গলনাঙ্ক

246

‘ব্যাক টু দ্য রুটস্?’

রিপনের সঙ্গে রঘুবীরকে নিয়ে আর কোন কথা হল না | দেড়টা নাগাদ ক্লাস করতে গেল তারা, রঘুবীরদারই ক্লাস | রঘুবীরদা ক্লাসে ঢুকতেই একটা হালকা চাঞ্চল্য দেখা দিল ক্লাসে | গর্বী বুঝতে পারল সবাই একবার তাকে, একবার রঘুবীরকে মাপছে | রিপনকে সে বলল, ‘সবাই এখন নিজের নিজের অপটিক নার্ভের ওপর জোর খাটাচ্ছে খুব রিপন! একটা কথা তুইও নিশ্চই মানবি যে মানুষের কাছে শেষ পর্যন্ত নিজের সেক্স অর্গানগুলো ছাড়া আর কিছুই থাকে না’ | বলে হাসতে লাগল সে | রিপন একটাও কথা বলল না আর | রঘুবীরদা বললেন, ‘তোমরা এই উইক-এ দুটো ছবি দেখবে, একটা হল কিনুগুসার ‘পেজ অফ ম্যাডনেস’! জাপানিজ ছবি, আর একটা হল ফ্র্যাঙ্ক কাপরার ‘ইট হ্যাপেন্ড ওয়ান নাইট’ | আর একটা ছবির কথা আমি ভেবেছি, সেটা যদি পাওয়া যায় – ‘লুলু’, পাবস্ট-এর ছবি |’

আজ বিকেলে গর্বীর কোন পড়ানো নেই | বিকেলটা সে বন্ধুদের সঙ্গে কাটাবে ঠিক করেছিল | নন্দন-এ একটা ডকু-ফিচার ফেস্ট চলছে | সবাই সেখানেই যাবে | সাড়ে চারটে নাগাদ ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে রক্তিম আর রিপনের সঙ্গে মিলনদার ক্যান্টিনের দিকে যেতে গিয়ে গর্বী দেখল অদূরেই তূনীর দাঁড়িয়ে চা-পাঁউরুটি খাচ্ছে | সে আলাদা হয়ে গেল রিপনদের থেকে | ডাকল তূনীরকে, ‘অ্যাই শোন!’
খুব অবজ্ঞার চোখে তাকাল তার দিকে তূনীর, এগিয়ে এল,’বল!’
‘তোর আর কোন কাজ নেই এখন? আমার ওপর নজরদারি করছিস সব সময়?’

‘নজরদারি করিনি | পড়াতে গেছিলাম তোদের পাড়ায় |’

‘আমি যে রঘুবীর চৌধুরীর বাড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছি সেটা রিপনকে গিয়ে বলার কি ছিল তোর? রিপন কি আমার গার্জেন?’

তূনীর চুপ করে রইল |

‘বল্? আর রঘুবীর চৌধুরীর কি কোনও ছোঁয়াচে রোগ আছে যে উনি কারও সঙ্গে বা ওঁর সঙ্গে কেউ মিশতে পারবে না? কি আশ্চর্য, রঘুবীর চৌধুরীকে নিয়ে সবার এত মাথা ব্যথা কিসের্?’

তূনীরের চোখটা ছলছলে হয়ে গেল, ‘তুই আর আমি যে আর একসঙ্গে নেই এটা মেনে নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে আমার গর্বী | কিন্তু তোকে বলছি, আই ওন্ট কাম ইন ইয়োর ওয়ে এনি মোর | তুই তোর মতো থাক, আর তোকে ডিসটার্ব করব না!’

‘আমরা কোনদিনই একসঙ্গে ছিলাম না তূনীর | তুই ভুল ভেবেছিস বরাবর | আর তোকে বোঝাতে পারছি না দেখে তোকে অ্যাভয়েড করতে শুরু করেছি আমি | এ ছাড়া কোনও উপায় নেই!’

মেজাজ খারাপ করে ফেলল তূনীর সঙ্গে সঙ্গে, ‘তুই খুব সুবিধাবাদী গর্বী |’

‘তোর কাছ থেকে কী সুবিধা নিয়েছি আমি তূনীর?’

