নদীস্রোতে

269

— মাঝখানে এই এতখানি নদী পেরিয়ে তোমার কাছে কেন হাসি বল দিকি?

এই কথাটি বলে সোহরাব তার চওড়া বুক দুলিয়ে হাসল ভারি সোজা-সাপটা | তার কালো রঙা পঁচিশ বছরি লম্বা আড়ার বুকের পাটায় এখনও দানা দানা নদীর জল লেগে | তবে কিনা সোনাই নদীর পরপার শেখ আনিসুরের কোনও ধূলা লেগে নেই |

বিকালের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে সোহরাব | তার মাথার ঝাঁকড়া চুলে এখনও নদীর পানির ছটা জড়িয়ে মড়িয়ে আছে | লুঙ্গির সঙ্গে কষে বাঁধা গামছাটি মূল বস্ত্রের মতোই ভিজে সপসপে | কালো ডাগর দু চোখের তারা ঝকঝক করছে এই বিকালের পড়তি আলোয় | তবে সে আলো যেহেতু এখন তার পিঠ বরাবর তারি আলোটুকু বুঝি আকাশে ধাক্কা লেগে তার চোখে ছটকেছে |

তার সদাই হাসি হাসি মুখের দিকে চোখ রেখে কাকলি বলল, তুমি এভাবে আর এসো না আমার কাছে | আমার বড় ভয় করে |

— ভয় — মানে ডর | তোমাকে তো আমি তো তেমন বলে জানি না | জানলে কি আর আসতাম |

— আমার কি জানো তুমি?

— জানি তোমার বুকের পাটা আছে |

— ছিঃ, অসব্য কথা বলতে নাই |

— কি অসব্য কথা শুনি?

— ওই যে এখুনি বললে — কিসের পাটা যেন | ও কথাটা মেয়েদের জন্যি নয় |

— কথার আবার মেয়ে-পুরুষ, হুঁ্ঃ |

এই বলে সোহরাব নিচু বারান্দা পার হয়ে সিধে গিয়ে ঢুকল কাকলির ঘরে | একটি ছোট বারান্দা আর পাশাপাশি দুখানি খুপরি ঘর | এক ঘরে কাকলি আর পাশের ঘরে তার বুড়ি পিসিমা | যেহেতু বাপ-মা নাই তাই ওই বুড়িই ভরসা | পিসি বাড়ি রক্ষে করে, রাঁধাবারা সারে আর সময় পেলেই পাড়া বেড়ায় | তবু, সে আছে বলেই কাকলি এখান থেকে বাস আর ভ্যানে চড়ে দূর বি ডি ও অফিসে যেয়ে মেয়েদের গ্রুপে সেলাই দিদিমণির কাজ করতে পারে | খোদ বি ডি ও সাহেবটি যুবক এবং কাকলিকে ডেকে ডেকে কথা কন | যা রোজগার হয় তাতে পিসি-ভাইঝির চলে যায় |

সোহরাব গিয়ে ভিজা অবস্থাতেই কাকলির তক্তপোশে বসে পড়ল | তারপর গোঁজ থেকে বিড়ির কৌটো বার করে লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে নিল | লোকে শুনলে কি বলবে, কিন্তু কাকলি জানে এই জোয়ান যুবকটির গা থেকে বিড়ির গন্ধ বার হলে তার কেমন একটা আনচান ভালো লাগে |

কাকলি বলল, দিলে তো আমার বিছানাটা ভিজিয়ে |

সোহরাব চোখ বড় বড় করে হাসল, এখন তুমি ওখানে আর আমি এখানে | তাহলে ভেজাভেজি হবে কেমনে!

কাকলি বলল, খালি অসব্য কথা | চা খাবে?

