‘মোনালিসা’-কে নাকি অসম্পূর্ণ রেখে প্রয়াত হয়েছিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

583

ইতালির রেনেসাঁর সময়কার কালজয়ী চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। তবে শুধু চিত্রশিল্পী হিসেবেই নয়, সেই সময়ে স্থাপত্য, ভাস্কর্য, সঙ্গীতে এক বহুমুখী প্রতিভাধর শিল্পী হলেন দ্য ভিঞ্চি। তাঁর শিল্পকর্মের জন্য তিনি গোটা বিশ্বের কাছে সমাদৃত হয়ে আসছেন। তাঁর শিল্পকর্মের মধ্যে দ্য লাস্ট সাপার এবং মোনালিসা- অত্যন্ত বিখ্যাত। দ্য ভিঞ্চি আনুমানিক ষোড়শ শতকে বিখ্যাত এই শিল্পকর্মটি সৃষ্টি করেন। সেই সময় থেকে আজ প্রায় কয়েকশো বছর পরেও মোনালিসা নিয়ে চর্চার শেষ নেই। বিশ্বের তাবড় তাবড় চিত্র সমালোচকেরা বিভিন্ন সময়ে মোনালিসা-র জন্য কলম ধরেছেন। বিখ্যাত এই শিল্পকর্মটি ফ্রান্সের ল্যুভ্র জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরের তথ্য অনুসারে, প্রায় আশি শতাংশ পর্যটক শুধু মোনালিসার চিত্রটি দেখার জন্য সেখানে ভিড় জমান। বিভিন্ন সময়ে এই মোনালিসার ছবিটিকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন। তবে সম্প্রতি গবেষকরা প্রকাশ করেছেন এক বিস্ময়কর তথ্য। স্নায়বিক অসুস্থতার কারণে নাকি বিস্ময়কর এই শিল্পকর্মটি সম্পূর্ণই করে উঠতে পারেননি ভিঞ্চি!

ইতিহাস বলছে, আনুমানিক ১৫০৩ থেকে ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে মোনালিসার ছবিটি এঁকেছিলেন তিনি। মোনালিসা যে ক্যানভাসের ওপর আঁকা, সেটি পাইন কাঠ দ্বারা নির্মিত। চিত্রকলার ইতিহাসে মোনালিসাই নাকি সবথেকে চর্চিত একটি ছবি। বিভিন্ন সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে মোনালিসা। এমনকী
দ্য  ভিঞ্চিরও সবথেকে প্রিয় শিল্পকর্ম ছিল মোনালিসা। আর এইজন্যই হয়তো মৃত্যুর আগে পর্যন্তও নিজের কাছে আগলে রেখেছিলেন এই ছবি। কিন্তু শোনা যায়, বহুবার চেষ্টার পরও ছবিটি শেষ করতে পারেননি তিনি।

ইতালির গবেষক তথা চিকিৎসকরা দাবি করছেন, মোনালিসা অসমাপ্ত থেকে যাওয়ার কারণ তাঁরা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। জার্নাল অফ রয়্যাল সোসাইটি অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গিয়েছে যে, ভিঞ্চি স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার ফলে তাঁর ডান হাত আংশিকভাবে অসার হয়ে যেত । বাহ্যিক সাড়
শূন্য হয়ে পড়ার কারণে হাতে জোর পেতেন না ভিঞ্চি । আর সেই কারণেই মৃত্যুর আগে পাঁচ বছরের মধ্যে কোনও নতুন শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতে পারেননি তিনি, এমনকী মোনালিসা-কেও অসম্পূর্ণ রেখে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন ।

দুই ইতালীয় চিকিৎসক- ডেভিড লাজেরি (প্লাস্টিক সার্জন) এবং কার্লো রোসি (স্নায়ুবিশারদ) বিশদ গবেষণার পর ওই প্রতিবেদন লিখেছেন, বিখ্যাত শিল্পীর যে কোনওসময়ে স্ট্রোক হয়েছিল বলে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রসঙ্গত, ভিঞ্চি একজন বাঁ-হাতি হলেও, তিনি ছবি আঁকার ক্ষেত্রে কিন্তু ডান হাত ব্যবহার করতেন। আর তাঁর এই বিশেষ স্নায়বিক দুর্বলতার কারণ বলে চিকিৎসকরা দায়ী করেছেন তাঁর হাতের অবস্থানকে।

ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে ১৫০৭ থেকে ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মিলানে ভিঞ্চি এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ শিল্পী গিওভান অ্যামব্রোগিয়ো ফিনিও ভিঞ্চির একটি প্রতিকৃতি তৈরি করেছিলেন। লাল চকে আঁকা ওই ছবি থেকেই চিকিৎসকরা তাঁর ছবি আঁকায় সমস্যার কারণ ধরতে পেরেছিলেন। ছবিতে দেখা গিয়েছে, ভিঞ্চির ডান হাতের বুড়ো আঙুল এবং তর্জনীটি সোজা হলেও মধ্যমাটি ছিল সামান্য বাঁকা এবং অনামিকা ও কনিষ্ঠ আঙুলটি খানিকটা সংকুচিত অবস্থায় ছিল। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাতের এই বিশেষ অবস্থানকে চিকিৎসার পরিভাষায় ‘ক্ল হ্যান্ড’ বলা হয়। শুধু তাই নয়, সাধারণত হাত ভেঙে গেলে, ভাঙা হাত যেভাবে স্লিং-এর সাহায্য ঝোলানো থাকে ছবিতেও দা ভিঞ্চির গলায় জড়ানো চাদরের সাহায্যেও হাতটা সেইভাবে রাখা বলে মত প্রকাশ করেছেন গবেষকরা।

সুতরাং এর থেকে বোঝাই যাচ্ছে যে, স্নায়বিক দুর্বলতার কাছে হেরে গিয়েছে তাঁর শিল্পীসত্ত্বা। তাই বারবার চেয়েও শেষ করতে পারেননি মোনালিসা। রহস্যময় হাসির মোনালিসা’কে নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকে মনে করেন মোনালিসা হলেন দ্য ভিঞ্চির মা, আবার অনেক মনে করেন মোনালিসা তাঁর বান্ধবী। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মোনালিসার প্রতিকৃতির সঙ্গে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির চেহারার বিশেষ মিল রয়েছে। সেই থেকে অনেক গবেষক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, মোনালিসা নারীও নয়, আবার পুরুষও নয়। বিতর্ক যাই থাকুক না কেন শারীরিক অসুস্থতার জন্যই মোনালিসা-সহ লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বহু শিল্পকর্মই অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.