিসম্পন্ন সৃষ্টিশীলতার অধিকারী।‘অমাবস্যা’ অজ্ঞান অবস্থার প্রতীক। সমাজের অজ্ঞতার নিকস অন্ধকারে সাধুসত্তা পূর্ণচন্দ্রের মতো জ্যোতিষ্মান। ভক্তিমান সাধকের জ্ঞানচোখে তিনি দিবালোকের মতো প্রসন্ন হয়ে ধরা দেয়। অসৎ-অভক্তেরা এর এর কিছুই টের পায় না।সাধুর শক্তিমত্তার যেমন আছে সম্মোহনী অনুরাগ বা আকর্ষণক্ষমতা তেমনই আবার বিপরীতভাবে রয়েছে বিরাগ বা বিকর্ষণপ্রবণতা। এমন দ্বিবিধ(বাইনারি) ধারা বা দ্বান্দ্বিকতা না থাকলে কেন্দ্ররূপে তিনি পরম ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারতেন না। তাঁর অটল নিরপেক্ষ চারিত্র্য, মাহাত্ম্য বা শৌর্যবীর্য বলেও কিছু থাকত না। তাই সাধুর আকর্ষণ মানেই আলোকময় চৌম্বকাকর্ষণ বা সজ্ঞানময় হাল। এবং সাধু হতে বিকর্ষণ ঘটলে অন্ধকার তথা অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে হয়। যার মনোলোকে সাধুগুরুর প্রতি পূর্বজন্মার্জিত শুদ্ধ ভক্তিভাবতরঙ্গ জায়মান সাধু কেবল তাকেই নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পারেন। সাধুজনা পরশ পাথরের চেয়েও অধিক অমূল্য বস্তু। পরশ পাথর লোহাকে স্পর্শ করে স্বর্ণে পরিণত করতে পারে মাত্র। কখনও পরশ পাথরে পরিণত করতে পারে না। কিন্তু পরিশুদ্ধ সাধুগুরু যে শিষ্যকে আলিঙ্গন ও কর্ষণ দ্বারা আকর্ষণ করেন তাকেও ধীরে ধীরে নিজের সমমানসম্পন্ন পরশ পাথরে রূপান্তরিত করে তোলেন। এখানেই প্রাচ্যের ভাববাদ নিজেকে ইওরোপীয় বস্তুবাদের চেয়ে অসীমভাবে মহীয়ান প্রমাণিত করে। তাই প্রাচ্যের আদি ভাববাদী দর্শন নিয়ে পাশ্চাত্যে এখন শুরু হয়েছে ভিন্নচিন্তার ঘূর্ণিটান ও নানা অদলবদল। অথচ আপন মাটিতে আমরা এখনও রয়ে গেলাম পরবাসী। আপন খবর আর আপনার হলো না। সাধুর আদম সুরত আপন চোখে দেখলাম না, নিজের সদ্বাক্য নিজের কানে শুনলাম না। অসাধু পণ্ডিত-পাণ্ডাদের ‘মাধ্যম’ করে সাধুদের সম্পর্কে যা জানি-বুঝি সেটা বরং আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনকে আরও ভ্রান্তির জালে জড়িয়ে ফেলে, পরিণামে অধোগতির দিকে ঠেলে দেয়। এরা সবাই যার যার চিন্তা ও কর্মগুণে সাধুর বিরাগভাজন। তাই নানাভাবে সাধুর বিকর্ষণের শিকার।

