সর্বত্র বিষ – কলিকাতা সীসায়িছে চলিতে চলিতে

সর্বত্র বিষ – কলিকাতা সীসায়িছে চলিতে চলিতে

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার এক সাম্প্রতিকতম সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে আমাদের কল্লোলিনী কলকাতা এখন সীসাময়। যুব বিশ্বকাপে মজে থাকা এই শহরের সেদিকে নজর দেওয়ার সময় বা ইচ্ছে কোনওটাই নেই। তাই খুব প্রত্যাশিতভাবেই অধিকাংশ সংবাদপত্রে এই খবরের কোনও উল্লেখই করা হয়নি। সীসা শরীরে গেলে কি হবে, তার থেকে ফাইনালের দিন বৃষ্টি হলে কি হবে কিংবা মুকুল রায়ের কি হবে —এই আলোচনা অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। এটাই হয়তো স্বাভাবিক।

২০১১ সালের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেশন অনুযায়ী আমাদের, মানে ভারতীয়দের শরীর প্রতি কিলোগ্রাম খাবারে ২.৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সীসার ধকল সহ্য করতে পারে। মানবশরীরের সহনশীলতা এটুকুই। দূষিত হতে হতে পোড় খেয়ে গিয়েছি বলেই হয়ত আমাদের বিষ সহ্য করার ক্ষমতাও বেশি। ইওরোপ-আমেরিকায় এই সহনশীলতা লিটার পিছু ০.২৫ মিলিগ্রাম। প্রসঙ্গত, পাশ্চাত্ত্যে মানবশরীরের সহনশীলতা প্রতি কিলোগ্রামের জায়গায় মাপা হয় প্রতি লিটারে। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সমীক্ষা বলছে, কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে খোলা আকাশের নীচে যে চাল-ডাল-সব্জি-মাছ-মাংস বিক্রি হয়, তাতে সীসার পরিমাণ প্রতি কিলোগ্রামে গড়ে ২৩.৫৬ মিলিগ্রাম। কাঁচা খাদ্যের বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করে প্রতি কিলোগ্রামে ৩.৭৮ মিলিগ্রাম থেকে ৪৩.৫৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সীসা মিলেছে।

মধ্যবিত্ত বাঙালি প্রতিদিন বাজার যায়। থলি হাতে কেটে গেল সারা জীবন! কেন্দ্রীয় সংস্থাটির সমীক্ষা থেকে যা পাওয়া গিয়েছে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। দেখা গিয়েছে, কলকাতার বিভিন্ন খোলা বাজারে যে কাঁচা সব্জি, চাল, ডাল বিক্রি হচ্ছে রোজ, তার শতকরা পঁচাত্তর ভাগের মধ্যেই ঘাপটি মেরে রয়েছে লাগামছাড়া সীসার বিষ। চিকিৎসকরা বলছেন, এই অতিরিক্ত সীসা যদি দিনের পর দিন আমাদের শরীরে ঢোকে, তা হলে তা কিডনির বড়সড় ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট। আক্রমণ থেকে বাদ যায় না লিভারও। সীসা শরীরের যা ক্ষতি করে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইরিভারসিবল। অর্থাৎ, ক্ষতিটা যা হওয়ার তা হয়ে যায়, আর ঠিক করা যায় না। সীসার আরও বেশ কিছু ‘গুণ’ রয়েছে। পেশীর নমনীয়তা কমে যায়, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। রক্ত তৈরি হওয়ার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রয়েছে, সীসার দূষণ ক্রমশ নষ্ট করে দিতে পারে তাও। বড়সড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে শিশুদের মস্তিষ্ক, বুদ্ধি আর বৃদ্ধির স্বাভাবিক পথেও। সারাদিনের দুষ্টুমিতে পুষ্টি বাকি থেকে যাওয়া বাচ্চাদের বাবা মায়েরা গ্লাসকে গ্লাস হেলথ্ ড্রিঙ্ক খাওয়াতে পারেন। কিন্তু তিল তিল করে যে বিষ ছোটদের শরীরে ঢুকছে প্রতিদিন, তার থেকে পরিত্রাণের কোনও সহজ রাস্তা নেই।