‘যশমাল্য চ্যাটার্জির ক্লোজ তুই এমনি এমনি হোসনি! ওখানে তোর অনেক স্বার্থ আছে | অনেক ক্ষমতা যশমাল্য চ্যাটার্জির, অনেক কানেকশান | ওটা একটা পরিষ্কার গিভ অ্যান্ড টেক রিলেশনশিপ | রঘুবীর চৌধুরির ব্যাপারটাও হয়ত তাই!’

‘যার সম্পর্কে তোর এ হেন ধারণা তুই বলতে চাস তুই তাকেই এত ভালবাসিস? তারই প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস?’

‘সত্যি বলতে তোর প্রতি এখন আমার কোনও প্রেম নেই কিন্তু এখনও আমার তোর সঙ্গে শোয়ার ইচ্ছে আছে! এ বছরের শেষে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ, তারপর তুই কোথায় আর আমিই বা কোথায় গর্বী?’

(‘তোর সঙ্গে শুতে আমারও আপত্তি ছিল না তূনীর! কিন্তু আর তোকে আমার ভরসা হয় না, চণ্ডালের মত বিহেভ করিস তুই! ভালগার হয়ে যাস |’ বলল গর্বী তাকে | গর্বীর নরম গালে হাত রাখল তূনীর, হয়ত শেষবারের জন্য | বলল, ‘তুই তো প্রেম বুঝিস না সোনা মেয়ে!’

নাকটা লাল হয়ে গেল গর্বীর, পাশ কাটিয়ে চলে গেল তাকে | সে বেরিয়ে এল চার নম্বর গেট দিয়ে | হাঁটতে লাগল | এবং বারবার চোখে জল চলে আসতে লাগল তার, গর্বীকে এত ছোট কথা বলল সে? যে গর্বীকে সে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে, সবচেয়ে বেশি চায়? ভিখিরির মতো?

পৃথিবী? ভিখিরি? সবচেয়ে বেশি চাওয়া? — নিজের মনেই হা, হা করে হেসে উঠল সে! সত্যি সত্যি সাহস করে তূনীর কোনদিনও গর্বীকে বলে বসেনি, ‘গর্বী আমি তোকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসি!?’ বললে ও বিশ্বাস করত না | মানত না | বুঝত-ও না! বরং এটা গর্বী বুঝল এবং বিশ্বাসও করল যে তার যাবতীয় মতিচ্ছন্নতার উৎস গর্বীর শরীর চেয়েও তা না পাওয়া | এই যে শহরটা, এই চারপাশের জগতটা, তার বন্ধুরা — ক্রমাগত তাকে শেখাতে চেয়েছে সহজ, সরল সত্যি থেকে দূরে থাকতে | এই চার পাঁচ বছর ধরে সেও চেষ্টা করেছে ওদের মতো হতে, পারেনি | যদি তূনীর আজ ক্যাম্পাসে সকলের সামনে পায়ে পড়ে যেত গর্বীর, বলত, ‘তোর মনটা চাই আমি গর্বী, সেই মনটা হাতের মুঠোয় নিতে গিয়ে শরীরটা ধরি, সেই মনটায় ঢুকতে ইচ্ছে করে বলে শরীরটায় ঢুকি!’ গর্বী বলত সে পাগল! যদি তূনীর বলত, ‘আমি একটা ভীষণ সাধারণ ছেলে গর্বী, জটিলতা আমার ভাল লাগে না, আই অ্যাম জাস্ট এনাদার ম্যান ওয়াকিং হিজ ওয়ে সিয়িং হিজ গোল!’ গর্বী নাক সিঁটকোত | মেটাফর, মেটাফর, মেটাফর চাই! ফর্ম ভাঙা চাই! প্রেমের! বিশ্বাসের! মৃত্যুর! গর্বী, রিপনদের বন্ধু ইনামই লিখেছে — ‘why do women so love metaphors?’ উত্তরটাও ইনামের কাছেই ছিল, ঠেকে যেদিন ‘Riverina’ কবিতাটা পড়ল ইনাম, ‘…riverina, let us be drug pedlars tonight, let police cars go up in flames as we narcotize the landscape…, riverina seduce me with cocoa and whips, hunt my body for ancient passwords…, সেদিন গর্বীকে সে প্রথমবার কাঁদতে দেখেছিল হাঁটুতে মুখ গুঁজে, তাকে বলেছিল গর্বী, ‘আমাকে ধর তূনীর, আমাকে একটু ধর!’ সে জাপটে ধরেছিল গর্বীকে প্রাণভোমরা ধরার মতো, আর সঙ্গে সঙ্গে গর্বী নিজেকে সরিয়ে নিতে নিতে বলেছিল, ‘না, না, তুই ধরলে হবে না, হবে না আমার!’ তার মনে হয়েছিল গর্বী ঘুরে ছোবল মারল তাকে! জ্বালা ধরা শরীর নিয়ে উঠে চলে এসেছিল তূনীর ঠেক ছেড়ে | সেই জ্বালা এখনও যায়নি তার ভেতর থেকে | সেই দিনের পর থেকে যতবার বিছানায় গেছে গর্বীর সঙ্গে মনে মনে তূনীর ভেবেছে ঠিক যখন গর্বী ডাকবে তাকে, কাতরাতে কাতরাতে আহ্বান করবে ‘আয়, এবার ভেতরে আয়!’ তখন, তখনই প্রতিশোধটা নেবে সে | এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মেয়েটাকে ওই অবস্থায় ফেলে রেখে বেরিয়ে আসবে!