সাধুজগত সম্বন্ধে আমাদের অসাধু ভদ্রসমাজের মনোবিভ্রম ও তজ্জনিত মনোবিকারের কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। সাধু সম্বন্ধে শিক্ষিত-সুশীলদের অন্তরে গভীর নিরীক্ষার বিন্দুবৎ কৌতুহলও দেখি না। আছে আজগবী চটকদার সব কৌতুক কাহিনির তেলেসমাতি। অন্তত আমাদের সাধু মহাজন ফকির লালন শাহকে নিয়ে সাম্প্রতিক সুনীল-গৌতমদের সিনেমাটিক দৌরাত্ম্যে তাদের সাধু সম্বন্ধীয় জ্ঞানগম্যির আগাপাশতলা ¯পষ্ট দেখা গেল। হায়! শুদ্ধচিত্ত লালনকে ওরা কামাচারী লালমোহন বানিয়ে দেখাল যাতে পাশ্চাত্যের পুরস্কারদাতাদের মনে এমন কুবিশ্বাস বদ্ধমূল হয় যেন সাধুগুরুমাত্রই ‘প্লেবয়’ গোছের কামুক স্বভাবী। এই অপমান সবাই মেনে নিলেও কেউ কেউ আমাকে প্রতিবাদের জন্য নিরন্তর উস্কানী দিয়ে চলেছেন । বলা বাহুল্য, ইনারা কেউই সাধু নন, সাধুভক্ত আশেক-দিওয়ানা। তাদের দাবি, ফকির লালন সমস্ত গুরুবাদী তরিকার মিলনমঞ্চ। তাঁকে অপমানিত করলে বাঙলার সাধু-ফকির-দরবেশ-অলিদের মর্যাদা বলতে কিছু থাকে না। অথচ এ নিয়ে সাধুগণ নিরুত্তর। কারণ অজ্ঞানীদের সাথে জ্ঞানী সাধু কখনও কুতর্কে লিপ্ত হন না। গুরুবাদ নিয়ে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ভদ্রলোকদের এমন অঘটনঘটনপটিয়সী অনেক কাজ-কারবারে সাধুগণ রুষ্ট হলেও সবার কাছে মুখ খোলেন না। সেই কষ্টভার ভক্তদের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। সংক্রামিত না হয়ে পারি আমরা?

অখণ্ড বাঙলা সাধু-ফকির-মোহান্ত-মহাপুরুষদের জন্মকর্ম ও সাধনসিদ্ধির পবিত্র তীর্থভূমি। তাঁদের সুকঠিন ত্যাগ-তিতিক্ষাময় জীবনদর্শনের প্রতি দৃকপাত করতে না জানার কারণে আমরাও আপনাপন চরিত্রহারা। কলোনিয়াল ছাগলের ছানার মতো লম্ফঝম্ফ করছি কেবল। ভুল ভাঙানোর দায়িত্ব কে নেয়? তথাস্তু “আমি আর কি বসব এমন সাধুর সাধবাজারে? না জানি কোন সময় কোন দশা ঘটে আমারে”…।

সাধ+উ=সাধু।‘সাধ’ অর্থ আকাক্ষা, ইচ্ছা, স্পৃহা, বাসনা ইত্যাদি। ‘উ’ অর্থ নাশকারী বা বিনাশক। সাঁইজি লালন বলেন, “সাধু নাম যাঁর শাস্ত্রে ভাসে”। অর্থাৎ ‘সাধু’ নামটি বেদ-বেদান্তসূত্রে আমাদের কাছে এসেছে। প্রাচীন ভারতীয় তত্ত্বদর্শনের মূলভিত্তি সাধু। যিনি আসক্তিপূর্ণ সমস্ত ‘সাধ’ কে ধুয়ে মুছে আপন দেহমনকে শুদ্ধ ও মুক্ত করে তুলতে সফল হয়েছেন তিনিই কেবল সাধু। দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ ও ভাবরূপে প্রতিনিয়ত সাধুর সপ্ত ইন্দ্রিয় দুয়ার দিয়ে অসংখ্য বিষয়রাশি ঢুকে তাঁর মনকে চঞ্চল ও মোহগ্রস্ত করে তুলতে পারে না। সাধু তাঁর সপ্ত ইন্দ্রিয়পথ দিয়ে আগত প্রতিটি চাঞ্চল্যকর বিষয়ের মোহবন্ধনকে ধ্যানের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে দেখে শুনে গ্রহণবর্জনের মাধ্যমে তাই ধীরস্থির ও অটল থাকেন।

