(সাক্ষাৎকার ও ভাবলিখন – তন্ময় দত্তগুপ্ত)

Holi Hai

আমার ছেলেবেলা।ছেলেবেলার দিন।পড়তে বসা,খেলতে যাওয়া,খাওয়া দাওয়া,রাতে রোজকার ঘুম।প্রায় একই রকম ডেইলি রুটিন।প্রতিটি দিন যেন জেরক্স মেশিনে ফোটোকপি।নিয়ম কানুনের ঘেরাটোপে একঘেয়েমি আসে।আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।মা বাবার মুখে তাই ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনলেই মনে হতো খোলা আকাশের নিচে একরাশ টাটকা বাতাস।বেড়াতে যাওয়া মানেই পড়াশোনার ছুটি।ক্ষণিকের অবসর।এই কিছুক্ষণের বিরতিই ছিল আমাদের শৈশবের স্বরলিপি।

আমরা তখন ছিলাম দিল্লির বাসিন্দা।ঘুরতে যেতাম দিল্লির আশেপাশের জঙ্গলে।জঙ্গলের সৌন্দর্য,গাছগাছালি,সবুজের আবেশ,পশুপাখির সংকেতে উন্মুক্ত হতো নতুন দিগন্ত।দিগন্ত রেখার গভীরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে রহস্য আরো ঘনীভূত।মনে অদম্য কৌতুহল,ভয় এবং রোমাঞ্চের মিশেলে অবর্ণনীয় অনুভূতি।ভ্রমণের গন্তব্য দূরবর্তী হলে গাড়িতে যেতে যেতে মনের মাঠে জন্ম নিত হরেক রকম খেলা।শিশুবেলায় এই সমস্ত খেলার স্রষ্টা ছিলাম আমি।পথে যেতে যেতে সাদা গাড়ি,লাল গাড়ি,বাসের সংখ্যা গোনা ছিল আমার আর আমার বোনের অন্যতম খেলা।

শৈশবের ভ্রমণের মধ্যে একটা ভ্রমণের কথা আজও মনে পড়ে।চাকরির সূত্রে আমার জ্যাঠা পোস্টেড ছিলেন বিহারের চাতরায়।আমরা দিল্লি থেকে কলকাতায় আসি।ফেরার পথে বাবা বললেন চলো আমরা চাতরা যাই।বোধহয় আমার কোনও জ্যাঠতুতো দাদার বিয়ে ছিল।চাতরার কাছেই ছিল জঙ্গল।গেলাম সেই জঙ্গলে।দিনের বেলায় সকলেই জঙ্গলে যান।কিন্তু আমরা গিয়েছিলাম রাতে।জ্যাঠা সরকারি অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মচারী বলে সহজেই নৈশ ভ্রমণের পারমিশন পেলেন।রাতের অন্ধকার।হুড খোলা জিপ।জ্যাঠার হাতে স্টিয়ারিং।

গাড়ির একপাশে বাবা।বাবার হাতে স্পটলাইট।জ্যাঠা আর বাবার মাঝে আমি।আলো ছায়ার জঙ্গল পথ।নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে গাড়ি।আর আমি দেখছি জঙ্গলের অন্য রূপ।অন্য সৌন্দর্য।বন্য শুয়োর,হরিণের হাঁটা চলায় ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছিল রহস্যময়ী রাত।

ধীরে ধীরে আমার বয়স বাড়ল।অনুভূতির রং তুলিতে জুড়লো নতুন মাত্রা।সময়ের নিয়মে গত হলেন বাবা।আমি তখন চাকুরিজীবী এবং বিবাহিত।রোজগারের পরিমাণ খুবই কম।বহু বছর কোথাও ঘোরা হয়নি।কিন্তু মনের মধ্যে তীব্র  ভ্রমণের বাসনা।

১৯৯৪ কি ৯৫ সাল।আমরা গেলাম ঘাটশিলায়।বন্ধুর মেসোর বাড়ি ছিল ওখানে।ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি দেখেছি।সুবর্ণরেখা নদীতে সেরেছি স্নান।যদিও পাহাড়,নদী, সমুদ্রের তুলনায় জঙ্গল আমার অত্যন্ত প্রিয়।আমার বোনের বিয়ের পর বোন আর ভগ্নিপোতের সঙ্গে গিয়েছি করবেটের জঙ্গলে।তখন অবশ্য ছেলেবেলার গণ্ডি পেরিয়ে প্রাপ্তমনস্ক বয়সের বৃত্তে।রাতে করবেটের ফরেস্ট গেস্ট হাউসের পথে আমরা।ঠিক তখনই দেখলাম বাঘ।একদম রাস্তায়।পরের দিন আমাদের কানে ভেসে এলো রোমহর্ষক কথা।অনেকটা গল্পের মতো।সেই বাঘের লক্ষ্যবস্তু ছিল হাতির বাচ্চা।কিন্তু লক্ষ্যভেদ হয়নি।তাই মা হাতির শুড়ের আঘাতে আহত হয়েছিল বাঘ।তুঙ্গ বিন্দুতে ছিল বাঘের মেজাজ।যদিও সেই হিংস্র বাঘের দর্শন আমরা পাইনি।