— তুমি দিলি আমি পয়েজনও খাই | তবে আর কেউ দিলি নয় |

কাকলি স্টোভ ধরিয়ে সসপ্যানে চা চড়ায় | সেই ফাঁকে সোহরাব গুনগুনিয়ে গান গায়, থাকিলে ডোবা খানা, হবে কচুরিমানা, বাঘে-গরুতে খানা একসাথে খাবে না, স্বভাব তো কখনো যাবে না …

তার গলাটি মিঠে আর ঝোঁক একটু চড়ার দিকে | চায়ে ফুট ধরে | আর তখনই উঠোন ছাড়িয়ে নয়ানজুলি আর পাকা বাস রাস্তা পেরিয়ে ওধারে বিছিয়ে থাকা দেদার মাঠে একখণ্ড বাতাস ওঠে | বেশ ধাক্কাওয়ালা বাতাস | তার প্রথম ধাক্কাটা গিয়ে পড়ে উঠোন পেরনোর পর ফাঁকা জমিতে দণ্ডায়মান কদম গাছটির গায়ে | মস্ত গাছটি অমনি পাতাপত্র সমেত ঝমঝম দুলে ওঠে | তার পরে পরেই মাঠের দিকে ধুলোর দমকা ওঠে |

কাকলি বলে, বৃষ্টি এল বুঝি |

সোহরাব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গায়, স্বভাব তো কখনো যাবে না…

বৃষ্টি কিন্তু আসে | এখান থেকে খানিক দূরে বাজারতলার মাথায় ঘোর করে জল নামে | বাজার পেরিয়ে খানিক ঢাল পেরিয়ে সাক্ষৎ সোনাই নদীর এপার সেপার দেখা যাওয়া তরঙ্গে বৃষ্টির সাজগোজ বেশ জাঁকিয়েই বসে | এপার ইন্ডিয়া আর ওপার কুষ্ঠিয়া বাংলাদেশে এই জলের কোনও বিভেদ হয় না | একরকম গজঝম্প মেজাজেই বৃষ্টি এ-দেশ সে-দেশের জোড়া সংসারকে নাজেহাল করে তোলে | বাজারতলার তেলেভাজার ছাউনিতলে ফুটন্ত কড়াইয়ে বেগুনি-পেঁয়াজির সঙ্গে জলের ছাঁট ছ্যাঁক-ছোঁক কোন্দল শুরু করে দেয় |

কে একজনা খরিদ্দর ইতিমধ্যে পেঁয়াজি চেয়ে ধাক্কা পেয়ে চলে যায় | দোকানি বলে, বাড়ির থেকে দুখানি প্যাঁজ নিয়ে আসুন গে | তারপর ভাজাভুজি হবে |

চা করে কাচের গ্লাসে ছাঁকতে বসে কাকলি | নিজের জন্যে একটি কানা ভাঙা কাপ |

সোহরাব কয়, তোমারে উবু হয়ি বসলি যে কি খাসা লাগে |

কাকলি ঝামটায়, আবার খারাপ কথা!

সোহরাব তার বুকের নিখাদ পাটা দুলিয়ে, সোন্দর ঝকঝকে দাঁত সমেত, আর কেমন ধারা কাজল পরানো ভাবের টানা টানা চোখ পেতে বলে, ওই যে বললাম — স্বভাব তো কখনো যাবে না |

— স্বভাব বেচাল করলে বদলাতে হয় বৈকি |

— আর যদি না বদলায়?

— তাহলি বিপদ |

— কার বিপদ শুনি? তোমার, না আমার |

সোহরাব হো হো হেসে ওঠে | তার হাসিতে বাইরের বাজ-বৃষ্টি‚ চৌগুণে জ্বলে ওঠে | ঘরের লণ্ঠন, যা খানিক আগেই জ্বেলে দিয়েছে কাকলি, তিরি তিরি কাঁপতে থাকে | সন্ধ্যার আগেই যাকে বলে অসকাল সন্ধ্যা এসে জুটে যায় | ঘর জুড়ে বাইরের বৃষ্টি কড়কানি ও ভিজে স্বভাব এসে দাপাদাপি শুরু করে | কাকলি বিপদের কথার সূত্র ধরেই বলে, বিপদ বললে দু-জনারই |

— কেন? দুজনার কেন?