সময় বড় বলবান। ‘শ্লোগান পাল্টে হয়ে যায় ফিসফাস’। আমাদের কোনও ঘটনা সত্যিই বেশিদিন মনে থাকে না। মনরে মোরা কহি যে, ভাল মন্দ যাহাই ঘটুক, ভুলিয়া যাইও সহজে। খাবারে এই ধরনের অন্যায় কিন্তু নতুন নয়। মুড়িতে ইউরিয়া, বিরিয়ানিতে মেটানিল ইয়েলো, গোলমরিচে পেঁপের বীজ, রাঙা আলুতে, মাছের কানকোতে আলতা—এই সব ঘটনার কথা মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যে আসে। এই সাঙ্ঘাতিক ঘটনাগুলো যাঁরা ঘটাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ক’জন শেষ পর্যন্ত শ্রীঘরে যান, জানতে পারা যায় না। আমাদের জানার ধৈর্য্যও নেই। মাসকয়েক আগের কথা। দমদমের একটি রেস্তোরাঁয় ছত্রাক ধরে যাওয়া মুরগীর মাংস ধরা পড়েছিল। এই নিয়ে শোরগোল হয়েছিল কিছু দিন। টেলিভিশনের প্রাইমটাইমে ঘণ্টাখানেক। রেস্তোরাঁয় আপাতত তালা, কিন্তু ওই রেস্তোরাঁয় প্রবাসী মালিকের যে কি হল, তিনি আদৌ ধরা পড়লেন কি না, তা জানতে পারিনি। রাস্তার ধারের খাবার দোকানগুলোতে খাবারের ঠিক ঠাক মান বজায় থাকছে কি না, তা নিয়ে কোনও পুর অভিযানের খবরও পাওয়া যায় না অনেক দিন। লেবু-পুদিনার শরবতে যে বরফ মেশানো হয় তার গুণমান নিয়ে কয়েক দিন বাজার সরগরম ছিল বেশ মনে পড়ে। দেখা গিয়েছিল, গরমে গলে যাওয়া আমাদের গলা ঠান্ডা করাতে পরম আদরে শরবতে যে বরফ মেলাচ্ছেন দোকানদাররা, সেই বরফের বেশ কিছুটা আসছে মৃতদেহ সংরক্ষণের বরফ থেকে। শবদেহের ‘গতি’ হয়ে গেলে ওই বরফ ফেলে দেওয়া হচ্ছে না, বরং হাতবদল হয়ে চলে আসছে শরবতওয়ালাদের কাছে। যত দূর মনে পড়ে, এর একটা বিহিত করার কথা ভাবা হয়েছিল। কথাবার্তা চলছিল, ব্যবসার কাজে ব্যবহার করার বরফ আর মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য বরফের রং আলাদা করে দেওয়া হবে। আমার অপারগতা ক্ষমা করবেন। আমি অন্তত এমন আলাদা রঙের বরফ এই শহরে দেখে উঠতে পারলাম না। সেই শরবতওয়ালারাও বহাল তবিয়তে আছেন। নিম্বু মেহেঙ্গা হো গ্যায়া, তাই শরবতের দামও বেড়েছে। আর আম আদমি আজও একই রকম ভাবে বরফ মেশানো শরবত গলায় ঢালছে। ঠান্ডা খাচ্ছে। ঘটনাটা জানাজানি হওয়ার পর হাতো গোণা কয়েক দিন হাতে গোণা ধরপাকড় হয়েছিল। তারপরেই সব শেষ। আর আমরা ভাবি, এ ভাবেই বুঝি খাবারে ভেজাল আটকানো যায়।