কিন্তু তূনীর একবারও গর্বীর সঙ্গে এ জিনিস করতে পারেনি | সংকল্প করে প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে | অসংখ্য বুদবুদ দিয়ে তৈরি একটা মনুমেন্টের মতো গর্বীর শরীরের যে বিন্দুতে বাধা দিতে গেছে সে — সেই বিন্দুটাই ফেটে গিয়ে আরও গিলে নিয়েছে তাকে গভীরে! আর এইভাবে সে খুঁজে পেয়েছে গর্বীর ভেতরের একটা টাইমলেস মোশনলেস সম্পূর্ণ জড়তার জগৎ! সেখানে পড়ে আছে রাশি, রাশি সিগারেটের দুমড়ানো প্যাকেট, সিগারেটের বাট, ছাই, পোড়া দেশলাই, ঘিলুর মত দেখতে চিবোনো চুইংগাম, ছেঁড়া, দলা পাকানো পেপার ন্যাপকিন — ব্যবহার করে গর্বী নিজেই এসব ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে নিজের ভেতর! ঘুরে বেড়িয়ে উঠে এসে গর্বীর মুখ দেখে ভীষণ মায়া হয়েছে তূনীরের তখন! তার মায়া হয়েছে এই ভেবে যে গর্বী এসব কিছুই জানে না!

রামকৃষ্ণ মিশনের রাস্তায় ঢুকে তূনীর বুঝতে পারল হাঁটতে হাঁটতে সে এত দূর চলে এসেছে | তখন অ্যান্ডারসন ক্লাবের পাশ দিয়ে লেকের সামনে চলে এল সে, বসল একটা ফাঁকা বেঞ্চে!

এরকম ছিল না সে কখনও — গাঁজাখোর, উড়নচন্ডে, উগ্র মেজাজ! গর্বীকে বুঝতে বুঝতে এরকম হয়ে গেল | হায়ার সেকেন্ডারির আগের বছর বাবা মারা যাওয়ার ঠিক পরের দিন বহরমপুরের বাড়ির পেছনের মাঠে তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মা বলেছিল, ‘তূনীর — বাবা কিন্তু নেই!’ ধূ-ধূ খাঁ–খাঁ অন্ধকারে ডুবে থাকা মাঠে মায়ের কথাটা বিরাট হাহাকারের মত ছড়িয়ে গেছিল তার চতুর্দিকে | ‘তোকে কিন্তু পড়তে হবে বাবা | দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে ! মেধা আর পরিশ্রম, এই তোর সম্বল | আর কিছু নেই!’ আর পড়েছিল সে, দিনরাত এক করে পড়েছিল | ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত তার চোখের সামনে ঝুলে থাকত শুধু একটাই জিনিস — পড়াশুনো, চাকরি, সার্থকতা! তারপর গর্বীর সঙ্গে দেখা হল তার | সাহিত্য, সিনেমা এসব নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না তার আগে, গর্বীর জন্যই সে মিশতে শুরু করেছিল রিপনদের সঙ্গে | ‘কাল্ট অফ বিউটির’ কথা বলে রিপনরা, সুন্দরের খোঁজে ঘুরে বেড়ায় ওরা দল বেঁধে | কিন্তু সুন্দরকে কি খুঁজতে হয় ? সুন্দর তো আপনিই এসে ধরা দেয় চোখে, বোধে! যে ব্রাত্য, যে নিঃসঙ্গ, যে এই বিকেল মুছে যাওয়া সময়ে লেকের জলের ধারে বসে কাঁদছে প্রেমিকার জন্য, সকলের অগোচরে অশ্রু বিসর্জন করছে — গর্বীরা, রিপনরা কি জানে তার প্রেমটা যখন একটা হলোকস্টে ঢুকে যাবে তখন এই পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে একটা সুন্দর? নষ্ট হয়ে যাবে? চিরদিনের মতো?