আরও পড়ুন:  একরঙা রেশমি কাপড়ের গহিনে আতরমাখা নরম তুলো...বাংলার এক নবাবের খেয়ালে জন্ম বালাপোশের

ভ্রমণের সঙ্গে ভ্রমণ সাহিত্যের সম্পর্ক নিবিড়।বাবা নিয়ম করে ভ্রমণ সাহিত্য পড়াতেন।শিশুবেলায় করবেট অমনিবাস পড়েছি।এছাড়া বাংলায় পড়েছি অসংখ্য শিকার কাহিনী।চিরকালই এ্যাডভেঞ্চারের ওপর আমার আগ্রহ বেশি।তবে শুধু বাঘ সিংহের লড়াই নয়।আমার মনে জমা হতো অন্য আলো।অন্য বাতাস।মনে হতো পশুপাখি সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।জন্তু জানোয়ার হত্যার পেছনে কোনও কৃতিত্ব নেই।মানুষের মেধা আছে।বুদ্ধি আছে।উন্নয়ন কী মানুষের জানা।বাস্তব অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষ ক্রমাগত আধুনিক হচ্ছেন।এ নিয়ে সংশয় নেই।

এই বাস্তবের অন্তরালে রয়েছে আরেক অপ্রিয় সত্য।পশু পাখি হত্যা করে মানুষ নিজের বীরত্ব প্রমাণ করতে চান।আমার বাবা বলতেন,মানুষের নিজের সাহস এবং শক্তির ওপর যদি আস্থা থাকত তাহলে অস্ত্র ছাড়া মানুষ বাঘের সঙ্গে লড়াই করত।মানুষ তা করে না।মানুষ একটা কুকুরের সঙ্গে লড়াইয়ে যেতে ভয় পায়।বাঘ তো অনেক দূরের গল্প।

ন্যাচারাল হিস্ট্রির বই পড়ে আমি অনেক তথ্য পেয়েছি।সমৃদ্ধ হয়েছি পড়তে পড়তে।কীভাবে ডি এন এ ফরমেশন এবং জন্তু জানয়ারের বিবর্তন হয় —এই সব তথ্য বন্য জীবনকে চিনিয়েছে অন্যভাবে।একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।মানব সন্তানের জন্মের পর সাবলম্বী হতে লাগে বেশ কিছু বছর।অন্যদিকে পশুর জন্মের একদিন পরেই তারা তৎপর হয়ে ওঠে।পশুর  “স্ট্রাগল ফর এগসিসটেন্সের” ক্ষমতা মানুষের থেকে অনেক বেশি।পশু ফিজিক্যালি স্ট্রং;মেন্টালি উইক।আর মানুষ ফিজিক্যালি উইক,মেন্টালি স্ট্রং।সেই কারণে সব জন্তু মানুষকে ভয় পায়।আত্মরক্ষার জন্য মানুষ নাকি পশু হত্যা করে।জঙ্গলের পর জঙ্গল কেটে জনবসতি গড়ে।এতে পশুদের স্বাভাবিক জীবন বিঘ্নিত হয়।খাদ্যের প্রয়োজনে তারা লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।

বিশেষ করে হাতিদের জীবনধারণের একটা পদ্ধতি আছে।তারা এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়।সেই জঙ্গল ক্ষয়িষ্ণু হলে তারা আবার অন্য জঙ্গলে যায়।এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বহু বছর পর তারা আবার যখন পুরানো গন্তব্যে ফিরে আসে ততদিনে ক্ষয়িষ্ণু জঙ্গল ফুলে ফলে ভরে ওঠে।হাতির এই মাইগ্রেটরি অভ্যাসের কারণে তাদের চলাচলের পথকে এলিফেন্ট করিডর বলে।এই এলিফেন্ট করিডরগুলিতে আমরা ধানক্ষেত,চা বাগান,ব্রিজ,রাস্তা,রেললাইন অবাধে তৈরি করেছি।

আরও পড়ুন:  পুরাতনে অবগাহন...৯৩ বছর বয়সী বৃদ্ধের অ্যান্টিক সংগ্রহে থমকে আছে সময়‚ ভর করে আছে ইতিহাস