ডেঙ্গি থেকে বাঁচতে আমরা সারাদিন মশারির তলায় বসে থাকতে পারি, মশা মারার জন্য সত্যিই কামান দাগতে পারি, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য খাবার খাওয়াটা তো বন্ধ করে দিতে পারি না। তবে আজকের এই দুর্দিনে কি যে খাব, এই নিয়ে মনে একটা বিশাল প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়। দরদ দিয়ে ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান’ গাইতে ভাল, কিন্তু বাস্তবে তা দিনের পর দিন হতে থাকলে কপালে ভাঁজ পড়তে বাধ্য। কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলব! কদিন আগেই ধুম উঠেছিল, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ টাকা প্রতি লিটারে খরচা করে যে দুধ কিনছি আমরা, তাতে নাকি মেশানো আছে ডিটারজেন্ট। পটল-ঝিঙে-ঢেঁড়শকে আরও সবুজ দেখানোর জন্য যে রঙে চোবানো হচ্ছে, তা নাকি আদতে কার্সিনোজেনিক। এবং কি আশ্চর্যের ব্যাপার দেখুন, চকচক করলেই সোনা হয় না—এমন ভাব সম্প্রসারণ স্কুলজীবনে মুখস্ত করে দশ বার লেখার পরেও আমরা এর সারসত্যটা ধরতে পারলাম না। আজও বহু মানুষ ভাবেন, যত সবুজ তত টাটকা, এবং তত বেশি পুষ্টি। কি অবলীলায় চন্দ্রমুখী আলু বিয়ের পিঁড়িতে বসে যাচ্ছে রোজ। গায়ে হলুদ হচ্ছে ফসল তোলার পর থেকেই! বাজার থেকে দশ টাকা আঁটির মহার্ঘ লালশাক কিনে এনে ধুতে গিয়ে দেখেছি, শ্রাবণের ধারার মতো ঝরে পড়ছে লাল রং। এই নিয়ে কারও কোনও প্রতিবাদ নেই। তিরিশ টাকা দিয়ে যে চিকেন বিরিয়ানি বিক্রি হয় অফিসপাড়ায়, সেই মাংস আদৌ পাতে দেওয়ার যোগ্য কি না তা নিয়ে কোনও আলোচনা হতে শুনি না। অথচ জানি, আগে থেকে মরে যাওয়া মুরগীরও একটা বাজার আছে। সেই রুগ্ন, অসুস্থ মুরগীই মেটানিল ইয়েলোর সোহাগ মেখে তিরিশ-পঁয়তিরিশ টাকায় রসনাতৃপ্তি করতে হাজির হয় কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হয়। অথচ নাগরিক ক্লান্তিমাখা আমরা কালও এমন দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করব, দাদা, বিরিয়ানি ভাল হবে তো? দোকানদারও সানন্দে মাথা নাড়বেন। ডানা ঝাপটাতে না পারলেও কে যে সত্যিকারের মুরগী তা বোঝা দায়!

সীসা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সীসা দিয়েই শেষ করি। খাবারে সীসার এই বাড়বাড়ন্তের জন্য গাড়ির ডিজেল ব্যবহারকেই দুষেছে ওয়াকিবহাল মহল। ডিজেলের ধোঁয়াই নাকি শহরজোড়া সীসার বিষের মূল জনক। ডিজেলের ধোঁয়া বাতাসে মিশছে। আর সেই বাতাসই বিষিয়ে তুলছে রাস্তার ধারে বিক্রি হওয়া খোলা খাবারকে। সমীক্ষকরা মনে করেছেন, বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাস বা ব্যাটারি চালিত গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে হবে। অর্থাৎ, কমাতে হবে ডিজেলচালিত গাড়ির সংখ্যা।

বলা সোজা। করা কঠিন। এ সব দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। সুতরাং, সীসার দূষণ থেকে আপাততমুক্তি পাওয়ার কোনও দিশা দেখা যাচ্ছে না। উল্টে আশঙ্কা হয়, গাড়ির সংখ্যা যত বাড়বে, গাড়ি যত পুরনো হবে, ধোঁয়াটাও আরও কু-ধোঁয়া হয়ে উঠবে দ্রুত। ফলে আমাদের রোজনামচায়, খাবার দাবারে, পাকস্থলীতে সীসার পরিমাণ কমবে না, বরং বাড়বে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে বিক্রি হওয়া সব্জিতে-চালে-ডালে হয়ত এই সীসার দূষণ কম। কিন্তু তা ক’জনের জন্যে!

কিছু কিছু সমস্যা আমাদের হাতের বাইরে থাকে। সহজ সমাধান হয় না। যেগুলোর হয়, সদিচ্ছা নিয়ে সেগুলো করলেও বেঁচে থাকাটা আরও একটু ভাল করা যেত। এই আর কি!

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

5 Responses

  1. Vishon informative akta lekha. Khub rag o hochhe nijeder opor.amra nijerai nijeder khotir karon.
    Thanks Amlan.
    But kojoner chokhe angul deya gelo jana nei…. Suvechha roilo

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।