লেকের জলে বোটিং করছে কতজন | সেইদিকে তাকিয়ে তূনীর নিজেকে কথা দিল সত্যিই আর গর্বীকে বিরক্ত করবে না কোনওদিন!)

কথা হচ্ছিল ফেলিনিকে নিয়ে, ফেলিনি যে বলেছিলেন ‘বয়েস হলে মানুষের জানার পরিধি কমে আসে’ — এই কথাটাই নিজের নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিল তারা | কিন্তু যা হয়, একটা প্রসঙ্গ থেকে আর একটা প্রসঙ্গে যেতে যেতে রক মিউজিক পাগল অর্চনের কথাটা দুম করে বুকে বিঁধে গেল গর্বীর! জিমি হনড্রিক্স বলেছিলেন, ‘You can only sacrifice the things you love. I burned my guiter because I love my guiter!’ একটা সিগারেট ধরিয়ে গর্বী ভাবতে বসল এক্ষুনি যদি একটা কিছু স্যাক্রিফাইস করতে বলা হয় তাকে তাহলে কোন জিনিসটা…! ভাবনাটা টস করতে করতে একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল গর্বী | ভালবাসার জিনিস বলতে শুধু যে তেমন সাংঘাতিক কিছু খুঁজে পেল না সে তাই নয় — তার মনে হল নিজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কয়েকটা অতি পছন্দের জিনিস যদি সে পুড়িয়েও ফেলে, ফেলেও দেয় ছুঁড়ে বা ট্যাক্সিতে রেখে নেমে চলেও যায় তাহলেও খুব গোপনে সে জানবে যে ওই প্রতিটা জিনিসই কোন না কোনভাবে রিপ্লেসড হয়ে যাবেই তার জীবনে | অন্তত হওয়া সম্ভব! যদি তাকে অন্যতম প্রিয় জিনিস সিনেমা ছেড়ে দিতে বলা হয়? সে আর সিনেমা দেখবে না, সিনেমা নিয়ে কথা বলবে না, সিনেমা তৈরির স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেবে, ভাবনা চিন্তা স্তব্ধ করে দেবে — তাহলেও কি খুব বড় ত্যাগ হবে সেটা? সে কি এতই ভালবাসে সিনেমা? বাকি থাকল মানুষ! ইনডিভিজুয়াল মানুষের কোনও রিপ্লেসমেন্ট হয় না, তাকে রিক্রিয়েট করা যায় না ঠিকই কিন্তু গর্বীর জীবনে এমন একটাও মানুষ নেই যাকে সে এত ভালবাসে যে তাকে ছেড়ে দেওয়াটা ‘স্যাক্রিফাইস’ মনে হতে পারে! অতএব? — হাতড়ে হাতড়ে ত্যাগ করার মতো হৃদয়ের কাছে অবিচ্ছেদ্য, ঘন অবলগ্ন কোনও বস্তু না পেয়ে তার বিশ্বাস জন্মাল নিজের শরীরটা ছাড়া, নিজের মনটা ছাড়া অপ্রতিস্থাপনীয় কিছু সত্যিই নেই তার জীবনে, একমাত্র তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোই বিলুপ্ত হলে অপূরণীয় থেকে যাবে | এই সত্য অনুধাবন করে ছেলেমানুষের মত বিষণ্ণ বোধ করতে লাগল সে | আশ্চর্য, শরীরটার বাইরে কোনও কিছুর সঙ্গেই কোনও মর্মান্তিক সম্পর্ক নেই তার? নন্দনের উদ্দেশ্যে দূত ধাবমান ট্যাক্সিতে বন্ধুদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেষি করে বসে থাকতে থাকতে নিজের হাত, পা, ফুলে থাকা স্তন, জমাট উরুর দিকে বারংবার তাকাতে লাগল গর্বী! এবং গাছপালা, আকাশ, বাতাস, মাটি, ট্যাক্সির চাকার নিচে ছুটতে থাকা পথ সব কিছুরই সঙ্গেই শরীরের মাধ্যমে জড়িয়ে থাকার অগৌরব টের পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে গেল এক সময়!