পশু ও প্রকৃতির রক্ষণাবেক্ষণ করলে মানুষও ভালো থাকবে।ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স থাকবে যথাযথ।এই সহজ সত্য মানুষ বুঝেও বোঝেন না।ভ্রমণের মাধ্যমে এইসব যেমন জেনেছি,তেমনই ন্যাচারাল হিস্ট্রি পড়ে আমি এ্যাস্থেটিকস বুঝেছি।

পৃথিবীতে যখন অক্সিজেন কম ছিল তখন ছোট ছোট অরগ্যানিজম হতো।তারপর অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ার ফলে ডায়নোসরের মতো বড় আকারের জন্তু দেখা গেল।বর্তমান পরিবেশে আবার অক্সিজেন কমছে।আজ থেকে হাজার বছর পরে হয়ত মানুষের আকার আকৃতি ছোট হবে।একেই বলে ইভোলিউশন।

আমরা জঙ্গলে সব সময় বাঘ সিংহ খুঁজি।কিন্তু বাঘ সিংহই এক মাত্র ওয়াইল্ড লাইফ নয়।এক-একটা গাছে অফুরন্ত ওয়াইল্ড লাইফ থাকে।কীটপতঙ্গ,পাখি আরো কত কি।একটা বড়ো গাছ মানে ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি।প্রাকৃতিক এই উপলব্ধি আমার চেতনায় আলো ফেলেছে।আমি পালামৌ’র ন্যাশোনাল পার্ক দেখেছি।এর অবস্থান বেতলায়।এখানেও প্রচুর পশুপাখি।এবং এই সময় থেকে আমি ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি শুরু করি।কেউ ক্যামেরায় পাখির ছবি তুললেই সেটা ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি হয় না।ফোটোগ্রাফার হওয়া মুখের কথা নয়।

আমাকে অভিনেতা বলা যেতে পারে।কারণ অভিনয় আমার পেশা।আমি নিজেকে কখনই ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফার বলি না।আমার সেই প্রতিভা আর দক্ষতা নেই।আমি একজন টুরিস্ট।ক্যামেরা নিয়ে পশুপাখির ছবি তুলি।সেটা এ্যাওয়ারনেসের জন্য।বন্য প্রাণী সংরক্ষণের বার্তা আমি মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করি।আমাকে এ্যাক্টিভিস্ট বলা যেতে পারে।

আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক জঙ্গল —পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন আর উড়িষ্যার ভিতরকণিকা।ভিতরকণিকা, সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে ভরপুর।এই অরণ্যে রয়েছে সল্ট ওয়াটার ক্রোকোডাইল।এই কুমিরের দৈর্ঘ প্রায় কুড়ি বাইশ ফুট।আর সুন্দরবনের অরণ্য বৈচিত্রপূর্ণ।বাঘ ছাড়াও রয়েছে পাখি,ভোঁদড়  ,কুমির,কাকড়া,মাছ,সাপের মতো প্রাণী।

সন্দীপ রায়ের “রয়েল বেঙ্গল রহস্যের”শুটিংয়ে আমি নিজের হাতে বিষধর কেউটে ধরেছি।ওই কেউটের যে বিষ দাঁত ভাঙ্গা হয়নি,সেটা জানতাম না।শটের পর ট্রেনার আমাকে বললেন ওই সাপের বিষ দাঁত ভাঙ্গা হয়নি।আমি ট্রেনারকে বললাম— সাপ হাতে আর শট দিতে পারব না।ট্রেনার আমাকে আশ্বস্ত করার পর আবার সাপ ধরলাম।সেই অর্থে আমার ভয় করেনি।কারণ আমার মনে হয় কেউটের বিষ আমাকে মারার পক্ষে যথেষ্ট নয়।আমাকে মারার জন্য আরো বিষধর সাপের প্রয়োজন।

আরও পড়ুন:  বাড়তি যত্ন নিন বাড়ির বয়স্কদের

তবে জঙ্গলে এ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি আমার অনেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে।গণ্ডার আর হাতি একবার আমাকে তাড়া করেছিল।জঙ্গলের ডকুমেন্টারি শুট করার সময় গরুমারার অরণ্যে সাপ লাফিয়ে ছোবল মারতে এসেছিল।হাতির পিঠে চড়ে একবার জঙ্গলে ঘুরছি।হাতি এমন ভাবে গাছের গা ঘেষে গেল যে আমার পায়ের হাড় ভাঙ্গার উপক্রম।এতো কিছুর পরেও জঙ্গলের নেশা আমাকে ছাড়েনি।আরো ডকুমেন্টারি করার ইচ্ছে আছে।বয়সের ভারে আর পেরে উঠব কি?মনে হয় না।জীবনের সব ইচ্ছা পূর্ণ হয় না।তাই স্মৃতিতেই থাক ভ্রমণের রূপ রস গন্ধ।

NO COMMENTS