সাধু মহাজন স্বয়ং সার্বভৌম শিব ব্যক্তিত্ব, আলীসত্তা তথা বুদ্ধব্যক্তি। একজন সম্যক গুরু এমনই পুরুষোত্তম ও পরাক্রমশালী। তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া ‘আইল ডিঙায়ে ঘাস খাওয়া’র সমান। মনে মনে চিরদিন এমন স্বেচ্ছাচারী ইচ্ছাপোষণ আমাদের দেহমনকে বক্র (ত্যাডা) মানে সাধুগুরুর সম্পূর্ণ অবাধ্য বা বিদ্রোহী করে রাখে।“মন সহজে কি সই (সোজা) হবা”? আজ হতে প্রায় আড়াইশো বর্ষকাল পূর্বে ফকির লালন শাহ কেন এবং কাকে এ কঠিন প্রশ্নবাণটি নিক্ষেপণ করেছিলেন তা এখন ধীরে ধীরে মালুম হচ্ছে। এর ফল সরাসরি নিজের “ডাবার (মাথার) উপর মুগুর প’লে সেইদিনেতে টের” পাই। গুরুদ্রোহী-অসাধুগণ মৃত্যুর পূর্বকালে তাদের পরিণাম স্পষ্ট দেখে থাকে। তাদের মতন কপট ও অসৎ লোকেদের কস্মিনকালেও সাধ্য নয় সাধুবাজার বা সৎসঙ্গে প্রবেশ লাভ করা। চরিত্র-স্বভাবে সাধু না হয়ে সাধুসঙ্গ বা সাধুপ্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা নিতান্তই অনধিকার চর্চা। এভাবে নাদানের শিরনি খাওয়ার লালসা আলখেল্লায় লুকিয়ে মডারেট বাঙলিগণ সাধ ও সাধু কিংবা পদ ও পদ্ধতির লেনদেন বা দেনলেন নিয়ে ভীষণ জগাখিচুড়িগ্রস্ত। প্রায় সবাই ভাবের মূল জায়গাটি হারিয়ে অভাবের কাড়াকাড়ির মধ্যে বিষম বিতর্কে ক্ষিপ্ত। কারণ আমাদের দেশে যারা নিজেদের উচ্চশিক্ষিত মনে করেন তারা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমান মিলনের কৌশল খোঁজেন। অথচ অন্যদেশের কলোনিয়াল ফরমেটে তাদের শিক্ষাদীক্ষা ও মানসজগত গড়ে উঠেছে। তাই তাদের কাছে সাধু বলতে ভাগ্যে ভোগবাদের পুরস্কার-পদকের শিকে ছেঁড়া আর পদবি অর্থ স্তুতি-মোসাহেবিয়ানায় গাধার ঘানিটানা কর্ম। এ তো সাধুচর্চা নয়, লোভাতুর খামখেয়ালীপনার আবর্তে ধুঁকে মরা।

সাধুর করণ মোটেও সহজ বিষয় নয়। সেজন্য প্রবাদ শুনি, “সাধু কোটিকে গোটিক”। বিশ্বের ৭০০ কোটি লোকের মধ্যে ৭০০ জন সাধু খুঁজে পাওয়া আজ দুঃসাধ্য। সাধুসত্তায় পরিণত হতে দশটি অপরিহার্য কঠিন নিষেধাজ্ঞা পালন করতেই হয়; যেমন: ১. পরনারী হরণ না করা ২. পরহত্যা না করা ৩. পরদ্রব্যে লোভ না করা ৪. মনে মনে পরনারী গমনাকাক্ষা ত্যাগ করা ৫. মনে মনে পরহত্যার জিঘাংসা পোষণ না করা ৬. মনে মনে পরদ্রব্যে লোভ না করা (১, ২ ও ৩ নং দেহরূপ কার্যের অনুরূপ মনোরূপ কর্ম) ৭. মিথ্যা না বলা ৮. বৃথা বাক্য ব্যয় না করা ৯. কটূবাক্য না বলা ১০. কখনও প্রলাপ না বকা। তাই সাঁইজি লালন ফকিরের দেশনা এমন:

সাধুসঙ্গ কর তত্ত্ব জেনে।

সাধন হবে না অনুমানে ॥

সাধুসঙ্গ কররে মন

অনর্থ হবে বিবর্তন

ব্র‏হ্মজ্ঞানে ইন্দ্রিয় দমন

হবেরে সঙ্গগুণে ॥

নবদ্বীপে পঞ্চতত্ত্ব

স্বরূপে রূপ আছে বর্ত

ভজন যদি হয় গো সত্য

গুরু ধরে লও গা জেনে ॥

আদ্যসঙ্গ যদি করে কোনও ভাগ্যবানে

সেই তো দেখেছে লীলা বর্তমানে

সিরাজ সাঁই কয় লালন যাস নে

না জেনে শ্রীবাস অঙ্গনে ॥

**********

(চলবে)……….

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.