আর নন্দনে নেমেছে কি নামেনি ফোন এল রঘুবীর চৌধুরীর, ‘গর্বী? গর্বী?’ বলে উঠলেন রঘুবীর | সে বলল, ‘হ্যাঁ, রঘুবীরদা বলুন?’

‘গর্বী তুমি কি আমার কাছাকাছি আছো?’

‘আমি নন্দনে |’

‘ওঃ!’ হতাশ হলেন রঘুবীর চৌধুরী |

‘কিছু হয়েছে?’ |

‘না, না, একটা মেয়ে, একটা মেয়ে…!’ ফিসফিস করছেন রঘুবীরদা |

‘একটা মেয়ে?’

‘আমাকে ইউনিভার্সিটি থেকে ফলো করছিল একটা মেয়ে, চৌরঙ্গীতে এসেছিলাম একটা কাজে | মেট্রোতেও মেয়েটা বারবার আমার পাশে চলে আসার চেষ্টা করছিল যখন আমি একটা কামরা থেকে চলে যাচ্ছিলাম অন্য কামরায়! এখন আমি গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে দিয়ে হাঁটছি, মেয়েটা আমার পাশে পাশে হাঁটছে!’

‘মেয়েটাকে আপনি চেনেন?’

‘না, না, আমি মেয়েটার মুখের দিকে তাকাব না কিছুতেই, আমি দেখতে চাই না মেয়েটা কে, মেয়েটাকে চিনি কিনা!’

‘তাকালে কী হবে রঘুবীরদা?’

‘তাকালে আমার যেটুকু মাথা কাজ করছে সেটাও আর করবে না গর্বী | মেয়েটার দিকে তাকানো মাত্র আমার চারপাশটা ফাঁকা হয়ে যাবে, দোকানপাটের আলো নিভে যাবে, রাস্তার আলো নিভে যাবে | হঠাৎ করে মৃত্যুপুরী হয়ে উঠবে জায়গাটা — মনে হবে মেট্রোর সামনে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে টেররিস্টরা! আমি দেখতে পাব প্রাণ ভরে ছুটে যাওয়া মানুষের জামায় রক্তের ছিটে, পালাতে গিয়ে পা থেকে খুলে গেছে জুতো!’ রঘুবীর চৌধুরী যেন ভয়ের অ্যান্টেনা খুলে ফেলেছেন, যেখানে যত রকম দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ভয় আছে, সম্ভাব্য ও অসম্ভব ভয় আছে টেনে নিচ্ছেন অ্যান্টেনা দিয়ে নিজের দিকে | তারপর সমস্ত রকম ভয় সিঙ্কোনাইজ করে নিজেকে নিজেই উসকে দিচ্ছেন আরও ভয় পেতে! কিন্তু সত্যিই কি কোনও মেয়ে ফলো করছে রঘুবীরকে ইউনিভার্সিটি থেকে? হয়ত এই অংশটুকু শুধু মাত্র ভয় পাওয়া নয় রঘুবীরের, সেই দুর্যোগের সন্ধ্যায় রঘুবীরের বাড়ির দরজা একদম হাট খোলা অবস্থায় পড়েছিল এ তো সত্যিই! গর্বী নিজের চোখে দেখেছে!

‘আপনি দাঁড়িয়ে থাকুন ঠিক গ্র্যান্ডের সামনে রঘুবীরদা, আমি আসছি! আর নইলে আপনি নন্দনে চলে আসুন একটা ট্যাক্সি ধরে, এখানে রক্তিম, রিপন সবাই আছে!’

‘ট্যাক্সি ধরতে পারব না আমি গর্বী!’

‘ঠিক আছে, তাহলে দাঁড়িয়ে থাকুন | এসে যদি মেয়েটাকে ধরতে পারি তাহলে আমিই জেনে নেব ও কেন আপনাকে ফলো করছে!’