কাকলি চায়ের গ্লাস একটি প্লেটে রাখে | পাশে দুটি বিস্কুট | সোহরাব বলে ওঠে, বিস্কুট চলবে না | ভেজা অবস্তাতে গরম গরম চা-ই জব্বর |

কাকলি চা নিয়ে সোহরাবের সামনে যায় | সে অমনি খুবই ক্ষিপ্রতায় তার হাত থেকে চা নিয়ে অপর হাতে তার পেটের কাছের কাপড় খামচে ধরল | কাকলি চমকে বলে, আমার হাত থেকে চা-টা পড়ে গেলে ওটি আর আমার খাওয়া হবেনি |

সোহরাব ভাবে এবার আলগোছে টেনে তার পাশে বসিয়ে দেয় | কাকলি অমনি তার বলিষ্ঠ আকার ভেদ করে তার মিঠে মিঠে ঘাম আর বিড়ির গন্ধ টের পায় | এই টের পাওয়ার শুরুতেই কাকলির বুকের ভিতরে আনচান করতে থাকে | বাইরের উলট পালট হাওয়া আর বৃষ্টির তোড় এসে ঘা দেয় বুক থেকে গড়িয়ে আপাদমস্তক | কাকলি আস্তে আস্তে বলে, তুমি — তুমি যেন ক্যামোন ছেলে |

— ক্যামোন শুনি | খুব খারাপ তো |

— আমি কি তাই বলিছি |

— তবে?

কাকলি এবার খানিক থামে | তারপর মুখ নিচু করে বলে, তুমি এমন করে — বিপদ মাথায় নিয়ে এখেনে আর এসো না |

— বিপদ! হ্যাঁ, তা খানিক আছে | এধারে বি এস এফ, ওপারে বি ডি আর | একবার গুড়ুম করি ঝেড়ি দিলিই হল |

— তাও তোমায় আসতি হবে!

— বেশ তো, তাহলি চলো আমার সঙ্গে | আজই চলো | রাতের বেলায় তোমায় পিঠে করে সাঁতার দে ওপারে নে যাই | আমার বাড়ি থাকবে তুমি — আমার সাথে | আমার না হয় এট্টা ইন্ডিয়ার বিবিই হোক না কেন |

কাকলি টের পায় সোহরাব তাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরছে আস্তে আস্তে | তার বিড়ির বাস, জলের আঁশটে সুগন্ধ, পাটকাঠির ঝাঁঝালো বাস, নদীপারের আকাট কথকতা এ সকলই ক্রমে ক্রমে গ্রাস করতে থাকে তাকে | কাকলির চক্ষু বুঁজে আসে | সে চোখ বোজে | বাইরে হাওয়া আর বৃষ্টির ঘোড়া ছুটে চলে অবিরাম |

কাকলি কিছু বলতে পারে না এ সময় | তার ঠোঁটের পৃষ্ঠে সোহরাবের মত্ত ঠোঁট এসে নামে ত্বরিতে | দুই কোমরের কাছে পুরুষ্টু দু-হাতের থাবা আইঢাই করে | কাকলি বুঝতে পারে নদীর জলে এখন পরিচিত তুফান জেগেছে |

নদীতে তুমুল তুফান তরঙ্গ | ঢেউ উপছে পড়ছে | কাকলি তার তালে-বেতালে উঠছে পড়ছে | সে এখন এই জাগা স্বপ্নের তরঙ্গে বুঝি দু-হাতে গলা জড়িয়ে সোহরাবের পিঠে চড়ে বসেছে | চড়ে বসে নয়, বুঝি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে | বিপুল হাওয়ায় তার আলুথালু চুল উড়ছে |

এ-পার সে-পার নদী তরঙ্গে গান উড়ছে, … স্বভাব তো কখনও যাবে না…

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.