বন্ধুদের থেকে একটু দূরে সরে গেছিল গর্বী কথা বলতে বলতে, একবার সে ভাবল অন্তত রিপনকে বলে যায় | তারপর রিপনকে দেখতে না পেয়ে সে ছুটে একটা ট্যাক্সিতে উঠে পড়ল |

লিন্ডসে স্ট্রিটের মুখে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে জোরে জোরে পা ফেলে গর্বী এগিয়ে গেল গ্র্যান্ড হোটেলের দিকে | ফোন লাগলে রঘুবীরকে | কিন্তু ফোন বেজে ওঠার আগেই সে দেখতে পেল একটা দীর্ঘদেহী, তন্বী, জিনস আর টপ পরা, চোখে মুন গ্লাস লাগানো, ঢাউস চামড়ার ব্যাগ কাঁধে ঝোলানো মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন রঘুবীর | সে গিয়ে দাঁড়াতে ম্লান হেসে রঘুবীর চৌধুরী বললেন, ‘গর্বী, ও হল পৃথা, আমাদের এখান থেকে ডিগ্রি ফিল্ম করে ও এখন বম্বেতে কাজ করছে, কার নাম বললে তুমি পৃথা?’ পৃথা মেয়েটি গর্বীর চেয়ে বয়েসে বছর চারেকের বড় হবে, লম্বায়ও গর্বীর থেকে ইঞ্চি দুয়েক বেশি, দুর্দান্ত ফিগার, হাসলে গালে টোল পড়ে, এক বিখ্যাত পরিচালকের নাম করল পৃথা | রঘুবীরদা বললেন, ‘ও এখন তাঁকেই অ্যাসিস্ট করছে গর্বী!’

পৃথা বলল, ‘আমি এখন কয়েকদিন কলকাতায় আছি | এখান থেকেই সোজা যাব নিউজিল্যান্ড | আমাদের ইউনিট এখন ওখানেই | পারলে একদিন ইউনিভার্সিটিতে আসব রঘুবীরদা | সেইসব দিনগুলো এত সুন্দর ছিল | কিছুতেই ভুলতে পারি না!’

এরকম আরও কয়েকটা কথার পর পৃথা একটু থামল, ইতস্তত করে, গর্বীর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘অলিভিয়াও এখন বম্বেতে | আমার সঙ্গে ওর যোগাযোগ আছে | ওর ফোন নাম্বারটা আপনি নেবেন রঘুবীরদা?’

নিমেষে বিবর্ণ হয়ে গেল রঘুবীর চৌধুরীর মুখ, ‘না!’

না বলে রঘুবীরদা মুখ নামিয়ে নিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন প্রায় পায়ের কাছে সাজানো ম্যাগাজিনগুলোর দিকে | এবং সেখানেও অসংখ্য, প্রায় নগ্ন, উন্মোচিত দেহকে নানা ভঙ্গিমায় মেলে ধরা মেয়েদের ছবি দেখে চোখ নিয়ে গিয়ে ফেললেন গর্বীর পায়ের পাতার ওপর |

পৃথা হাসল, ‘ওঃ, ঠিক আছে রঘুবীরদা, তাহলে আসি? দেখা হয়ে খুব ভাল লাগল |’

পৃথা চলে গেল উল্টোদিকে, সাতটা বাজে | এখন আর নন্দনে গিয়ে কোনও লাভ নেই | ‘ট্যাক্সিতে উঠি?’ জিজ্ঞেস করল সে রঘুবীরকে | মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানালেন উনি | এই সময় ট্যাক্সি পাওয়া সহজ নয়, অনেক ছুটোছুটি করে অবশেষে একটা ট্যাক্সি যেতে রাজি হল যাদবপুর | গাড়ি চলতে শুরু করলে সে বলল, ‘এই মেয়েটাই আপনাকে ফলো করছিল রঘুবীরদা?’

‘না গর্বী! যদিও সামনে এসে দাঁড়িয়ে কথা না বললে আমি পৃথাকে চিনতে পারতাম না তবু যে মেয়েটা ছায়ার মতো লেগেছিল আমার সঙ্গে সেই মেয়েটা এত লম্বা নয়!’

সে বলল, ‘অলিভিয়া কে? অলিভিয়ার নাম শুনে আপনি এত ভয় পেয়ে গেলেন কেন?’ গর্বী বলল না যশমাল্যর কাছেও সে অলিভিয়ার নাম শুনেছে |

‘যে সব মেয়েদের আমি জীবনে সবচেয়ে বেশি ভয়

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.